রবিবার | আগস্ট ১৪, ২০২২ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯  

প্রথম পাতা

অবকাঠামো উন্নয়নে বিলুপ্ত শেরেবাংলা নগরের জলাশয়

আল ফাতাহ মামুন

ছবি: সালাহউদ্দিন আহমেদ

এক সময় ঢাকার সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন এলাকাগুলোর একটি ছিল এখনকার শেরেবাংলা নগর। কারণেই জাতীয় সংসদ ভবন নির্মাণের জন্য এলাকাটিকে বেছে নেয়া হয়েছিল। এলাকাটির সৌন্দর্যের বড় উৎস ছিল এখানকার জলাশয়গুলো। বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কান ষাটের দশকে এলাকাটির মাস্টারপ্ল্যানও তৈরি করেছিলেন জলাশয়গুলোকে কেন্দ্র করে। জলাশয়গুলোর সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে সে মহাপরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পরও দীর্ঘদিন এলাকাটির জলাশয়গুলোর সৌন্দর্য নগরবাসীকে দীর্ঘদিন মুগ্ধ করেছে। কিন্তু এক পর্যায়ে সংস্কারের নামে লুই আই কানের মহাপরিকল্পনাটি বদলে ফেলা হয়। এলাকাটির জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা হয় একের পর সরকারি দপ্তর অবকাঠামো। চলতি শতকের শুরুতেও এলাকাটিতে বড় জলাশয় ছিল সাতটি। ভরাট, দখল অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের ফলে এর চারটিই এখন বিলুপ্ত। তিনটি আংশিকভাবে টিকে থাকলেও সেগুলোকেও এখন ভরাটের পরিকল্পনা চলছে।

যেকোনো নগরীর জন্য অপরিহার্য উপাদান হলো জলাশয়। নগরীর পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিতে এর কোনো বিকল্প নেই। পানি নিষ্কাশনের পাশাপাশি ধুলাবালির দূষণ নিয়ন্ত্রণ, অগ্নি দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং স্থানীয় প্রতিবেশ বাস্তুসংস্থানের সুরক্ষা দেয়ার জন্য নগরে জলাশয় নির্মাণ সংরক্ষণ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রেক্ষাপটে নগরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য জলাশয়ের উপস্থিতিকে অপরিহার্য হিসেবে দেখছেন তারা। এজন্য বিশ্বের সবখানেই এখন নগর পরিকল্পনায় পর্যাপ্তসংখ্যক জলাশয়ের উপস্থিতি এগুলোর সংরক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, যার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দখল দূষণে ভরাট হয়ে পড়ছে জলাশয়গুলো। এরই এক বড় উদাহরণ শেরেবাংলা নগরের ভরাট হয়ে পড়া জলাশয়গুলো।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শেরেবাংলা নগরে বড় জলাশয় ছিল অন্তত সাতটি। এর মধ্যে আইডিবি ভবন থেকে লায়ন্স হাসপাতাল পর্যন্ত একটি; সংগীত কলেজের চারপাশে নিচু ভূমি জলাশয়; ইউজিসি ভবনের পাশে একটি; শেরেবাংলা বয়েজ স্কুল, এলজিইডি ভবন পাসপোর্ট অফিস এলাকাজুড়ে আরো একটি; জিটিসিএল, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, শ্যামলী নম্বর রোডের শেষ মাথা পর্যন্ত বিশাল ডোবা; বেতার ভবনের পেছনে একটি এবং শেরেবাংলা গার্লস স্কুলের পেছনে একটি বড় জলাশয় ছিল। এর মধ্যে চারটির এখন কোনো অস্তিত্বই নেই। কেবল ইউজিসি ভবন, বেতার ভবন শেরেবাংলা বয়েজ স্কুলের তিনটি জলাশয় আংশিকভাবে টিকে আছে। অবকাঠামো উন্নয়ন করতে গিয়ে সেগুলোও এখন ভরাটের পরিকল্পনা চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে।



শেরেবাংলা নগরের পুরনো বাসিন্দা আলী আকবর। নব্বইয়ের দশকেও এখানে বেশকিছু জলাশয়ের উপস্থিতি দেখেছেন তিনি। একে একে বড় সাতটি জলাশয় ভরাট করে সেখানে তৈরি করা হয়েছে পাসপোর্ট অফিস, এলজিইডি ভবন, আইডিবি ভবন, বেতার ভবনের নতুন বিল্ডিং, ইউজিসির নতুন ভবন, শেরেবাংলা বয়েজ স্কুল, লায়ন্স হাসপাতাল, ফিল্ম আর্কাইভ ভবন, পরিবেশ অধিদপ্তর ভবন, মমতা বহুমুখী মার্কেট, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জিটিসিএল কার্যালয়, কিডনি হাসপাতাল, নাক-কান-গলা হাসপাতালসহ সরকারি অনেক অফিস। যে জলাশয়ে তিনি গোসল করতেন, সেটিও এখন বিলুপ্তপ্রায়। সেখানে এখন গড়ে উঠেছে ইউজিসি ভবন।

জন্মসূত্রেই শেরেবাংলা নগরের স্থানীয় বাসিন্দা রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ। বর্তমানে সাহাবুদ্দিন স্কুলের সামনে পৈত্রিক ভিটায় বসবাস করছেন তিনি। মোহাম্মদ এজাজ স্মৃতিচারণ করে বলেন, এখানে আমাদের বিস্তৃত জমি ছিল। ধান চাষও হতো। সংগীত কলেজের চারপাশে ছিল নিচু জমি। পুরো এলাকায় বেশ বড় বড় খাল-জলাশয় ছিল। মানুষ নৌকা দিয়ে যাতায়াত করত। ২০১০ সাল পর্যন্ত নৌকা সাঁকোয় যাতায়াত করেছি আমরা। কিন্তু সব এখন ভরাট হয়ে গিয়েছে। জলাশয়গুলো অপরিকল্পিতভাবে ভরাটের ফলে প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষতি তো হয়েছেই, পাশাপাশি এলাকার আবহাওয়াও মারাত্মকভাবে বদলে গিয়েছে। তার পরও এখনো যেসব ভবন নির্মাণ হচ্ছে, আমাদের দাবি থাকবে সেগুলোয় যেন জলাশয় জলাধার সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়।

সদিচ্ছা থাকলে অবকাঠামো নির্মাণের সময় ছোট পরিসরে হলেও জলাশয়গুলো সংরক্ষণ করা যেত বলে মনে করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। নগরবিদ ইকবাল হাবিব বণিক বার্তাকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সামনে একটি খাল ছিল, যেটি ইউজিসি ভবন হয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে গিয়ে পড়ে। কিন্তু উন্নয়নের নামে সেই খালটি মেরে ফেলা হয়েছে। একইভাবে কল্যাণপুর খালের বড় অংশ এরই মধ্যে দখল হয়ে গেছে। এভাবে জলাশয় খাল ধ্বংস করে অবকাঠামো নির্মাণ করায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একদিন অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, আমরা দেখেছি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে পুরান ঢাকা আজ জলজটের এলাকায় পরিণত হয়েছে। একই অবস্থা দেখা যাচ্ছে শেরেবাংলা নগরেও। এখানে বৃষ্টির পানি ধারণের কোনো স্থান অবশিষ্ট নেই। শুধু তা- নয়, অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটলে পানি নেয়ারও কোনো উৎস রাখা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই উন্মুক্ত জলাশয় নিশ্চিত করে অবকাঠামো উন্নয়নের দরকার ছিল।

শেরেবাংলা নগরকে নিয়ে স্থপতি লুই আই কান প্রণীত মহাপরিকল্পনার তত্কালীন মানচিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী মিরপুরের মধ্যবর্তী এলাকাটিই বর্তমান শেরেবাংলা নগর। এখানকার জলাশয়গুলোকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেই এলাকার উন্নয়নের পরিকল্পনা করেছিলেন লুই আই কান। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাজধানীর সীমা বাড়াতে গিয়ে পরিকল্পনাটি বদলে ফেলা হয়। নতুন পরিকল্পনায় জলাশয় সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। সরকারি দপ্তর নির্মাণের জন্য আশির দশকে শুরু হয় ভূমি অধিগ্রহণ। ওই এলাকার রূপ পাল্টাতে থাকে সংসদ ভবনকে ঘিরে। তখন শেরেবাংলা নগরে পাকা ভবন বলতে ছিল শুধু সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল স্টাফ কোয়ার্টার। বাকি এলাকাজুড়ে ছিল টিনের ঘরবাড়ি, নিচু ভূমি আর জলাশয়। চলতি শতকের শুরুতে ২০০০ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত বেশকিছু অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। ২০১০ সালের পর ওই এলাকায় রাতারাতি অনেকগুলো বৃহৎ আকারের ভবন দাঁড়িয়ে যায়। এসব অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে জলাশয় বা জলাধার সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়নি একেবারেই।

ইউজিসি দপ্তরের পাশে এখন একটি পুকুর থাকলেও সেটি এখন বিলুপ্তপ্রায়। কমিশনের সচিব . ফেরদৌস জামান এখানে কর্মরত রয়েছেন ২২ বছর ধরে। তিনি বলেন, এখন যেখানে বিজ্ঞান জাদুঘর, ডিএমডি বাজার রয়েছে, সেখান দিয়ে আমার সহকর্মীরা নৌকায় চড়ে অফিসে আসতেন। আমাদের এখানে এখনো একটি পুকুর আছে। তবে দখল-দূষণে সেটিও আজ প্রায় বিপন্ন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্থাপত্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক স্থপতি (জোন-) আবদুল্লাহ আল মামুন বণিক বার্তাকে বলেন, কোনো জলাধার বা জলাশয় ভরাট করে যেন অবকাঠামো নির্মাণ না হয় সে বিষয়ে আমরা সবসময়ই সচেতন। শেরেবাংলা নগরের অবকাঠামো উন্নয়নেও জলাশয় সংরক্ষণের বিষয়টি কঠোরভাবে নজরে রেখেছি। তবে সরকার যদি কোনো জলাধার ভরাটের প্রয়োজন মনে করে তাহলে উপরের মহলের পরামর্শে নানা সমীক্ষার আলোকেই নিশ্চয়ই করেছে। সে ব্যাপারে আমাদের কিছু করার ছিল না, কিছু করারও নেই।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন