শুক্রবার | অক্টোবর ৩০, ২০২০ | ১৫ কার্তিক ১৪২৭

সম্পাদকীয়

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বাধা কোথায়?

আনোয়ার ফারুক তালুকদার

করোনার বিপর্যয় থেকে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের পরিমাণ হচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ কোটি টাকা ব্যাংকগুলো পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে। বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে বিনিয়োগ হবে। গ্রাহক পর্যায়ে এই ঋণের সুদের হার হবে শতকরা ৪ ভাগ। যদিও প্রণোদনা ঋণের সুদের হার ব্যাংকগুলো পাবে ৯ ভাগই পাবে। বাকি ৫ ভাগ ভর্তুকি হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক দেবে। তবে এখানে শর্ত হচ্ছে, প্রণোদনা ঋণের টাকা এক বছরের মধ্যে গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করতে হবে এবং তিনমাস অন্তর অন্তর যে সুদ হবে তা তিন মাস শেষ হওয়ার পাঁচদিনের মধ্যে ঋণ গ্রহীতা কর্তৃক পরিশোধিত হতে হবে। তাছাড়া বেশ কিছু শর্ত রয়েছে প্রণোদনা ঋণে, তার মধ্যে রয়েছে মোট ঋণের ২০ ভাগ ব্যবসা খাতে দিতে হবে এবং বাকি ৮০ ভাগ শিল্প এবং সেবা খাতে প্রদান করতে হবে। প্রথম নির্দেশনায় ৫০ ভাগ শিল্প খাতে এবং ৩০ ভাগ সেবা খাতে এবং বাকি ২০ ভাগ ব্যবসা খাতে প্রদান করার কথা ছিল। পরবর্তী নির্দেশনায় শিল্প এবং সেবা খাতের সীমাকে একত্রিত করে ৮০ ভাগ করা হয়েছে।

বণিক বার্তার রিপোর্ট অনুযায়ী গত মাস পর্যন্ত ব্যাংকগুলো মাত্র ১৭ ভাগ ঋণ প্রদান করতে পেরেছে। অন্যদিকে বৃহৎ শিল্পের বেশীরভাগ ঋণই প্রদান করা হয়ে গেছে। এখানে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য- কেন ব্যংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে প্রণোদনার ঋণ বিতরণ করতে পারছে না? তার অন্যতম প্রধান কারণ হিসাবে ব্যাংকাররা চিহ্নিত করেছেন ঋণ বিতরণের খাতভিত্তিক বিভাজন। এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ঋণের ৬০ ভাগই হচ্ছে ব্যবসা খাত। এই কারনে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। এই খাতের সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন খাতভিত্তিক বিভাজন উঠিয়ে দিলে এই খাতের প্রণোদনা প্যাকেজ বিতরণ সহজ হবে। অন্যথায় সময়মত গ্রাহকদের কাছে এই ঋণ পৌঁছানো সম্ভব নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংকাররা বাংলাদেশ ব্যাংককে নীতি পরিবর্তন করতে বলছেন।

শিল্প ও সেবা খাতে ঋণ বিতরণ করা দেশের অর্থনীতির জন্য বেশী সহায়ক সন্দেহ নাই। দেশের শিল্প ও সেবা খাতের উন্নয়নের জন্য এই দুটি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এতেও কারো আপত্তি নাই। দেশীয় শিল্প গড়ে উঠলে দেশের উন্নয়ন তরান্বিত হবে। তবে আমাদের একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। আমাদের দেশের বেশীরভাগ ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেশীয় শিল্পের তৈরি পণ্য বিক্রয় করে। ফলে দেশী পণ্যের প্রসার বা দেশী শিল্প সুরক্ষার যে বিষয়টি সামনে আসে তা কিন্তু অন্যভাবেও সমাধান করা যায়। দেশে উৎপাদিত পণ্যের ব্যবসা যারা করেন তাদের আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করা দরকার। আমদানিকৃত পণ্য যারা বিক্রি করে তাদের ব্যবসা বা ট্রেডিং সেক্টর বলা যেতে পারে। আমাদের উদ্দেশ্য যদি হয় দেশী শিল্পের প্রসার তবে দেশে উৎপাদিত পণ্য যারা উৎপাদন ও বিপণন করে অথবা দেশী শিল্পের উৎপাদিত পণ্য যারা খুচরা বিক্রয় করে তাহলে তাদের সরাসরি ব্যবসা খাত না বলে অন্য কোন জুতসই নামে অভিহিত করা যেতে পারে এবং তাদের উৎসাহিত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। সেটা বর্তমানে প্রদেয় প্রণোদনা প্যাকেজ থেকেই ঘোষণা আসতে পারে। এতে করে একদিকে যেমন প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন সহজ হবে অন্যদিকে দেশীও শিল্পের প্রসারে আমাদের উদ্যোগ সফল হবে।   

লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক    

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন