সোমবার | এপ্রিল ১৯, ২০২১ | ৫ বৈশাখ ১৪২৮

শেষ পাতা

দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধে ১৫ বছর সময় চান পোশাক শিল্প মালিকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

ক্রেতা দেশগুলোতে গণটিকা প্রয়োগ শুরু হলেও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখনো ফেরেনি। লকডাউন পুরোপুরি প্রত্যাহার করেনি অনেক দেশ। এর মধ্যে প্রাপ্ত ক্রয়াদেশ অনুযায়ী পণ্য প্রস্তুত করেছে কারখানা কিন্তু ক্রেতা না নেয়ায় মজুদ বাড়ছে। এদিকে সুতার দাম, পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। আবার প্রণোদনার বিপরীতে ঋণের কিস্তি পরিশোধে বাড়ছে ব্যাংকের চাপ। শঙ্কা বাড়ছে ঋণখেলাপি হওয়ার। পরিস্থিতিতে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ১৫ বছর ধরে পরিশোধের সুযোগ চাইছেন পোশাক শিল্প-কারখানা মালিকরা।

সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে করোনা মহামারী প্রেক্ষাপটে পোশাক শিল্প খাতে বর্তমান বিপর্যয় নিয়ে সভার আয়োজন করা হয়। পোশাক শিল্প মালিক সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সদস্যদের নিয়ে অনুষ্ঠিত ওই বিশেষ সাধারণ সভায় বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রাপ্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সভায় উপস্থিত ছিলেন পাঁচ শতাধিক শিল্প উদ্যোক্তা। তাদের আলোচনায় দীর্ঘমেয়াদি ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় বাড়ানোর বিষয়টি উঠে আসে। এছাড়া আসন্ন দুই ঈদ পর্যন্ত পোশাক শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে আরো প্রণোদনার দাবিও উঠেছে। আলোচনায় বলা হয়, কয়েক মাস ধরে করোনার বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ক্রেতারা ক্রয়াদেশকৃত পণ্য নিতে পারছেন না। ফলে প্রস্তুতকৃত তৈরি পোশাক স্টক হয়ে গেছে।

বিকেএমইএ প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, করোনার প্রভাবমুক্ত হতে করণীয় নিয়েই আমরা বিশেষ সভায় আলোচনা করেছি। অনেক ধরনের প্রস্তাব উঠে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দীর্ঘমেয়াদি ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা ১৫ বছর করা।

পোশাক পণ্য তৈরিতে ব্যবহূত উপকরণ আনুষঙ্গিক ব্যয় চিত্রও উল্লেখ করা হয় সভার আলোচনায়। উদ্যোক্তারা জানান, সুতার লাগামহীন এবং অনির্ধারিত মূল্যবৃদ্ধি, জাহাজের পণ্য পরিবহন ব্যয় প্রায় ২০০-৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি, প্রণোদনার বিপরীতে ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যাংকের চাপ এবং অন্যদিকে কাস্টমস, ভ্যাট, ট্যাক্স বন্ড কমিশনারেট সংক্রান্ত নানাবিধ অযৌক্তিক চাপের কারণে তৈরি পোশাক শিল্প ধারাবাহিকভাবে ২০২০ সাল থেকে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে চলছে। ফলে শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের নীতি সহায়তা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই।

উদ্যোক্তাদের দাবি, এমনিতেই রফতানি আদেশ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। অনেক ক্ষুদ্র-মাঝারি প্রতিষ্ঠান প্রায় বন্ধের উপক্রম। উদ্যোক্তা এবং তার ব্যাংকের বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা ১৪-১৫ বছর করার ব্যাপারে বাণিজ্যিক ব্যাংকের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের আট বছরের অধিক কাউকে কিস্তি পরিশোধের সময় না দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এতে অনেক উদ্যোক্তাই ক্ল্যাসিফায়েড হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ক্ল্যাসিফায়েড লোন প্রকারান্তরে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে বলে মন্তব্য করেন তারা।

সভায় বলা হয়, ২০২০ সালে করোনা শুরুর পর পরই প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব বিবেচনায় হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঋণ দেন। এর ফলেই শিল্প উদ্যোক্তারা সেই সময়ে কারখানা চালু রেখে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং শ্রমিকদেরও বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু স্বাভাবিক পরিস্থিতি এখনো ফিরে আসেনি। অথচ এর মধ্যেই ওই ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য ব্যাংক চাপ দিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের মূল রফতানি বাজার ইউরোপে অর্থনীতি সংকোচনের মুখে পড়ায় এখন পর্যন্ত রফতানি আদেশ সেই অর্থে বৃদ্ধি পায়নি। এছাড়া যে পরিমাণ রফতানি আদেশ হাতে রয়েছে, সুতার অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেটিরও কার্যাদেশ বাস্তবায়ন করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা।

আসন্ন দুটি ঈদে শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য ওই ধরনের আর একটি নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করার দাবি জানিয়ে সভায় শিল্প উদ্যোক্তারা বলেছেন, প্রয়োজনে নতুন প্রণোদনা ঋণ প্যাকেজ এবং আগের প্রণোদনা ঋণ প্যাকেজের পরিমাণ একীভূত করে উদ্যোক্তাদের আরো এক বছর সময় দিয়ে, এর বিপরীতে ১৮ মাসের পরিবর্তে অন্তত ৩৬ মাসের কিস্তি পরিশোধের সময় দিলে পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। অন্যথায় শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ৪৫ লাখ মানুষ এবং পরোক্ষভাবে দুই কোটি মানুষ তাদের পরিবারের জীবন জীবিকা প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে অর্থনৈতিক হুমকির সম্মুখীন হতে পারে।

সভায় নগদ সহায়তা প্রাপ্তিতে জটিলতার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন অনেক শিল্প উদ্যোক্তা। তাদের দাবি, নগদ সহায়তা প্রাপ্তির বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের মূল ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এমনিতেই করোনাকালে শিল্প মালিকরা লভ্যাংশের কথা চিন্তা না করে এবং অনেকেই আবার ব্যক্তিগত মূলধন খাটিয়ে কারখানা চালু রেখেছেন। সেই সময় নগদ সহায়তার অর্থ পেতে যদি এত জটিলতর অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়, তবে শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই অডিট ছাড়াই রফতানির বিপরীতে সরাসরি প্রত্যাবাসিত মূল্যের ওপর নগদ সহায়তার অর্থ উদ্যোক্তাদের ব্যাংক হিসাবায়নে দিয়ে দেয়ার জোর দাবি জানানো হয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন