শনিবার | সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২১ | ১০ আশ্বিন ১৪২৮

সম্পাদকীয়

শিক্ষায় মানের ঘাটতি করোনাকালে দেশে নতুন বৈষম্য সৃষ্টি করছে

. নিয়াজ আসাদুল্লাহ মালয়েশিয়ার মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অর্থনীতির অধ্যাপক। দায়িত্ব পালন করছেন সেন্টার ফর পভার্টি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (সিপিডিএস) উপপরিচালক হিসেবে। কাজ করেছেন রিডিং ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের ভিজিটিং ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের ভিজিটিং প্রফেসরিয়াল ফেলো, ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব লেবারের রিসার্চ ফেলো, এসকেওপিইতে (ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশন, ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড) ভিজিটিং রিসার্চার হিসেবে। তিনি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি বিআইডিএসের সিনিয়র ফেলো ছিলেন। কভিডের সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থা, অনলাইনে পাঠদান জনসম্পদসহ নানা বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা

 

করোনার মধ্যে সারা বিশ্বেই শিক্ষা ব্যবস্থা কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষতি অপেক্ষাকৃত বেশি। আমরা কি সহসাই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব?

শিক্ষা খাতের দুর্যোগ নিয়ে সবাই শঙ্কিত। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে করোনার প্রভাবে ৬৭ বিলিয়ন থেকে ১৪০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশের জিডিপির আকার ৩০০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। শতকরা হিসাবে এটি বিশাল অংকের ক্ষতি। করোনার কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে এবং কিছু দেশ আবার চালু করতে পেরেছে। মালয়েশিয়া শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার পর আবার বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে টানা প্রায় দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধই ছিল। এখানে সংকটটা বড় কারণে যে করোনার আগেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা একটা ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। আমার নিজের গবেষণায় দেখেছি যে গ্রামাঞ্চলে একটা শ্রেণী থেকে আরেকটি শ্রেণীতে প্রমোশনের পর শিক্ষার্থীদের সাক্ষরতায় বড় কোনো তারতম্য আসে না। যাকে আমরা বলি শিক্ষাবিহীন সাক্ষরতা। অন্যভাবে বলতে গেলে, কিশোর-কিশোরীরা সরকারপ্রদত্ত সার্টিফিকেট জিপিএ নিয়ে বেরোচ্ছে, কিন্তু সেই সাপেক্ষে তাদের শ্রমবাজারভিত্তিক কর্মদক্ষতা তৈরি হয়নি। সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় সংকট খুবই ব্যাপক। শহরাঞ্চলের বাইরে সুনির্দিষ্টভাবে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা সরকারের ওপর নির্ভরশীল। যারা শহরে আছেন, তাদের জন্য ব্যক্তি খাতে উচ্চমানের শিক্ষা ব্যবস্থা আছে কিন্তু কে শিক্ষাটা পাবে তা নির্ভর করে ব্যক্তি পরিবারের আয়ক্ষমতার ওপর। বিদ্যমান বৈষম্য এবং শিক্ষায় মানের ঘাটতি করোনাকালে আরো নতুন বৈষম্যের সৃষ্টি করছে, যার দায় সরকারের ওপর বর্তায়।

করোনা দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল কি?

বাংলাদেশের জন্য করোনার মতো দুর্যোগ মোকাবেলায় শিক্ষা ব্যবস্থায় কী ধরনের প্রস্তুতি থাকা উচিত, সে রকম কোনো চিন্তা সরকারের ছিল না। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সরকার উপকূলীয় এলাকায় ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট অনেক প্রকল্প চালু করেছে। যে কারণে এখন ঘূর্ণিঝড় হলে আগের মতো মানুষ মারা যায় না। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যে আরো ভয়াবহ রকমের দুর্যোগে আক্রান্ত এবং নতুন আরেকটি দুর্যোগ এলে শিক্ষার ক্ষেত্রে তা কীভাবে মোকাবেলা করব, সে ধরনের কোনো চিন্তা-পরিকল্পনা ছিল না। সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে আজ হঠাৎ করে শিক্ষার সংকট আরো বড় হয়ে উঠেছে। অথচ করোনা মোকাবেলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিক্ষা ব্যবস্থা রি-ইনভেন্ট করেছে, রিমবিলাইজ করেছে, শিক্ষা অবকাঠামোগুলোকে ঢেলে সাজিয়েছেএমন দেশ চীন মালয়েশিয়া খুব দ্রুতগতিতে তারা অফলাইন থেকে অনলাইন শিক্ষায় চলে গেছে। ফলে পাঠদানে ছেদ (লার্নিং ডিসকন্টিউনিটি) ব্যাপক আকারে হয়নি। সেই তুলনায় বাংলাদেশে পাঠদানের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সরকারের কিছু উদ্যোগ ছিল, যেগুলো প্রশংসার দাবি রাখে। যেমন রেডিও এবং টেলিভিশনভিত্তিক দূরশিক্ষা। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নে বড় ধরনের সমন্বয়ের অভাব ছিল। সমরূপভাবে ডিজিটাল ডিভাইড বা প্রযুক্তি অভিগম্যতার ক্ষেত্রে বড় বৈষম্য বিদ্যমান। দুটো প্রক্রিয়ার সমন্বয়হীনতার কারণে বাংলাদেশে কিছু উদ্যোগ নেয়া সত্ত্বেও লার্নিং কন্টিনিউটি বা পাঠদানের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। করোনার আগেই শিক্ষার মান বিবেচনায় বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে ছিল, এখন পিছিয়ে পড়ার হারটা আরো বেড়ে গেছে। অনেকেই বলছেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় করোনার অভিঘাতের ক্ষতি আমাদের পুরো জিডিপির এক-চতুর্থাংশের সমপরিমাণ হবে। এটি খুবই উদ্বেগজনক।

অনেকেই বলছেন, এখন ঝরে পড়ার হার অনেক বেড়ে যাবে। এতে নতুন করে কিছু সামাজিক সংকটও দেখা দেয়ার শঙ্কা করা হচ্ছে। আপনি বিষয়গুলো নিয়ে অনেক দিন ধরেই গবেষণা করছেন। আপনার বিশ্লেষণ কী বলে?

করোনাসংক্রান্ত যেসব চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে এসেছে, সেগুলো বহুমাত্রিক। বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, বিভিন্ন শ্রেণী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার যে প্রতিক্রিয়া, তাও অসম। যেমন অসময়ে ঝরে পড়া, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী মেয়ে সন্তানরা। এক্ষেত্রে একটা বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে যে শহরাঞ্চলে ঝরে পড়ার ঝুঁকি ছেলেদের কোনো অংশে কম নয়। বস্তি এলাকায় শিশুশ্রম খুবই স্বাভাবিক প্রবণতা এবং শিশুদের বিভিন্ন শিল্প-কারখানার কাজে ব্যবহার করা হয়। তবে গ্রামের প্রেক্ষাপটে বেতনভিত্তিক শ্রমবাজার ততটা সক্রিয় নয়। সেক্ষেত্রে ঝরে পড়ার ঝুঁকিটা মেয়েদের বেশি। বয়ঃসন্ধির সময় হলে মেয়েকে নিয়ে মা-বাবা চিন্তিত হয়ে পড়েন। সামাজিক নিরাপত্তার বিষয় চলে আসে। পরিবার একজন সদস্যের ওপর ব্যয় কমাতে পারলে আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে বলে মনে করে। চিন্তা থেকে অনেকেই মেয়েকে বিয়ের পথে ঠেলে দেন। তার কারণে গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের ঝরে পড়ার ঝুঁকিটা একটু বেশি। পাশাপাশি আরেকটা বিষয় হলো যৌতুক প্রথা। বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেখানে যৌতুক প্রথা চালু আছে, সেখানে অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে মেয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে যৌতুক অর্থায়ন সম্ভব হয় না বিধায় বাল্যবিবাহ সাময়িকভাবে কমে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মুহূর্তে এটা পরিষ্কার নয় যে করোনায় বাল্যবিবাহ কমেছে নাকি বেড়েছে।

আমরা দুই বছর ধরে বাংলাদেশের ৮০টা গ্রামের বিবাহযোগ্য মেয়ের ওপর গবেষণা করছি। করোনার এক বছর পরে আমরা আবার তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলাপ করেছি। খতিয়ে দেখব যে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে করোনার কেমন প্রভাব পড়েছে। আমাদের গবেষণায় গত বছর কিন্তু তেমন কোনো বড় পরিবর্তন লক্ষ করিনি। তবে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ বেড়েছে। কিন্তু আমরা যদি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় বিষয়টিকে চিন্তা করি, তাহলে বলব যে এখনো আমাদের কাছে স্পষ্ট কোনো চিত্র আসেনি। এটি একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটাকে যথাযথ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় খতিয়ে দেখতে হবে।

মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশ কভিডের সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখার ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

আমি একটু পেছন থেকে শুরু করতে চাই। আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগে মালয়েশিয়ার সরকার বাংলাদেশের বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে শিক্ষক নিয়ে যেত। তৎকালে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ব্যবস্থার অঞ্চলে যথেষ্ট সুনাম ছিল। আমাদের শিক্ষকদের একটা আঞ্চলিক চাহিদা ছিল। আজ ২০২১ সালে দাঁড়িয়ে পুরো বিষয়টি উল্টো হয়ে গেছে। মালয়েশিয়া উচ্চশিক্ষার দিক থেকে অনেক এগিয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র্যাংকিং বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মালয়েশিয়ার একটা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ২০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মালয়েশিয়ার একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেখানে বিশ্বের শীর্ষ ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও নেই। শিক্ষার গুণগত মানে অগ্রগামী দেশটির শিক্ষা খাতে সুব্যবস্থাপনা করোনা সংকট মোকাবেলায় বাড়তি সহায়তা জুগিয়েছে। মালয়েশিয়ার সরকার অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং পরিকল্পিতভাবে নির্দেশনা দিয়ে গাইডলাইন তৈরি করে পুরো দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করোনার মধ্যে একটা একীভূত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে। ফলে এক সপ্তাহের জন্যও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান কিংবা পরীক্ষার সময় সূচির ব্যাঘাত ঘটেনি।

এত অল্প সময়ের মধ্যে মালয়েশিয়া কীভাবে পাঠদানের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করল?

এর একটা ইতিহাস আছে। পাঁচ বছর ধরে সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি মাসের একটি সপ্তাহ -লার্নিং করার জন্য বাধ্যতামূলক করেছিল। তখন অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিল, এর প্রয়োজনীয়তা কী? উত্তরে সরকার বলেছিল, যদি ভবিষ্যতে কখনো কোনো দুর্যোগ আসে তখন আমরা যেন ক্যাম্পাসে সশরীরে না এসে পাঠদান চালিয়ে যেতে পারি, এটা তারই প্রস্তুতি। করোনা সংকটের সময়ে মালয়েশিয়ার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা অনুশাসনে সফলতা শিক্ষার বিষয়ে তাদের দূরদর্শিতারই পরিচয়। তারা চার-পাঁচ বছর আগেই সংকটের সময়ে কীভাবে ডিজিটাল টেকনোলজির প্রয়োগে পূর্ণসক্ষমতায় উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া যায়, তার প্রস্তুতি নিয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উচ্চশিক্ষা খাতে যে দূরদর্শিতা, ফিউচার ওরিয়েন্টেশন এবং ক্রাইসিস রেজিলিয়েন্ট সিস্টেমের উন্নয়ন, তার কোনোটাই বাংলাদেশে দেখা যায়নি; বরং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা সমন্বয়ের অভাব বিরাজমান। ইউজিসি আছে কিন্তু এত বছরেও তারা একটি কার্যকর টেকসই উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। দুর্যোগের সময় কীভাবে পাঠদান চালিয়ে যাওয়া যাবে, তার কোনো চিন্তাভাবনা তাদের ছিল না। আজ করোনার সময়ে এসব প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনসংক্রান্ত ঘাটতি আরো প্রকট হয়ে উঠছে। এখন কিছু মৌলিক বিষয় সামনে আনতে হবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশ থেকে এতটা গোছানো এবং তারা এতটা দূরদর্শী হলো কীভাবে?

সেক্ষেত্রে একটা বিষয় সামনে চলে আসে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে কখনই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের শিকার হয়নি। এখানে রাজনীতির কোনো প্রয়োগ নেইসেটা উপাচার্য, অধ্যাপক বা অন্য যেকোনো শিক্ষক কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগ, যা- বলুন না কেন। এখানে রাজনীতিমুক্ত পরিবেশে নিয়োগ হয় কেবল যোগ্যতার ভিত্তিতে, একজন শিক্ষকের পাণ্ডিত্যের ভিত্তিতে, একাডেমিক অর্জন গবেষণার বিচারে। বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে যারা শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় আছেন, তারা কর্মজীবনে গবেষক হিসেবে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা। তাদের কাছ থেকে দুর্যোগের সময় একটা কার্যকর ব্যবস্থাপনা আশা না করাটাই স্বাভাবিক। সেটাই কিন্তু হয়েছে। মালয়েশিয়া বা পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় যাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তারা ব্যক্তিগত জীবনে শিক্ষকতা, গবেষক ব্যবস্থাপকতিন ক্ষেত্রেই সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তারই স্বীকৃতি এসেছে যখন তাদের আরো উচ্চপদের নেতৃত্ব দেয়া হয়েছে। ধরনের কার্যকর নেতৃত্বেরই প্রতিফলন ঘটেছে মহামারীকালীন শিক্ষা ব্যবস্থাপনায়। তারা দক্ষতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ওপর দুর্যোগের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলা করেছে। করোনাসৃষ্ট আজকের পরিস্থিতি থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজাতে হবে, ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত আমাদের বিশ্বদ্যািলয়ের ব্যবস্থা বদলাতে হবে। আজ আমরা শিক্ষা খাতে যেসব সংকট দেখছি, তার অনেকটাই রাজনীতিকীকরণের ফল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শিক্ষা খাতে যে অগ্রগতি দেখছি, তার অন্যতম কারণই হলো রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত আমাদের প্রতিবেশী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে কিছু ভালো শিক্ষা গ্রহণ করা এবং তাদের সফলতা কীভাবে এসেছে তা খতিয়ে দেখা। একই সঙ্গে দেশের স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে শিক্ষা ব্যবস্থা রাজনীতিমুক্ত করা।

আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা বলছিলাম। বাংলাদেশ কি এর জন্য প্রস্তুত ছিল বলে মনে করেন?

যেসব দেশে আইনের শাসন আছে সেখানে মহামারী সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে সামাজিক সেবা প্রদান প্রথায় একটা ইতিবাচক পরির্বতন আসছে। কেবল প্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহার সেবার মান নিশ্চিত করে না। পাশাপাশি সম্পূরক অবকাঠামো থাকা জরুরি। উদাহরণস্বরূপ বলতে গেলে, ধরনের অসংগতির দেখা মেলে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে। আমাদের সরকারি স্কুল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মধ্যে দায়বোধের সংকট নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। কর্মক্ষেত্রে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের একটি সর্বজনীন সমস্যা। এটি আমাদের প্রশাসন ব্যবস্থার মৌলিক ঘাটতির প্রতিফলন। যে দেশে একজন অধ্যাপক বিশ্ববিদ্যালয় চলাকালীন যথারীতি সময়ে বা নিয়মিত যথারীতি পাঠদান করেন না, সেখানে কেবল অনলাইন প্রযুক্তির ব্যবহার করোনাকালে শিক্ষা নিশ্চিত করে না।

সম্পূরক অবকাঠামোর আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতি হিসেবে সরকার স্কুলের পাঠ্যসূচিতে কোডিং শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে যাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় স্কুলে কম্পিউটার এবং তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গ্রামীণ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো আমাদের শিশু তরুণদের তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের উপযোগী করতে পারেনি। দশ বছরের শিশুদের ৫০ শতাংশের ওপরে একটি বাক্য মাতৃভাষায় সঠিকভাবে পড়তে পারে না। শিক্ষার অংশগ্রহণের হার বেড়েছে কিন্তু মানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। রকম একটি ভঙ্গুর সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে একচ্ছত্র প্রযুক্তিসংক্রান্ত বিনিয়োগ টেকসই হবে না। এতে সামাজিক অসমতা আরো বাড়বে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল আজ কেবল শহর অঞ্চলের নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমিত।

প্রযুক্তি কি শিক্ষা স্বাস্থ্য খাতে কতটা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে

একজন শিক্ষক আগে শ্রেণীকক্ষে কতটুকু একাগ্রতা, নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠদান করছেন, তার পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না। যে কারণে অনেকে এর সুযোগ নিতেন। আজ করোনায় প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা বেড়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় সম্পূরক অবকাঠামোর বড় মাপের তেমন ঘাটতি নেই। কারণেই করোনা সংকট অঞ্চলে একার্থে একটি সঞ্চালক হিসেবে কাজ করছে। করোনা মোকাবেলায় প্রযুক্তিসংক্রান্ত বিনিয়োগ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকে আরো ধাবিত করছে। মালয়েশিয়া থেকে দুটো উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

করোনাকালীন প্রযুক্তিগত সংস্কারের মাধ্যমে মালয়েশিয়া মাত্র এক বছরের মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দ্রুত সময়োচিত পদক্ষেপ এবং নীতিমালা প্রণয়নের মধ্য দিয়ে সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বজনীন অবকাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে পুরাক্রমে সব কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত সময়ে কর্মী ট্রেসিং অ্যাপ উন্নয়ন করেছে, যার দ্বারা শিক্ষক কর্মচারীরাই দৈনন্দিন কার্যক্রম তদারক করছেন।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায়ও আমূল পরিবর্তন এসেছে। দেশব্যাপী প্রতিটি নাগরিক বিদেশী কর্মী সবাই একটি ইউনিফাইড ডাটাবেজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে যথাসময়ে সরকারি উদ্যোগে কন্টাক্ট ট্রেসিং অ্যাপের বাধ্যতামূলক প্রয়োগের মাধ্যমে। এর দ্বারা আজ দেশব্যাপী ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচির সুষ্ঠু পরিচালনা সম্ভব হয়েছে। একইভাবে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের চলাচলের সঠিক পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা সম্ভব হয়েছে এবং তাদের দ্রুত সেবা প্রদান সম্ভব হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রতিটি লেকচারই রেকর্ড করতে হবে, প্রতিটি লেকচারে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ইলেকট্রনিক্যালি নিশ্চিত করতে হবে। মহামারীর সময় শিক্ষা অন্য সরকারি সেবা প্রদানে ফাঁকি দেয়ার সুযোগ নেই। প্রযুুক্তি প্রয়োগের ফলে দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি আরো দৃঢ় হয়েছে। শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদেরও আস্থা বেড়েছে। শিক্ষার্থীরা ভিডিটি পুনরায় দেখতে পারছে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ ছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, সরকারের নীতিমালা পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি অনলাইনে রূপান্তর ঘটেনি। ফলে বাংলাদেশ ডিজিটাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি নিশ্চিতের সুযোগ হারাচ্ছে।

এমনও হতে পারে যে নীতি প্রণয়নে আমাদের দায়িত্বশীলরা অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবে সংস্কারের পদক্ষেপ উপেক্ষা করেছেন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভিন্ন কারণে রেন্ট সিকিং মাইন্ডসেট বছরের পর বছর ধরে চলে এসেছে। করোনার কারণে বিভিন্ন দেশ যে সংস্কারগুলো করেছে, তার একটা বড় লক্ষ্য হলো সমাজকে রেন্ট ফ্রি করা। সুনির্দিষ্টভাবে যারা সরকারি খাতে নিয়োজিত, যারা মানুষ গড়ার কারিগর, যারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জ্ঞান দান করবেন, সুশিক্ষা নিশ্চিত করবেন, তাদের মধ্যে রেন্ট সিকিং মাইন্ডসেট থাকলে ওই শিক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে কখনো একটা জাতি দাঁড়াতে পারে না। বাংলাদেশের জন্য করোনা মহামারী ছিল একটা বড় সুযোগ। করোনা দুর্যোগের কারণে সরকার যে সংস্কারগুলো হাতে নিতে পারত, যার মাধ্যমে শিক্ষা খাতের মৌলিক দুর্বলতাগুলো দূর করা যেত, সেটি ব্যবহার করা হচ্ছে না। করোনা-পরবর্তী আমরা যে শিক্ষার্থীদের আবার শিক্ষা ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনার কথা বলছি, সেখানে ধরনের দুর্বলতা আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নকে আরো কঠিন করে তুলবে। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি ঠিক উল্টো। করোনা-পরবর্তী সময়ে তারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য লাভ করবে। এখানে আরেকটা বিষয় না বললেই নয়, করোনা সংকট-সংক্রান্ত চলমান প্রযুক্তিভিত্তিক সংস্কারগুলো টেকসই করতে মালয়েশিয়ার সরকার ২০২১ সালের মে মাসে ডিজিটাল অর্থনৈতিক ব্লু প্রিন্ট চালু করেছে। এর মাধ্যমে আগামী চার বছরের প্রযুক্তিগত সব সরকারি কর্মকাণ্ড একটি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা লাভ করবে। ধরনের সময়োচিত সুষ্ঠু নীতিমালার অভাবে বাংলাদেশ সামাজিক (স্বাস্থ্য শিক্ষা) খাতে প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের সুফল থেকে বঞ্চিত থাকবে। তবে ব্যক্তি খাতে -কমার্স ব্যবসার ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি ইতিবাচক। ব্যক্তি উদ্যোগে স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে প্রযুক্তিনির্ভর কিছু উদ্যোগ প্রশংসনীয়।

দেশে লকডাউন মানে সরকারি অফিস বন্ধ, বেসরকারি সব অফিস খোলা। এটাকে কীভাবে দেখেন?

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর করোনা দুর্যোগ মোকাবেলার একটা অন্যতম দিক হলো, নীতিগত সমন্বয়, দুর্যোগকালীন সরকার পরিচালনায় স্বচ্ছতা দুর্যোগ মোকাবেলায় রাষ্ট্রের সক্ষমতা। যখন সারা দেশকে লকডাউনের আওতায় আনা হয়, কোনো সরকারি অফিস কিন্তু তাদের সেবা প্রদান বন্ধ করেনি। পুরো সরকারই ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সেবা প্রদান করছে। আমি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছি। আমাদের প্রতিদিনই ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে কাজের রিপোর্ট করতে হয়। একইভাবে দেশব্যাপী বেসরকারি সংস্থাগুলো বাড়ি থেকে কাজের সরকারি সংস্কৃতি গ্রহণ করে। কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর জন্য সড়কপথে চলাচল পাবলিক প্লেসে জনসমাগম বন্ধ করা হয়েছে। মালয়েশিয়ায় লকডাউনে কখনই সরকারি সেবা বন্ধ ছিল না। করোনার সুবাদে দেশব্যাপী প্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রদানের এক নতুন সংস্কৃতির প্রবর্তন হয়েছে, যা কিনা সরকারি ব্যবস্থাপনায় এক অর্থে বরং আরো দায়বদ্ধতা স্বচ্ছতা এনেছে। সবকিছুই দেশব্যাপী সরকারি ব্যবস্থাপনার প্রতি মালয়েশিয়ার জনগণের ব্যাপক আস্থার এটি একটি অন্যতম কারণ। এসব দিক থেকে বিবেচনা করলে করোনা দুর্যোগ মোকাবেলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভীষণভাবে পিছিয়ে গেছে। সরকারি নীতি ব্যবস্থাপনার প্রতি অনাস্থাবাংলাদেশে লকডাউন বাস্তবায়নে জনসমর্থনের অভাবের এটিও একটি অন্যতম কারণ।

 

শ্রুতলিখন: হুমায়ুন কবির

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন