বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২১, ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার দারিদ্র্য দূরীকরণে আমূল ভাবনা

ড. মোহাম্মাদ দুলাল মিয়া

সুইডিশ রয়্যাল একাডেমি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার-২০১৯ ঘোষণা করে ১৪ অক্টোবর। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি, তার সহধর্মিণী ফ্রান্স বংশোদ্ভূত মার্কিন অর্থনীতিবিদ এস্তার দুফলো হার্ভার্ডের অধ্যাপক মাইকেল ক্রেমারকে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। অভিজিৎ-দুফলো দম্পতি আমেরিকার বিখ্যাত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) অধ্যাপক। দম্পতির যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দারিদ্র্য দূরীকরণের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আব্দুল লতিফ জামিল পোভার্টি অ্যাকশন ল্যাব তাদের নোবেল পুরস্কার প্রদানে এটাই প্রতীয়মান হয় যে দারিদ্র্য এখনো বিশ্বের মূল সমস্যাগুলোর অন্যতম।

তবে ২০১৯ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার অন্য কারণেও বেশ তাত্পর্যপূর্ণ। অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের সূচনা হয় ১৯৬৯ সালে, আজ থেকে ঠিক ৫০ বছর আগে। এই ৫০ বছরে মাত্র দুজন নারী অর্থনীতিবিদ সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হন। এর আগে ২০১০ সালে মার্কিন অধ্যাপক এলিনর অসট্রম অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি দেখিয়েছেন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অথবা সমাজ বা গোষ্ঠী মালিকানাধীন সম্পদের কীভাবে সর্বোত্তম ব্যবহার করা যায়। তবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে এস্তার দুফলোই সর্বকনিষ্ঠ।

নোবেল কমিটি তাদের বিবেচনার সপক্ষে বেশকিছু বাস্তবিক যুক্তি তুলে ধরে। তার মধ্যে প্রথম প্রধান হচ্ছে যে ত্রয়ীর গবেষণার ফল দারিদ্র্য নিরসনে রাষ্ট্র বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, যারা দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে কাজ করছে, তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। গত দুই দশকে তাদের গবেষণার ফল উন্নয়ন অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে অভিহিত করা হয়।

দারিদ্র্য নিরসনে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক কার্যক্রম কয়েক দশক ধরে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও প্রকৃত অবস্থার উন্নয়নে বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিশ্বব্যাংকের ভাষ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-দশমাংশ (প্রায় ৭৫ কোটি) লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, যারা দৈনিক মাত্র দশমিক মার্কিন ডলারে জীবন যাপন করে। তাদের অর্ধেকেরও বেশি (প্রায় ৪১ কোটি) বাস করে সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলে। পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে অতিদারিদ্র্যের হার কমলেও সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে, যা সত্যিই আশঙ্কাজনক। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৫০ লাখ শিশু মারা যায় এমন সব রোগে, যা স্বল্প ব্যয়ের চিকিৎসা দ্বারা প্রতিরোধ বা নিরাময় করা সম্ভব। তদুপরি বিশ্বের অর্ধেক শিশু এখনো প্রাথমিক সাক্ষরতা গণিতের কোনো রকম দক্ষতা ছাড়াই বিদ্যালয় ছেড়ে চলে যায়। পরিসংখ্যান এটাই প্রমাণ করে যে দারিদ্র্য এখনো বিশ্বের একটি প্রধান সমস্যা। মাইকেল ক্রেমার তার সহকর্মীদের গবেষণার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল কীভাবে অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। যদিও ভাবনা অর্থনীতিতে নতুন কিছু নয়, তবে তাদের গবেষণা চিরাচরিত পদ্ধতির চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন।

দারিদ্র্য নিরসনে আন্তর্জাতিক সংস্থার (যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ) পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) তাদের শ্রম সম্পদ দিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে দারিদ্র্য নিরসনে সফলতার হার তুলনামূলকভাবে কম, সেটা উপরের পরিসংখ্যানই বলে দেয়। নোবেলজয়ী ত্রয়ী অর্থনীতিবিদ সমস্যার মূল কারণ অনুসন্ধানে পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে, দারিদ্র্যকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে প্রথাগত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে দারিদ্র্যের মধ্যে মিশে গিয়ে তাদের প্রকৃত অবস্থাটা বুঝতে হবে। তার জন্য দরকার পর্যাপ্ত সময়ের। সেই নিমিত্তে তাদের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে আব্দুল লতিফ জামিল পোভার্টি অ্যাকশন ল্যাব। ল্যাবের মাধ্যমেই পরিচালিত হয় মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষামূলক (এক্সপেরিমেন্টাল) গবেষণা। তাদের উদ্ভাবিত গবেষণা পদ্ধতি দারিদ্র্য নিরসনে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পেরেছে।

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার নিম্নহার নিম্নমানের জন্য দারিদ্র্যকেই প্রধানত দায়ী করা হয়। যেমন শিক্ষা সম্পর্কে অভিভাবকদের উদাসীনতা, শিক্ষার ভবিষ্যৎ সুফল সম্পর্কে অজ্ঞানতা, তাত্ক্ষণিক লাভের আশায় শিশুদের স্কুলে না পাঠিয়ে পারিবারিক বা অন্যান্য কাজে নিয়োগ ইত্যাদি কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিতির হার বেশি হয়। আর এজন্য শিশুদের স্কুলভিত্তিক কিছু প্রণোদনা দেয়া হয়। প্রথাগত সমাধান কতটুকু বাস্তব, সেটা প্রমাণ করার জন্য ক্রেমার তার টিম কেনিয়ায় পরীক্ষামূলক গবেষণা চালান। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখেন যে আফ্রিকা মহাদেশের শিশুরা প্রায়ই অসুখে ভোগে, যার জন্য তারা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। সেসব রোগের প্রায় অর্ধেকই সংক্রামক এবং পরজীবী। বিশেষ করে অন্ত্রের বিভিন্ন ধরনের কৃমির প্রভাব, যা তাদের শারীরিক মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে। ধারণা থেকে ১৯৯৮ সালে কেনিয়ার ৭৫টি স্কুলকে দৈবচয়ন ভিত্তিতে তিনটি ভাগে ভাগ করেন। এনজিওর মাধ্যমে প্রত্যেকটা নিয়ন্ত্রিত দলকে প্রতি ছয় মাস অন্তর তিন বছর ধরে কৃমিনাশক ওষুধ দেয়া হয়। তিন বছর পর দেখা যায় যে শিশুদের প্রায় ৬১ শতাংশের মধ্যে সংক্রামক পরজীবী রোগের প্রকোপ কমেছে। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রিত দলের শিশুদের স্কুলে অনুপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে (২৫ শতাংশ) হ্রাস পেয়েছে। শুধু তাই নয়,পরীক্ষামূলক অঞ্চলের তিন কিলোমিটার পর্যন্ত কৃমিনাশক ওষুধ না খাওয়ানো শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণের হার হ্রাস পেয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ধারণা বহুল প্রচলিত যে অসচ্ছল পরিবারগুলো অর্থের অভাবে পর্যাপ্ত শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহে অপারগ, ফলে জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার হার মান অনেক কম। ধারণা থেকে উন্নয়নশীল দেশে সাধারণত বিনা মূল্যে শিশুদের মধ্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের প্রচলন রয়েছে। আবার কিছু প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খাবারের বন্দোবস্ত করছে। এসব কার্যক্রম সুফল বয়ে আনলেও শিক্ষার গুণগত তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায় না। ক্রেমার তার টিম কেনিয়ায় আরেকটি পরীক্ষামূলক গবেষণা চালিয়ে দেখার চেষ্টা করেন যে বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ শিক্ষার মানে কতটুকু প্রভাব ফেলে। তারা বিভিন্ন শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের একটি নিয়ন্ত্রিত গ্রুপে ভাগ করে তাদের মধ্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করে নির্দিষ্ট সময় পর ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখান যে নিয়ন্ত্রিত অনিয়ন্ত্রিত গ্রুপের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানে (টেস্ট স্কোর) তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য নেই। পাঠ্যপুস্তক বিতরণ সেরা শিক্ষার্থীদের স্কোর বাড়িয়েছে বটে, তবে অন্য শিক্ষার্থীদের (বিশেষ করে দরিদ্র সম্প্রদায়) ওপর প্রভাব অনেক কম। এর কারণ হিসেবে তারা দেখিয়েছেন কেন্দ্রীভূত এবং অভিন্ন জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমের দুর্বলতা।


অভিজিৎ-দুফলো দম্পতিও একই পদ্ধতি অনুসরণ করে কীভাবে দারিদ্র্য দূর করা যায়, তার কিছু টেকসই প্রস্তাব নীতিনির্ধারকদের জন্য তুলে ধরেছেন। দম্পতি দেখান যে অসচ্ছল ব্যক্তিরাও প্রায় প্রতিটি উপায়ে সমাজের বাকিদের মতোই। সবার একই রকম ইচ্ছা এবং দুর্বলতা রয়েছে। অসচ্ছলরা অন্য কারো চেয়ে কম যুক্তিযুক্ত নয়; বরং উল্টো। কারণ সম্পদের অনেক বেশি সীমাবদ্ধতার ভেতরে তাদের পছন্দগুলো সতর্কতার সঙ্গে চিন্তাভাবনা করে বাস্তবায়ন করতে হয়। অবস্থায় সামান্যতম বিচ্যুতি, বিশ্বাসের অভাব অথবা রকম ছোটখাটো কোনো সমস্যা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে দিতে পারে। সুতরাং অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তাদের দরকার একটুখানি সাহায্যের হাত, তথ্যের সরবরাহ, সঠিক নির্দেশনা।

ভারতের কয়েকটি রাজ্যে পরীক্ষামূলক গবেষণা চালিয়ে দেখান যে অপুষ্টির কারণে অনেক শিশু স্কুলে যেতে পারে না। যদিও সেসব জনসংখ্যার আয়ের এবং সময়ের একটা বড় অংশ চিকিৎসার জন্য ব্যয় হয়, তবু তারা রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে, যা সহজলভ্য এবং মোটেও ব্যয়বহুল নয়, খুবই উদাসীন। অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কিছু পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন, যেমন কোনো স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু রাখা। যদি সেবাগ্রহীতা সেই সেবা নিতে না চান, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সেটা অবগত করতে হবে। এই অতিরিক্ত পদক্ষেপের প্রয়োজন সেবাগ্রহীতাকে সেবা না নেয়ার জন্য নিরুৎসাহিত করেছে। এছাড়া অতিরিক্ত প্রণোদনা যেমন একটি টিকাক্রমের পরবর্তী ডোজ পাওয়ার পুরস্কার হিসেবে বিনা মূল্যে খাবার বিতরণ অনেক কার্যকরী বলে প্রমাণিত হয়েছে। আবার শর্তহীন নগদ টাকা প্রদান শিশুদের স্কুলে ভর্তির হার বৃদ্ধি করে। এছাড়া মা-বাবাদের বুঝিয়ে বলা যে শিক্ষার প্রতিটি অতিরিক্ত বছরের সঙ্গে আয়ের পরিমাণটি আনুপাতিকভাবে বৃদ্ধি পায়। পন্থাটিও অনেক কার্যকরী। পরীক্ষামূলক গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে নেয়া পদক্ষেপে ভারতের প্রায় পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি শিশু উপকৃত হয়েছে। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রচুর ভর্তুকির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভারতের সাফল্য অনেক দেশকে অনুপ্রাণিত করেছে পদক্ষেপ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে।

ত্রয়ী অর্থনীতিবিদের গবেষণার আরেকটা উল্লেখযোগ্য দিক হলো, সমসাময়িক উন্নয়নের তত্ত্বগুলো, যেখানে প্রায়ই ধরে নেয় যে বড় সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্য কঠোর রাজনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন, যা অনেক ক্ষেত্রে খুব কঠিন বা প্রায় অসম্ভব, সেখানে তারা দেখিয়েছেন যে বিদ্যমান সামাজিক রাজনৈতিক অবকাঠামোর মধ্যে থেকেও নীতিগত উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব। মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এলে আপনা-আপনিই সচেতন হবে, যা পরবর্তী সময়ে সামাজিক রাজনৈতিক কাঠামোকে সংস্কারের প্রয়োজনীয় উপকরণের জোগান দেবে। সামগ্রিকভাবে ছোট ছোট উন্নয়নের নীতি সরকারের ওপর মানুষের আস্থার জন্ম দেবে। সেই আস্থার ওপর ভিত্তি করে সরকার দীর্ঘমেয়াদি বড় বড় পদক্ষেপ নিতে পারবে, যা প্রকারান্তরে দেশ জাতির সামগ্রিক উন্নয়নে সহায়ক হবে।

জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্যই দরিদ্ররা পায় না। আর তাই যা সত্য নয় তা- বিশ্বাস করে। অবস্থা তাদের চিন্তাধারাকে সীমিত করে ফেলে। তাতে তাদের আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি হয়। অবস্থা বিরাজমান থাকলে দারিদ্র্য নিরসন প্রায় অসম্ভব। তাই তাদের বোঝাতে হবে যে দরিদ্রতা তাদের প্রাপ্য কোনো বিষয় নয় বা ইতিহাস বা ঐতিহ্যের অংশ নয়। বরং তারা চাইলেই অবস্থার উত্তরণ সম্ভব। তারা যা যা করতে সক্ষম, সে সম্পর্কে তাদের ওয়াকিবহাল করতে হবে। কথা মনে রাখতে হবে যে আজকে তারা যা ভাববে, তাদের ভবিষ্যতের পথ সেভাবেই নির্ধারণ হবে।

 

. মোহাম্মাদ দুলাল মিয়া: অধ্যাপক বিভাগীয় প্রধান ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্স

নিজুয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ওমান

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন