সিল্করুট

নিমকনামার নোকতা

গঙ্গা-যমুনা-মেঘনা বদ্বীপে লবণ উৎপাদন প্রসঙ্গে

স্বাধীন সেন

অধ্যাপক কুদরাসদের প্রবন্ধে উপস্থাপিত গোলাকার চুল্লির ধ্বংসাবশেষ

লবণ, নুন, নিমক—এখন আমরা যে নামেই ডাকি না কেন, লবণের ইতিহাস গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বব্দীপ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জবানের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। তবে লবণের সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের যাপনের ঐতিহাসিক লিপ্ততা নিয়ে সমাজবিদ্যার বিভিন্ন শাস্ত্রের গবেষকদের মনোযোগের ঘাটতি লক্ষণীয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের লিখিত সূত্রে আদিকাল (অন্ততপক্ষে প্রাক-সাধারণ চতুর্থ-তৃতীয় শতাব্দী থেকেই) বিভিন্ন প্রতিবেশে লবণের উৎস, উৎপাদন, আহরণ, ব্যবহার, বিপণন, উৎপাদনের বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। পাহাড়, খনি কিংবা মাটি থেকে লবণ উৎপাদন-সংগ্রহ-নিষ্কাষণের উল্লেখ এসব সূত্রে যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ব্যাধি নিরাময়কারী হিসেবে কিংবা দ্রব্যাদি সংরক্ষণ কারণ হিসেবে অথবা ধর্মীয় বিভিন্ন আচারে ব্যবহৃত উপাদান হিসেবে বিভিন্ন ধরনের লবণের ব্যবহারবিধির প্রসঙ্গও। গরু বা মহিষের মতো গৃহপালিত প্রাণির খাদ্য, লবণমুক্ত জমির লবণাক্ততা বাড়ানোর উপাদান, বিভিন্ন দ্রব্য পরিশোধনে বা শুদ্ধীকরণে নুনের প্রয়োগ ও ব্যবহার দৈনন্দিন যাপনের অংশই বলা যায়। ‘নুন খাই যার, গুণ গাই তার’-এর মতো বচনে, অথবা নিমকহারাম বা নিমকহালালের মতো শব্দের ব্যঞ্জনায় বদ্বীপের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, আনুগত্য, ইমানদারি ও দোস্তির দ্যোতক হয়ে উঠেছে লবণ। নুনের বা লবণের মতো ভালোবাসার কাহিনীতে পিতা ও কন্যার মধ্যকার সর্বোৎকৃষ্ট ভালোবাসার প্রকাশও ঘটে নুনের বা লবণের উপমায়। লোকায়ত জীবনে বা বনেদি ও প্রাতিষ্ঠানিক দরবারি রীতিতে বিভিন্ন উদ্ভাসে লবণের বা নিমকের উপস্থিতি এ অঞ্চলে। খুঁজলে তুলনীয় কাহিনী বা কথন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলেও পাওয়া যাবে হয়তো।

দক্ষিণ এশিয়ার বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন বিভিন্ন বাণিজ্য কেন্দ্রের বা বন্দরের সংলগ্ন বা একই প্রতিবেশে সমুদ্রের নোনা পানি বা উপকূলবর্তী নোনা মাটি থেকে স্থানীয় বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে লবণ উৎপাদনের ঐতিহ্য বা চর্চা উল্লেখযোগ্য। সময়ের পরিক্রমায় উপকূলীয় প্রতিবেশগত বদলের সঙ্গে সঙ্গে লবণ চাষ বা লবণ উৎপাদনের পদ্ধতি ও প্রযুক্তি পাল্টেছে। পাশাপাশি স্থানিক বৈচিত্র্যের ওপরে নির্ভর করেও লবণের প্রকার, ব্যবহারবিধি, চাহিদা ও উৎপাদন সম্পর্ক পাল্টেছে। লবণ উৎপাদনের ওপর কর্তৃত্ব শাসক বা সামন্তদের ছিল। অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক পণ্য হওয়ায় লবণ উৎপাদনের (খনি, বিশেষ পার্বত্য শিলাস্তর, লবণের জলজ ডিপোজিট ইত্যাদি) রাষ্ট্রীয় বা শাসকের কর্তৃত্ব বজায় রাখার প্রচেষ্টা জারি ছিল। লবণের ব্যবসার ওপর বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর থাকত। ইজারা নেয়া ও দেয়ার আইনকানুন ছিল। অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন উপ-অঞ্চলে (যেমন বরেন্দ্র, বঙ্গ, সমতটের) জমি দান করার সময় নোনা জমি বা লবণযুক্ত ভূমির ওপরের হক গ্রহীতার ওপরে বর্তাত। 

২.

স্থানীয় বিভিন্ন গবেষকের লেখালেখিতে তারও আগে থেকে অবিভক্ত বাংলা ও বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলে এবং সুন্দরবনের মধ্যে থাকা লবণ উৎপাদনের বিভিন্ন নিদর্শন এবং গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা হদিস পাই। যেমন সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোর-খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে আমরা এমন উল্লেখ পাই। ঔপনিবেশিক আমলে অবিভক্ত বাংলায় উপকূলীয় অঞ্চলের লবণ উৎপাদন নিয়ে বিভিন্ন গবেষণার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।

গত দুই দশক বা তারও বেশি সময় ধরেই ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগর, আরব সাগরসম চীন সাগরসহ সামুদ্রিক যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং বিভিন্ন চিন্তা-প্রযুক্তি-ধর্মীয় ঐতিহ্যের বিনিময় নিয়ে গবেষণার প্রতি বিভিন্ন শাস্ত্রের গবেষকদের ঝোঁক অনেক বেড়েছে। এসব গবেষণা প্রতিষ্ঠিত স্থল/জমিকেন্দ্রিক ইতিহাস ও সামাজিক বিদ্যার বিভিন্ন অনুমান ও প্রবণতাকে প্রশ্ন করেছে। অনেক নতুন ধারণা ও বিনিময়ের বিভিন্ন মাত্রিক ধরন আর মানবীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য সম্পর্কে তথ্য আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও অনেক গবেষণায় কিছু নির্বাচিত পণ্য এবং ভাবনাচিন্তার বিনিময় ও বাণিজ্য গুরুত্ব পেয়েছে, কিছু গবেষণায় যোগাযোগ ও বিনিময়ের বহুমাত্রিকতাও উল্লেখিত হয়েছে। কেবল রেশমবস্ত্র, মূল্যবান ধাতু ও ধাতব বস্তু, চাল, মসলা, মূল্যবান সিরামিকসের মতো পণ্য না। কড়ি, লবণ, সুগন্ধি, গন্ডারের শিং, বিশেষ ওষুধি গুণবিশিষ্ট বস্তু বা গাছপালা কিংবা গাছপালা থেকে পাওয়া পণ্যসহ নানাবিধ দ্রব্য কম ও বেশি দূরত্বের বিভিন্ন বন্দরের মাধ্যমে ধাপে ধাপে পশ্চিম ও পূর্ব দিকে বিভিন্ন অঞ্চলে বঙ্গীয় বদ্বীপ অঞ্চল থেকে বা বঙ্গীয় বদ্বীপের বিভিন্ন বন্দর হয়ে সমুদ্রপথে পাঠানো হতো বা আনা হতো। ষোড়শ শতাব্দীর পতুর্গিজ লিখিত উৎস থেকে জানা যায়, তৎকালীন সন্দ্বীপ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলে চাল ও লবণ রফতানি করা হতো। সন্দ্বীপ থেকে প্রতি বছর ২০০ নৌকা ভরা লবণ বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাঠানো হতো। (১) একই সময় ও তারও আগে চট্টগ্রাম ছিল এ অঞ্চলের বৃহত্তম বন্দরগুলোর একটি। 

প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলে অবিভক্ত বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে এবং সুন্দরবনের মধ্যে থাকা লবণ উৎপাদনের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ, প্রত্নপ্রতিবেশবিদ এবং ইতিহাসবিদদের মধ্যে আগ্রহ কম এখনো। তার একটা বড় কারণ হলো বড় আকারের স্থাপনা, নগরের ধ্বংসাবশেষ এবং জনপ্রিয় পরিসরে গৌরবময় অতীতের বিষয়ে অন্ধ ঝোঁক বজায় রাখার মতো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে আমাদের অঞ্চলের প্রত্নতত্ত্ববিদ আর ইতিহাসবিদের মনোযোগ সংগতকারণেই অনেক বেশি। লবণ উৎপাদনের জন্য তৈরি করা চুল্লি ও অন্যান্য কাঠামো এবং সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন (যেমন মৃৎপাত্র) নিয়ে গবেষণা খুব কমই হয়েছে। সম্প্রতি অধ্যাপক হারমান কুদরাস ও অন্যদের লিখিত (২) এবং তারও আগে টিল হানবুথ ও অন্যদের লিখিত দুটো প্রবন্ধে (৩, ৪) লবণ উৎপাদনের চুলা সম্পর্কে আমরা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জানার সুযোগ পাই। আলোচ্য প্রবন্ধ দুটো বাংলাদেশের উপকূলীয় জমিনে ও জলের সংসর্গে লবণ উৎপাদন নিয়ে বেশকিছু উপাত্ত আমাদের সামনে হাজির করেছে।