বুধবার | জুন ২৯, ২০২২ | ১৫ আষাঢ় ১৪২৯  

সম্পাদকীয়

সময়ের ভাবনা

পরীক্ষা পরিচালনা ও ফলাফল প্রকাশে কিউআর কোডের ব্যবহার

ড. জাহাঙ্গীর এইচ মজুমদার

সেদিন একটি জাতীয় দৈনিকের এক কোণে ছোট করে ছাপা একটা সংবাদে চোখ আটকে যায়। খবরটি ছিলনতুন প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংক রিকশাচালকদের অভিনব পদ্ধতিতে সেলফোনে লেনদেনের সুযোগ করে দিয়েছে। ব্যাংকটি তাদের কিউআর (কুইক রেসপন্স) কোড-সংবলিত এক ধরনের কার্ড দিয়েছে। যাত্রী নির্দিষ্ট অ্যাপ দিয়ে সে কিউআর কোডটি স্ক্যান করে চালকের ওয়ালেটে ভাড়ার টাকা ট্রান্সফার করতে পারবে। এতে নাম্বার প্রদান, নগদ লেনদেন ভাংতি নিয়ে দুশ্চিন্তাও থাকবে না। রিকশাচালকের সাধারণ ফিচার ফোন হলেও চলবে, লাগবে না স্মার্টফোন। চালক পরে নির্দিষ্ট এজেন্টের কাছ থেকে প্রয়োজনমতো টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। ঘটনাটি বেশ ইতিবাচক। প্রান্তিক জনগণও প্রযুক্তির সুবিধা ঘরে তুলতে পারবে। ভারতের এক রেলস্টেশনেও দেখা গেছে এক ভিক্ষুক কিউআর কোড-সংবলিত কার্ড ব্যবহার করে ভিক্ষা করছে। এবার মূল প্রসঙ্গে যাওয়া যাককিউআর কোড ব্যবহার করে কম খরচে দ্রুততম সময়ে কীভাবে বিভিন্ন পরীক্ষা পরিচালনা ফল প্রকাশ করা যায়।

দেশে বিভিন্ন রকম পাবলিক পরীক্ষাপিএসসি, জেএসসি, এসএসসি এইচএসসি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাঅনুষ্ঠিত হচ্ছে। এছাড়া রয়েছে ভর্তি পরীক্ষা, নিয়োগ পরীক্ষা। তবে লেখার মূল মনোযোগ বোর্ড জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার ওপর। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালে এসএসসিতে ২২ লাখ ২৭ হাজার ১১৩ এবং এইচএসসিতে প্রায় ১৩ লাখ ৯৯ হাজার ৬৯০ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। বিপুল পরীক্ষার্থীর ফল প্রস্তুত এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। উদাহরণস্বরূপ, এইচএসসির প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়াটি দেখা যাক। অতিমারীর ব্যতিক্রম বাদ দিলে সাধারণভাবে প্রত্যেক এইচএসসি পরীক্ষার্থীকে ১৩টি লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। অর্থাৎ তাদের জন্য মোট কোটি ৮২ লাখ উত্তরপত্র প্রস্তুত, মূল্যায়ন আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়। বর্তমানে লিখিত পরীক্ষার খাতা প্রস্তুত করার সময় প্রত্যেকটির সঙ্গে একটি করে ওএমআর ফরম জুড়ে দেয়া হয়। প্রতিটি ওএমআর ফরমের দাম পড়ে প্রায় টাকা। সেক্ষেত্রে ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর ১৩টি করে বিষয়ের ওএমআর বাবদ খরচ পড়বে প্রায় কোটি ১০ লাখ টাকা।

পরীক্ষা পরিচালনার সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, পরীক্ষার হলে পরীক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিরূপণ রেকর্ড সংরক্ষণ। এটি এখন ম্যানুয়ালি করা হয়। মাঝে মাঝে অসাধু পরীক্ষার্থীরা এর সুযোগ নিয়ে অন্য কাউকে দিয়ে প্রক্সি পরীক্ষা দেয়ায়। আবার অনেক সময় দীর্ঘদিন পেপার বেজড এসব রেকর্ডপত্র সংরক্ষণ একটি জটিল কাজ। আবার কখনো কখনো মিসিং হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এক্ষেত্রে ডিজাটালি রেকর্ড সংরক্ষণ করা গেলে পরবর্তী সময়ে পুনরুদ্ধার করাও সহজ হবে।

এবার আসা যাক মূল্যায়নের পর আনুষঙ্গিক কাজ প্রসঙ্গে। নির্বাচিত পরীক্ষকরা বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তরপত্র গ্রহণ করার পর তা মূল্যায়ন করেন এবং আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেগুলো প্রধান পরীক্ষকের কাছে জমা দেন। কিন্তু পরীক্ষকরা প্রায়ই বলেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নের থেকে আনুষঙ্গিক কাজে অধিক সময় শ্রম দিতে হয়। আনুষঙ্গিক কাজের মধ্যে রয়েছে ওএমআর ফরমে বিভিন্ন তথ্য পূরণ করা এবং সে অনুযায়ী বৃত্ত ভরাট করা। কাজটি পরীক্ষকদের জন্য বিরাট বোঝা। অনেক সময় এসব কাজ সম্পাদনে পরীক্ষকরা শিক্ষার্থী বা পরিবারের সদস্যদের সাহায্য নেন। এতে দেখা যায়, তথ্য পূরণ বৃত্ত ভরাটে অনেক ধরনের ভুল থেকে যায়। দেখা যায়, কোনো পরীক্ষার্থী পেয়েছে ৮১ কিন্তু ভুলে ভরাট করা হয়েছে ১৮, আবার কেউ হয়তো পেয়েছে ৬০ কিন্তু তথ্য লেখা পূরণ করা হয়েছে ০৬। ফলে কোনো কোনো শিক্ষার্থীর জীবনে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। মাঝে মাঝে পুনর্মূল্যায়নের পর ফেল করা শিক্ষার্থীর জিপিএ প্রাপ্তির খবরও বের হয়। আবার এসব তথ্য পূরণ বৃত্ত ভরাটে এতটা সময় দিতে হয় যে অনেক সময় পরীক্ষকরা উত্তরপত্র মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ কাজে সময় কম দেন। এতে মূল্যায়নের নির্ভরযোগ্যতা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে প্রধান পরীক্ষকের কাছে উত্তরপত্র এলে সেগুলোর নিরীক্ষা করা হয়। অনেক সময় সেসব নিরীক্ষার ফাঁকফোকরে ভুল-ভ্রান্তি থেকে যায়। সব শেষে প্রধান পরীক্ষক মূল উত্তরপত্র থেকে ওএমআরের নির্ধারিত অংশ আলাদা করে বোর্ডে পাঠিয়ে দেন। বোর্ড সেসব অংশ স্ক্যান করে এবং ফলাফল প্রস্তুত করে। কোটি কোটি ওএমআর স্ক্যান করার কাজটি বোর্ডের জন্য বেশ শ্রমসাধ্য সময়সাপেক্ষ। এমন পরিপ্রেক্ষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে পরীক্ষক বোর্ডের সময়, শ্রম সম্পদ বাঁচিয়ে আরো সহজে অপেক্ষাকৃত নির্ভুলভাবে কাজটি সম্পন্ন করা যেতে পারে। কিন্তু কীভাবে এটি সম্ভব?

শুরু করতে হবে প্রবেশপত্র দিয়ে। শিক্ষার্থীদের প্রদত্ত প্রবেশপত্রে সংযুক্ত করতে হবে কিউআর কোড। উত্তরপত্রের কাভার পৃষ্ঠায়ও কিউআর কোড সংযুক্ত করতে হবে। যেহেতু কেন্দ্রে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ সেহেতু বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয় ইন্টারনেটে যুক্ত এক ধরনের কাস্টমাইজড কিউআর কোড স্ক্যানার সরবরাহ করবে প্রতিটি কেন্দ্রে। প্রদত্ত ডিভাইসটি দিয়ে একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর প্রবেশপত্র উত্তরপত্র স্ক্যান করবে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরীক্ষার্থীর তথ্যের সঙ্গে নির্দিষ্ট উত্তরপত্রের বাইন্ডিং হবে। প্রক্রিয়ায় পরীক্ষার্থী হাজিরার বিষয়টিও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষার্থীটি অন্য কারো হয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে কিনা, তাও চিহ্নিত করা যাবে। স্ক্যানার থেকে প্রাপ্ত এসব তথ্য তত্ক্ষণাৎ বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সার্ভারে জমা হতে থাকবে। ব্যাকআপ তথ্যের জন্য, উত্তরপত্রের কাভার পৃষ্ঠায় হাতে লিখিত শিক্ষার্থীর অংশটি ছিঁড়ে কেন্দ্রে সংরক্ষণ করলেই হবে। এগুলো আর শিক্ষা বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে না। যেহেতু বৃত্ত ভরাটের বিষয় থাকছে না, সেহেতু কাভার পৃষ্ঠাটি সাধারণ কাগজের হলেও সমস্যা নেই। বর্তমানে লিথোকোড যুক্ত একটি ফরমের জন্য যেখানে টাকা খরচ হয়, সেখানে খরচ হবে মাত্র টাকা। বেঁচে যাবে প্রায় কোটি ২৮ লাখ টাকা।

এরপর পরীক্ষা শেষে উত্তরপত্র যখন পরীক্ষকের কাছে যাবে তখন পরীক্ষককে শুধু তথ্য পূরণ করলেই হবে, বৃত্ত ভরাটের প্রয়োজন পড়বে না। ফলে তারা উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য অধিক সময় পাবেন। মূল্যায়ন শেষে পরীক্ষক নিজেই উত্তরপত্রের কিউআর কোড স্ক্যান করে উত্তরপত্রের ক্রমিক এবং প্রাপ্ত নম্বর এন্ট্রি দেবেন। এজন্য শিক্ষা বোর্ড পরীক্ষকদের স্মার্টফোনে বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত অ্যাপস ইনস্টল করে দেবে এবং তাদের মোবাইল নাম্বারের সঙ্গে তা বাইন্ড করে দেবে। যেমনটি আমরা সোনালী ব্যাংকের সোনালী ওয়ালেটের ক্ষেত্রে দেখি। পরীক্ষক নম্বর এন্ট্রি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভারে আপলোড হতে থাকবে। তবে এক্ষেত্রে এগুলো প্রথমে নির্ধারিত প্রধান পরীক্ষকের প্যানেলে দেখাবে। নিরীক্ষক প্রধান পরীক্ষক সেখানে এগুলোর ওপর কাজ করতে পারবেন। কাজ শেষে প্রধান পরীক্ষক কৃত পরিবর্তনসহ সেসব নম্বর বোর্ডে পাঠিয়ে দেবেন। এতে বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়কে আর লাখ লাখ ওএমআর স্ক্যান করতে গিয়ে গলদঘর্ম হতে হবে না। প্রধান পরীক্ষকদের কাজ শেষের মাত্র এক সপ্তাহ বা আরো কম সময়ের মধ্যে বোর্ড ফল প্রস্তুত করতে পারবে। এখনকার মতো আর এক-দেড় মাস সময়ের প্রয়োজন হবে না। মোটের ওপর বলা যায়, পরীক্ষা শেষ হওয়ার ১৫-২০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে। আবার পরীক্ষক যেহেতু উত্তরপত্রে একটি ক্রমিক লিখে প্রাপ্ত নম্বর এন্ট্রি দিচ্ছেন, সেহেতু পরবর্তী সময়ে পুনর্নিরীক্ষণের জন্য উত্তরপত্র খুঁজে বের করা আগের মতোই সহজ থাকবে।

ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় একটি বোর্ডের প্রোগ্রামার জানিয়েছেন, কাজটি খুব কঠিন কিছু হবে না। কাজে বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে উত্তরপত্রের কাভার পৃষ্ঠা, কিউআর কোড স্ক্যানের জন্য একটি অ্যাপস কাস্টমাইজড ডিভাইস প্রস্তুত করতে হবে। যেহেতু ওএমআর ফরম লাগবে না, সেহেতু সে খাতে যে টাকা বাঁচবে, তাতেই ব্যয় মেটানো সম্ভব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে কলেজগুলো থেকে আইসিটির শিক্ষক এনে অ্যাপস ডিভাইস প্রস্তুত এবং নিয়ন্ত্রণের কাজে লাগাতে পারে। একবার প্রস্তুত হয়ে গেলে পরের বছর খরচ আরো কম লাগবে। প্রাথমিকভাবে এটিকে পাইলটিং করে দেখা যেতে পারে। সাফল্য পেলে পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়নের দিকে যাওয়া যাবে এবং কম খরচে, কম ভুলে এবং কম সময়ে ফল প্রদান সম্ভব হবে। আশার কথা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিরূপণে রকম একটি অ্যাপস প্রস্তুত করছে। এটির সফল বাস্তবায়ন অন্যান্য পরীক্ষায়ও পদ্ধতির প্রয়োগ উৎসাহিত করবে।

 

. জাহাঙ্গীর এইচ মজুমদার: শিক্ষক গবেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন


×