আর্টিস্টরা কেবল ছবি আঁকেন না, বিখ্যাত ব্র্যান্ডও তৈরি করেছেন

ছবি: নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা

নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা ক্যানভাসে রঙ-তুলি দিয়ে আঁকার পাশাপাশি পারফরম্যান্স আর্ট, ভিডিও ইনস্টলেশন ও ইলেকট্রনিক আর্টেও কাজ করছেন। তার কাজের প্রদর্শনী হয়েছে এশিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। ২০১৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন উইমেন ইন লিডারশিপ (উইল) নামে একটি প্লাটফর্ম। এটি নারী শিল্পীদের অর্থনৈতিক উদ্যোগ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান আহরণ এবং বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে। নারী শিল্পীদের উদ্যোগ, উইলআর্ট নিয়ে প্রিমা কথা বলেছেন নভেরার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শানজিদ অর্ণব

উইমেন ইন লিডারশিপ (উইল) সৃষ্টির প্রেক্ষাপটটা জানতে চাই

শিল্পী হিসেবে আমার দীর্ঘ ২৭ বছরের ক্যারিয়ার। শুধু শিল্পী নই, আমি অ্যাক্টিভিস্ট, উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেকে গঠন করেছি। ২০০২ সালে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে আমার প্রথম ডিজিটাল আর্ট শো হয়। আমি গত ১৬ বছর ব্যান্ড ফোরামের ডিরেক্টর হিসেবে আছি। অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কনসালট্যান্ট ছিলাম। চারুকলার প্রথম বর্ষ থেকেই আমি এগুলোর সঙ্গে যুক্ত। একবার ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম দেশে এসেছিল একটি প্রজেক্ট নিয়ে। টেন্ডার কল করেছিল তারা। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। পাঁচদিনের কাজটি দেখে তারা অবাক হয়েছিল এবং তারা বুঝতে পেরেছিল আমি আগে থেকে কিছু জানতাম না। আমি কাজ করতে করতে শিখেছি। এভরিথিং ইজ ক্রিয়েটিভিটি। ব্র্যান্ড ফোরামে কাজ করতে গিয়ে মনে হলো করপোরেটে মেয়েদের কোনো ডেভেলপমেন্ট নেই। ওরা চাকরিতে এক জায়গায় আটকে থাকে। বিষয়টি ভীষণভাবে ভাবাল—আমার কাজে যেহেতু নারী প্রাধান্য পাচ্ছিল, নারীর আঁকা এবং নারীর ক্ষমতায়ন দুটোই আসছিল। মনে হলো ছবিতে নারীকে আঁকাই সবকিছু না। আমার আঁকা ছবি এত টাকায় বিক্রি হচ্ছে, মানুষ আমাকে বাহবা দিচ্ছে। কিন্তু সমাজের কিছু হচ্ছে না। তখন আমার মনে হলো আর্ট যদি সমাজকে কিছু না দেয় তাহলে ভবিষ্যতে আর্ট দিয়ে কোনো লাভ হবে না। আমার স্বপ্ন জাগল মেয়েদের ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করব। পৃথিবীতে কোনো আর্টিস্ট নেই যারা এ নিয়ে কাজ করেছেন। এগুলো লিডাররা করেছে। আমি অক্সফোর্ডে একটি প্রস্তাব করছি এটিকে সাবজেক্ট করতে। কী করে আমার আর্ট ট্রান্সফর্ম হয়ে একটি প্লাটফর্ম হয়ে গেল সে বিষয় নিয়ে। 

আমি যখন দেখলাম আমার বিমূর্ত নারীরা কোনোভাবেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারছে না তখন উইলআর্টের জন্ম হলো। সেখান থেকে আমরা মেন্টরিং শুরু করি দিনব্যাপী নারীদের ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা হবে। ২০১২ সালে বাংলাদেশে আর কোনো প্রতিষ্ঠানে এটি হয়নি। এ প্লাটফর্মের যে পাওয়ার তা আমি চার-পাঁচ বছর পর দেখলাম। অনেক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোও ভালো, তবে সেখানে নারীর ভেতরের কোনো বোধ জাগ্রত হয় না। আমি সেটিই করেছি। 


উইলআর্ট কী করতে চায়?

উইলআর্ট কখনই কাউকে বলবে না কী করতে পারবে। কেউ লিডারশিপ, আর্ট, বিজনেস যেকোনো কিছু করতে পারে। 

আর্টিস্টরা প্রত্যেকেই কিন্তু একজন উদ্যোক্তা। উইলআর্টে নারীদের উৎসাহিত করা হয়েছে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য। নিজেদের সক্ষমতা বোঝার। কর্মক্ষেত্রে যেন তাদের অধিকার রক্ষা হয়, তারা যেন বিকশিত হতে পারে। আর্টিস্টরা সমাজকে ধারণ করেন, সমাজের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। আর্টিস্টদের মাধ্যমেই সমাজের অবস্থান আমরা জানতে পারি। সেই আর্টিস্টদের যদি আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে না পারি, তাদের মূল্য বাড়বে না। শুধু আঁকাআঁকি দিয়ে মূল্য বাড়বে না। নজরুল যখন বলেন, ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন, খুঁজে ফিরি তারে আপনায়।’ কিংবা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনই লীলা তব, ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ জীবন নব নব।’ আর্টিস্ট নতুন নতুন জীবন তৈরি করবে। শুধু আঁকা তার কাজ নয়। আমরা আঁকি, কোথায় দিলে বিক্রি হবে ভাবি, কার কাছে বিক্রি হবে ভাবি, কেমন ফ্রেমে সুন্দর লাগবে ভাবি, কীভাবে এক্সিবিশনে দিলে ‍সুন্দর লাগবে ভাবি। প্রতিটি জায়গাই বিজনেসের অংশ। এক্সিবিশনের আগে আমরা গ্যালারি নির্ধারণ করি। বিজনেসে অফিস নির্ধারণ করা হয়। আর্টের দাম দিই। বিজনেসম্যানরাও তাই করেন। অথচ আর্টিস্টরা দাবি করেন তারা বিজনেস বোঝেন না। তিনি আসলে বোঝেন, কিন্তু ধারণ করেন না। 

আপনারা এখন কী ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন?

উইলআর্টের এবার একটা ছোট আলোচনা সভা হয়েছে। এতে আর্টিস্টরা নিজেদের কথা বলেছেন। খুব দ্রুত এটা একটা সামিটে রূপান্তর হবে। আগামীতে স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম করবে। দেখা যাবে তিনদিনের সফরে বাংলাদেশের আর্টিস্ট অন্য দেশে যাবেন। উদ্যোগী হওয়ার জন্য কানেক্টিভিটির প্রয়োজন হয়। ধরা যাক, একজন আর্টিস্টের সঙ্গে একটা ডিজাইন হাউজকে ট্যাগ করে দিলাম। আর্টিস্টদের মার্কেট আছে। আর্টিস্টরা কেবল ছবি আঁকেন না, পৃথিবীর বিখ্যাত অনেক ব্র্যান্ড আর্টিস্টরা তৈরি করেছেন।

উইলআর্ট তাহলে একজন শিল্পীকে উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে নিতে চায়?

শুধু উদ্যোক্তা নয়, উইলআর্ট একজন আর্টিস্টের সামনে তার সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরে। কেবল শিল্পী হিসেবে নয়, উদ্যোক্তা ও লিডার হিসেবে আরো নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কারের সম্ভাবনা তাদের সামনে হাজির করে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন রোকেয়া সাখাওয়াত আছেন বলেই বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষিত হয়েছে। তেমনই আমি আমার ফিলোসফির জায়গা থেকে মেয়েদের এ প্লাটফর্মটা তৈরি করে দেব।

ডিপ টেক, এনএফটি ও এআই শিল্পীদের জীবন, ক্যারিয়ারকে কীভাবে প্রভাবিত করবে?

এনএফটি যেকোনো ইমেজকে ডিজিটালি কনভার্ট করতে পারে। এখন তো সবই ডিজিটাল। ডিজিটাল হলে তো একই পেইন্টিংয়ের প্রচুর প্রিন্ট থাকে। আর্টিস্ট যদি এটা না বোঝেন, তাহলে আগামী দিনগুলোয় কীভাবে ডিল করবেন? আজকে যারা মিড ক্যারিয়ারে আছেন, তারা পিছিয়ে যাবেন। নলেজ বেজড আর্টের বিকল্প নেই। এনএফটি, রোবোটিকস, এআইকে আর্টিস্টরা যেভাবে এক্সপ্লোর করবেন, সেটা ভিন্ন পর্যায়ে নিয়ে যাবে তার শিল্পকে। উইলআর্ট এটা শুরু করেছে। আমার প্রথম ভার্চুয়াল শো হয় ২০০০ সালে। অথচ এখনো দেশে অনেক আর্টিস্টের একটা ওয়েবসাইটও নেই। উইলআর্ট এসব বিষয় নিয়ে কাজ করবে। আর্টিস্টরা আর কী কী জায়গা এক্সপ্লোর করতে পারেন, সেটা তাদের সামনে উন্মোচন করে দেবেন।

করপোরেট ও আর্টিস্টরা যখন নলেজ শেয়ার করবেন, তখন তাদের জীবন বদলে যাবে। একটা ইকোসিস্টেম তৈরি হবে। সেখানে আর্টিস্টের ডিসকোর্স বিশাল। করপোরেট ফান্ড কালচারাল ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে কাজ করবে, এটা গুরুত্বপূর্ণ।

সেদিন একটা সেমিনারে গিয়েছিলাম। সব আলোচনায় দেখলাম, তারা বর্তমান নিয়ে কথা বলে। কিন্তু কথা বলতে হবে ভবিষ্যৎ নিয়ে। কারণ অ্যাচিভ করতে সময় লাগে। এজন্য স্টুডেন্টদের যুক্ত করার বিষয়টায় জোর দিচ্ছি। কারণ তারাই আগামী। তাদের মধ্যেই তৈরি করতে হবে কালচারাল ইনফ্লুয়েন্স।

উইলআর্টের সামনের দিনের কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে বলবেন?

উইল প্লাটফর্মটি ২০১৪ সাল থেকে চলছে। প্রত্যেকেরই প্রতিদিন একটা গ্রোথ হয়। আমরা একটা প্রসেসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। গত ১০ মার্চ উইলআর্টের প্রোগ্রামের প্রতিপাদ্য ছিল শিল্প স্বাধীনতায় নারী। এ প্রতিপাদ্যের আলোকে যে কাজ করা হয়েছে, তার ফল আমরা দেখছি। অংশগ্রহণকারীরা প্রভাবিত হচ্ছেন এবং নিজেরাই এগিয়ে যাচ্ছেন। আগামীতে উইলআর্ট এ স্কোপ আরো বাড়াবে। আমার একটা আইডিয়া আছে—ওউনিং, আর্নিং অ্যান্ড ভিজিবিলিটি। নারীরা নিজেকে ওউন করতে শিখবে, আর্ন করতে শিখবে এবং এসব নিয়ে ভিজিবল হবে সমাজে। এটার ওপরে উইলআর্ট যুক্ত হলো। আর্টিস্টদের এটার মধ্যে আনতে হবে। আর্টিস্টদের পয়সা লাগবে, না হলে আর্ট কীভাবে করবেন? চিন্তা কীভাবে করবেন? এটাই উইলআর্টের পরবর্তী আন্দোলন। এটা একটা বিপ্লবী আন্দোলন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন