রবিবার | জুন ২০, ২০২১ | ৬ আষাঢ় ১৪২৮

সম্পাদকীয়

মে দিবস

শিল্প শ্রমিক অসন্তোষ পরিস্থিতি ও করণীয়

মো. আরিফুল ইসলাম, ড. খুরশিদ আলম

দেশে গত কয়েক বছরে শিল্প শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা বহুলাংশে কমেছে। বিশেষত ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নতি হয়েছে। তার পরও প্রতি বছর নানা কারণে কলকারখানায় বেশ কিছুসংখ্যক শিল্প বিরোধ দেখা যাচ্ছে।

শিল্পাঞ্চল পুলিশের অর্থায়নে বিআইএসআর ট্রাস্টের একটি গবেষণায় বাংলাদেশের শিল্প শ্রমিক অসন্তোষের চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৭ সালে সারা দেশে মোট ৮২টি শিল্প শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে, যা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এর অধিকাংশই ব্যক্তিমালিকানাধীন (৯৪ শতাংশ) এবং শতাংশ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কারখানায় ঘটেছে। প্রায় ৮৪ শতাংশ অসন্তোষ পোশাক কারখানায় এবং ১৬ শতাংশ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাটকল, চিনিকল, কাগজকল, জাহাজ নির্মাণ বা পণ্য উৎপাদন কারখানায় ঘটেছে।

এর মধ্যে ২৫টি কারখানায় দুই বা ততোধিক মাসের শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া ছিল। কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিক অসন্তোষ নির্দিষ্ট কোনো কারখানায় সীমাবদ্ধ না থেকে একই দাবি বা সংহতি থেকে একাধিক কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে।

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বেতন বাড়ানোর দাবিতে আশুলিয়া শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনায় নয়জন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতাসহ মোট ৩৪ জন শ্রমিক আটক হন। বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ৫৯টি কারখানা সাময়িক বন্ধ ঘোষণার পাশাপাশি দেড় হাজারের বেশি শ্রমিক ঢালাওভাবে ছাঁটাইয়ের শিকার হন। এদের মধ্যে অনেকের নামে থানায় মামলা করা হয়। এই অসন্তোষ নিয়ে দেশীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক ফেডারেশনের উদ্যোগে বাংলাদেশের ১৩টি দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। ১১ জন মার্কিন কংগ্রেসম্যান যৌথ বিবৃতি দেন। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত অ্যাপারেল সামিটে পাঁচটি ব্র্যান্ড বর্জন করার পর ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে ইস্যুটির সমাধান হয়।

পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরটিতে কমপক্ষে ১৪টি শিল্প-কারাখানার মোট হাজার ৪৫৩ জন শ্রমিক ছাঁটাই বা কর্মচ্যুতির শিকার হন। শ্রমিক অসন্তোষের এসব ঘটনায় কমপক্ষে ৩৬৯ জন শ্রমিক, ১২ জন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা, ১১ জন কারখানা ব্যবস্থাপনা কর্মী এবং ২০ জন শিল্পাঞ্চল পুলিশ আহত হন। কারখানা মালিকপক্ষ কিছু ঘটনায় শ্রমিক ফেডারেশন নেতাদের নামে থানায় মামলা করে। এছাড়া বছরটিতে গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় পণ্যপ্রতি মজুরি (পিস রেট) বৃদ্ধির দাবি থেকে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের পর আটজন শ্রমিককে আটক করা হয়।

এসব ঘটনায় সারা দেশে মোট ৩০টি যানজটের সৃষ্টি হয়, যার মধ্যে ১১টি ঘটনায় যানজট থেকে ঘণ্টাব্যাপী স্থায়ী ছিল। কমপক্ষে পাঁচটি যানজট সাত থেকে ১২ কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেলে হাজারো সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়।

৪৭০ জন শ্রমিকের ওপর জরিপ ফলাফলে দেখা যায়, শিল্প-কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের প্রধান কারণগুলো হচ্ছে মজুরি ওভারটাইম বোনাস পরিশোধে বিলম্ব (বিশেষত ঈদকেন্দ্রিক) (৭৬. শতাংশ), মজুরি (বা পিস রেট) বৃদ্ধির দাবি (৫২. শতাংশ), হঠাৎ ছাঁটাই বা কর্মহীন (কারখানা লে-অফ বা ঢাকা শহরের বাইরে স্থানান্তরজনিত কারণে ২৯. শতাংশ), দীর্ঘ সময়ের বকেয়া পারিশ্রমিক (২১. শতাংশ), ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দ্বারা মৌখিক শারীরিক অপব্যবহার (২০ শতাংশ) এবং কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ দাবি (. শতাংশ) শ্রমিকদের অসন্তোষ বহিঃপ্রকাশের ধরনগুলোর মধ্যে সাময়িক কর্মবিরতি (৮৭. শতাংশ), বিক্ষোভ-প্রতিবাদ সমাবেশ (৪৫. শতাংশ), সড়ক-কারখানা অবরোধ (৩৯. শতাংশ), ধর্মঘট (৩৩. শতাংশ), মানববন্ধন (২৬. শতাংশ) সহিংসতা-ভাংচুর (. শতাংশ) উল্লেখযোগ্য।

বছরটিতে বিভিন্ন শ্রমিক ফেডারেশনের ২২টি কর্মসূচি নির্দিষ্ট কোনো কারখানায় সৃষ্ট শিল্প বিরোধে শ্রমিকদের সঙ্গে সংহতি বা প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করেছিল। শিল্প শ্রমিকদের সাধারণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবিদাওয়া নিয়ে ফেডারেশনগুলোর ৩৬টি কর্মসূচি আয়োজিত হয়েছিল। ফেডারেশনগুলোর মধ্যে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (২৭. শতাংশ), জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন (১২ শতাংশ), গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট ( শতাংশ) ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিল ( শতাংশ) বেশি কর্মসূচি আয়োজন করেছিল। ট্রেড ইউনিয়নের দাবিগুলোর মধ্যে ঈদের আগে শ্রমিকদের মজুরি বোনাস পরিশোধ (১৯ শতাংশ), কারখানা স্থানান্তর বা লে-অফের পর শ্রম আইন-২০০৬ অনুযায়ী শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ (১৫. শতাংশ), ন্যূনতম মজুরি ১৬ হাজার টাকা নির্ধারণ (১৩. শতাংশ), কারখানায় দুর্ঘটনায় দোষীদের শাস্তি প্রদান (১৩. শতাংশ) অন্যতম। একটি কারখানার সামনে অবস্থান কর্মসূচিকালীন অতর্কিত হামলায় শ্রমিক নেতাসহ ১৫ জন শ্রমিক আহত হওয়ার ঘটনায় ফেডারেশনের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছিল।

শিল্পাঞ্চল পুলিশের তথ্যভাণ্ডার (ডাটাবেজ) অনুযায়ী, ২০১৭ সালে গাজীপুরে ১৩৯টি, নারায়ণগঞ্জে ৯১টি, চট্টগ্রামে ১৬টি এবং ২০১৮ সালের প্রথম চার মাসে গাজীপুরে ২৮টি চট্টগ্রামে সাতটি উৎপাদনমুখী কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণত সাব-কন্ট্রাক্ট ভিত্তিতে কাজ করা প্রায় ৫৭ শতাংশ ছোট-ক্ষুদ্র এবং ৪০ শতাংশ মাঝারি আকারের কারখানা বন্ধ হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তৈরি পোশাক কারখানা (আরএমজি) বন্ধ হয়, যা প্রায় ৮৮ শতাংশ।

অপর্যাপ্ত ক্রয়াদেশজনিত আর্থিক সংকট থেকে অধিকাংশ (প্রায় ৮৯ শতাংশ) কারখানা বন্ধ হয়। অন্য কারণগুলো হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ দালান (যেটি অ্যাকর্ড অ্যালায়েন্সের শর্তপূরণে ব্যর্থ) বা ভাড়া দালান (. শতাংশ), মালিকানা নিয়ে বিরোধ (. শতাংশ) ইত্যাদি। কেবল পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে হঠাৎ কারখানা বন্ধ হওয়ার দরুন পাঁচ হাজারের অধিক শ্রমিক চাকরি হারিয়ে কর্মহীন হয়ে যান।

শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে শিল্পাঞ্চল পুলিশ এবং কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডাইফি) বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে বিরোধ নিরসনে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা এবং নিয়মিত কারখানা পরিদর্শনের মাধ্যমে শিল্পাঞ্চলে মালিক শ্রমিকবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়াসটি অন্যতম। তবে কিছু ক্ষেত্রে অসন্তোষ চলাকালীন পুলিশ বল প্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এটি অস্থিতিশীল অবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি করে বলে জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৩১ শতাংশ শ্রমিক মনে করছেন। একইভাবে নানা কারণে ২০১৮, ২০১৯ কিংবা ২০২০ সালেও শিল্প শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটছে, যা গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক দেশে নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবজনিত কারণে কারখানা বন্ধ বা চালু করার দোদুল্যমান অবস্থা নিয়ে শ্রমিকদের মাঝে অসন্তোষ বিরাজ করছে।   

শিল্প শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে যা করণীয়: . ত্রিপক্ষীয় আলোচনাকে অধিক প্রাধান্য দেয়া এবং চর্চাটি অব্যাহত রাখা; . শ্রমিকদের নিয়মিত মজুরি পরিশোধের বিষয়টি শিল্পাঞ্চল পুলিশের পর্যবেক্ষণ করা; . মাসে একদিন কারখানায় মালিকপক্ষের শ্রমিকদের নিয়ে মতবিনিময় করা; . সরকারের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কারখানাগুলোর পণ্য উৎপাদন বাজারজাতের প্রতি বিশেষ নজর দেয়া; . দুর্ঘটনা এড়াতে নিয়মিত সব বিপজ্জনক যন্ত্রপাতির বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা পরীক্ষা করা; . শিল্প বিরোধ নিরসনে মালিকপক্ষ বা শিল্পাঞ্চল পুলিশের দমন নীতি গ্রহণ না করা; . কারখানা লে-অফ বা স্থানান্তরে বাধ্য হলে শ্রমিকদের যথাসম্ভব আগে জানানো কাউন্সেলিং করা এবং সম্ভাব্য বিকল্প চাকরির জন্য যোগাযোগ স্থাপন করে দেয়া; . শ্রমিক ফেডারেশনকে প্রতিপক্ষ না ভেবে শিল্প অংশীদার মনে করা; . শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি প্রদান এবং শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন না করা এবং ১০. কারখানা মালিকদের সংগঠন বিশেষত বিজিএমইএ বিকেএমইএর সক্রিয় ইতিবাচক ভূমিকা পালন করা জরুরি।

 

মো. আরিফুল ইসলাম: সাবেক গবেষণা কর্মকর্তা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোস্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট

. খুরশিদ আলম: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোস্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন