শুক্রবার | অক্টোবর ১৮, ২০১৯ | ৩ কার্তিক ১৪২৬

সম্পাদকীয়

অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন কিছু অভিজ্ঞতা

ড. সৈয়দ বাশার

সেপ্টেম্বর ২০১৬ থেকে এপ্রিল ২০১৯ পর্যন্ত আমি স্বনামধন্য একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। অদ্যাবধি নিজের জীবনবৃত্তান্তে আমার কখনো প্রশাসনিক কাজের অভিজ্ঞতা লাভের বিষয়টি সংযুক্ত করা হয়ে ওঠেনি। সুতরাং আগ্রহভরে এবং সন্তুষ্ট চিত্তে আমি পদটির দায়িত্ব নিতে রাজি হই। যদিও বিষয়টি আমি বিন্দুমাত্র উপলব্ধি করিনি যে এক্ষেত্রে আমাকে কী পরিমাণ দাপ্তরিক কাজের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। 

১৯৯২ সালে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনালগ্ন থেকেই এর সঙ্গে আমার দীর্ঘ বোঝাপড়ার সম্পর্ক বিদ্যমান। স্নাতক শিক্ষার্থী হিসেবে শুরু, এরপর স্নাতক সম্পন্ন করে শিক্ষকের সহকারী হিসেবে নিযুক্ত হই। দীর্ঘ ১৫ বছর অনুপস্থিতির পর আমি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করি। তাই বলা যায়, বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমকালো উত্থান পর্বটি আমার চোখের সামনেই ঘটেছে।

বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, সে সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য বিভাগীয় প্রধান হিসেবে আমি আমার অভিজ্ঞতা লেখার তাড়না অনুভব করছি। আমি আশা করছি, এতে অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আমার সহকর্মীরা তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা সম্পর্কে খোলামেলাভাবে কথা বলতে উত্সাহিত হবেন। এখানে আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বেছে নেয়া আটটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করছি

প্রথমত, শিক্ষার্থীদের প্রায়ই তাদের দুর্বল কর্মক্ষমতার জন্য দোষ দেয়া হয়। কিন্তু আমরা খুব কমই শিক্ষকদের তাদের পঠন-পাঠনের পদ্ধতির নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি। এখানে পরীক্ষা গ্রহণই (যেমন মধ্যবর্তী বা বার্ষিক পরীক্ষা) শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের একমাত্র পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত। অনেক শিক্ষার্থীই প্রচলিত মুখস্থ বিদ্যানির্ভর পরীক্ষায় অসন্তোষজনক ফল অর্জন করে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের দক্ষতা মূল্যায়নের অন্যান্য পদ্ধতি, যেমন ক্লাস প্রেজেন্টেশন, ফিল্ড ট্রিপ-পরবর্তী স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ কিংবা দলের মধ্যে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন ইত্যাদি ক্ষেত্রে তারা চমত্কার দক্ষতা প্রদর্শন করে। আমরা দেখেছি মূল্যায়ন পদ্ধতির একটি পোর্টফোলিও শিক্ষার্থীদের শেখার উদ্দীপনা জাগাতে চমত্কারভাবে কাজ করে।

দ্বিতীয়ত, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের দ্রুত দক্ষ করে তুলতে সাহায্য করে। যেমন বিনিময় হার বিষয়ে বক্তৃতা প্রদানের সময় পশ্চিমা পাঠ্যবইয়ের ডলার-ইয়েন কিংবা ডলার-পাউন্ডের উদাহরণ টানার বদলে ডলার-টাকা কিংবা রুপি-টাকার উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া ভালো। উন্নয়ন অর্থনীতির বইগুলো সাধারণত বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্যের প্রচলিত উদাহরণগুলো দিয়ে ভর্তি। কারণে শিক্ষার্থীদের জন্যও এটি সহজপাঠ্য। একইভাবে শিক্ষকদের স্থানীয় উদাহরণ সম্পর্কিত ধারণাগুলো তুলে ধরতে বাড়তি কাজ করতে হবে, বিশেষ করে যখনই প্রয়োজন পড়বে। তবে সব শিক্ষক এটা করেন না, কারণ এজন্য অতিরিক্ত প্রচেষ্টা যোগের প্রয়োজন পড়ে।  

তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষকদের নৈতিক দায় থাকা উচিত। এক-চতুর্থাংশেরও কম শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করতে সক্ষম হয়। তবু পাঠ্যক্রমের একটি বড় অংশ পুরনো বিষয়বস্তু আর তত্ত্ব-সংবলিত থাকে বিধায় পরবর্তী সময়ে এটি চাকরির জন্য যে ধরনের দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন, তা শেখায় না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে এখানে উদ্যোগী হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের পাঠ্যসূচি উন্নত করার জন্য নেতৃত্ব দিতে হবে, যাতে সমাজ অর্থনীতির দ্বৈত উদ্দেশ্য সাধন করা সম্ভব হয়।

চতুর্থত, আজকালকার শিক্ষার্থীরা নিজেদের অধিকার কর্তব্য সম্পর্কে অসচেতন মনে হয়। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ করে, এমনকি যেখানে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতাও নেই। কিছু শিক্ষার্থী আবার ক্লাস শেষ হওয়ার পর প্রশ্ন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং অন্য শিক্ষার্থীদের প্রশ্নটি থেকে শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। প্রশ্ন করার অভ্যাসগুলো মনের জড়তা কাটানো আর দ্বিধাহীন হওয়ার সেরা উপায়। এছাড়া এর অন্যান্য উপকারও রয়েছে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, চাপা স্বভাবের কোনো শিক্ষার্থী যখন প্রশ্ন করে, তখন পরীক্ষায় ধরনের কোনো প্রশ্ন আসবে কিনা।

পঞ্চমত, বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত এক বছরে তিনটি সেমিস্টারের যে পদ্ধতি রয়েছে, অভিভাবকরা সে সম্পর্কে খুব ভালো জানেন না। আর্থিক সহায়তার জন্য সময়সীমা থেকে শুরু করে কোন কোর্সটি বাদ দিতে কিংবা প্রত্যাহার করতে হবে অথবা পুনর্বার দিতে হবে, এসব বিষয়ে সঠিক তথ্য না জানার কারণে এটি তাদের আর্থিক ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। সম্প্রতি পাস করে বের হওয়ার পর স্নাতক পাস শিক্ষার্থীদের চাকরিতে অবস্থান কী হবে কিংবা প্রথম চাকরি পাওয়ার সময়, কাজ শুরুকালীন বেতন কেমন হবে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অভিভাবকরা খুব কমই অনুসন্ধান করেন। মা-বাবারা যখন তাদের ব্যয়বহুল বিনিয়োগের প্রতিদান সম্পর্কে নিজেদের মতামত উত্থাপন করবেন, তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরো ভালো অবস্থানে থাকবে।

ষষ্ঠ, একসময় স্টিভ জবস বলেছিলেন, চৌকস লোকদের নিয়োগ দিয়ে তাদের কী করতে হবে, এটা বলে দেয়াটা কোনো কাজের কথা নয়; তাদের নিয়োগের মাধ্যমে আমরা বরং আমাদের করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা গ্রহণ করতে পারি। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিক বিপরীত। তারা যোগ্য ডিন আর প্রধান নির্বাহীদের নিয়োগ দেয় ঠিকই, কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা দেয়া হয় না। কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি, যেখান থেকে আমি পড়াশোনা করেছি, সেখানে কিন্তু কারো নিয়োগ কিংবা চাকরিচ্যুতির বিষয়গুলোয় এককভাবে ডিনদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে। এমনকি উপাচার্যের মতো ঊর্ধ্বতন প্রশাসকরা গবেষণা তহবিল বাহ্যিক সহযোগিতা নিয়ে কাজ করেন। আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিকেন্দ্রীকরণের ভিত্তিতে অনুরূপ মডেল থেকে উপকৃত হবে।

সপ্তমত, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা হয় না, এমন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ধারণ করার জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠা হয়েছে। অন্যথায় শিক্ষার্থীদের অনেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাত। অন্যান্য ক্ষেত্রে অবদান রাখা ছাড়াও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাই দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাপ বেশি। এখানে পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সময় বের করাটা বেশ মুশকিল। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতির সময়, গবেষণা যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে, যা কিনা অযুক্তিসংগতও। এটি এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে খুব সাবধানী চিন্তাভাবনা প্রয়োজন।

অষ্টমত, আমাদের সমাজ শিক্ষা সরবরাহকারীদের মালিকানা সম্পর্কে একটি অযথা বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। অনেকেই এখনো বিশ্বাস করে যে বেসরকারি বিশ্বদ্যালয়গুলো থেকে শিক্ষার্থীরা গ্রেড কিনতে পারে। আমার কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের নিজেদের মা-বাবা এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজন এমনকি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সহোদর-সহোদরা কিংবা চাচাতো ভাইবোনের কাছ থেকে রীতিমতো পীড়নের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ধরনের ধারণা পরিবর্তনের লক্ষ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশ ধীরগতিতেই অগ্রসর হচ্ছে। বেসরকারি খাতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের বরং অনেকগুলো হোমওয়ার্ক করতে হবে, যাতে তাদের মান স্বীকৃত হয়।

বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালনের শেষ দিকে আমি ব্যাপকভাবে যে বিষয়টি উপলব্ধিতে সমর্থ হই তা হলো, একজন শিক্ষাবিদ প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিবিদের মধ্যকার দ্বিবিভাজন। যদিও বিষয়টি আংশিকভাবে নিজের জন্য ক্ষতিকর। আমি এটি ভেবে বিস্মিত হয়েছি তা হলো, প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিবিদযাদের কিনা ক্লাসের প্রস্তুতি গ্রহণ, লেকচার তৈরি, মিটিং থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী এবং অন্যদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতে হয়, -মেইল আদান-প্রদান করাসহ অন্যান্য কাজের সঙ্গেও সম্পৃক্ত থাকতে হয় এবং তারা বাস্তব জীবনের সামাজিক অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। যতক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষাবিদরা সত্যিকারের সমস্যার সঙ্গে নিজেদের সংশ্লিষ্ট করতে আগ্রহী না হবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে সমাজের যথাযথ সেবা করা সম্ভব হবে না।

 

. সৈয়দ বাশার: অর্থনীতির অধ্যাপক

ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন