মঙ্গলবার | জুন ২৮, ২০২২ | ১৪ আষাঢ় ১৪২৯  

সম্পাদকীয়

গবেষণা ফলাফল

শিল্প শ্রমিক অসন্তোষ ও শিল্পাঞ্চল পুলিশ

মো. আরিফুল ইসলাম, ড. খুরশিদ আলম

শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীল পরিবেশ রক্ষার্থে বাংলাদেশ পুলিশের একটি ইউনিট হিসেবেশিল্পাঞ্চল পুলিশ২০১০ সালের ৩১ অক্টোবর যাত্রা করে। ক্রমবর্ধমান শিল্পপণ্য রফতানি আয়নির্ভর অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে ধরনের বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট প্রবর্তনে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম। এক দশক ধরেই দেশের রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ পোশাক শিল্প থেকে আসছে। শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায়ে বিভিন্ন ইতিবাচক ভূমিকা রাখায় পরবর্তী সময়েশিল্পাঞ্চল পুলিশ বিধিমালা, ২০১৭দ্বারা ইউনিটটির কাঠামো কার্যাবলি আরো সুনির্দিষ্ট করা হয়।  

সাধারণত একটি লোকাল থানায় গড়ে মাত্র ৪০-৫০ জন পুলিশ থাকে। এদিকে কেবল আশুলিয়ায় ৮০০টি কারখানায় থেকে সাড়ে লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। কোনো একটি বা একাধিক কারখানায় কোনো কারণে শ্রমিক অসন্তোষ শুরু হলে উদ্ভূত পরিস্থিতির সাময়িক নিরসনে অধিক লোকবল নিয়ে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট থাকা অপরিহার্য।

বর্তমানে শিল্পাঞ্চল পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স (উত্তরা) ছয়টি জোনের (ঢাকা-আশুলিয়া-, গাজীপুর-, চট্টগ্রাম-, নারায়ণগঞ্জ-, ময়মনসিংহ মানিকগঞ্জ- এবং খুলনা-) আওতায় জনবল মোট হাজার ৮১০ জন রয়েছে। শিল্পাঞ্চল পুলিশের কার্যক্রমের আওতায় হাজার ৪৯১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ৩৯ লাখ ১২ হাজার ৮৯৫ শ্রমিক (৫৩. শতাংশ নারী), ৬০টি এনজিও এবং ১১৬টি শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। দেশের শিল্প খাতের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ বজায় রাখা, সম্ভাব্য নৈরাজ্য নিয়ন্ত্রণ সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা প্রদানই ইউনিটের মূল লক্ষ্য। অস্থায়ী অবকাঠামো, আবাসন ব্যবস্থা বা অপ্রতুল লজিস্টিক নিয়ে ইউনিটগুলো যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে বাজেট, সরবরাহ অন্যান্য সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিলস এফইএসের তথ্যানুযায়ী, দেশে ২০০৮ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ২৫৯টি শিল্প বিরোধের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৭৫টি শিল্প বিরোধ (প্রায় ৬৮ শতাংশ) শ্রমিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। পোশাক খাতে শিল্প বিরোধের ঘটনা ২০০৮ সালে ২০৯টি, ২০০৯ সালে ১৭৯টি এবং ২০১৩ সালে ১৯৯টি ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শিল্প বিরোধ বা শ্রমিক অসন্তোষ তুলনামূলক কম। এতে শিল্পসংশ্লিষ্ট সবার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা যায়।

শিল্পাঞ্চল পুলিশের অর্থায়নে বিআইএসআর ট্রাস্টের এক গবেষণায় (২০১৮) বাংলাদেশে শিল্প শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে শিল্পাঞ্চল পুলিশের ভূমিকার একটি চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণাটিতে শিল্পসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাক্ষাত্কার ৪৭০ শ্রমিকের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়।

গবেষণা ফলাফলে দেখা যায়, অসন্তোষ চলাকালীন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিল্পাঞ্চল পুলিশ বিক্ষোভরত শ্রমিকদের বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে এবং শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়। সম্ভাব্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিল্পাঞ্চল পুলিশ শ্রমিকদের দাবি নিয়ে কারখানা মালিকদের সঙ্গে আলোচনা সমঝোতার চেষ্টা করে। অর্থাৎ অসন্তোষ নিরসনে ত্রিপক্ষীয় আলোচনায়শিল্পাঞ্চল পুলিশএকটি সক্রিয় তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা পালন করে। তবে কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বল প্রয়োগ করে, যা শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের রূপ নিয়ে কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটে।

জরিপে অংশগ্রহণকারী ৬০ শতাংশ শ্রমিকের মতে, সাধারণত শিল্পাঞ্চল পুলিশ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। কিছু ক্ষেত্রে শিল্পাঞ্চল পুলিশ কারখানা মালিকের প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করে বলে ২৯ শতাংশ শ্রমিক মনে করেন। প্রয়োজনে ডাকলে শিল্পাঞ্চল পুলিশ দ্রুত সাড়াদান করে বলে অধিকাংশ কারখানা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। আগাম তথ্য পেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রায়ই শিল্পাঞ্চল পুলিশ ইউনিফর্মে ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়।

প্রতি বছর দুই ঈদকেন্দ্রিক মজুরি-বোনাস নিয়ে উদ্ভূত শ্রমিক অসন্তোষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চল পুলিশকে বেশ তত্পর থাকতে হয়। ২০১৮ সালে শিল্পাঞ্চল পুলিশ- ঢাকা অঞ্চলের এখতিয়ারে হাজার ৯৭টি কারখানার মধ্যে ১০৭টি কারখানা ঈদুল ফিতরে মজুরি পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারে এমন আগামগোয়েন্দা তথ্যপায়। সমস্যা সমাধানের জন্য শিল্পাঞ্চল পুলিশ নিজে উদ্যোগী হয়ে ওই ১০৭টি কারখানার মালিকপক্ষের সঙ্গে আগাম বৈঠক করে। বছরটিতেও আশঙ্কা ছিল, ঈদুল ফিতরের আগে বেতন-বোনাস হবে না দেশের প্রায় হাজার ৪০০টি শিল্প-কারখানায়। অবস্থায় কিছু এনজিও শ্রমিকদের উসকে দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে বলে ধারণা ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর (বণিক বার্তা, ২০ মে ২০২০)

একটি কারখানায় শ্রমিক আন্দোলন শুরু হলে ক্রমান্বয়ে তা পাঁচ বা ততোধিক কারখানায় ছড়িয়ে সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। অনেক সময় কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করতে হয়, যা পণ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দেশে মহাসড়কে যানজটের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে বিক্ষোভরত শিল্প শ্রমিকদের রাস্তা অবরোধ করা। এক্ষেত্রে শিল্পাঞ্চল পুলিশ দ্রুত সমস্যা সমাধানে প্রাধান্য দেয়।

এছাড়া ইউনিটটির নিয়মিত কার্যক্রমের মধ্যে () বিধির সেকশন () অনুযায়ী শিল্পসংশ্লিষ্টদের সম্পৃক্ত করে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা, () স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া কারখানার তালিকা অন্যান্য তথ্যসংবলিত ডাটাবেজ রক্ষণাবেক্ষণ, () নিয়মিত কারখানার মালিকপক্ষ শ্রমিকপক্ষ উভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, () আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা (স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধন, শ্রমিকদের মজুরি নিয়মিত দেয়া হচ্ছে কিনা) উল্লেখযোগ্য।

শিল্পাঞ্চল পুলিশের নিয়মিত টহল থাকায় শিল্পাঞ্চলে ছিনতাই অন্য কিছু অপরাধ (যেমন ঝুট ব্যবসাসংক্রান্ত বিরোধ) কমেছে বলে প্রায় ৮৩ শতাংশ শ্রমিক মনে করেন। প্রায় ৬১ শতাংশ শ্রমিক শিল্পাঞ্চল পুলিশের সার্বিক পারফরম্যান্সের ওপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। যেখানে উত্তরদাতারা মতামত প্রদানে গতানুগতিক থানা পুলিশের আচরণ ব্যক্তি অভিজ্ঞতাগুলো দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন বলে অনুমান করা যায়। তবে বাংলাদেশ পুলিশের অন্যান্য ইউনিটের তুলনায় পরিসংখ্যান অনেকটাই আশাব্যঞ্জক বলে মনে করা যায়। যদিও মাঠ পর্যায়ে তথ্যসংগ্রহকালীন উত্তরদাতাদের অনেকেই শিল্পাঞ্চল পুলিশের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট নিক্ষেপ, আটক বা মামলার হুমকি দিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন থেকে সরে আসতে চাপ দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন।

২০১৭ সালে ঢাকা অঞ্চলে শিল্প বিরোধসংক্রান্ত মামলা হয়েছিল পাঁচটি (মোট ঘটনা ২৪৫টি), চট্টগ্রামে ১৭টি এবং ময়মনসিংহে মাত্র তিনটি। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর১৭ পর্যন্ত পরিসংখ্যান পর্যালোচনায়শিল্প বিরোধক্রমে নিম্নমুখী দেখা যায়। শিল্পাঞ্চল পুলিশ প্রবর্তনের পর শিল্প খাত বিশেষত তৈরি পোশাক খাতেমালিক-শ্রমিকবিরোধ কমেছে বলে প্রায় ৮৩ শতাংশ শ্রমিক মত দিয়েছেন। এদিকে কারখানা মালিকপক্ষের প্রায় অধিকাংশই শিল্পাঞ্চল পুলিশের ভূমিকাকে খুবই ইতিবাচকভাবে দেখছেন।

শিল্পাঞ্চল পুলিশের আরো ইতিবাচক ভূমিকা পালনে যা করা দরকার: . ‘কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডাইফি) সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বিতভাবে কাজ করা, . শিল্পাঞ্চল পুলিশ বিধিমালায় বর্ণিত আটটি দায়িত্ব কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করা, . পেশাদারিত্ব বজায় রেখে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা, . অসন্তোষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অযাচিত বলপ্রয়োগ না করা, . শিল্প বিরোধসংক্রান্ত মামলা তদন্তে স্থানীয় থানা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় থাকা, . শ্রমিক সংগঠন কারখানা মালিক সংগঠনের সঙ্গে মাসিক মতবিনিময় করা, . নারী শ্রমিকদের রাতের বেলা যাতায়াতে নিরাপত্তা প্রদানে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা, . জনবলে নারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো, . শ্রমিকদের মাঝে গুজব প্রতিরোধে সতর্কতামূলক প্রচারণা চালানো এবং ১০. ইউনিটের সব সদস্যেরপাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম)’ শ্রম আইন-২০০৬বিষয়ক প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি।

 

মো. আরিফুল ইসলাম: সাবেক গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোস্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট

. খুরশিদ আলম: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোস্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট

[email protected]

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন


×