সোমবার | সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ | ৬ আশ্বিন ১৪২৭

প্রথম পাতা

করোনাকালে খাদ্যনিরাপত্তা বোরোর পর আউশে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই দেখা দিতে পারে খাদ্য সংকট। এরই মধ্যে চাল ও গম উৎপাদনকারী অনেক দেশ পণ্য দুটির রফতানি বন্ধ কিংবা সীমিত করার ঘোষণা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে খাদ্য উৎপাদন ও মজুদ শক্তিশালী করতে বোরোর পর আউশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। এজন্য প্রথমবারের মতো আউশে দ্বিতীয় ধাপে প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। লক্ষ্য গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ছয় লাখ টন বাড়তি চাল উৎপাদন।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বোরো আবাদে কৃষকের উৎপাদন খরচ যেমন বেশি হয় তেমনি নির্ভর করতে হয় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। সেই বিবেচনায় গত কয়েক বছরের মতো চলতি আউশ মৌসুমেও প্রথম ধাপে বীজ, সার, সেচ সুবিধাসহ নগদ অর্থ দেয়া হয়েছিল কৃষককে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এখন দ্বিতীয় ধাপে সারা দেশের প্রায় ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৪৩৪ জন কৃষককে ৪১ লাখ ৮৬০ কেজি বীজ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। 

গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) দেশে ১১ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে ২৯ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছিল। কিন্তু চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের আউশ মৌসুমে সারা দেশে প্রায় ৩৫ লাখ টন আউশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে। সে হিসেবে গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৬ লাখ টন বেশি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। 

এ লক্ষ্যে খরিপ-১ মৌসুমে উফশী আউশ উৎপাদন বাড়াতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে প্রণোদনা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলায় ৪ লাখ ৫৯ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে মোট ৪০ কোটি ১৮ লাখ ২০ হাজার ৭৫০ টাকার বীজ ডিএপি, এমওপি সার, পরিবহন ও আনুষঙ্গিক ব্যয় প্রদান করা হচ্ছে। সর্বোচ্চ ১ বিঘা জমির জন্য একজন কৃষক মোট ৮৭৫ টাকার প্রণোদনা পেয়েছেন। এ প্রণোদনা কার্যক্রম 

শেষ হতে না হতেই করোনাভাইরাসের থাবায় বৈশ্বিক খাদ্য পরিস্থিতিতে পরিবর্তন শুরু হয়। সেজন্য আউশের উৎপাদন আরো একটু বাড়িয়ে নিতে কৃষককে দ্বিতীয় ধাপে আরো সহায়তা দিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় আউশের জন্য কৃষকদের মাঝে বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি আউশ ছাড়াও মৌসুমের অন্যান্য শস্য বিশেষ করে পাট, তিল ও গ্রীষ্মকালীন সবজি আবাদে প্রণোদনা সুবিধা পাবেন কৃষক।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ) মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল বণিক বার্তাকে বলেন, আগামী আউশ মৌসুমে কৃষককে সার ও প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণের পাশাপাশি নতুন করে বীজ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। মূলত করোনা পরিস্থিতির কারণেই এটি দেয়া হচ্ছে। আগের সহায়তা কার্যক্রমে যারা তালিকাভুক্ত হয়েছেন, তারা এ সুবিধা পাবেন না। প্রতিটি কৃষক যাতে আউশ মৌসুমে এ প্রণোদনা পান, তা পর্যায়ক্রমে নিশ্চিত করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমন ও বোরো মৌসুমের মধ্যবর্তী সময় ফাঁকা জমিতে আউশ চাষ করে অতিরিক্ত ফলনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দেশে আউশের আবাদ মূলত প্রচলিত স্থানীয় জাত দিয়ে করার কারণে উৎপাদনশীলতা বেশ কম। তাই ভালো জাতের অভাবে আউশ চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন কৃষক। তাছাড়া ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ার কারণেও আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকে। 

স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত আউশের আবাদ ও উৎপাদনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর জমিতে আউশের উৎপাদন ছিল প্রায় ২৩ লাখ ৪১ হাজার টন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অর্থবছরে তা বাড়তে থাকে। এ যাবত্কালের সর্বোচ্চ আবাদ ছিল ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে, ৩৪ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। তবে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয় ১৯৭৮-৭৯ অর্থবছরে। সে সময় উৎপাদন হয়েছিল ৩২ লাখ ৮৭ হাজার টন, যদিও আবাদ হয়েছিল ৩২ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর জমিতে। পরবর্তী এক দশক উৎপাদন ৩০ লাখ টনের ঘরে ছিল। আবাদের পরিমাণও খুব বেশি কমেনি। তবে ১৯৯০ সালের পর থেকেই কমতে থাকে আবাদ ও উৎপাদন। তবে ২০১০-পরবর্তী সময়ে আবার আবাদ ও উৎপাদন বাড়তে থাকে। মাঝেমধ্যে ওঠানামা করলেও কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে আউশ আবাদে। এজন্য কয়েক বছর ধরেই আউশ আবাদে দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা। এর সুফলও আসছে। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ ১০ হাজার টনে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২১ লাখ ৩৩ হাজার টন। 

সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, পরিবেশগত দিক এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ বিবেচনায় আউশ আবাদ বাড়াতে হবে। এজন্য ভর্তুকি সহায়তার পাশাপাশি উন্নত জাতের মাধ্যমে কৃষককে আরো উৎসাহিত করতে হবে। যে পরিমাণ টাকা কৃষককে দেয়া হচ্ছে, তার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কিনা, সেটি তদারক করতে হবে। কৃষক এই টাকা নিয়ে ফসল আবাদ করলেন কিনা সেটি দেখতে হবে। আবার টাকা কৃষককেই দেয়া হচ্ছে কিনা, সেটিও দেখতে হবে। ভর্তুকির টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে প্রতিনিয়তই উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

বর্তমানে প্রতি কেজি বোরো আবাদে পানি লাগে প্রায় ৩ হাজার ২০০ লিটার। ফলে সেচের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় বোরোর চাপ কমাতে আউশ আবাদে কৃষকদের উৎসাহিত করছে সরকার। কারণ আউশে উৎপাদন খরচ কম। 

এক একর স্থানীয় জাতের আউশ আবাদে কৃষকের খরচ হয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। অন্যদিকে হাইব্রিড জাতের বোরো আবাদে খরচ প্রায় ৫০ হাজার ৪৮৩ টাকা। অর্থাৎ আউশ আবাদে কৃষকের বোরোর তুলনায় খরচ কমে প্রায় ৪২ শতাংশ। তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচ এবং সরকারের নানাবিধ ভর্তুকি সহায়তা কার্যক্রম এবং পরিবেশগত বিষয়ের কারণে আউশ আবাদ আবার জনপ্রিয় হচ্ছে।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো, আবদুর রাজ্জাক এ বিষয়ে বলেন, আউশের আবাদ ও উৎপাদন বাড়াতে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য ধরে রাখতে আউশ আবাদ বাড়ানো হবে। উচ্চফলনশীল জাতের আউশ ধান আবাদ বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি করা হবে। করোনা পরিস্থিতিতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা আরো জোরদার করতে সহায়ক হতে পারে আউশ উৎপাদন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন