মঙ্গলবার | জুন ০২, ২০২০ | ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ফিচার

মূল্যস্ফীতির অস্থির সময়ে মজুদ ছাড়াই বিলিয়ন ডলারের খুচরা ব্যবসা

বণিক বার্তা অনলাইন

ব্রাজিলের বিলিয়নেয়ার ব্যবসায়ী লুইজা ট্রাজানো। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে অসম্ভব মুদ্রাস্ফীতি, বারবার নতুন মুদ্রার প্রচলন ও প্রত্যাহার এমন টালমাটাল অবস্থার মধ্যে ছিল ব্রাজিলের অর্থনীতি। এমন একটি পরিস্থিতিতে পণ্য মজুদ করে ব্যবসা করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু লুইজা ছিলেন উচ্চাভিলাসী একই সঙ্গে উদ্ভাবনী। অসাধ্যকে সাধন করে অভাবনীয় এক ব্যবসা মডেল দাঁড় করান তিনি। বিভিন্ন স্থানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দোকান দিয়ে চেইন শপ খোলেন তিনি। অর্ডার নিতেন অনলাইনে। পণ্য পৌঁছে দেয়া হতো ক্রেতার বাড়িতে। বলা যায়, বর্তমান অনলাইন মার্কেটের পথিকৃৎ লুইজা ট্রাজানো। তার কোম্পানি ম্যাগাজিন লুইজার বর্তমান বাৎসরিক রাজস্ব প্রায় ৫০০ কোটি ডলার। ৬৮ বছর বয়সী লুইজা এখন ব্রাজিলের অন্যতম ধনী ব্যক্তি।

বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকের ঘটনা। ব্রাজিলে তখন মূল্যস্ফীতি ৩০০০ শতাংশে পৌঁছে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার কমপক্ষে চারটি নতুন মুদ্রা এনেও অল্প সময়ের মধ্যে বাতিল করে। ওই সময় খুচরা ব্যবসায়ীদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছিল।

লুইজাদের একটি পারিবারিক ব্যবসা ছিল। গৃহস্থালীর ইলেকট্রনিক্স ও অন্যান্য জিনিসপত্রের খুচরা ব্যবসা। প্রতিষ্ঠানটির নাম ম্যাগাজিন লুইজা। এটির প্রথম দোকান চালু হয় ১৯৫৭ সালে লুইজার জন্মশহর ফ্রাঙ্কায়। সাও পাওলো থেকে ৪০০ কিলোমিটার উত্তরে ওই শহরে দোকানটি চালাতেন লুইজার চাচা ও চাচী। ফরাসি শব্দ ‘মাগাজ্যঁ’ বা দোকান ও চাচীর নামের প্রথম অংশ ‘লুইজা’ থেকে এমন নামকরণ।  

১২ বছর বয়স থেকেই পড়াশোনার ফাঁকে দোকানে চাচা-চাচীকে সাহায্য করতেন লুইজা। ‍মূলত বিক্রয়কর্মীর কাজ করতেন। বাল্যকালের সেই স্মৃতি রোমন্থন করে লুইজা বলেন, আমি খুবই ছোট একটি দোকানে বিক্রয়কর্মীর কাজ করতাম। ওই কাজ আমার কাছে কেবল অভিজ্ঞতা নয় সাফল্যেরও চাবিকাঠি বটে! বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়ার পাশাপাশিও তিনি দোকানে কাজ করেছেন। স্নাতক শেষ করার পরে পুরোপুরি পারিবারিক ব্যবসায় নেমে পড়েন। 

ব্রাজিলে ওই সময় প্রচুর পরিমাণ পণ্য মজুদ রেখে বড় বড় খুচরা দোকান চালানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই লুইজা ছোট ছোট দোকান নিয়ে একটি চেইন খোলার সিদ্ধান্ত নেন। যাতে কোনো পণ্য মজুদের দরকার না হয়। পাশাপাশি পণ্যের কম্পিউটারাইজড ক্যাটালগ তৈরি করেন। ক্রেতা কম্পিউটার টার্মিনালে বসে ক্যাটালগ থেকে পছন্দের পণ্য অর্ডার করতে পারতেন। আর দেশব্যাপী স্থাপিত বিতরণ ডিপো থেকে ক্রেতার বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হতো পণ্য। এ পদ্ধতিতে আরেকটি সুবিধা ছিল- পণ্যের জন্য প্রাইস ট্যাগ প্রিন্ট করার খরচ বেঁচে যেত। তাছাড়া মূল্যস্ফীতি ও নতুন নতুন মুদ্রা অবমুক্ত করার অস্থির বাজারে কম্পিউটার ক্যাটালগে নিয়মিত মূল্য হালনাগাদ করে দিলেই চলতো।

১৯৯২ সালে এমন একটি ব্যবসায়িক ভাবনা রীতিমতো বৈপ্লবিক ব্যাপার। কারণ ব্রাজিলে সাধারণ ভোক্তাদের কাছে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছায় ১৯৯৭ সালে। অর্থাৎ ব্রাজিলের সর্বত্র ইন্টারনেট পৌঁছানোর আগে থেকেই অনলাইনে পণ্য বিক্রয়ের সূচনা করে ‘ম্যাগাজিন লুইজা’।

মাত্র তিন বছরের মাথায় গোটা ব্রাজিলে ম্যাগাজিন লুইজার কয়েকশ দোকান খোলা হয়। এর মধ্যে ৫৮টিই ছিল বড় বড় শহরে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের এক হাজারেরও বেশি দোকানে কর্মী আছে প্রায় ৩০ হাজার। ৪৮ শতাংশ পণ্যই বিক্রি হয় কোম্পানির ওয়েবসাইট থেকে। বার্ষিক রাজস্ব ৪৯০ কোটি ডলার। বর্তমানে ব্রাজিলের বৃহত্তম খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের একটি। খুচরা বিক্রিতে ২০০৬ সালে শীর্ষে ছিল ম্যাগাজিন লুইজা।

নতুন ব্যবসা মডেল উদ্ভাবনের ২৮ বছর পর সম্প্রতি বিবিসি ‘দ্য বস’ সিরিজে লুইজা বলেন, এটা বিশাল বিপ্লব ছিল। আমরা ভার্চুয়াল বিক্রয়ের একটি নতুন উপায় প্রবর্তন করেছি। এটি অন্য যে কারোর আগে আমরা প্রস্তুত করেছিলাম। আরেকটি বড় পরিবর্তন এনেছিলাম, তা হলো, অনেক ভোরে দোকান খোলা। আমরা ভোর ৫টায় দোকান খুলতাম। যুক্তরাজ্য এবং উত্তর আমেরিকায় এমন চর্চা থাকলেও ব্রাজিলে এর আগে কেউ এমনটি দেখেনি। পরে অবশ্য অন্যরাও আমাদের অনুসরণ করে।

সফল ব্যবসায়ী লুইজা ব্রাজিলের অন্যতম ধনী ব্যক্তি। ফোর্বস ম্যাগাজিনের হিসাবে তার মোট সম্পদের মূল্য ৩৫০ কোটি ডলার। লুইজার এখনই অবসর নেয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। ছেলে ফ্রেডেরিকোকে প্রধান নির্বাহীর পদে বসিয়ে নিজে হয়েছেন ম্যাগাজিন লুইজার চেয়ারপার্সন। তার উদ্যমের মূল মন্ত্র, শুধু অভিযোগ করলে সমস্যার সমাধান হয় না। সমস্যায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করা ও সমাধান খোঁজাই আসল কাজ!

বিবিসি অবলম্বনে

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন