সোমবার | মে ২৩, ২০২২ | ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ 

টকিজ

‘নোনা জলের কাব্য’কে ট্র্যাজেডি ফিল্ম বানাতে চাইনি

৬৪তম বিএফআই লন্ডন চলচ্চিত্র উত্সব, ২৫তম বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবসহ বিশ্বের বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উত্সবে জায়গা করে নিচ্ছে তরুণ নির্মাতা রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতে নোনা জলের কাব্য ছবিটি টরিনো ফিল্ম ল্যাব অডিয়েন্স (টিএফএল) ডিজাইন ফান্ড ২০২০- জিতেছে। চলচ্চিত্রটি নির্মাণের আদ্যোপান্ত নিয়ে সম্প্রতি টকিজের মুখোমুখি হন ছবির নির্মাতা। আলাপ করেছেন রাইসা জান্নাত

আপনার প্রথম ফিচার ফিল্ম নোনা জলের কাব্য একের পর এক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিচ্ছে। নিশ্চয় ভালো লাগছে...শুরুতেই ভালো লাগার কথা জানতে চাই।

যেকোনো বড় চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেয়া একজন তরুণ নির্মাতার জন্য বড় ব্যাপার। তবে আমার ক্ষেত্রে এটা একটু বিশেষ। কারণ প্রজেক্টে নিয়ে আমি পাঁচ বছর অতিবাহিত করেছি। ছবিটির মধ্য দিয়ে নিজের দেশকে রিপ্রেজেন্ট করছি। সবচেয়ে বড় কথা হলো দুটি সংবাদই যখন পটুয়াখালীর জেলেপাড়ার মানুষের সঙ্গে শেয়ার করেছি, তারা খুবই খুশি হয়েছেন। রকম একটা মুহূর্তের জন্যই হয়তো তারা অপেক্ষা করছিলেন। সব মিলিয়ে ভালো লাগা কাজ করছে।


আপনি বললেন, ছবিটি নির্মাণে পাঁচ বছর অতিবাহিত করেছেন। এত সময় নিলেন যে...

ফিল্ম নিয়ে স্টাডির সময় আমি শিখেছি যে ফিল্মের প্রডাকশন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার আগে ডেভেলপমেন্ট প্রক্রিয়াটি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ধাপে স্ক্রিপ্ট ডেভেলপমেন্ট, গবেষণা, টিম ফরমেশন এগুলোয় যথেষ্ট সময় দেয়ার কথা বলা হয়। হোমওয়ার্ক করে তারপর মাঠে নামা। নোনা জলের কাব্যে সেই ডেভেলপমেন্ট ধাপটি ছিল আড়াই বছরের। শুটিংয়ে সময় লেগেছে ৩৬ দিন আর পোস্ট প্রডাকশনে দেড় বছর। সম্পাদনার সময় অন্য একটি ছবির স্ক্রিপ্ট লিখতে গিয়ে কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে। সব মিলিয়ে নানা কারণে একটু সময় লেগেছে।

আপনার ছবিটি কি জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কোনো বার্তা দিচ্ছে?

হ্যাঁ। পটুয়াখালীর প্রত্যন্ত একটা চরে শুটিং হয়েছে। এখানকার মানুষ কাদা-মাটি, ঝড়-বাদলার সঙ্গে যুদ্ধ করে বসবাস করে। অঞ্চলটিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফ্রন্ট লাইন বলা হয়। আমরা সেখানে দুই মাস ছিলাম। স্বভাবতই ক্যামেরায় জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত অনেক কিছু উঠে এসেছে। স্ক্রিপ্টেও বিষয়গুলো ছিল। তবে শুটিংয়ের সময় জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জেলেদের নিত্যদিনের যুদ্ধের প্রতিফলনও উঠে এসেছে। এছাড়া সংগ্রামের মাঝেও তাদের জীবনে রয়েছে রঙ, সুখ, স্বপ্ন; তো সেগুলোও নোনা জলের কাব্যে রয়েছে। আমি এটাকে ট্র্যাজেডি ফিল্ম বানাতে চাইনি। ট্র্যাজেডির মাঝখানেও আশা আছে।

রকম বিষয়বস্তু বেছে নেয়ার কারণ?

২০০৭ সালে সিডর হওয়ার তিন-চার মাস পর গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে কিছু বন্ধুরা মিলে কুয়াকাটায় গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে একটা ক্যামেরা ছিল। সে সময় চাক্ষুষ দেখেছি সিডরের মতো একটা সাইক্লোন সেখানকার মানুষের ওপর কীরকম প্রভাব ফেলে। দেখার পর মনে হলো ছবি তুলি। এরপর ছোট ছোট জেলেপল্লী চোখে পড়ে। তখন তাদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করি। প্রান্তিক জেলেদের গল্প তো কেউ বলে না। তখন মনে হলো তাদের নিয়ে স্টাডি করি। এরপর ২০১২ সালে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আমার প্রফেসররা আমাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন ফিচারধর্মী স্ক্রিপ্ট লেখার জন্য। স্ক্রিপ্ট লিখতে গিয়ে আমার মন চলে যায় বাংলাদেশের সমতল ভূমিতে। যেখানে জেলেরা কাদা-মাটি, ঝড়-বাদলের সঙ্গে জীবন কাটায়। তখন তাদের নিয়ে লিখতে শুরু করি। ২০১৪ সালে লেখা শুরু করি। ২০১৫ সাল থেকে জেলেদের দলে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতে থাকি এবং ২০১৭-তে প্রথম টিম নিয়ে সেখানে যাই।

কভিড পরিস্থিতিতে দেশে ছবিটির প্রদর্শনী বা প্রিমিয়ার নিয়ে কী ভাবছেন?

আশা করছি থিয়েটারগুলো সরকার খুব দ্রুত খুলে দেবে। তবে খোলার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ছবিটি নিয়ে আসতে পারব না। কারণ করোনার কারণে মানুষের সিনেমা দেখার অভ্যাসে মাঝখানে বিরতি পড়ে গেছে। সে অভ্যাসটা আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। সেটা করতে পারবে স্টুডিও ফিল্ম। এক্ষেত্রে বাইরের স্টুডিও ফিল্মও আসতে হবে। দুটি মিলে যখন একটা প্রাণশক্তি ফেরত আনবে, তখন নোনা জলের কাব্যে মতো স্বাধীন ধারার ফিল্মগুলোও পর্দায় ঢুকে পড়বে। আশা করছি ফেব্রুয়ারি-মার্চে ছবিটি নিয়ে আসতে পারব।


আপনার প্রথম ছবি নিয়ে নিজস্ব মূল্যায়ন কী?

ছবিটি মূল্যায়ন করবে দর্শক। তবে আমি, চলচ্চিত্রের অভিনয়শিল্পী কলাকুশলীরা দুই মাস কাজ করতে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। অনেক জীবন শিক্ষা পেয়েছি। এগুলো ভবিষ্যতে আমাদের অনেক কাজে দেবে। আর ছবিটা কতদূর যাবে তা দর্শকই বিবেচনা করবেন।

আপনি তো একজন তরুণ নির্মাতা। অন্যান্য তরুণ নির্মাতার উদ্দেশে আপনার কী বার্তা?

প্রথমত, ছবি নির্মাণের আগে গল্পের সঙ্গে নিজের আত্মার সংযোগের বিষয়টি যাচাই করে নেয়া। একটা চরিত্র, গল্প বা জনপদের সঙ্গে যদি ব্যক্তিগত সংযোগ তৈরি হয়, তখন আপনা-আপনিই একটা সুন্দর চলচ্চিত্র বা গল্প তৈরি হয়। এজন্য ব্যক্তিগত সংযোগটা গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, প্রডাকশনের আগে ডেভেলপমেন্ট প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট সময় দেয়া। এখন করোনাকাল, তাই একটু দাঁতে দাঁত কামড়ে থাকতে হবে। অনেকেই হয়তো ট্র্যাক থেকে সরে আসতে বলবেন। তবে যদি ইচ্ছা ভালো গল্প থাকে, তাহলে অবশ্যই লেগে থাকতে হবে। আশাবাদী হতে হবে।

আগামীতে ছবি নির্মাণ নিয়ে কী পরিকল্পনা আপনার?

আমার দ্বিতীয় ছবি নিউ প্রফেট-এর কাজ চলছে। এটা সায়েন্স ফিকশন সিনেমা। ছবিটা নিয়ে টরিনো ল্যাবে আরেকটি সেকশন ফিচার ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম- চান্স পেয়েছি। এখন স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করছি। আগামী বছর শুট শুরু করতে চাই।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন