রবিবার | মার্চ ০৭, ২০২১ | ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭

সম্পাদকীয়

পর্যালোচনা

ঝুলন্ত তারের জঞ্জাল সমাধানে করণীয়

ড. আদিল মুহাম্মদ খান

সম্প্রতি ঢাকা শহরে ঝুলন্ত তার অপসারণে সিটি করপোরশনগুলো জোরালোভাবে উদ্যোগ নেয়া শুরু করলে তার ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সবার আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। ন্যূনতম শৃঙ্খলা না মেনে ও এলোমেলোভাবে টানানো নগরের বড় রাস্তা থেকে অলিগলি পর্যন্ত সম্প্রসারিত এসব ঝুলন্ত তারের মাধ্যমে নগরবাসী বিদ্যুৎ, টেলিফোন, ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট চ্যানেল ও অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তি সেবা পেয়ে আসছে। ফলে ঝুলন্ত তার অপসারণের বিষয়টিকে নগরবাসীর অনেকেই স্বাগত জানালেও প্রয়োজনীয় বিকল্প ব্যবস্থা না করে তার কেটে ফেলায় নাগরিক সেবায় বিঘ্ন ঘটেছে প্রবলভাবে, কেননা কভিড মহামারীর এই বিশেষ সময়ে ইন্টারনেটসহ তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিকমিউনিকেশনের ওপর মানুষের নির্ভরতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে পড়েছে। ঝুলন্ত তার কাটার প্রতিবাদে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) ও কেবল অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব), ইন্টারনেট ও কেবল টিভি পরিষেবা বন্ধসহ ধর্মঘটের হুমকি দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর উদ্যোগে অচলাবস্থার সাময়িক সমাধান হলে এবং নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে ঝুলন্ত তার সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খোঁজাটা আমাদের একান্ত প্রয়োজন। 

২. শহরের অপরিকল্পিত ও সমন্বয়হীনভাবে সম্প্রসারিত বিভিন্ন সেবা সংস্থার ঝুলন্ত তারের কারণে প্রায়ই বিভিন্ন দুর্ঘটনাও ঘটে। উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎ পরিবাহী তারের সঙ্গে ইন্টারনেট, টেলিফোন ও কেবল টিভির তারের নেটওয়ার্ক এলোমেলোভাবে টানা থাকার কারণে বিদ্যুতায়িত হওয়া কিংবা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরেই নগরবাসীর উদ্বেগের কারণ। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা এসব তার ছিড়ে মাঝে মাঝেই দুর্ঘটনা ঘটে। কখনো কখনো অগ্নিকাণ্ডেরও কারণ ঘটায়।

অন্যদিকে এই পরিষেবা লাইনগুলোকে ভূগর্ভে নিয়ে গেলে সেক্ষেত্রেও নিরাপদ সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে বেশকিছু ঝুঁকি রয়েছে। আমাদের দেশ বৃষ্টিপ্রবণ হওয়ায় ভূগর্ভস্থ ডাক্ট লাইনে পানি প্রবেশ করলে সেক্ষেত্রেও নিরাপত্তা ঝুঁকির সঙ্গে সঙ্গে সেবা বিঘ্নিত হওয়ারও ঝুঁকি থেকে যায়। ফলে বাংলাদেশের আবহাওয়া, জলবায়ু ও মাটির বিশ্লেষণে ভূগর্ভস্থ পরিষেবা অবকাঠামোগত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন। 

৩. অপরিকল্পিত ও এলোমেলোভাবে টানা তার নগর নান্দনিকতার প্রতিবন্ধক এবং শহরের সৌন্দর্যহানি করে—ব্যাপারটা সরলীকরণ করলে হয়তো পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে ভুল হবে। পরিকল্পিতভাবে তারের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হলে এবং তারের খুঁটিগুলোকে নান্দনিকভাবে ডিজাইন করা গেলে সেগুলোও নগরশৈলীর অংশ হতে পারে। 

৪. ভূগর্ভে তারের সঙ্গে অন্য পরিষেবাগুলো যেমন গ্যাস, ড্রেনেজ লাইন প্রভৃতির সমন্বয়ের মাধ্যমে ইউটিলিটি ডাক্টের মাধ্যমে সব পরিষেবাকে একসঙ্গে আনতে পারলে তুলনামূলকভাবে খরচ কমানো সম্ভব হয়। পক্ষান্তরে, পৃথকভাবে বিভিন্ন সেবার জন্য আলাদা আলাদা ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো তৈরি করা লাগলে আমাদের নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। ফলে প্রয়োজনীয় নগর এলাকার কোন কোন অংশে ভূগর্ভস্থ ইউটিলিটি ডাক্ট নির্মাণ করা সম্ভব, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করার মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। 

৫. ঝুলন্ত তারকে শহরের ভূগর্ভে সড়কের নিচে নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি ডাক্ট তথা পরিষেবা টানেল করার ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হওয়ায় অনেক শহর ভূগর্ভস্থ টানেল পদ্ধতি ব্যবহার করেনি। ইউরোপের ইংল্যান্ড, জার্মানির মতো শহরে এ পদ্ধতির ব্যবহার দেখা গেলেও এশিয়ার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে অন্যতম পরাশক্তি জাপানের রাজধানী টোকিও শহরের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের অল্প কিছু এলাকায় টেলিকমিউনিকেশন ও বিদ্যুৎ সেবা ভূগর্ভে নেয়া হলেও অবশিষ্ট এলাকায় এয়ার কেবল বা এরিয়াল কেবল পদ্ধতিতে পরিষেবা বিতরণ করা হচ্ছে।

৬. কেবল সার্ভিস পরিষেবা ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কে নেয়ার বিবেচনায় অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু হচ্ছে, এ পদ্ধতির সম্ভাব্য ব্যয়ের বিপরীতে প্রাপ্ত সুবিধাদির তুলনামূলক বিশ্লেষণ। একই সঙ্গে যে বিবেচনাটি অতি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হচ্ছে ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কে কেবল সেবাদানের যে অতিরিক্ত খরচ, তার ব্যয়ভার কে বহন করবে—এ প্রশ্নটি। মুক্ত বাজার অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত ব্যয়ভার গ্রাহকের ওপরই আপতিত হবে। করোনা-উত্তরকালে ইন্টারনেট একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক সেবা হিসেবে পরিগণিত, সেক্ষেত্রে আমাদের উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সব শ্রেণীর মানুষের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে ইন্টারনেট, কেবল সেবা থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের শহরে নিম্ন, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। সেই কারণে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কেবল সেবা প্রদানের সিদ্ধান্তের প্রভাবে এ সেবাগুলো অনেকেরই সক্ষমতার বাইরে চলে যায় কিনা, সে বিষয়টিও নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে। ফলে পুরো বিষয়টি নিয়ে আর্থসামাজিক এবং পরিকল্পনাগত-প্রকৌশলগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। 

৭. ঝুলন্ত তারের ভূ-উপরস্থ অবস্থান থেকে মাটির নিচে ইউটিলিটি ডাক্টের মধ্যে প্রতিস্থাপন করার জন্য এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সেবা সংস্থার মধ্যে আন্তরিক সমন্বয় ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ সেবা দেয়া সম্ভব। উন্নত দেশে সাধারণত স্থানীয় নগর সরকার বা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে সব সেবা সংস্থার কাজ পরিচালিত হয়। ফলে আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ে জটিলতা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এর বিপরীতে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় বিভিন্ন সেবা সংস্থা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। এ সংস্থাগুলোর সার্বিক কর্মকাণ্ডের ওপর সিটি করপোরেশনের প্রভাব ও নজরদারি দুর্বল এবং ফলে বিদ্যমান কাঠামোয় সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সম্মিলিতভাবে ও সুসমন্বয়ের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সেবা দেয়া প্রায় অসম্ভব; যার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে সাম্প্রতিক ঝুলন্ত তার অপসারণ প্রক্রিয়ায়ও। ফলে সিটি করপোরেশনের ক্ষমতার পরিধি না বাড়ানো হলে কিংবা কার্যকর নগর সরকার কাঠামো তৈরি করা না গেলে ভূগর্ভস্থ পরিষেবা লাইনের মাধ্যমে টেলিকমিউনিকেশন ও অন্যান্য পরিষেবা প্রদান করা হলে জনভোগান্তি বাড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল । 

৮. বাংলাদেশের অধিকাংশ নগর এলাকার খুব অল্প অংশই পরিকল্পনামাফিক গড়ে উঠেছে, রাজধানী ঢাকা শহরও এর ব্যতিক্রম নয়। ঢাকা শহরের সড়ক বিন্যাস সুপরিকল্পিত নয়, সড়কের ক্রম অনুযায়ী পরিকল্পিতভাবে রাস্তা গড়ে ওঠেনি এবং অধিকাংশ সড়কের প্রস্থ ১২ ফুটেরও কম। এ শহরের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে বিভিন্ন অলিগলির বাস্তবতা পরিকল্পিত এলাকার সড়ক বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অথচ এই অপ্রশস্ত, অবিন্যস্ত গলির ভেতর অসংখ্য ভবনে বসবাসরত মানুষ ইন্টারনেট, কেবল টিভির পরিণেবা নিয়ে থাকে। আমাদের সড়ক নেটওয়ার্কের বিদ্যমান বাস্তবতায় এসব অলিগলির ভেতর ভূগর্ভের ভেতর দিয়ে কেবল লাইন নেয়াটা সম্ভবপর হবে কিনা, সে বিষয়ে পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।      

৯. বিদ্যমান নগর এলাকায় ভূগর্ভে কেবল সিস্টেম তৈরি করার তুলনায় নতুন শহরের পরিকল্পনামাফিক করাটা অনেক সহজ। আমাদের ঢাকার অদূরে পূর্বাচল শহরের পরিকল্পনার শুরুতেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া গেলে ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক লাইনসহ কেবল সিস্টেম সহজে গড়ে তোলা যেত। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে সে উদ্যোগ তখন বাস্তবায়ন করা যায়নি। ফলে পূর্বাচল শহরে এরই মধ্যে বিদ্যুতায়নের জন্য সড়কে সনাতন প্রক্রিয়ায় ওভারহেডেড পদ্ধতিতে ঝুলন্ত তার দিয়ে লাইন টানানোর কাজ করা হয়েছিল।

বিলম্বে হলেও পূর্বাচলকে আধুনিক শহর গড়ে তোলার লক্ষ্যে শতভাগ ঝুলন্ত তারমুক্ত শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার, যার অংশ হিসেবে পূর্বাচল শহরে মাটির নিচ দিয়ে বৈদ্যুতিক তার নেয়ার জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, যা সফল হলে বর্তমানে ওভারহেড লাইনের মাধ্যমে যেসব বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে অপসারণ করা হবে।

তবে পূর্বাচলে শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ নয়, গ্যাস, টেলিফোন, টেলিকমিউনিকেশনসহ সব সার্ভিসকে  ভূগর্ভস্থ পরিষেবা লাইনের মাধ্যমে নিতে পারি কিনা, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা দরকার।  পূর্বাচল প্রকল্পের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শেষ হওয়ার আগেই যদি পরিকল্পনামাফিক আমরা ভূগর্ভস্থ পরিষেবা লাইন তৈরি করতে পারি, সেক্ষেত্রে আমাদের খরচ তুলনামূলকভাবে কম হবে। পূর্বাচল এলাকায় মানুষের বসবাস শুরু করার আগেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারলে সরকারের ব্যয়সাশ্রয় হবে এবং সার্বিকভাবে জনস্বার্থ নিশ্চিত হবে।

১০. মাটির নিচ দিয়ে মৌলিক পরিষেবা লাইন স্থাপনের ব্যাপারে সিলেট শহর আমাদের কাছে এরই মধ্যে উদাহরণ তৈরি করেছে।  সিলেট নগরীতে দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ লাইনের সঞ্চালন কার্যক্রম শুরু হয়েছে নগরের দরগাহ সড়কে।   

সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ‘বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প’-এর মাধ্যমে নগরের আম্বরখানা থেকে বন্দরবাজার, পূর্ব দরগা গেট থেকে হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজার, চৌহাট্টা থেকে বাগবাড়ী পয়েন্ট এবং শাহজালাল উপশহরের কয়েকটি ব্লকেও ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ লাইন চালুর সিদ্ধান্ত হয়। প্রায় সাত কিলোমিটার জায়গায় এ লাইন নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও খুলনা শহরে এবং বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুতের তার ভূগর্ভে নেয়ার উদ্যোগ চলমান আছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ইন্টারনেট-কেবল টিভি সেবাদানকারী সংস্থা, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের অভাবে এরই মধ্যে এসব প্রকল্পের ধীরগতি কিংবা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য লক্ষ করা যাচ্ছে না। 

১১. সুশৃঙ্খল তার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নগরে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে এবং একই সঙ্গে কার্যকর ও নান্দনিক নগর পেতে গেলে আমাদের মোটাদাগে তিন ধরনের বিকল্প নিয়ে কাজ করা যেতে পারে। 

প্রথমত, ওভারহেড পদ্ধতির মধ্যে শৃঙ্খলা আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার মাধ্যমে ওভারহেড অবকাঠামোগুলোর সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা ও নান্দনিক ডিজাইনের মাধ্যমে কেবলগুলোর সুন্দর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে ব্যয়সাশ্রয়ী এবং সহজে ও কম সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য। 

দ্বিতীয়ত, ভূ-অভ্যন্তরে ডাক্ট বা টানেল না করে ভূগর্ভস্থ কেবলিং সিস্টেমের মাধ্যমে তারকে ভূ-অভ্যন্তরে প্রতিস্থাপিত করা, যা ওভারহেড পদ্ধতির চেয়ে তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল এবং বাস্তবায়নে বেশি সময় লাগে।  

তৃতীয়ত, ভূগর্ভস্থ ডাক্ট টানেল পদ্ধতি, যা মাটির নিচ দিয়ে নির্মিত বিশেষ ধরনের প্যাসাজওয়ে; যা মূলত চারপাশে পরিবেষ্টিত মাটি ও পাথরের মধ্য দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে খননকাজ পরিচালনার মাধ্যমে নির্মিত। এ পদ্ধতিতে ভূগর্ভস্থ টানেলের মধ্য দিয়ে নাগরিক বিভিন্ন পরিষেবা, যেমন গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া যায় এবং রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ছাড়াই রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করা যায়। তবে এক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় অনেক বেশি এবং বাস্তবায়নে অনেক বেশি সময় লাগে। একই সঙ্গে বিভিন্ন পরিষেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধনের দরকার এবং সাধারণত নগর সরকার বা মেট্রোপলিটন গভর্মেন্টের মতো কর্তৃপক্ষের অধীনে সব পরিষেবা থাকলে সেবা প্রদানের উত্কর্ষ বজায় রাখা সহজ হয়। 

১২. উপরোক্ত পদ্ধতির বাইরে উচ্চ পদ্ধতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার মাধ্যমে তারবিহীন দ্রুতগতির ইন্টারনেট প্রযুক্তি ‘ওয়াইম্যাক্স’-এর আওতায় নগরে পরিষেবা দেয়া সম্ভব। অনুরূপভাবে তারযুক্ত কেবল টিভির বিকল্প হিসেবে ডিটিএইচ (ডিরেক্ট টু হোম) প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা দেয়া সম্ভব, যা এরই মধ্যে বাংলাদেশের কিছু এলাকায় চালু হয়েছে। একসময় কথা বলার জন্য কেবলনির্ভর টেলিফোন ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে পৃথিবীব্যাপী মোবাইল সার্ভিসের বিস্তৃতি ঘটেছে। বস্তুত, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি এগিয়ে যায়, নগরের পরিষেবা ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন ধরনের নতুন কৌশল ও ধারণার উন্মেষ ঘটে। 

১৩. সার্বিক বিবেচনায় নগর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত নগর সংস্থাগুলোর পারস্পরিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ, কারিগরি দক্ষতা, অর্থনৈতিক পর্যালোচনা, গ্রাহকদের সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি লাভ-ক্ষতির আনুপাতিক হিসাবের নির্মোহ  বিশ্লেষণের মাধ্যমে কেবল সার্ভিস ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। একই কৌশল শহরের সব এলাকার ও সব ধরনের শ্রেণী-পেশার জন্য কার্যকরী নয়—পরিকল্পনার এই মৌলিক শিক্ষাটিও আমাদের মনে রাখতে হবে। ঝুলন্ত তারের ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে এগোলেই নগর কর্তৃপক্ষগুলো সমাধান খুঁজে পাবে বলে আমরা মনে করি। আর সব ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে সর্বোচ্চ মানের পরিষেবা নিশ্চিত করাটাই নগর কর্তৃপক্ষদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, নাগরিক হিসেবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।  


ড. আদিল মুহাম্মদ খান: নগর পরিকল্পনাবিদ ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন