বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২১, ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

স্কুলগামীদের ১৮ শতাংশ রোগা-পাতলা

পুষ্টিহীনতা দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হোক

ইউনিসেফের জরিপের তথ্যমতে, স্কুলগামীদের এখনো ১৮ শতাংশ রোগা-পাতলা। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, কমেছে দারিদ্র্যও। তার পরও জনসংখ্যার একটা বড় অংশ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, তারা রোগা-পাতলা। সুস্থ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তৈরিতে পুষ্টিহীনতা মারাত্মক চ্যালেঞ্জ, যা খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। একসময় খাদ্যনিরাপত্তার অর্থ ছিল জনসংখ্যা অনুপাতে যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য মজুদ থাকা। কিন্তু বর্তমানে জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের সংজ্ঞানুসারে খাদ্যনিরাপত্তা হলো দেশের সব মানুষের জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর, পছন্দমাফিক প্রয়োজনীয় খাবার যথেষ্ট পরিমাণে প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। অর্থাৎ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে সামাজিক অর্থনৈতিক সুবিধার নিশ্চয়তা। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে। পুষ্টি কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা এখনো উচ্চমাত্রার পুষ্টিহীনতার শিকার। প্রাক-বিদ্যালয়ের শিশুদের রয়েছে ভিটামিন জিঙ্কের অভাব এবং নারীরা আয়োডিনস্বল্পতায় ভুগছেন। শহরের বস্তিতে পুষ্টি পরিস্থিতি খুব নাজুক। গ্রামের অবস্থাও খুব ভালো নয়। বস্তির অধিকাংশ শিশু খর্বকায়।

উন্নত দেশগুলোর মতো প্রকট না হলেও বর্তমানে শিশুদের স্থূলতা নতুন বিড়ম্বনা তৈরি করছে। স্থূলতার কারণে শিশু-কিশোররা শারীরিক মানসিক নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। এখন অপুষ্টির পাশাপাশি শিশুদের স্থূলতা সমস্যার প্রতিও আমাদের গুরুত্বারোপ করতে হবে। শিক্ষার মূল লক্ষ্য শারীরিক মানসিক বিকাশ। প্রত্যাশিত বিকাশের জন্য অভিভাবকদেরই সতর্ক থাকতে হবে। বলা আবশ্যক, মায়েদের মধ্যে স্থূলতার বিপদ সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে জরিপ কাজে লাগবে। একই সঙ্গে বলা প্রয়োজন, স্কুলের শিক্ষকরাও শিশুদের স্থূলতা কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। শিক্ষা অধিদপ্তরের স্কুল হেলথ কর্মসূচি আরো জোরদার করা প্রয়োজন। স্কুলে মিড ডে মিল চালু করলে শিশুদের শাকসবজিসহ পুষ্টিকর খাবারে অভ্যস্ত করে তোলাও সম্ভব।

জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতেও পুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। পুষ্টিহীনতার কারণে হ্রাস পায় কর্মশক্তি কর্মোদ্যম। জন্মগ্রহণ করে খর্বকায় প্রতিবন্ধী শিশু। বিঘ্নিত হয় অর্থনৈতিক অগ্রগতি। প্রেক্ষাপটে পুষ্টিহীনতা দূরীকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী অপুষ্টি রোধে সঠিক নীতিমালা দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতে হবে। পুষ্টিসম্মত খাদ্য গ্রহণে গড়ে তুলতে হবে জাতীয়ভিত্তিক সচেতনতা। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, স্থানীয় জাতীয় পর্যায়ের সংগঠনগুলো শিশুর খর্বতা সমস্যা মোকাবেলায় কাজ করছে। তাদের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে শিক্ষার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি, সম্প্রসারিত পুষ্টি কার্যক্রম, মানসম্মত খাদ্য উৎপাদন পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণে উৎসাহিত করা। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সব দেশ থেকে অপুষ্টি দূর করতে হবে। আর ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুর খর্বতা স্বাস্থ্য ক্ষয় রোধে আন্তর্জাতিকভাবে সব লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। খর্বাকৃতির জন্য শিশুরা কোনোভাবেই দায়ী নয়। বর্তমান শিশুবান্ধব সরকার শিশুদের কল্যাণে প্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন রকম কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। দুস্থ, অসহায়, মাতৃ-পিতৃহীন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিরাপত্তা কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি সুস্থ, নিরাপদ কর্মমুখী জীবন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারের নিজস্ব উদ্যোগ, জাতিসংঘ শিশু তহবিল অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় সব শিশুকে পুষ্টি উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় আনার প্রচেষ্টা চলছে। কার্যক্রম সফল করতে পারলে শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা যাবে এবং খর্বকায় শিশুর সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে।

শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে আরো ব্যাপক পুষ্টি কর্মসূচি চালু করা উচিত। আশার কথা হচ্ছে, সরকার দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পর্যায়ক্রমে পুষ্টিসমৃদ্ধ দুপুরের খাবার প্রদানের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এতে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা যেমন হ্রাস পাবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের স্মরণশক্তি বৃদ্ধি পাবে। শিশুরা ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারবে। আনন্দ আগ্রহের সঙ্গে পাঠ গ্রহণ করতে পারবে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হারও বাড়বে। টিফিন পিরিয়ডে ক্লাস রেখে বাসায় চলে যাওয়ার প্রবণতা হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে ঝরে পড়ার প্রবণতা হ্রাস পাবে, বৃদ্ধি পাবে ভর্তির হার। পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার কারণে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। পুষ্টি সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি পড়াশোনা, খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে শিশুদের মেধা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হলে একটি সুশিক্ষিত, সুস্থ মেধাবী জাতি গড়ার পথও মসৃণ হবে। জনগণকে ক্ষুধা, দারিদ্র্যের মধ্যে পুষ্টিহীন রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। খাদ্য অধিকার একটি মানবাধিকার। অন্যান্য মানবাধিকার নিশ্চিত করতে খাদ্য অধিকার সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত আলোচনায় পুষ্টি বিষয়টি তেমন অগ্রাধিকার পায়নি এতদিন। মা, নবজাতক, শিশু শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে পুষ্টি সমস্যা গুরুত্ব পায়নি মোটেও। অবহেলার বিষয়টি বোধগম্য হলেও যুক্তিযুক্ত নয়। কেবল পুষ্টি কৌশলই সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট নয়, মা শিশুর অপুষ্টি মোকাবেলায় প্রযুক্তি দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা বড় প্রয়োজন। বিশ্বের অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর ৮০ শতাংশ রয়েছে মাত্র ২০টি দেশে, জোরালো পুষ্টি প্রকল্প গ্রহণ করলে শিশু মাতৃমৃত্যুর হার কমানো সম্ভব। লাতিন আমেরিকান দেশগুলোয় এসব কার্যক্রম গ্রহণ করে খর্বতা, কম ওজন, শীর্ণতা অনেক কমানো গেছে। আমাদেরও স্থানীয় উপযোগী করে একই পথ অনুসরণ করা যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আন্তর্জাতিক পুষ্টি কার্যক্রমে চার ধরনের সুযোগ মানুষের জন্য সৃষ্টি করা উচিত। এগুলো হলো তত্ত্বাবধান, অর্থনৈতিক সম্পদ আহরণ সংগ্রহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিপর্যয়ে সরাসরি পুষ্টির জোগান দেয়ার ব্যবস্থা এবং মানব প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদকে শক্তিশালী করে তোলা। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে পুষ্টি উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশের নীতিনির্ধারকদের নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং একই সঙ্গে তার যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন