মঙ্গলবার | জুলাই ১৪, ২০২০ | ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

সম্পাদকীয়

করোনার চূড়ান্ত ‘চূড়া’র সুলুক সন্ধানে

ড. মো. হাসিনুর রহমান খান

আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিইন, লকডাউন, সোশ্যাল ডিসটান্সিং, মাস্ক, পিক, কনট্যাক্ট ট্রেসিং ইত্যাদি শব্দ-শব্দগুচ্ছ এখন বাঙালির শব্দভান্ডারকে নতুন করে ‍‘ঋদ্ধ করে’ চলেছে। গেল বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রথম যখন চীনের উহানে প্রথম করোনা শনাক্ত হলো তখন থেকেই এই শব্দগুলোর সাথে পরিচিত হতে ব্যক্তিগতভাবে আমারও অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। এখনও এই শব্দগুলোর সাথে স্বচ্ছ ধারণা নেই- আমাদের শিক্ষিত সমাজেও এমন লোক অনুপস্থিত নয়। সেদিন দেখলাম বেসরকারি এক টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে কোন এক অতিথি আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টিনকে গুলিয়ে ফেলছিলেন। এই সময়ের মধ্যে একইভাবে সরকারের একটি প্রতিষ্ঠানও জোড়ালোভাবে আমাদের সাথে পরিচিতি লাভ করে। এই প্রতিষ্ঠান হলো রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। উল্লেখিত শব্দগুলোর সহজাত অর্থ বোঝার আগেই শব্দগুলোকে আলাদাভাবে দেখার ক্ষেত্র তৈরির জন্য প্রধানত দায়ী এই আইইডিসিআর। করোনার শুরু বা তার পরের দিনগুলোতে প্রতিদিনের সংবাদ বুলেটিনে আইইডিসিআর যদি সঠিক বাংলা প্রতিশব্দের ব্যবহার শুরু করতো, তাহলে বিদেশী ভাষার এই শব্দগুলোকে আমরা হয়তো চিনতাম না। সমাজের সর্বোস্তরে এখনও যে অস্বচ্ছ ধারণা রয়েছে সেগুলি দূর হয়ে যেতো একথা বলা যায় নির্দ্বিধায়। সামাজিক দূরত্ব বেশ পরিচিত সর্বস্তরেই সোশ্যাল ডিসটেনসিং এর প্রতিশব্দ হিসেবে। ইদানিং পিক বা করোনার পিক শব্দের ব্যবহার বেড়ে গেছে। টেলিভিশন বা মিডিয়াগুলোতে এমনটি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকারের দায়িত্বশীল লোকেরাও বলেছেন আমরা করোনার পিকে যাবো অমুক দিন বা তমুক মাসে। পিকের প্রতিশব্দ হিসেবে বাংলায় চূড়া ব্যবহৃত হতে পারে খুব সহজেই এবং এটি হওয়া বাঞ্ছনীয়।
   
আমার এই লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের করোনা আক্রান্ত চূড়ান্ত পর্যায় কী হতে পারে সে ব্যাপারে আলোকপাত করা এবং অন্যান্য দেশেও এই পরিস্থিতি ক পর্যায়ে রয়েছে তা ব্যাখ্যা করা। কোন কিছুর সংখ্যা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে যায় তখন ওই সংখ্যাকে তার চূড়া বা ইংরেজিতে Peak বলা হয়। এই চূড়া হতে পারে অনেক কিছুর। তথাকথিত আমাদের দেশে করোনার চূড়া বলতে যা বলা হচ্ছে তা হলো করোনার দৈনিক আক্রান্তের সর্বোচ্চ সংখ্যাকে। এর বাইরেও অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ করোনা সংক্রান্ত চূড়া রয়েছে যেগুলোও ব্যাপকভাবে আলোচিত হওয়া দরকার যা উন্নত বিশ্বে হরহামেশাই আলোচিত হতে দেখা যায়। সেগুলি হলো করোনায় মৃত্যুর সর্বোচ্চ চূড়া, বা করোনা পরীক্ষার সংখ্যার চূড়া বা সর্বোচ্চ সংখ্যক পিপিই- দৈনিক ব্যবহৃত হতে পারে তার সংখ্যা বা সামাজিক দূরত্ব বা লকডাউনের সর্বোচ্চ চূড়া ইত্যাদি। আমাদের দেশে এগুলো নিয়ে হরহামেশাই আলোচনা হচ্ছে বা হয়েছে এমনটি চোখে পড়েনি। আক্রান্তের চূড়া জানার চেয়ে ক্ষেত্রবিশেষে অন্য চূড়াগুলির অনেক গুলি চূড়া জানা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। যেমন বর্তমানে সর্বোচ্চ করোনা পরীক্ষার সংখ্যাটি কি হতে পারে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ যা মৃত্যুর সংখ্যার বিচারেও কবে এবং সর্বোচ্চ কত মৃত্যু হতে পারে সে সংখ্যাটি জানাও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। পক্ষান্তরে আমি বলছি আক্রান্তের সর্বোচ্চ সংখ্যা কি হতে পারে এবং কবে নাগাদ হতে পারে সেটি জানা এই মূহূর্তে কম গুরুত্বপূর্ণ। কেন কম গুরুত্বপূর্ণ সে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করবো পরের দিকে। তার আগে বলে নেই এই চূড়া ও তার দিনক্ষণ জানার সম্ভবত একমাত্র উপায় হলো বিদ্যমান তথ্য উপাত্তের নিবিড় ও সুনিপুণ বিশ্লেষণ করা। আর এই বিশ্লেষণের জন্য থাকতে হবে দুটি আবশ্যিক বিষয় তা হলো যথাযথ পরিসংখ্যানিক মডেলের ব্যবহার এবং তথ্য বা উপাত্তের যথাযথ গুনগত মানের উপস্থিতি । দুটি আবশ্যিক বিষয়েই যথেষ্ট ঘাটতি আছে এমনটি পরিলক্ষিত হচ্ছে ব্যাপকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৈনন্দিন কর্মকান্ডের বিচার বিশ্লেষণ করলে। ফলে তথ্য উপাত্তের নিবিড় ও সুনিপুণ বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। ফলশ্রূতিতে উল্লেখিত চূড়াও তাদের দিনক্ষণের ব্যাপারেও সঠিকভাবে প্রক্ষেপণ করা সম্ভব নয়।

আইইডিসিআর বা সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের উচিত সঠিক তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করা বিশেষ করে আক্রান্ত ব্যক্তির অধিকতর তথ্য সন্নিবেশিত করা যেমন ডাটাবেজের মাধ্যমে প্রত্যেক আক্রান্ত ব্যক্তির পরিচয়, বয়স, পেশা, লিঙ্গ, আবাসস্থান, পরিবারের সদস্য সংখ্যা, আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে সংস্পর্শে এসেছে এমন ব্যাক্তির সংখ্যা, আক্রান্তের সম্ভাব্য কারণ হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল কিনা, হলে কবে, কখন ছাড়া পেতে হয়েছে, কী উপসর্গ দেখা দিয়েছিল, কী ট্রিটমেন্ট করা হয়েছিল, কোন কোমরবিডি ছিল কিনা, থাকলে কী ছিল ইত্যাদি। এই তথ্যগুলি উপরোক্ত চূড়ার বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনা ও প্রক্ষেপণের জন্য অতিব দরকারী। এছাড়াও রোগের প্রেগনেসিস ও আক্রান্তের বিস্তারের গতি ও প্রকৃতি কী হবে সেটা ভালোভাবে জানা যাবে। আক্রান্তের সম্ভাব্য সংখ্যা, মৃত্যুর সম্ভাব্য সংখ্যা বা অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা সক্রান্ত বিষয়ের যেমন হসপিটাল বেড, আইসিইউ বেডের সম্ভাব্য সংখ্যা ভবিষ্যতে কী হবে তার জন্য সঠিক মডেলভিত্তিক প্রক্ষেপণ করা ও তা প্রকাশ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি ইতোমধ্যে এমন প্রক্ষেপণ করে থাকে এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ না করে তাহলে তাদের মডেলভিত্তিক প্রক্ষেপণ তৈরির ব্যাপারে দক্ষতা নিয়ে জনগণের মনে সন্দেহ দেখা দিতে পারে।

ইদানিং বিভিন্ন গণমাধ্যমে সরকারের ঊর্ধ্বতন অনেকেই অবশ্য বলছেন যে একটি রক্ষণশীল প্রক্ষেপণ করা হয়েছে এবং সরকার সে অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তবে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করছে না। প্রকাশ না করার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে প্রক্ষেপণ ঠিক নাও থাকতে পারে এবং এটা নিয়ে মানুষের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। উন্নত বিশ্বসহ পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশে বিভিন্ন প্রক্ষেপণ নির্দেশ হরহামেশাই বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত প্রচার করছে। আমার জানা মতে, সেসব দেশের অভ্যন্তরে জনগণের মনে এ নিয়ে বিরূপ কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। আমার বিশ্বাস সঠিক প্রক্ষেপণ প্রকাশ করা হলে আমাদের দেশের জনগণের মধ্যে কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিবে না কারণ সবাই জানে এই করোনা মহামারীতে সবদেশেই আক্রান্ত ও সম্ভাব্য জীবনের ক্ষতি, আক্রান্তের ধরন, চিকিৎসা সেবা, নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ইত্যাদি সবদেশেই মোটাদাগে একইভাবে চলছে। যদিও দেশের সামর্থ্য ও সক্ষমতার ভেদে তার ভিন্নতা আছে। ভবিষ্যতে মৃত্যুর সংখ্যা বা আক্রান্তের সংখ্যা কী হবে সেটার সম্পর্কে করোনা মহামারীর কঠিন বাস্তবতাকে এড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষ অবাস্তব বা বিরূপ মন্তব্য করবে এটি কখনই আমার মনে হয়নি। কোনো প্রক্ষেপণই সঠিক না কিন্তু যথাযথভাবে নিরূপিত প্রক্ষেপণ সম্ভাব্য সংখ্যার একটা ভালো ধারণা দিতে পারে মাত্র। প্রক্ষেপণের সহজাত এই বৈশিষ্ট্যকে অজুহাত করে প্রক্ষেপণ প্রকাশ না করাকে কোনভাবে আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নিতে পারি না। প্রয়োজনীয় তথ্য পেলে আমাদের দেশে অনেক গবেষক আছে যারা যথাযথ প্রক্ষেপণ নিরূপণ করতে পারবে এবং বাংলাদেশের এ ব্যাপারে সক্ষমতার পরিচয় বিশ্বে তুলে ধরতে পারবে এমনটি আমি সবসময় বিশ্বাস করি। সঠিক প্রক্ষেপণ প্রকাশ করা হলে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ও অন্যান্য স্টেকহল্ডার, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এমনকি ব্যক্তিপর্যায়েও নানা আশু পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সুবিধা হবে এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় করোনা মহামারীকে রুখে দিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
 
গত ৫ মে গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ SIR মডেলের প্রক্ষেপণ করে এবং সে অনুযায়ী আক্রান্তের সর্বোচ্চ সংখ্যা মে মাসের মাঝামাঝিতে হতে পারে। আমি যখন এ লেখাটি লিখছি সে পর্যন্ত এ চূড়াটি ধরা পড়েছে ২৫ মে-তে তবে বিদ্যমান অবস্থাদৃষ্টে যা মনে হচ্ছে সেটি ধরা পরবে আরও অনেক পরে। ৪ মে বণিক বার্তাবাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রক্ষেপণ ও কিছু কথা শীর্ষক প্রবন্ধে আমি উল্লেখ করেছিলাম সর্বোচ্চ আক্রান্তের সংখ্যাটি দেখা যেতে পারে জুন মাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে। আপাতদৃষ্টিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া আক্রান্তের চূড়ায় যাওয়ার তথ্যটি ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। আবারও বলছি এই ভুল প্রমাণিত হওয়া মানেই আমাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে এমনটি নয়। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের SIR মডেলভিত্তিক প্রক্ষেপণে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিস্মিত হয়েছি কেননা SIR মডেল হলো যেকোন সংক্রামক রোগের প্রক্ষেপণের একেবারেই প্রাথমিক মডেল। করোনা সংক্রামক রোগের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাদি যেমন সামাজিক দূরত্ব, লকডাউন, হাত ধোয়া ইত্যাদিকে SIR মডেলে সন্নিবেশিত করা যায় না ফলে SIR মডেল যেকোন মহামারীর শুরুর দিকের মডেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেজন্য প্রত্যেকটি দেশ মডিফাইড SIR মডেল যেমন  SEIR, SIRD, SEIS ইত্যাদি ব্যবহার করছে যথাযথ প্রক্ষেপণের জন্য এবং যেখানে মহামারীর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাগুলোকে সহজেই একিভূত করা যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে SIR টাইপ মডিফাইড মডেল ব্যবহার করে দেখেছি যে, জুনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে আক্রান্তের চূড়ায় যেতে পারি তবে এই প্রক্ষেপণটিও অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে সাম্প্রতিক লকডাউন ও সামাজিক দূরত্বের ব্যাপক শিথিলতার কারণে। সেজন্য এটা বলা প্রায় অনিশ্চিত কবে নাগাদ আক্রান্তের সর্বোচ্চ সংখ্যা দেখতে পারবো। যদিও অনেকাংশে এটি নির্ভর করছে আমরা ভবিষ্যতে দৈনিক কি পরিমাণ টেস্ট করবো তার উপরে। সরকারি মহল হতে বলা হচ্ছে সামনের দিনগুলোতে দৈনিক ২০ হাজারে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। ফলশ্রুতিতে বলা যায় অদূর ভবিষ্যতে আক্রান্তের চূড়ায় যাওয়া হয়তো সম্ভব নয়।

আমি আগে বলেছি আক্রান্তের চূড়া জানাটা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং তার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো টেস্টের চূড়ায় বা মৃত্যুর চূড়ায় কবে নাগাদ যেতে পারি সেটা জানা । কেন গুরুত্বপূর্ণ নয়, এর দুটি ব্যাখ্যা দেয়া যাক। প্রথমটি হলো সেবাদান বা হসপিটালগুলির সেবাদানের ক্ষেত্রে সক্ষমতা বা সহনীয়তার পাল্লার সাথে জটিল আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখা যেটি তথাকথিত ফ্লাটেনিং কার্ভ বলা হয়। আক্রান্তের চূড়া জানলে এই সেবাদানের সক্ষমতার পাল্লাটিকে সর্বোচ্চ কি পর্যায়ে নিতে হবে তা জানা যাবে কিন্তু বাস্তবদৃষ্টে আক্রান্তের সংখ্যা যখন অধিক হারে বাড়বে যেটি শুরু হয়েছে মে মাসের ১০ তারিখ হতে বলে মনে হচ্ছে। তখন অধিকতর জটিল রোগীদের চিকিৎসাদানের পর্যাপ্ত হসপিটাল বেডের ( আইসিইউ) সুযোগ থাকবে না। যেটি বাংলাদেশ বাদেও অনেক উন্নত দেশেও হয়েছে। ফলে কবে নাগাদ চূড়া আসবে তা না ভেবে বরং আক্রান্তের সংখ্যাকে ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে এবং সেটি সম্ভব একমাত্র ব্যাপক টেস্ট ও কার্যকরী লকডাউন ও সামাজিক দুরত্বকে নিশ্চিত করার মাধ্যমে । রুটি-রুজি বা আর্থ-সামাজিক অবস্থার নিয়ন্ত্রিত সচলতার মাধ্যমে কিভাবে লকডাউনেও কার্যকর করা যায় সে ব্যাপারে গবেষণা করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। আক্রান্তের চূড়া জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নয় এর দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হলো আপাত মানসিক তুষ্টি বা স্বস্তি। অর্থাৎ আমরা সবাই খুশি হবো এই বুঝি করোনার দৌঁড়ছুট শেষ হতে চলেছে, আমাদের স্বাভাবিক জীবন ও কর্মকান্ড ফিরে পেতে চলেছি, দানবীয় ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা পেতে চলেছি- ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো সব তাৎক্ষণিক আশাব্যাঞ্জন ও মনতুষ্টির ব্যাপার মাত্র, তার কারণ হলো যেদেশগুলিতে চূড়া দেখা দিয়েছে তার অধিকাংশ দেশগুলিতে চূড়া পরবর্তী সময়টাতে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চূড়া পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় ব্যাপকভাবে প্রলম্বিত হচ্ছে। আরো পরিষ্কার করে বলি, এই মূহূর্তে ২৭টি দেশ রয়েছে যারা আক্রান্তের সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এই দেশগুলির মধ্যে বেশিরভাগেরই চূড়া দেখা দিয়েছে। যে দেশগুলির এখনও চূড়া দেখা দেয়নি এমন দেশ গুলির মধ্যে রয়েছে শুধুমাত্র ব্রাজিল, ভারত, পেরু, সৌদিআরব, মেক্সিকো, চিলি এবং বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের ঠিক উপরে রয়েছে সিঙ্গাপুর যেখানে চূড়া দেখা দিয়েছিল এপ্রিলের ২০ তারিখে কিন্তু এখনও বেশি হারে আক্রান্ত ধরা পড়ছে। সিঙ্গাপুরের ঠিক উপরে রয়েছে পর্তুগাল যেখানে চূড়া ধরা পরেছে এপ্রিলের ১০ তারিখে কিন্তু এখনও দৈনিক ২০০-২৫০ আক্রান্ত ধরা পরছে। পর্তুগালের ঠিক উপরে রয়েছে সুইজারল্যান্ড যেখানে চূড়া দেখা দিয়েছিল অনেক আগেই- ২০ মার্চ কিন্তু অদ্যাবধি ২০-২৫ দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। এর উপরে সুইডেন যেখানে ২৪ এপ্রিল চূড়া দেখা দিয়েছিল এবং এখন ব্যাপক হারে আক্রান্ত হচ্ছে। ২০তম অবস্থানে রয়েছে নেদারল্যান্ড যেখানে ১০ এপ্রিল চূড়া দেখা দিয়েছিল এখনও দৈনিক ১৫০-২০০ জন আক্রান্ত হচ্ছে। ১৭তম অবস্থানে রয়েছে বেলজিয়াম যেখানে ১৫ এপ্রিল চূড়া দেখা দিয়েছিল কিন্তু এখনও ২০০-২৫০ জন আক্রান্ত হচ্ছে। ৯ম পজিশনে রয়েছে তুরস্ক যেখানে চূড়া দেখা গেছে এপ্রিলের ১১ তারিখে কিন্তু এখনও ১০০০-১১০০ করে আক্রান্ত হচ্ছে। এর ঠিক উপরে রয়েছে জার্মানি যেখানে চূড়া দেখা দিয়েছিল ৭ মার্চ কিন্তু এখনও ৭০০-৮০০ করে আক্রান্ত হচ্ছে। জার্মানির ঠিক উপরে রয়েছে ফ্রান্স যেখানে চূড়া ধরা পড়েছিল এপ্রিলের ৩ তারিখে এবং এখন পর্যন্ত ৭০০-৮০০ করে আক্রান্ত হচ্ছে। ফ্রান্সের উপরে রয়েছে ইতালি যেখানে অনেক আগেই (মার্চ ২১) চূড়া ধরা পরলেও এখনও দৈনিক ৬০০-৭০০ করে আক্রান্ত হচ্ছে। ইতালির ঠিক উপরে রয়েছে যুক্তরাজ্য যেখানে চূড়া দেখা দিয়েছিল এপ্রিলের ১০ তারিখে কিন্তু এখনো ব্যাপকহারে আক্রান্তের সংখ্যা ধরা পড়ছে। যুক্তরাজ্যের ঠিক উপরে রয়েছে স্পেন যেখানে ২৬শে মার্চ চূড়া ধরা পড়লেও এখনও ৬০০-৭০০ করে আক্রান্ত হচ্ছে। সবার উপরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ২৪ এপ্রিল চূড়া ধরা পড়ে অথচ এখনও ২০০০০-২২০০০ করে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা ধরা পড়ছে।

সুতরাং উপরের পরিসংখ্যানে এটা স্পষ্ট যে আমরা চূড়া পেলেও চূড়া পরবর্তী দিনগুলিতে আক্রান্তের সংখ্যাটা প্রলম্বিত হবে। আমার মতে জুনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে চূড়া দেখা দিলেও আমাদের চূড়া পরবর্তী দুই-তিন মাস পর্যন্ত দানবীয় ভাইরাসের অজানা শঙ্কার মধ্যে বসবাস করতে হবে। সে হিসেবে সেপ্টেম্বরের দিকে আমাদের সব ধরনের স্বাভাবিক কর্মকান্ডের শুরু হতে পারে। সে পর্যন্ত অনেকটা ইমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ইতোমধ্যে হয়ে যেতে পারে। আর কিছু দিন অপেক্ষা করে বছর শেষে বহুল আকাঙ্খিত টিকার সন্ধান পেলে এই মহামারী ভাইরাসের হাত থেকে আগামী বছরের মাঝামাঝিতে মোটামুটিভাবে বাংলাদেশের মানুষ মুক্ত হতে পারবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।

লেখক: ড. মো. হাসিনুর রহমান খান
সহযোগী অধ্যাপক, ফলিত পরিসংখ্যান
আইএসআরটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন