রবিবার | নভেম্বর ০১, ২০২০ | ১৬ কার্তিক ১৪২৭

প্রথম পাতা

বাংলাদেশের পাদুকা শিল্প সংকুচিত হচ্ছে কি

সাইদ শাহীন

তৈরি পোশাকের পরই রফতানিতে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখা দিয়েছিল চামড়াজাত পণ্য পাদুকা। কয়েক বছর ধরে রফতানিতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি পেয়ে আসছিল পণ্যটি। কিন্তু ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে গত এক বছরে। করোনার আগেই পণ্যটির উৎপাদন রফতানি দুটোই কমার দিকে ছিল, করোনা এসে তা আরো কমিয়ে দিয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে জুতার রফতানি কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক মোট উৎপাদনে বাংলাদেশের অংশ দশমিক শতাংশ থেকে কমে দশমিক শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে শীর্ষ ১০ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় ষষ্ঠ থেকে অষ্টম অবস্থানে নেমে এসেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭৫ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার ডলারের পাদুকা রফতানি করেছে বাংলাদেশ। যদিও রফতানির পরিমাণ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৮৭ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রায় ৮০ কোটি ৯৭ লাখ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭৭ কোটি ৭৮ লাখ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে ৭১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের জুতা রফতানি করেছে বাংলাদেশ।

রফতানি কমে যাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মহিউদ্দীন আহমেদ মাহিন বণিক বার্তাকে বলেন, বৈশ্বিকভাবে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বাজার সংকুচিত হয়েছে। করোনার অভিঘাত হয়তো আরো এক বছর থাকবে। তবে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। পাদুকার বাজারে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি বাজার দখলে থাকা চীনের বাজার সংকুচিত হচ্ছে। সেখানে তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচের মাধ্যমে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সে দক্ষতা খাতের উদ্যোক্তাদের রয়েছে। প্রয়োজন শুধু নীতিসহায়তা। অধিকাংশ বড় কারখানাই পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। ইটিপির সমাধান হলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ সব বাজারেই রফতানি বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া আমাদের বিদেশী মিশনের কমার্শিয়াল উইংগুলো বাণিজ্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা নিলে রফতানি আরো বাড়ানো যাবে।

শুধু রফতানি নয়, ২০১৯ সালে জুতার বৈশ্বিক উৎপাদনেও বাংলাদেশের অংশ কমেছে। ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার ইয়ারবুক-২০২০-এর তথ্যমতে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৪৬ কোটি ১০ লাখ জোড়া জুতা উৎপাদন করেছিল। এক বছরের ব্যবধানে ২০১৯ সালে সংখ্যা কমে ৪০ কোটি ৭০ লাখ জোড়ায় নেমে এসেছে। সেই সঙ্গে বিশ্বের শীর্ষ ১০ জুতা উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ থেকে অষ্টমে নেমে এসেছে।

বিশ্বের শীর্ষ ১০টি জুতা উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় প্রথম অবস্থানে রয়েছে চীন। ২০১৯ সালে দেশটি হাজার ৩৪৭ কোটি ৫০ লাখ জুতা উৎপাদন করে। ওই বছর মোট বৈশ্বিক উৎপাদনের ৫৫ দশমিক শতাংশ ছিল চীনের। চীনের পর দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারত গত বছর ২৬০ কোটি জোড়া জুতা উৎপাদন করে মোট বৈশ্বিক উৎপাদনে ১০ দশমিক শতাংশ অবদান রাখে। এছাড়া ওই বছর মোট উৎপাদনে তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামের অংশ ছিল দশমিক শতাংশ, চতুর্থ অবস্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়ার অংশ ছিল প্রায় দশমিক এবং পঞ্চম অবস্থানে থাকা ব্রাজিলের অংশ ছিল দশমিক শতাংশ। শীর্ষ দশের অন্য দেশগুলোর মধ্যে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা তুরস্কের অংশ ছিল দশমিক শতাংশ, সপ্তম অবস্থানে থাকা পাকিস্তানের , অষ্টম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের দশমিক , নবম অবস্থানে থাকা মেক্সিকোর দশমিক দশম অবস্থানে থাকা ইতালির অংশ ছিল শূন্য দশমিক শতাংশ। গত বছর জুতার বৈশ্বিক উৎপাদনে ভিয়েতনাম, পাকিস্তান তুরস্কের অংশ যেমন বেড়েছে, তেমনি রফতানির পরিমাণে বেশ উল্লম্ফন হয়েছে দেশগুলোর। অন্যদিকে ভারতের উৎপাদনে অংশ স্থির রয়েছে, যদিও মোট রফতানি বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ উৎপাদনে অংশ দুটোই কমেছে।

২০২১ সালের মধ্যে চামড়া চামড়াজাত পণ্যের রফতানি বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। সেক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় বাজার হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী ফুটওয়্যারের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে অনেক। বৈশ্বিক চামড়াজাত ফুটওয়্যার পণ্যের ২৪ দশমিক শতাংশই আমদানি করে দেশটি, যার অর্ধেকেরও বেশি সরবরাহ করছেন চীনের ফুটওয়্যার রফতানিকারকরা। তবে উৎপাদন খরচ বাড়ায় চীন থেকে বাংলাদেশ, ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশে উৎপাদন সরিয়ে নিচ্ছে মার্কিন ব্র্যান্ডগুলো। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটওয়্যার আমদানিতে বাংলাদেশের অবদান শতাংশের কাছাকাছি। আবার শিল্পে ভিয়েতনামের মতো সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) সম্প্রসারিত করতে পারলে বিদেশী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আরো দ্রুত ইন্টিগ্রেটেড করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

রফতানিকারকরা বলছেন, পাদুকা বা ফুটওয়্যার রফতানিতে প্রধান বাধা লিড টাইম বেশি হওয়া। আমাদের দেশে ফুটওয়্যারের ক্রয়াদেশ আসলে সিংহভাগ ক্ষেত্রেই জাহাজীকরণ প্রক্রিয়ায় বিলম্বিত হয়। কিন্তু গ্লোবাল ভ্যালু চেইনের অংশ হতে হলে সঠিক সময়ে রফতানি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে পরবর্তী সময়ে রফতানি পাওয়া বেশ দুষ্কর হয়। ভিয়েতনামসহ অনেক দেশ এক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও চীনের শ্রম ব্যয়ের কারণে অনেক ব্র্যান্ড চীনে উৎপাদন থেকে সরে আসছে। সেই স্থানটি বাংলাদেশ নিতে পারলে দেশের পাদুকা শিল্প আরো সমৃদ্ধ হতে পারে। সেক্ষেত্রে সাভার ইটিপিকে আরো সক্রিয় করতে হবে। কারণ ট্যানারির ইটিপি সমস্যায় উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরেই ভুগছেন। এছাড়া ব্যাকওয়ার্ড শিল্প গড়ে তুলতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাহলে খাতের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এলএফএমইএবি) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্লু ওশান ফুটওয়্যার লিমিটেডের পরিচালক আব্দুল মোমেন ভুইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, করোনার মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই রিটেইল দোকানগুলো বন্ধ ছিল। ফলে আমরা এসব দেশে লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে পাদুকা রফতানি করতে পারিনি, যার প্রভাব পড়েছে রফতানি আয়ে। সামনে আরো এক-দুই বছর আমাদের ধরনের নিম্নমুখী অবস্থানে থাকতে হবে। তবে সময়ে ভারত ভিয়েতনামের রফতানি বৃদ্ধির কারণ কী ছিল, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভিয়েতনাম এখন উচ্চমূল্যের পাদুকা তৈরি করছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তারা দ্রুত অর্ডার নিতে পারে এবং ডেলিভারি দিতে পারে। কিন্তু আমাদের লিড টাইম অনেক বেশি। ফলে সরবরাহের দেরিতে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। কেননা আমাদের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের অবস্থা খুব বেশি সমৃদ্ধ নয়। আবার ট্যানারি শিল্পে রয়েছে নানা দুর্বলতা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন