শনিবার | ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

সেই ছেলেটি ছিল, নেই

সেলিম জাহান

না, ছেলেটিকে আমি চিনতাম না নামও জানতাম না দেখা হয়নি কখনো চিনি না তার পিতাকেও কিন্তু তবু আবরার ফাহাদকে আমি চিনি কারণ আমি অভিজিৎ, দীপনদেরও চিনি পশুত্ব, সহিংসতা নৃশংসতার শিকার ওদের কেউ আমার অচেনা নয় আবরারের বাবাকেও আমি জানি কারণ অধ্যাপক অজয় রায় আর অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকও আমার চেনানা, ব্যক্তিগত পরিচিতির কারণে নয়, সন্তান হারানোর পর তাদের মুখাবয়বের সঙ্গে আবরারের পিতার আর্ত মুখের কোনো তফাৎ নেই বলে

আবরার কি রাজনীতির শিকার, সে কি প্রাণ দিয়েছে মতামতের ভেদাভেদের কারণে, সে কি চলে গেল অন্যের ক্রোধের মূল্য দিতে গিয়ে? আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হলেও আবরার আসলে আত্মাহুতি দিয়েছে নৃশংসতার কাছে, শিকার হয়েছে সহিংসতার, হার মেনেছে পশুত্বের কাছে যারা আবরারের ওপর চড়াও হয়েছিল, তারা ছাত্র নয়, তারা তরুণ নয়, তারা হয়তো মানুষও নয়; তারা নৃশংসতার ছোরা, তারা সহিংসতার তরবারি, তারা পশুত্বের রাম-দা ওইদিন শুধু আবরারের প্রাণহানি ঘটেনি, মৃত্যু হয়েছে সহনশীলতার, শুভ বুদ্ধির আর মানবতার

আমাদের সমাজে ভিন্নতা তো নতুন কিছু নয় ভিন্নতা রয়েছে সংস্কৃতির, ধর্মের, রাজনৈতিক বিশ্বাসের, আর্থসামাজিক অবস্থানের, জীবনযাপন প্রক্রিয়ার সে ভিন্নতা নিয়েও আমরা সম্প্রীতির সঙ্গে, সৌহার্দের সঙ্গে, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বসবাস করেছি যুগ যুগ ধরে কিন্তু সেই বৈচিত্র্য আমাদের শক্তিশালী করেছে দুর্বল করেনি বিরোধ কি ঘটেনি তখন, মতানৈক্য কি দেখা যায়নি, সংঘর্ষ কি বাধেনি তখন? সবই হয়েছে কিন্তু সে সবই আবার মিটিয়ে ফেলা হয়েছে বিবিধ প্রক্রিয়ায় ভিন্নতা মাত্রেই ভেদাভেদে পরিণত হয়নি


তাহলে এখন কেন সবকিছু বদলে গেল পাঁচটি কারণ বারবার আমার চিন্তা-চেতনায় উঠে আসে প্রথমত, আমাদের সমাজে মানুষে মানুষে একটি সম্পর্ক ছিল আত্মিক, অন্যটি ব্যবসায়িক আজ সব সম্পর্কই স্বার্থের সম্পর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে কোনোদিন ভাবিনি শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক অর্থের হয়ে দাঁড়াবে, ভাই-বোনের সম্পর্ক ব্যবসায়িক হয়ে যাবে, সতীর্থ বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর সম্পর্ক স্বার্থে রূপান্তরিত হবেরাজনৈতিক স্বার্থ, আর্থিক স্বার্থ, সামাজিক স্বার্থ? স্বার্থ যখন সব সম্পর্কের নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়, তখন কোনো মতভেদই সহ্য করা যায় না

দ্বিতীয়ত, স্বার্থের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক ইউ আর কিউ-এর মতো স্বার্থ যেমন বহু অর্থের চালিকাশক্তি, অর্থও তেমনি বহু স্বার্থের জোগানদার অর্থের বিনিময়ে বহু স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষ মানুষকে অপমান করতে, নিগৃহীত হতে, প্রাণহানি ঘটাতে দ্বিধা করে না বর্তমান সময়ে আমাদের তরুণ সমাজের মাঝে, আমাদের নানা ছাত্র সংগঠনের মধ্যে প্রবণতাটি প্রবল

তৃতীয়ত, স্বার্থ অর্থ যেখানে মুখ্য, সেখানে মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হবেই আত্মকেন্দ্রিকতা কতগুলো মাত্রিকতার সৃষ্টি করে, যেমন যেকোনো ব্যাপারে চরম অবস্থান নেয়া, সহনশীলতা হারিয়ে ফেলা, পরমতসহিষ্ণুতার বিলুপ্তি অবস্থায় কোনো রকম দ্বিমতের অবস্থান স্বীকার করা হয় না তুমি আমা থেকে যেকোনো দিকেই ভিন্ন হলে, তুমি আমার কাছে শুধু অগ্রহণযোগ্যই নও, তুমি আমার কাছে পরিত্যাজ্য’—এটাই আজ আমাদের সামাজিক সম্পর্কের একটা মূল সূত্র

চতুর্থত, যেকোনো বিরোধ বা মতভেদ বিবিধ উপায়ে নিরসন করা যায়বিতর্ক, আলাপ-আলোচনা, মধ্যস্থতা এমনকি বিরাগের দ্বারাও কিন্তু আজকের বাংলাদেশের সমাজে সব বিরোধের মীমাংসা করা হয় অস্ত্রের মাধ্যমে শক্তি প্রয়োগের দ্বারা আমাদের সমাজের অস্ত্রায়ণ পেশিশক্তির সংস্কৃতি বিরোধ মীমাংসার অন্য সব উপকরণকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে

পঞ্চমত, অস্ত্রায়ণের পথ ধরেই আসে নির্মমতা আর নৃশংসতা অস্ত্রের ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে গেলে নৃশংসতা সেখানে স্বাভাবিক হয়ে যায় সেটা আমরা বিশ্বজিৎ থেকে আবরার পর্যন্ত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডে দেখেছি নৃশংসতা মানুষের পাশবিকতাকে উসকে দেয় আর তাই নৃশংসতার কালে মানুষের কোনো বিচারবুদ্ধি কাজ করে না

শেষ করি তিনটি কথা দিয়ে এক. সহিংসতা, নৃশংসতা আর হত্যার প্রবণতায় শুধু আবেগমথিত হওয়াই যথেষ্ট নয়, সেখানে বিবেকচালিত হওয়া প্রয়োজন ব্যক্তিগত কাতরতাকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করা বড়ই জরুরি

দুই, গণতন্ত্রের একটি মূল স্তম্ভই হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সেই মত প্রকাশে মানুষ যদি ভীত হয়ে পড়ে, তাহলে গণতন্ত্র হারিয়ে যাবে সে জায়গাটিকে আমরা যাতে ধ্বংস না করি

তিন. আমি মনে করি, জাতি হিসেবে আমাদের একটি মনস্তাত্ত্বিক নিরীক্ষণ হওয়া দরকার মনোবিজ্ঞানীদের ব্যাপারে এগিয়ে আসা উচিত আমাদের বর্তমান অবস্থাটি তুলে ধরতে কে যেন উল্লেখ করেছিলেন, মুখোশে মুখোশে মানুষের সাথে শুয়োরের বসবাস হয়তো এটাও বলা যায়, শুয়োরের সাথে মুখোশে মুখোশে মানুষের বসবাস

 

সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন