শনিবার | জুলাই ২৪, ২০২১ | ৯ শ্রাবণ ১৪২৮

সিল্করুট

বাঙালির লক্ষ্ণৌ

মুহিত হাসান

লক্ষ্ণৌ বাঙালিদের কথা

আশ্চর্য হলেও কথা সত্যি, আজ থেকে নিদেনপক্ষে ২৫০ বছর আগেইযখন আক্ষরিক অর্থেই দুর্গম গিরি কান্তার মরু কিসিমের প্রতিবন্ধকতাময় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এই বাংলা মুলুক থেকে কয়েকজন বাঙালি সুদূর উত্তর প্রদেশের শাহি শহর লক্ষ্ণৌতে গিয়ে বসবাস শুরু করেছিলেন। নিছক ভ্রমণের উদ্দেশ্যে তারও আগে কেউ লক্ষ্ণৌতে গিয়েছিলেন কিনা জানা নেই। কিন্তু রীতিমতো বসবাসের উদ্দেশ্যে বাঙালির লক্ষ্ণৌ গমনের শুরু তখন থেকেই।

সময়টা ১৭৭৫ সাল। লক্ষ্ণৌ শাসনভার চতুর্থ নবাব আসফউদ্দৌলার কাঁধে পড়ল। শহরকে নতুনভাবে সাজানোর স্বপ্ন ছিল তার, সেজন্য চাইতেন প্রতিভাবান কর্মঠ বাঙালিরা এখানে থাকতে আসুনতা পেশা তাদের যা- হোক না কেন। শিল্পী কি ব্যবসায়ী, সবারই ঠাঁই করে দিতে চেয়েছিলেন আসফউদ্দৌলা। হুগলি জেলার উত্তরপাড়া নিবাসী দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্ভবত আসফউদ্দৌলার দরবারে আসন পাওয়া প্রথম বাঙালি। তাকে নবাব নিজের তোষাখানার দেওয়ান পদে নিযুক্ত করেছিলেন। প্রায় একই সময়ে আরেক বাঙালি চন্দ্রশেখর মিত্র দরবারের প্রধান মুনশি পদে যোগ দিয়েছিলেন। পরে তার আপন ছোট ভাই প্রিয়নাথ মিত্র লক্ষ্ণৌ ইংরেজ রেসিডেন্টের ক্যাশিয়ার হিসেবে নিয়োগ পান। সম্ভবত কর্মীরূপে লক্ষ্ণৌ নবাবি দরবারে বাঙালির আগমনের শুরু এখান থেকেই। আবার প্রথমবারের মতো দরবারের ওপর মহলের সঙ্গে বাঙালিদের সরাসরি যোগাযোগের আরম্ভও ঘটল ওই সময়েই। আসফউদ্দৌলার পর ১৮১৪-তে গাজীউদ্দিন হায়দার যখন লক্ষ্ণৌ নবাব ছিলেন, তখন তার অধীনে একজন বাঙালি ঘড়িনির্মাতা কাজ করতেন বলে শোনা যায়। গাজীউদ্দিনের পর নাসিরউদ্দিন হায়দার ১৮২৭ সালে নবাব হলেন। লক্ষ্ণৌতে একটি তারাওয়ালি কোঠি বা মানমন্দির স্থাপনের কাজ নাসিরউদ্দিন শুরু করেছিলেন। মানমন্দিরের সূক্ষ্ম কাজকর্ম সামলানোর জন্য দুই বাঙালি মাধবদাস বাবাজি কালীচরণ চট্টোপাধ্যায়কে লক্ষ্ণৌতে নিয়ে আসা হয় তারই নির্দেশে। কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নিয়োজিত রাখেননি, লক্ষ্ণৌ নবাবদের মধ্যে শিল্প-সাহিত্য চর্চার যে ঐতিহ্য ছিলতিনি আনন্দের সঙ্গে সেটিরও ভাগীদার হয়েছিলেন। লক্ষ্ণৌতে থাকার সময় তিনি ফারসি উর্দু শেখেন। উত্তমরূপে চর্চার ফলে তিনি অনর্গল ওই দুই ভাষায় কথা বলতেও পারতেন। পারস্যের মহাকবি হাফিজের দিওয়ান ছিল তার অবসরের প্রিয় পাঠ্য।

অবশ্য, সিপাহি বিদ্রোহের পর লক্ষ্ণৌ শেষ নবাব ওয়াজিদ আলী শাহর পতন পুরো অঞ্চলেই ইংরেজ শাসন পাকাপোক্ত হলে সেখানকার বাঙালিরাও নতুন রাস্তা খুঁজে নিতে বাধ্য হন। ডিরোজিওর সরাসরি ছাত্র, উনিশ শতকের বেঙ্গল স্পেক্টেটর পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের কথা এক্ষেত্রে বলা যায়। ওয়াজিদ আলী শাহর পতনের আগেই দক্ষিণারঞ্জন লক্ষ্ণৌতে বসবাস শুরু করেছিলেন। সেখানে প্রচুর জমিও তিনি কেনেন। ফলে অধৌ তালুকদার সভা- সম্পাদকের পদও পান। ব্রাহ্ম আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য-সমর্থক দক্ষিণারঞ্জনের উদ্যোগেই লক্ষ্ণৌতে ব্রাহ্মসমাজের শুরু। দৃশ্যপট পাল্টে গেল লক্ষ্ণৌতে ইংরেজ শাসন পুরোদমে জেঁকে বসার পর। তত্কালীন ইংরেজ সরকারের পক্ষে দক্ষিণারঞ্জন কয়েকটি নিবন্ধ লেখেন। ফলে বড় লাট লর্ড ক্যানিংয়ের সুনজরে পড়েন। ১৮৬৯ সালে লক্ষ্ণৌতে ইংরেজি কেতায় ওয়ার্ডস ইনস্টিটিউশন নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হলে তাকে সেখানকার পরিদর্শক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। পরে এলাকার ভূস্বামীদের নিয়ে একটি সংগঠন বা তালুকদার সভা গঠনও হয় তারই হাতে। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ শাসন ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আরেকটু মসৃণ করে তোলা। শাসকশ্রেণীর শক্তপোক্ত আনুকূল্য লাভের পর দক্ষিণারঞ্জন নতুনভাবে লক্ষ্ণৌ শহর ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন। বড় লাটের নামে ক্যানিং কলেজ স্থাপন দিয়ে শুরু। তারপর সমাচার হিন্দুস্তানি নামের একটি দৈনিক দক্ষিণারঞ্জনের প্রচেষ্টায় লক্ষ্ণৌ থেকে ছেপে বেরোতে থাকে। এখন অব্দি উনিশ কি আঠারো শতকে লক্ষ্ণৌতে ঘাঁটি গাড়া যে কয়জন বাঙালির কথা এখানে বলা হলো, তারা সবাই ছিলেন তখনকার বঙ্গদেশের অপেক্ষাকৃত উন্নত এলাকা কলকাতা-হুগলি-হাওড়ার বাসিন্দা। কিন্তু জলাজঙ্গলে পূর্ণ দুর্গম সেকালের পূর্ববঙ্গ থেকেও এক প্রতিভাধর অসমসাহসী বাঙাল সন্তান লক্ষ্ণৌ পাড়ি দিয়েছিলেন। তাও আবার এমন এক সময়ে, যখন সিপাহি বিদ্রোহ চলছে। এবার তার কথাই বলা যাক। খুলনার জমিদার বংশের আনন্দলাল রায় চৌধুরী লক্ষ্ণৌ পাড়ি দিয়েছিলেন জলপথে। উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন শহর ঘুরে এক সময় তিনি কানপুরে হাজির হন। তখন বিদ্রোহী সিপাহিদের তত্পরতা তুঙ্গে। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে তিনি লক্ষ্ণৌতে থিতু হন। দক্ষিণারঞ্জনের হাতে প্রতিষ্ঠিত ওয়ার্ডস ইনস্টিটিউশন- অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ নেন। অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরে অর্থকড়ি জমিয়ে ওয়াজিদ আলী শাহর মালিকানায় থাকা চৌলক্ষ্মীমহল নামের একটি বাড়িও আনন্দলাল কিনে নেন।

ইংরেজ-রাজের প্রশাসনে যোগদানকারীরা ছাড়াও একাধিক বাঙালি চিকিৎসকও সে আমলে লক্ষ্ণৌনিবাসী হয়েছিলেন বলে তথ্য মেলে। ১৮৫৫ সালে লক্ষ্ণৌতে এসেছিলেন ডাক্তার চণ্ডীচরণ ঘোষ। শহরের কিংস হাসপাতালে তিনি নিয়োগ পান। পরে সহকারী সিভিল সার্জন লক্ষ্ণৌ পুলিশের মেডিকেল অফিসারের দায়িত্বের পাশাপাশি স্থানীয় মেডিকেল স্কুলেও অধ্যাপনা করেন। সম্ভবত, তিনিই লক্ষ্ণৌতে আসা প্রথম বাঙালি চিকিৎসক। সিপাহি বিদ্রোহের সময়ে লক্ষ্ণৌতে আরেক বাঙালি ডাক্তার, কলকাতা মেডিকেল স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থী সূর্যকুমার সর্বাধিকারী কর্মরত ছিলেন লক্ষ্ণৌতে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তিনি ইংরেজ সেনাবাহিনীর সদস্যদের চিকিৎসা দিয়ে তাদের মধ্যে সুনাম কুড়িয়েছিলেন। তবে ইংরেজদের অকারণ ঔদ্ধত্য তার পছন্দ ছিল না। এই সূত্রে লক্ষ্ণৌ একটি ঘটনা এখানে বলা যেতে পারে। সিপাহি বিদ্রোহ খানিক স্তিমিত হওয়ার সময়ে মধ্যরাতে স্থানীয় একটি বরযাত্রী-দল লক্ষ্ণৌ মধ্যে দিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিল। তাদের বিদ্রোহী বলে সন্দেহ করে তত্ক্ষণাৎ সেনাছাউনিতে এনে খতম করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ইংরেজ এক সেনা-ক্যাপ্টেন। ঘটনাক্রমে সেদিন সেখানে ডা. সূর্যকুমার উপস্থিত ছিলেন। তিনি ক্যাপ্টেনের মুখের ওপর সোজাসুজি বলেন, এরা বিদ্রোহী নয়, দস্যুও নয়। এরা সত্যিকার বর নিয়ে বিয়ে দিতে যাচ্ছে পরে তার এই তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদে বরযাত্রীর দলটি প্রাণে রক্ষা পায়। এরপর ১৮৬২ সালে ডাক্তার শম্ভুচন্দ্র মুখোপাধ্যায় লক্ষ্ণৌতে থাকতে শুরু করেন। চিকিৎসার পাশাপাশি সাংবাদিকতা শিক্ষকতায় তার খ্যাতি হয়েছিল। ১৮৬৮ সালে লক্ষ্ণৌ পূর্বোক্ত কিংস হাসপাতালে আরেক বাঙালি ডাক্তার নবীনচন্দ্র মিত্রের নিয়োগ পাওয়ার খবর পাওয়া যায়। নবীনচন্দ্র অবশ্য নিছক ডাক্তারের সীমা ছাড়িয়ে লক্ষ্ণৌ শহরে সমাজ সংস্কারকের ভূমিকা নিয়েছিলেন। লক্ষ্ণৌ শহরের মুসলিম সমাজে আধুনিক অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা সম্পর্কে সেই সময় অজ্ঞানতা ভুল ধারণার রমরমা ছিল। অনেকে মনে করতেন অ্যালোপ্যাথিক পথ্যে মদিরা মেশানো হয়অতএব তা নিষিদ্ধ। নবীনচন্দ্র আন্তরিকতা মমতার সঙ্গে আসল ঘটনা তুলে ধরে মুসলিম সমাজের ওই ভুল ধারণা ভাঙাতে সক্ষম হয়েছিলেন। বস্তুত, তার মতো মিষ্টভাষী চিকিৎসক নাকি ওই শহরে তখন খুব কমই ছিলেন। শহরের সুন্নি শিয়া উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মগুরুরা তার কাছ থেকে চিকিৎসা নিতেন। সাধারণ গরিব মানুষও তার ওপর অপরিসীম ভরসা রাখত। ওই সময়ের একাধিক উর্দু কথাসাহিত্যিক তাদের লেখা উপন্যাসে নবীনচন্দ্রের উল্লেখ করে গিয়েছেন এবং সেই বিবরণের সবটাই ইতিবাচক। প্রসঙ্গে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাশ তার বঙ্গের বাহিরে বাঙ্গালী গ্রন্থে লিখেছেন: নবীন বাবু যে কেবল সুচিকিৎসক বলিয়া এতদূর প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছিলেন তাহাই নহে। তিনি সকলকে সমদৃষ্টিতে দেখিতেন। কি ধনী, কি দরিদ্র সকলের প্রতি তাঁহার সমান যত্ন মনোযোগ ছিল।...

লক্ষ্ণৌ শহরের আরেক বাঙালি ব্যক্তিত্ব পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় উনিশ শতকে খ্যাতি পেয়েছিলেন। তবে আজ তার নাম অনেকটাই বিস্মৃত। তিনি ছিলেন একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ। তবে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বিখ্যাত লক্ষ্ণৌ-প্রবাসী বাঙালি সম্ভবত একজনই। তিনি কবি সংগীতজ্ঞ অতুলপ্রসাদ সেন। বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পরীক্ষা পাস করে কলকাতায় পসার জমাতে পারছিলেন না অতুলপ্রসাদ। তার ওপর সদ্য বিয়ে করেছেনঘাড়ে সংসারের বোঝা। তখন তার আরেক আইনজীবী বন্ধু মমতাজ হোসেন পরামর্শ দিলেন লক্ষ্ণৌ যাওয়ার। লক্ষ্ণৌ সংগীত-সংস্কৃতির প্রাচুর্য অতুলপ্রসাদের কাছে আগে থেকেই আকর্ষণের বিষয় ছিল। উপরন্তু, সে শহরে বাঙালি অধিবাসীর সংখ্যাও কম নয়। অতএব উনিশ শতকের শেষ দশকে তিনি লক্ষ্ণৌ পাড়ি জমালেন। লক্ষ্ণৌ শহর অতুলপ্রসাদকে আশার চেয়েও অধিক মমত্বে যেন বরণ করে নিয়েছিল। লক্ষ্ণৌ আদালতে পেশাগত সাফল্য পেলেন, স্থানীয় বাঙালি মহলে দ্রুতই হয়ে উঠলেন এক আকর্ষণীয় ফিগার এবং সর্বোপরি লক্ষ্ণৌ সাংগীতিক আবহাওয়া তাকে মনে-প্রাণে চাঙ্গা করে তুলল অনেকটাই। উর্দু শিখে শহরের আদি বাসিন্দাদের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে মেশা শুরু হলো তার। লক্ষ্ণৌ কেশরবাগে সেকালের ৩৩ হাজার টাকা খরচা করে বাড়ি বানালেন। সেখানে বসত বিখ্যাত সব শিল্পীর গানের আসর। শহরে বন্যা হলে গান গেয়ে রিলিফ ফান্ড সংগ্রহ করা থেকে দাঙ্গা লাগলে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে নেমে পড়ালক্ষ্ণৌ শহরের আনাচে-কানাচে সবখানেই তিনি নিরন্তর ছুটে চলতেন। লক্ষ্ণৌ এক দাঙ্গার পর ব্যথিত হয়ে তিনি লেখেন: পরের শিকল ভাঙিস আগে, নিজের নিগড় ভাঙ রে ভাই/...প্রবেশ করে দেখ রে দু ভাই অন্দরে যে একজনাই।...

বাঙালির লক্ষ্ণৌ দর্শন

তো গেল লক্ষ্ণৌ শহরের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে ওঠা বাঙালিদের কথা। কিন্তু সেকালের বাঙালিরা কি ছুটিছাটায় বা নতুন জায়গা দর্শনের আকাঙ্ক্ষায় লক্ষ্ণৌ যেতেন না? হ্যাঁ, তা তো যেতেনই। আদতে সে কালের ভ্রমণপ্রিয়, ইতিহাস-সচেতন কি সংগীতপ্রেমী বাঙালিদের কাছে লক্ষ্ণৌ ছিল এক পরম প্রার্থিত গন্তব্য। শহরের জৌলুসদার নবাবিয়ানা, বিচিত্র ইতিহাস বিরল সাংগীতিক ঐতিহ্যের আকর্ষণ তাদের সহজেই টেনে নিত। যেমন ধরা যাক, ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুরের জমিদার ধরণীকান্ত লাহিড়ী চৌধুরীর কথা। ১৯১০ সালে ছেপে বের হওয়া তার বিশালাকৃতির ভ্রমণগ্রন্থ ভারত-ভ্রমণ-এর একটি বড় অধ্যায়জুড়েই রয়েছে লক্ষ্ণৌ কথা। সম্ভবত বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। প্রথম দেখায় ধরণীকান্তর কাছে লক্ষ্ণৌ শহর আরব্য-রজনীর কোনো অলৌকিক নগরের চিত্রের ন্যায় প্রতিভাত হইয়াছিল। পরে তত্ক্ষণাৎ চোখে পড়া লক্ষ্ণৌ বিশেষত্বগুলো নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন: স্থানে খাদ্যদ্রব্যাদি বিশেষ সুলভ। নিদ্রান্তে অপরাহ্নে নগর দেখিতে বাহির হওয়া গেলসুন্দর নগরীদুই পার্শ্বে দ্বিতল ত্রিতল অট্টালিকাদেখিতে বেশ। রাজপথে অনেক বাঙ্গালী দেখিলাম নগরে অনেক বাঙ্গালী বাস করিয়া থাকেন।...লখনৌ যে কেবল স্থাপত্য-শিল্পে এবং প্রাচীন গৌরবেই গৌরবান্বিত, তাহা নহে; শিল্পবাণিজ্যেও ভারতবর্ষের অন্যান্য বহু নগরী হইতে ইহা শ্রেষ্ঠ।


লক্ষ্ণৌ শহর প্রিয় ছিল খোদ রবীন্দ্রনাথেরও। ১৯১৪ সালে প্রথমবারের মতো লক্ষ্ণৌ ভ্রমণ করেছিলেন কবি। তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আর কেউ নয়, স্বয়ং অতুলপ্রসাদ সেন। লক্ষ্ণৌ সফরে রবীন্দ্রনাথকে নিজের বাড়িতে আসর বসিয়ে নানা বিচিত্র ঘরানার গান শোনানোর আয়োজন করেছিলেন তিনি। পরে কলকাতায় ফিরে লক্ষ্ণৌ সাংগীতিক আসরের সুনাম করে অতুলপ্রসাদকে রবীন্দ্রনাথ চিঠিও লিখেছিলেন। পরে ১৯২৩ সালে লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উপলক্ষে সেখানে বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এর তিন বছর পর ১৯২৫ সালে তিনি আবার সেখানে যান। ওই যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল একটু অন্য রকমের, সেবার তিনি গিয়েছিলেন শহরের মোতি মহলে অনুষ্ঠিত বিরাটাকার সংগীত-যজ্ঞ অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্স- যোগ দিতে। বিরাট আগ্রহ নিয়ে সংগীত সম্মেলনে যোগ দিতে গেলেও ওই সফর রবীন্দ্রনাথের জন্য চরম দুঃখের হয়ে দাঁড়িয়েছিল। লক্ষ্ণৌ বসেই তিনি খবর পান তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর পরলোক গমন করেছেন। অগত্যা তাকে দ্রুত লক্ষ্ণৌ ছেড়ে কলকাতায় ফিরতে হয়। এরপর ১৯৩০ ১৯৩৫ সালেও তিনি লক্ষ্ণৌতে আসেন। তবে ওই দুবারের আসাটা ছিল অনেকটাই আনুষ্ঠানিক, মুখ্যত বিশ্বভারতীর তহবিল গঠনের ভাবনায় অর্থ তোলার জন্য। এসব সফরের কোনো একটিতে তিনি ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও নিয়ে এসেছিলেন। সেই স্মৃতি রোমন্থন করে অবন ঠাকুর রানী চন্দকে বলেছিলেন: লখনৌতে গিয়েছিলুম রবিকার সঙ্গে। গোমতীর ওপরে বাদশার আমদরবারের ভগ্ন স্তূপে বসে মনে পড়ত আমার দক্ষিণের বারান্দার আড্ডা।...

অতুলপ্রসাদের সঙ্গে সংযোগ-সূত্রে আরেক শ্রেষ্ঠ বাঙালি সত্যজিৎ রায়ও প্রথমবারের মতো এসেছিলেন লক্ষ্ণৌ শহরে বেড়াতে। তবে তা নিতান্তই শিশুকালে। তার মা সুপ্রভা রায়ের মাসতুতো দাদা ছিলেন অতুলপ্রসাদ। অতুলপ্রসাদের বাড়িতে থাকার সময় ভারতীয় মার্গসংগীতের নানা নিদর্শন শিশু সত্যজিতের কানে এসেছিল। ভবিষ্যতে তার সংগীতজ্ঞান গড়ে ওঠার নেপথ্যে তাই লক্ষ্ণৌ শহরের ভূমিকা আছে বলতেই হয়। প্রথমবার সফরের পর আরো বেশ কয়েকবার সত্যজিৎ এসেছিলেন লক্ষ্ণৌতে। স্মৃতিকথা যখন ছোট ছিলাম- লক্ষ্ণৌ সম্পর্কে তার বয়ান রকম: শহরটার উপরেও একটা টান পড়ে গিয়েছিল। নবাবদের শহরের বড়া ইমামবাড়া, ছোটা ইমামবাড়া, ছত্তর মঞ্জিল, দিলখুশার বাগান এসব যেন মনটাকে নিয়ে যেত আরব্যোপন্যাসের দেশে।...ইতিহাস ভেসে ওঠে চোখের সামনে। এই লক্ষ্ণৌকে পরে আমি গল্পে আর ফিল্মে ব্যবহার করেছি। ছেলেবেলার স্মৃতি আমার কাজ অনেকটা সহজ করে দিয়েছিল।... যখন দেখি, সত্যজিতের লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ ফেলুদা-উপন্যাস বাদশাহী আংটি (পরে শকুন্তলার কণ্ঠহার উপন্যাসেও ফেলুদাকে লক্ষ্ণৌ যেতে দেখা গেছে) তার হাতে নির্মিত প্রথম ভিনভাষার কাহিনীচিত্র শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’— দুয়েরই পটভূমি লক্ষ্ণৌ শহর; তখন এই শহর যে তার কাছে কতটা গুরুত্ববহ ছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক