সিল্করুট

ইউরোপীয়দের কাছে বিস্ময়কর ‘বেগম’

সোনিয়া তাসনিম  

বেগম সামরুর প্রতিকৃতি। শিল্পী অজানা। সূত্র: ক্রিস্টি’জ

This woman has an uncommon share of natural abilities, with a s trength of mind rarely met with, particularly in a female. The natives say that she was a born politician, has allies everywhere, and friends nowwhere.’ (Mrs. Deane’s Tour, p.149)

সাবলীল বাক্যটির সৌষ্ঠব শব্দ গাঁথুনিতে মূর্ত হয়েছেন আঠারো শতকের মিরাট নিকটবর্তী শক্তিশালী রাজ্য সারধানার শাসক। ইতিহাসে যার পরিচয়, বেগম সামরু নামে। সামান্য নর্তকী থেকে সারধানার শাসক হয়ে ওঠা জোয়ানা নোবিলিস সম্বার বলে পরিচিত এই রমণীর জীবন এক আশ্চর্য রহস্য বলয়ে আবৃত। ভারতবর্ষের বৈচিত্র্যময় ইতিহাসে বিস্মৃতপ্রায় নামগুলোর মাঝে বেগম সামরু অন্যতম। মাথায় পাগড়ি, হাতে একটি বিরাট হুঁকার নল—পূর্ব কোনো ধারণা না থাকলেও তার সেই বিখ্যাত ছবিটির দিকে তাকালে অনায়াসে বলে দেয়া যায় ইতিহাসের এক শক্তিশালী নারী চরিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। এ নারীর জীবনদর্শন তথা রাজনৈতিক কূটকৌশল নিয়ে পণ্ডিত মহলে রয়েছে নানা মতভেদ। 

বেগম সামরুর গোটা জীবনকে বিশ্লেষণে স্পস্ট হয়ে ওঠে, তার প্রখর বুদ্ধিমত্তা, যুক্তিনির্ভর নীতি, রণকৌশল, নারী ক্ষমতায়ন, উপস্থিত বুদ্ধির অসামান্য মিশেল। ব্যক্তিগত জীবন থেকে প্রশাসনিক জীবন—সব জায়গায়ই সামরু তার চরিত্র ও কাজকর্মে বৈচিত্র্যের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন নানন্দিকভাবে।

ফরসা, খাটো গড়নের সামরু তারুণ্যে বেশ সুন্দরী ছিলেন। Geo Thomas, Mrs. A. Deaneসহ নানান ঐতিহাসিক এবং পরিদর্শকদের লিখিত বিবৃতিতে এমন তথ্যের প্রমাণ মেলে। তার সৌন্দর্য বয়ান করতে গিয়ে চিত্রকর Zophany মুগ্ধতায় ডুবে বলেছিলেন,”It is a perfect model. ফারসি ও হিন্দুস্তানি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। আলোচনা করতেন যুক্তি ও বুদ্ধির সমন্বয়ে। 

কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত সামরুর আদি নাম ছিল ফারজানা। ১৭৬৩ সালে পাটনায় ১৫০ ইংরেজ হত্যা করে পাটনার কসাই বলে কুখ্যাতি অর্জন করে নেয়া মার্সেনারি ওয়াল্টার রাইনহার্ট সম্বার ১৭৬৫ সালের কোনো এক সাঁঝে পা ফেলেছিলেন, দিল্লির চাউরিবাজারে খানুমজানের বাইজি কোঠায়। সেখানেই ১৪ বছরের সুশ্রী কিশোরী ফারজানাকে দেখে তার প্রেমে মজে যান ৪৫ বছর বয়স্ক সম্বার। পরিণয়ের এ রংধনু রঙই মূলত পাল্টে দেয় ফারজানার জীবনের নকশা। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ফারজানা ক্রমেই সম্বারের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন এবং একসময় তারা তাদের সম্পর্কের নামকরণও করেন। তবে ঐতিহাসিক অদিতি দাসগুপ্তের মতে, সামরু অবিবাহিতই ছিলেন। কারণ, দাম্পত্য সম্পর্কে জড়িয়ে গেলে তাকে হয়তো পর্দা প্রথার আড়ালে হারিয়ে যেতে হতো। রাজনীতির দৌড়ে পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার বশবর্তী হয়েই হয়তো সামরু এমন সিদ্ধান্তে এসেছিলেন। এ থেকেই অনুমান করা যায়, বেগম সামরুর কূটনীতিক কৌশল কতটুকু ক্ষুরধার ছিল। মন বিনিময় পর্বে তার রাজনৈতিক চাল থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়। কারণ, সম্বারের সঙ্গে বেঁধে নেয়া গাঁটছড়াই একটা সময়ে তাকে সারধানার শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত করে।