
প্রিন্স হ্যারির স্মৃতিকথা
‘স্পেয়ার’। বলতে গেলে আকস্মিকই প্রকাশ্যে এল দীর্ঘ সময় ধরে ব্রিটিশ রাজপরিবারের চেপে
রাখা কথা। এ নিয়ে তোলপাড়-বিতর্কের শেষ নেই। বই প্রকাশের আগে প্রামাণ্যচিত্র ও একাধিক
সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক তথ্য হাজির করেছিলেন হ্যারি। এবার জানা গেল, আরো বিস্তারিত।
কেন স্পেয়ার?
রাজকীয় অভিধানে বংশের যে সন্তান পরবর্তীতে সিংহাসনে বসার জন্য নির্বাচিত হন, তাকে ডাকা হয় ‘ক্রাউন প্রিন্স’। বাকিদের বলা হয় ‘স্পেয়ার’। বর্তমান সম্রাট তৃতীয় চার্লসের পর দায়িত্ব নেবেন প্রিন্স উইলিয়াম। সে হিসেবে তার ছোট ভাই প্রিন্স হ্যারি ‘স্পেয়ার’। আর রাজকীয় প্রাসাদ ত্যাগ করা হ্যারির অবস্থানের ছাপ বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠাতে স্পষ্ট। কোনো রাখঢাক ছাড়াই দীর্ঘদিনের টানাপড়েন তুলে এনেছেন তিনি।
হ্যারি ও মেগান। ছবি: রয়টার্স
স্ত্রীকে নিয়ে কেন রাজপরিবার ছাড়েন
২০১৬ সালে আমেরিকান
অভিনেত্রী মেগান মার্কেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান প্রিন্স হ্যারি। ২০১৮ সালের মে মাসে
তারা বিয়ে করেন। ঠিক পরের বছরই তারা রাজপরিবার থেকে পৃথক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বসবাস
শুরু করেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। যা হওয়ার কথা; তা-ই হলো। সিদ্ধান্তটি অনেকের মধ্যেই কৌতূহল
সৃষ্টি করে।
স্মৃতিকথায় হ্যারির
দাবি, মেগানকে রুক্ষ্ম ও উগ্র বলে অভিহিত করেন প্রিন্স উইলিয়াম। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক
হয়ে পড়েছিল, উইলিয়াম তার শার্টের কলারে ধরে ও গলার নেকলেস ছিঁড়ে ছুড়ে ফেলে।
উইলিয়ামের উৎসাহে নাৎসি উর্দি পরেন হ্যারি
২০০৫ সালে নাৎসিদের
বাহিনীর পোশাক পরে ছবি তুলে সমালোচিত হন হ্যারি। বইতে তা নিয়ে কৈফিয়ত দিয়েছেন ডিউক
অব সাসেক্স। তার দাবি, প্রিন্স উইলিয়াম ও তার স্ত্রী ক্যাথেরিন তাকে উত্সাহিত করেছিল
তখন। ঘটনাটি নেটফ্লিক্সের প্রামাণ্যচিত্র ‘হ্যারি অ্যান্ড মেগান’-এও তুলে ধরা হয়। হ্যারি
দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন পরে। তবে শিরোনাম তার পিছু ছাড়েনি।
হ্যারির বর্ণবাদী মন্তব্য
২০০৯ সালে আরেকবার গণমাধ্যমে আসে প্রিন্সের নাম। পাকিস্তানি এক সৈন্যের প্রতি বর্ণবাদসূচক মন্তব্যের সূত্র ধরে। ধারণ করা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ছেলের পক্ষ হয়ে দুঃখপ্রকাশ করেন তখনকার প্রিন্স চার্লস। হ্যারি বারবার দাবি করেছেন তিনি বর্ণবাদী নন। পাকিস্তানি আহমাদ রেজা খানের সঙ্গে তার ভালো বোঝাপড়া। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে।
বাবা রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে হ্যারি ও উইলিয়াম। ছবি: রয়টার্স
হ্যারির জন্ম নিয়ে মজা করেছিলেন বাবা!
পিতা চার্লস সম্পর্কেও
অভিযোগ রয়েছে হ্যারির। মা প্রিন্সেস ডায়নাকে নিয়ে করা অশোভন মন্তব্যগুলোও অকপটে উদ্ধৃত
করেছেন তিনি। নব্বইয়ের দশকে ডায়নার সঙ্গে মেজর হিউইটের সম্পর্ক ছিল। সেদিকে ইঙ্গিত
করে হ্যারির জন্ম নিয়ে মজা করেছিলেন বাবা চার্লস। এদিকে ২০০৫ সালে কামিলা পার্কারকে
বিয়ে করেন তিনি। এই বিয়েতে নানা ভাবে নিরুত্সাহিত করেছেন উইলিয়াম ও হ্যারি। বিয়ের পরেও
মেনে নিতে পারেননি দুই ভাই।
তালেবান হত্যা নিয়ে বিতর্ক
রাজকীয় দায়িত্ব পালনে
২০০৭-০৮ ও ২০১২-১৩ সালে দুই দফায় আফগানিস্তানে অবস্থান করেন হ্যারি। পরে ২৫ জন তালেবান
সদস্যকে হত্যার কথা প্রকাশ করেন। এ নিয়ে ব্রিটিশ নিরাপত্তা ও সামরিক পক্ষ থেকে সমালোচনা
হয়। সে দিকেই আরো একবার আলো ফেলেছেন হ্যারি। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি আরেক দফা বিতর্ক
উঠে। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবানরাও।
রানী মৃত্যুর খবরেও টানাপড়েন
২০২১ সালের এপ্রিলে প্রিন্স ফিলিপের শেষকৃত্যে রাজপরিবারে ফেরেন হ্যারি। তখনো ভাই উইলিয়ামের সঙ্গে তার টানাপড়েন বিদ্যমান। অনেকেই ভেবেছিল সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু হয়নি। গত বছর রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পরও কমেনি। হ্যারির দাবি অনুযায়ী, বাবা চার্লস তাকে সর্বপ্রথম রানীর স্বাস্থ্যের অবনতির ব্যাপারে জানান। উইলিয়ামকে মেসেজ দিয়েও প্রত্যুত্তর পাননি। পরবর্তীতে চার্লস তাকে ডাকলেও মেগানের ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানান। প্লেন অবতরণের সময়ে মেগানই তাকে ফোন করে জানায় মৃত্যুর কথা।
মা প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে হ্যারি। ছবি: রয়টার্স
কোকেন নিতেন হ্যারি
নিজের জীবনের কালো দিকগুলোও
তুলে আনতে সংকোচ বোধ করেননি প্রিন্স। সতেরো বছর বয়সে তিনি কোকেন নিতেন। সেজন্য তাকে
রিহ্যাবেও পাঠানো হয়েছিল। বয়স্ক এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কও ছিল।
বারো বছর বয়সে ১৯৯৭
সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মাকে হারিয়েছেন হ্যারি। মায়ের শেষকৃত্যের সময় থেকে পরবর্তী জীবনে
নিজের মানসিক অবস্থা ও পরিবারের সাথে সম্পর্কের নানা দিক তুলে ধরেছেন। তবে এই সব আনীত
অভিযোগ নিয়ে এখনো নিশ্চুপ বাকিংহাম প্যালেস।
এর আগে গত ডিসেম্বরে আরেক দফা হইচই তোলেন এই রাজকীয় দম্পতি। ওই সময় নেটফ্লিক্সে প্রচার হয় ‘হ্যারি অ্যান্ড মেগান’ শিরোনামের প্রামাণ্যচিত্র সিরিজ। যা নন-ফিকশন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভিউয়ের রেকর্ড গড়ে। সেখানেও উঠে আসে রাজপরিবারের বিতর্কিত কিছু বিষয়।