শুক্রবার | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

শেরেবাংলা: জনদরদি রাজনীতিবিদ

মেহেদী হাসান

গতকাল ছিল (২৬ অক্টোবর) শেরেবাংলা কে ফজলুল হকের ১৪৬তম জন্মদিন। অনেকটা নীরবেই আসে দিনটি, চলেও যায় নীরবে। স্কুলে পড়ার সময় মহান নেতা সম্পর্কে সামান্য জানার সৌভাগ্য হয়েছিল! তার মধ্যে বিশেষভাবে যে বিষয়গুলো স্থান করে নিয়েছিল, তা হচ্ছে তার প্রখর মেধা, নান্দনিক শিক্ষাজীবন, সাহস ডানপিটে চরিত্রের কথা। কেন জানি ওই বিষয়গুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছি তাকে আমরা। তার বর্ণাঢ্য সমাজকর্ম রাজনৈতিক জীবন চাপা পড়ে গেছে সময়ের ব্যবধানে। কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখিত অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়তে গিয়ে হঠাৎ এক জায়গায় চোখ আটকে গেল। হক সাহেব সম্পর্কে তত্কালীন সময়ের জনমনের ভাবনা হক সাহেবকে নতুন করে জানতে আগ্রহী করল। বঙ্গবন্ধুর কথায়, “একদিনের কথা মনে আছে, আব্বা আমি রাত দুইটা পর্যন্ত রাজনীতির আলোচনা করি। আব্বা আমার আলোচনা শুনে খুশি হলেন। শুধু বললেন, শেরে বাংলা . কে. ফজলুল হক সাহেবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ না করতে। একদিন আমার মা- আমাকে বলেছিলেন, ‘বাবা যাহাই করো, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলিও না।শেরেবাংলা মিছামিছিই শেরে বাংলাহন নাই। বাংলার মাটিও তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেছি, তখনই বাধা পেয়েছি। একদিন আমার মনে আছে একটা সভা করছিলাম আমার নিজের ইউনিয়নে, হক সাহেব কেন লীগ ত্যাগ করলেন, কেন পাকিস্তান চান না এখন? কেন তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন? এই সমস্ত আলোচনা করছিলাম, হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক যিনি আমার দাদার খুব ভক্ত, আমাদের বাড়িতে সকল সময়ই আসতেন, আমাদের বংশের সকলকে খুব শ্রদ্ধা করতেনদাঁড়িয়ে বললেন, ‘যাহা কিছু বলার বলেন, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না। জিন্নাহ কে? তার নামও তো শুনি নাই। আমাদের গরিবের বন্ধু হক সাহেব। কথার পর আমি অন্যভাবে বক্তৃতা দিতে শুরু করলাম। সোজাসুজিভাবে আর হক সাহেবকে দোষ দিতে চেষ্টা করলাম না। কেন পাকিস্তান আমাদের প্রতিষ্ঠা করতেই হবে তাই বুঝালাম। শুধু এইটুকু না, যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কালো পতাকা দেখাতে গিয়েছি, তখনই জনসাধারণ আমাদের মারপিট করেছে। অনেক সময় ছাত্রদের নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি, মার খেয়ে।”— (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান)

একজন নিঃস্বার্থ জনদরদি রাজনীতিবিদ। আমৃত্যু তিনি গণমানুষের মুক্তির লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন। অবহেলিত পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করেছেন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে, মুসলিমদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সমসাময়িক যেকোনো নেতার চেয়ে তিনিই সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন, পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে রাজনীতির মাঠে বারবার বিপর্যস্ত করেছেন। মা-বাবা আবুল কাশেম ফজলুল হক নাম রাখলেও তিনি তার কর্মযজ্ঞের কারণে শেরেবাংলা হয়ে উঠেছিলেনযাদের জন্য তার রাজনীতিতে আসা নিরন্তর লড়াই-সংগ্রাম, সেই কৃষক-শ্রমিক শ্রেণী প্রিয় নেতাকে হক সাহেব হিসেবে সম্বোধন করেন। বাঙালি জাতীয় জীবনে হক সাহেবের অবদান সামান্য একটি প্রবন্ধের মধ্যে লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। জনদরদি নেতা পিছিয়ে পড়া পূর্ববঙ্গের জন্য শিক্ষা কৃষি খাতে যে অবদান রেখেছেন, তা এখন পর্যন্ত অতুলনীয়। তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদ, সুপরিচিত আইনজীবী, শিক্ষক একজন ভালো সাংবাদিক। ১৯০১ সালের বরিশাল পৌরসভা জেলা বোর্ডের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিপুল ভোটের ব্যবধানে সদস্য নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমেই . কে ফজলুক হকের রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত। ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্সে যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১২ সালে . কে. ফজলুল হক মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯১৩ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তার অদম্য চেষ্টার ফলে ১৯১৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কারমাইকেল টেইলার হোস্টেল স্থাপন করা হয়েছিল।

তত্কালীন শিক্ষা বিভাগের ডিপিআই হর্নেল সাহেব ফজলুল হকের শিক্ষাবিষয়ক উদ্যোগের প্রশংসা করে তাকে বাংলার বেন্থামহিসেবে আখ্যায়িত করেন। আজকের বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার উল্লেখযোগ্য কিছু অবদান: কারমাইকেল হোস্টেল, টেইলার হোস্টেল, কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ, লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ, তেজগাঁও কৃষি কলেজ, ফজলুল হক হল, চাখার ফজলুল হক কলেজ, আদিনা ফজলুল হক কলেজ, হরগঙ্গা কলেজ, ঢাকা সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ, সেন্ট্রাল কলেজ। তার সময় দুই হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় শত শত মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২১ সালে তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি গণশিক্ষা বিস্তারের জন্য আমরণ সংগ্রাম করেছেন। ১৯১৯ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট পদ লাভ করেন। ১৯১৪ সালে ফজলুল হক নিখিল ভারত কংগ্রেস দলে যোগ দেন। একই সঙ্গে তিনি মুসলিম লীগ কংগ্রেস দলের নেতা হয়ে ওঠেন। এই বিরল কৃতিত্ব শুধু হক সাহেবেরই ছিল। ১৯২৪ সালে তত্কালীন সময়ে বাংলার গভর্নর লিটন ফজলুল হককে বাংলার শিক্ষা স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিয়োগ করেন। ১৯৩৫ সালে . কে. ফজলুল হক কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯২৪ সালে শিক্ষামন্ত্রীর পদে ইস্তফা দেয়ার পর তিনি সম্পূণরূপে কৃষকদের রাজনীতিতে জড়িত হয়ে পড়েছিলেন। ১৯৩৭ সালের মার্চে বঙ্গীয় আইন পরিষদের নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টির পক্ষ থেকে পটুয়াখালী নির্বাচনী এলাকায় জয়লাভ করেন এবং বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেরেবাংলা . কে. ফজলুল হক। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বহু কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। তার আমলে দরিদ্র কৃষকের ওপর কর ধার্য না করে সারা বাংলায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়। বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ’-এর পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেন। ১৯৩৮ সালের ১৮ আগস্ট বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধনী পাস হয় এবং জমিদারদের লাগামহীন অত্যাচার চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়। ১৯৩৯ সালের বঙ্গীয় চাকুরী নিয়োগ বিধিপ্রবর্তন করে মন্ত্রিপরিষদ মুসলমানদের জন্য ৫০ শতাংশ চাকরি নির্দিষ্ট রাখার ব্যবস্থা করে। বছরেই চাষী খাতক আইন’-এর সংশোধনী এনে ঋণ সালিশি বোর্ডকে শক্তিশালী করা হয়। ক্লাউড কমিশনের সুপারিশ অনুসারে ১৯৪০ সালে হক সাহেব আইন পরিষদে মহাজনী আইনপাস করান। বছরই দোকান কর্মচারী আইনপ্রণয়ন করে তিনি দোকান শ্রমিকদের সপ্তাহে একদিন বন্ধ অন্যান্য সুবিধা প্রদানের নির্দেশ জারি করেন। কৃষি আধুনিকায়নের জন্য ঢাকা, রাজশাহী খুলনার দৌলতপুরে কৃষি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। পাটচাষীদের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার লক্ষ্যে ১৯৩৮ সালে পাট অধ্যাদেশজারি করেন। বাংলার লাখ লাখ কৃষক পরিবারকে ঋণমুক্ত করার জন্য ১৯৪০ সালে মহাজনী আইনপাস করেন। আইনে সুদের উচ্চহার শতাংশ নির্দিষ্ট করে চক্রবৃদ্ধি সুদ বন্ধ করা হয়। নারী কর্মচারী শ্রমিকদের কল্যাণে ১৯৩৯ সালে ম্যাটারনিটি বেনিফিট অ্যাক্টবা মাতৃমঙ্গল আইনপ্রণয়ন করেন। নারী চাকরিজীবীরা সন্তান প্রসবের আগে এক মাস পরে এক মাস বেতন ভাতাদিসহ ছুটি ভোগের অধিকার লাভ করেন। শিশু শ্রমিকদের কল্যাণে শিশুশ্রম বন্ধের জন্য ১৯৩৮ সালে শিশু নিয়োগ আইন প্রণয়ন করেন। আইনে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ বন্ধ করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে শিশুদের নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়। জমিদারদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ বাংলার কৃষকদের দুর্দশা লাঘবের লক্ষ্যে তিনি মানি ল্যান্ডার্স অ্যাক্ট (১৯৩৮), বেঙ্গল টিন্যান্সি (সংশোধন) অ্যাক্ট (১৯৩৮), ভূমি সংস্কার আইনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেন। ১৯৪৩ সালে ভবঘুরে আইনপ্রণয়ন করে আশ্রয়হীন নারী শিশুদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়।

শেরেবাংলার উদ্যোগে বাংলাদেশে অনেক এতিমখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। ম্যালেরিয়া জ্বর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য কুইনাইন চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করা হয়। চাকরিবৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে তিনি মুসলমানদের ৫০ শতাংশ এবং তফসিলি সম্প্রদায়ের জন্য ১৫ শতাংশ চাকরির নিশ্চয়তা প্রদান করে বিধি জারি করেন। ১৯৩৭ সালে ১৫ অক্টোবর লক্ষে শহরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনে বাংলার প্রধানমন্ত্রী .কে. ফজলুল হক উর্দু ভাষায় জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে লক্ষেৗবাসীর হূদয় জয় করেন। তারা ফজলুল হকের হূদয়স্পর্শী বক্তৃতায় আকৃষ্ট হয়ে তাকে শেরেবাংলা উপাধি দেন। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অধিবেশনে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের উপস্থাপক ছিলেন . কে. ফজলুক হক, যা পরবর্তীকালে পাকিস্তান প্রস্তাবহিসেবে আখ্যায়িত হয়।  তিনি ঢাকা হাইকোর্ট বারের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে . কে. ফজলুক হক সমর্থন দেন। ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বর . কে. ফজলুক হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিপরিষদ এই ২১ দফা বাস্তবায়নের জন্য তত্পর হয়। ফলে ১৯৫৪ সালের ৩১ মে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিপরিষদ বাতিল করে দিয়ে ৯২() ধারা জারির মাধ্যমে প্রদেশে গভর্নরের শাসন প্রবর্তন করেন। সময় . কে. ফজলুক হক পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ১৯৫৬ সালের ২৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালের এপ্রিল পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার তাকে গভর্নরের পদ থেকে অপসারণ করে। এর পরই তিনি তার ৪৬ বছরের বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক জীবন থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৫৮-এর ২৭ অক্টোবর . কে. ফজলুল হককে পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদক হেলাল--পাকিস্তানখেতাব দেয়া হয়। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল . কে. ফজলুক হক ৮৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। এরই মাধ্যমে শেষ হয় এই মহান নেতার বর্ণাঢ্য জীবন।

 

মেহেদী হাসান: শিক্ষক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন