শনিবার | জুলাই ২৪, ২০২১ | ৯ শ্রাবণ ১৪২৮

সিল্করুট

লক্ষ্মণপুর থেকে লক্ষ্ণৌ

মাহমুদুর রহমান

লক্ষ্ণৌ কবে প্রতিষ্ঠিত হলো বা এখানে কে প্রথম জনপদ গড়ে তুলল সে প্রসঙ্গে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। কিংবদন্তি হলো লংকা বিজয় এবং বনবাস শেষে রাম যখন সিংহাসন লাভ করেন, তিনি লক্ষ্মণকে অঞ্চল দান করেন। লক্ষ্মণের নাম অনুসারে অঞ্চলের নাম হয় লক্ষ্মণপুর আরেকটি তত্ত্ব অনুসারে যুধিষ্ঠিরের পৌত্র জনমেজয় অঞ্চল মুনি-ঋষিদের দান করেছিলেন। মুনি-ঋষিদের পার্থিব অনাগ্রহের কারণে তরাই অঞ্চল হতে ভর পাঁসী নামে দুটি জাতি আগমন করে অঞ্চলটি দখল করে বসতি স্থাপন করে। তারও বহু পর, একাদশ শতাব্দীতে গজনীর সুলতান মাহমুদের ভাগ্নে সৈয়দ সালার মাসুদের অভিযানের সময়ে অঞ্চলে মুসলমানদের আগমন ঘটে।

লক্ষ্ণৌ সঙ্গে অযোধ্যার যোগাযোগ রয়েছে, তা নামকরণ হোক কিংবা বসতি স্থাপন। আমরা যদি মানচিত্রে লক্ষ করি, তবে দেখব অযোধ্যা হতে পশ্চিমে লক্ষ্ণৌ অবস্থিত। আমরা জানি, নৃপতিরা তাদের নিকটজনকে জায়গির প্রদান করে থাকেন। সে হিসেবে মেনে নেয়া সম্ভব যে লক্ষ্মণের নামানুসারে অঞ্চল লক্ষ্মণপুর হয়েছিল। আরো কথিত রয়েছে লক্ষ্মণ একটি টিলার ওপর প্রাসাদ তৈরি করার কারণে এটি লক্ষ্মণটিলা নামে পরিচিত হয়। লক্ষ্মণপুর  কিংবা লক্ষ্মণটিলা থেকে লক্ষ্ণৌতি হয়ে ঠিক কবে লক্ষ্ণৌ হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। আকবরের সময়ের নথিতে সর্বপ্রথম লক্ষ্ণৌ উল্লেখ পাওয়া যায়।

যে লক্ষ্ণৌ নিয়ে কবিতা, কিংবদন্তি রচিত হয়েছে কিংবা যে লক্ষ্ণৌ রোশনাইয়ে সজ্জিত হতো, সে লক্ষ্ণৌ অষ্টাদশ শতাব্দীতে তৈরি হয়েছিল। পৌরাণিক যুগে শহর পত্তন থেকে সময় পর্যন্ত লক্ষ্ণৌ ইতিহাস কিছুটা ঝাপসা। পর্যায়ের লক্ষ্ণৌ খবর নিতে আরেকটু বড় পরিসরে অওধ-কে দেখতে হয়। লক্ষ্ণৌ সঙ্গে অযোধ্যার যোগাযোগ রয়েছে এবং তা বরাবরের। অনেকে পৌরাণিক অযোধ্যাকেই পরবর্তীকালের অওধ মনে করেন, কিন্তু এটি ভুল। বর্তমানে ফৈজাবাদের সঙ্গে প্রায় সংযুক্ত সেকালের অযোধ্যা হতে শুরু করে রায়বেরেলী, সুলতানপুর, উন্নাও এবং সেখান থেকে শুরু করে বড়বাঁকি, লক্ষ্ণৌ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল নিয়ে অওধ অষ্টাদশ শতাব্দীতে লক্ষ্ণৌ উত্থানের পূর্বে অওধের মধ্যেই শহরের বিকাশ ঘটেছিল।

হিন্দু শাসনের কালপর্বে অঞ্চলটি কোশল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার কেন্দ্র ছিল অযোধ্যা। সে হিসেবে লক্ষ্ণৌ উত্তর কোশলের অংশ হয়েছিল। অযোধ্যার সঙ্গে মিলিয়ে লক্ষ্ণৌ ইতিহাস চিন্তা করলে বলতে হয়, প্রথমে তা সাকেতের অধীন ছিল এবং পরবর্তী সময়ে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীন হয়। ষষ্ঠ শতাব্দীতে হূন আক্রমণের পর গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন হলে অযোধ্যা থেকে ক্ষমতার কেন্দ্র কাণ্যকুব্জে স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তী সময়ে লক্ষ্মণ স্থাপিত জনপদের গুরুত্ববহ উল্লেখ লক্ষ করা যায় না।

মধ্যযুগের লক্ষ্ণৌ কখনো দিল্লির সুলতান, কখনো শর্কী শাসনের অধীনস্থ হয়। ১৩৯৪ হতে ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জৌনপুরে অবস্থান করে শর্কীরা অযোধ্যা থেকে লক্ষ্ণৌ অঞ্চল তথা উত্তর প্রদেশ শাসন করেন। সুলতান নাসিরুদ্দিন মুহম্মদ তুঘলকের উজির মালিক সারওয়ার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই শর্কী বংশে আরো পাঁচজন শাসক এসেছিলেন, যার মধ্যে সর্বশেষ হুসেন শাহ বাহুলুল লোদী কর্তৃক পরাজিত হয়ে বাংলার দিকে পলায়ন করেন। বাহুলুলের পুত্রকে পরবর্তী সময়ে জৌনপুরের শাসক হিসেবে বসানো হলে লক্ষ্ণৌ এক হিসেবে দিল্লির অধীনস্থ হয়ে পড়ে। ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে শের শাহ কাছে পরাজিত হুমায়ুন যখন উত্তর-পশ্চিমে পলায়ন করছিলেন সে সময়ে তিনি ঘণ্টার জন্য লক্ষ্ণৌতে বিশ্রাম গ্রহণ করেন। লক্ষ্ণৌ জনতা সেই অল্প সময়ে ভাগ্যাহত হুমায়ুনকে ১০ হাজার টাকা এবং ৫০টি ঘোড়া উপহার দিয়েছিল। হুমায়ুনের ঘটনা থেকে ধরে নেয়া যায়, মোগল শাসন শুরুর কালে লক্ষ্ণৌ বর্ধিষ্ণু জনবহুল অঞ্চল ছিল।

আকবরের সময় থেকেই লক্ষ্ণৌ সমৃদ্ধি ঘটতে থাকে। মূলত জাহাঙ্গীর, শাহজাহান, আওরঙ্গজেব সবাই লক্ষ্ণৌ প্রতি যত্নশীল ছিলেন। যত্নের অন্যতম একটি কারণ ছিল লক্ষ্ণৌ উর্বর ভূমি। গঙ্গা-যমুনার মধ্যস্থ দোয়াব অঞ্চল এতটাই উর্বর যে তা ভারতের শস্যভাণ্ডার নামে পরিচিত হয়। সেই শস্যের গুণ এবং দিল্লির নিকটবর্তী হওয়ায় আকবরের সময় হতেই লক্ষ্ণৌ মূলত উত্তর ভারতের অন্যতম ব্যবসায়িক কেন্দ্রে পরিণত হয়। আর যেহেতু সেই সময় থেকে শেখ বংশ লক্ষ্ণৌ ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল, তারা নিজেদের শক্তিশালী করে তোলে। মোগল দরবার হতে যেকোনো মোগল কর্মচারী, সম্রাটের পছন্দ অনুসারে সুবাদার হিসেবে নিয়োগ লাভ করলেও লক্ষ্ণৌ মূল ক্ষমতা ছিল শেখজাদাদের হাতে। তারাই রাজস্ব, বাণিজ্য, কৃষি দেখাশোনা করতেন। দিল্লির নিযুক্ত সুবাদার কেবল তাদের কাছ হতে তা গ্রহণ করতেন। অবস্থা একসময় এমন হয়ে দাঁড়ায় যে শেখজাদারা সম্রাটের আদেশের অন্যথা করতেও ভীত হন না।

আওরঙ্গজেবের শাসনামলের পর মোগল সাম্রাজ্য যখন দুর্বল হয়ে পড়ে সে সময়ে ভারতে তিনটি কার্যত স্বাধীন অঞ্চল তৈরি হয়, যার মধ্যে লক্ষ্ণৌ একটি। মূলত ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে বুরহান-উল-মূলক সাদাত আলী খান যে সময় হতে আওয়াধের সুবাদারি লাভ করলেন, সে সময় হতেই লক্ষ্ণৌ পূর্ণ বিকশিত হতে শুরু করে। অবশ্য আওয়াধ অধিকারের জন্য শেখজাদাদের সঙ্গে সাদাত আলীকে লড়াই করতে হয়েছিল। তাদের পরাজিত করেই সাদাত আলী খান অঞ্চলে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সাদাত আলী খানের জয়লাভের পর কৃষি, রাজস্ব, ভূমি ব্যবস্থায় অওধের উন্নতি হয় এবং সেখান থেকে আওয়াধের রাজধানী হিসেবে লক্ষ্ণৌ দ্রুত উন্নত হয়। সাদাত আলী খানের সময় হতে যারা আওয়াধের সুবাদারি লাভ করেন, সবাই নওয়াব বলে পরিচিত হন। বলা চলে, সাদাত আলী খানের হাত ধরেই আওয়াধের নওয়াবি এবং লক্ষ্ণৌ নতুন যাত্রা হয়।

লক্ষ্ণৌ সমৃদ্ধি কেমন করে হয়েছিল? এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। মূলত তত্কালীন মোগল ভারতে একের পর এক আক্রমণের কথা সবারই জানা। নাদির শাহ আক্রমণের সময় দিল্লিতে বুরহান-উল-মূলক সাদাত আলী খানের মৃত্যু হলে সফদর জং লক্ষ্ণৌ দায়িত্ব লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে দিল্লির সঙ্গে লক্ষ্ণৌ যোগাযোগ কমে গিয়ে অধীনতা কেবল কাগজে-কলমেই রইল। অর্থাৎ লক্ষ্ণৌ ওপর দিল্লির নিয়ন্ত্রণ কমে আসে। ফলে লক্ষ্ণৌ নওয়াবরা আপন ইচ্ছানুসারে লক্ষ্ণৌকে সাজাতে পেরেছিলেন। পাশাপাশি যেহেতু লক্ষ্ণৌ হয়ে উঠেছিল বাণিজ্যের কেন্দ্র, ফলে ক্রমেই তা রাজনীতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আবদালির দিল্লি আক্রমণের সময়কার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে ভারতের রাজনীতিতে লক্ষ্ণৌ লক্ষ্ণৌ নওয়াবের প্রভাব বোঝা যায়।

আবদালি যে সময়ে দিল্লির দিকে এগিয়ে আসছিলেন, সে সময়ে লক্ষ্ণৌ নওয়াব ছিলেন সুজাউদ্দৌলা। ওই সময়ে রোহিলা নেতা নাজিব-উদ-দৌলা লক্ষ্ণৌ নওয়াবের কাছে ক্রমাগত তদবির করে তাকে আফগান পক্ষে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানান। একই আমন্ত্রণ মারাঠাদের পক্ষ হতেও এসেছিল। অনেকেই মনে করেন, সুজাউদ্দৌলা আফগান পক্ষে যোগ দেয়ার মধ্য দিয়েই মারাঠাদের পরাজয় নিশ্চিত হয়েছিল। মূলত লক্ষ্ণৌ অবস্থান এমন এক অঞ্চলে, অর্থাৎ দোয়াব দিল্লির নিকটবর্তী হওয়ার কারণে ভূরাজনৈতিক কারণেও লক্ষ্ণৌ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যুদ্ধে জয়লাভের পর একদিকে দিল্লি, এর পাশে রোহিলাখণ্ডে মিত্রতার দরুন লক্ষ্ণৌ উন্নতিতে আর কোনো বাধা আসেনি।

পরবর্তী সময়ে বাংলা দিল্লির সঙ্গী হয়ে লক্ষ্ণৌ ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। সিরাজদ্দৌলার পরাজয়ের সাত বছর পর ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধে সম্রাট শাহ আলম এবং মীর কাসিমের সঙ্গে সুজাউদ্দৌলা মৈত্রী করেছিলেন। যুদ্ধের পেছনে পরিকল্পনা ছিল বাংলাকে ইংরেজদের কবল থেকে মুক্ত করা এবং নির্বাসিত সম্রাট শাহ আলমকে দিল্লিতে পুনঃস্থাপন। অর্থাৎ লক্ষ্ণৌ একাধারে বাংলা দিল্লির পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ইংরেজদের বিরুদ্ধে জয়লাভ সম্ভব হয়নি এবং সম্ভবত বক্সারের যুদ্ধের মধ্য দিয়েই ইংরেজদের মধ্যে লক্ষ্ণৌ বিরোধিতা শুরু হয়। কিন্তু তাতে লক্ষ্ণৌ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়নি।

পরবর্তী প্রায় ১০০ বছর ধরে লক্ষ্ণৌকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রত্যেক নবাব ভূমিকা পালন করেছেন। এর মধ্যে আসাফউদ্দৌলা ২২ বছর, দ্বিতীয় সাদাত আলী খান ১৬ বছর নওয়াবি করেন। আসাফউদ্দৌলা তার দীর্ঘ সময়ে লক্ষ্ণৌ বাণিজ্য, কৃষির উন্নতি করেছিলেন। বুরহান-উল-মূলক সাদাত আলী খান ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থায় বিশেষ পরিবর্তন এনেছিলেন, যা রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সুজাউদ্দৌলা লক্ষ্ণৌ শক্তি বৃদ্ধি করলে তাদের উত্তরসূরি হিসেবে আসাফউদ্দৌলা লক্ষ্ণৌ স্থাপত্যের প্রতি মনোযোগী হন। লক্ষ্ণৌ স্থাপত্যে আসাফের অবদান সবচেয়ে বেশি। মূলত তাকেই নওয়াবি লক্ষ্ণৌ প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।

মোগল স্থাপত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিনি বেশকিছু স্থাপনা তৈরি করেন। বিখ্যাত বড় ইমামবাড়া সময়ে নির্মিত, যা আসফি ইমামবাড়া নামেও পরিচিত। সুসজ্জিত একটি বাগানের পাশাপাশি ইমামবাড়ায় একটি মসজিদ রয়েছে, যা আসফি মসজিদ নামে পরিচিত। তবে এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটির নাম ভুল ভুলাইয়া এটি একটি গোলকধাঁধা, যেখানে একবার ঢুকলে অভিজ্ঞ ব্যক্তি ব্যতীত বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব।

আসাফউদ্দৌলা তার দানশীলতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তার সম্পর্কে প্রচলিত প্রবাদ হলো, জিসকো না দে মওলা, উসকো দে আসাফউদ্দৌলা।

লক্ষ্ণৌ যে কাব্য, আদব, তেহজিব (সহবত), শিল্প বিলাসের জন্য পরিচিত, সে সবকিছুর মূর্ত প্রতীক ওয়াজিদ আলী শাহ। পিতা আমজাদ আলী শাহের মৃত্যুর পর ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি যখন লক্ষ্ণৌ নওয়াব হন, ইংরেজরা তখন ভারতের নওয়াবি একে একে গ্রাস করে চলেছে। সেই সময়ে ওয়াজিদ আলী শাহ নওয়াবি রক্ষায় যথার্থ মনোযোগী ছিলেন কিনা তা নিয়ে ভিন্ন প্রসঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা হয়ে থাকে, কিন্তু লক্ষ্ণৌ প্রতি তার ভালোবাসা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না। বস্তুত তিনি লক্ষ্ণৌকে ধারণ করেছিলেন। বিকশিত যে লক্ষ্ণৌকে তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছিলেন, তাকে ওয়াজিদ আলী শাহ দিয়েছিলেন কবিতা, গান, গজল, নাটক ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের একটি শাখাঠুমরি। কিন্তু আজও বিলাসী ভোগী বলে পরিচিত ওয়াজিদ আলী শাহকে ইতিহাস স্মরণ করে কেবল তার হারেম বিয়ের সংখ্যার হিসাবে। কিন্তু ইংরেজ কর্তৃক বিতাড়িত ওয়াজিদ কলকাতার মেটিয়াবুরুজে নির্বাসিত হয়ে লক্ষ্ণৌ ত্যাগ করার সময় যে কষ্ট প্রকাশ করেছিলেন, মাতৃভূমির প্রতি মমত্ববোধ নিয়ে রচিত যাব ছোড় চালি লক্ষ্ণৌ নগরী/কাহে হাল কে হাম পার কেয়া গুজরী; এমন দুটো লাইন সহজে মেলে না।

ওয়াজিদ আলী শাহ হয়তো ভাগ্যবান ছিলেন। কেননা কলকাতায় নির্বাসিত নওয়াবকে লক্ষ্ণৌ পতন প্রত্যক্ষ করতে হয়নি। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি নির্বাসিত হওয়ার পরের বছরই, অর্থাৎ ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত সিপাহি বিদ্রোহের আগুন লক্ষ্ণৌকেও স্পর্শ করে। বিদ্রোহীরা লক্ষ্ণৌ দখল করে নেয় এবং ওয়াজিদ আলী শাহর স্ত্রী বেগম হজরত মহল সে সময়ে কার্যত লক্ষ্ণৌ প্রধানে পরিণত হন। দেড় বছর স্বাধীনতা বজায় রাখার পর ব্রিটিশদের হাতে লক্ষ্ণৌ পতন হয়।

নওয়াবি আমলের সে লক্ষ্ণৌ বদলে গেছে। বর্তমান ভারতের লক্ষ্ণৌ শহরে বর্তমানে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের বাস। আদব, তেহজিবের সেই পুরনো কথা আধুনিক মানুষের মনে নেই। থাকলেও সময়ের সঙ্গে সেসব মেলে না। কিন্তু আদতে লক্ষ্ণৌ আরো আগেই হারিয়ে গিয়েছিল। সে কথা স্মরণ করে মীর্জা হাদি রুসওয়া (১৮৫৭-১৯৩১) লিখেছিলেন,

দিল্লি ছুটি থি পেহলে আব লক্ষ্ণৌ ভি ছোড়ে

দো শেহের থে ইয়ে আপনে, দোনো তাবাহ নিকলে

 

দিল্লি হারিয়েছিলাম প্রথমে, এবার লক্ষ্ণৌ ছাড়ছি

শহর দুটো বড় আপন ছিল, তছনছ হয়ে গেল।

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক