শনিবার | জুলাই ২৪, ২০২১ | ৯ শ্রাবণ ১৪২৮

সিল্করুট

লক্ষ্ণৌ সংস্কৃতি

এসএম রশিদ

পুঁজিপতির দল যখন দিল্লির সংস্কৃতিকে হত্যা করল, তখন সেই সংস্কৃতি আপন জন্মভূমি থেকে পালিয়ে লক্ষ্ণৌ কনিষ্ঠ দরবারের শরণ নিল। ছোট দরবার; কিন্তু তার সীমায় প্রবেশের পর কারও নজরেই পড়ত না: এর চেয়ে বড় আর কোনো দরবার আছে! তাই এখানেই বসে, স্বাধীনভাবে, দিল্লির শরিফ ব্যক্তিরা স্বকীয় সৌজন্যের নিয়মাবলি পালন করতে লাগলেন। কিছুদিনের মধ্যেই সারা হিন্দুস্তানে সভ্যতা শিষ্টতার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়াল অদ্বিতীয় লক্ষ্ণৌ। অন্যান্য সব শহরের লোকেরা লক্ষ্ণৌবাসীদের অনুসরণ করতে লাগল।’—আবদুল হালীম শরর (১৮৬০-১৯২৬)-এর মূল্যায়ন লক্ষ্ণৌ সাংস্কৃতিক গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অনেকে বলেন, শরর ছিলেন লক্ষ্ণৌ গর্বিত সন্তান। শহরের যে গৌরব বিগত, যে কালই হারিয়ে গেছে তা শব্দের জাদুকরী ক্ষমতা দিয়ে শরর ধরে রেখেছেন তার গুযিশ্তা লক্ষ্ণৌ গ্রন্থে। কোনো নগরের শিল্প-সংস্কৃতির এমন জীবন্ত বিবরণ বিশ্বসাহিত্যে দুর্লভই বলতে হয়। বঙ্কিমের দুর্গেশনন্দিনী তিনি অনুবাদ করে প্রথমবার উর্দুভাষী পাঠকের কাছে হাজির করেছিলেন। তিনি নিজেই সেকালের লক্ষ্ণৌ সাংস্কৃতিক উত্কর্ষের অস্তায়মান কালের এক নিদর্শন। একাধারে সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক, গদ্যকার সমাজ সংস্কারক। লক্ষ্ণৌ সংস্কৃতির গর্ব ছিল অন্তরে। বলা হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন শুরুর মাধ্যমে ভারতবর্ষের নিজস্ব সংস্কৃতির যে ক্ষয়ের যাত্রা হয়েছিল তার আগে লক্ষ্ণৌ ছিল এর সমৃদ্ধির শেষ প্রতীক।

লক্ষ্ণৌ নামকরণ থেকেই ভারতীয় ঐতিহ্যের নিবিড় বাহক। কথিত আছে লঙ্কা বিজয়ের পর রাম যখন অযোধ্যার সিংহাসনে বসেন, তখন লক্ষ্ণৌ অঞ্চলটি জায়গির দেন প্রিয় ভাই লক্ষ্মণক। ধীরে ধীরে অঞ্চলের নাম হয় লক্ষ্মণপুর। তবে লক্ষ্মণপুর কবে থেকে লক্ষ্ণৌ নামে পরিচিত হয়ে উঠল, সে কথা আমরা নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি না। তবে জানা যায় সম্রাট আকবরের শাসনামলের আগে লক্ষ্ণৌ নামের ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায় না।

ভারতীয় সংস্কৃতির পড়ন্ত কালে অষ্টাদশ উনিশ শতাব্দীর লক্ষ্ণৌতে শিল্প-সংস্কৃতির যে স্বর্ণযুগের আবির্ভাব হয়েছিল, তার পেছনে অবশ্য ছিল পতনের ঠেউ। মোগল সাম্রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণু দশা দিল্লির গৌরবকে ম্লান করছিল, অন্যদিকে এল ১৭৬৪ সালের ইতিহাসের সন্ধিক্ষণবক্সারের যুদ্ধ। বিহারের কাছে বক্সারে অনুষ্ঠিত এই ইতিহাস বদলে দেয়া যুদ্ধে একদিকে ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কমান্ডার হেকটর মুনরো আর ভারতীয় শিবিরে মীর কাসিম, মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম অওধের নবাব সুজাউদ্দৌলা। বক্সারে হারের পর অওধের দরবারে শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে কোম্পানি। সেনা-সংস্কারসহ বহুবিধ জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে গিয়ে সুজাউদ্দৌলা ব্যতিব্যস্ত হয়ে রইলেন। ১৭৭৫- তিনি ধরাধাম ত্যাগ করলেন। শাসনভার পেল তার পুত্র নবাব আসফউদ্দৌলা। ইতিহাস এবার প্রত্যক্ষ করল অবিস্মরণীয় এক ট্র্যাজেডি। এর ভালোমন্দ বিচার করা কঠিন। বক্সারে পরাজয়ের পর সুজাউদ্দৌলা ফয়জাবাদেই ছিলেন। তখন থেকেই দিল্লি থেকে নানা পেশার কৃতবিদ্যরা এখানে আসতে শুরু করেন। সামরিক শক্তি না বাড়লেও উজ্জ্বল হচ্ছিল শিল্পের বিভিন্ন শাখা। ক্ষমতায় বসে আসফউদ্দৌলা ফয়জাবাদ ছেড়ে চলে এলেন লক্ষ্ণৌ। ফয়জাবাদের জমজমাট আসর ভেঙে এবার চলে এল আসফের সঙ্গে। ইংরেজদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়ানোর ইচ্ছা আসফের ছিল না, সেনাবাহিনীর ছোট একটি অংশ রেখে বাকিদের বিদায় করে দিলেন। এবার বেঁচে যাওয়া অর্থ দিয়ে শুরু করলেন বিলাসিতা আর লক্ষ্ণৌ সাজসজ্জা। ইংরেজরাও অমত করেনি। রাজা-প্রজা কেউই আর খেয়াল করছিলেন না শাসনক্ষমতা ক্রমেই ইংরেজদের হাতে চলে যাচ্ছে। লক্ষ্ণৌ দিক তাকালে আজও যেসব স্থাপনার সৌন্দর্য বিমোহিত করে, অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে হয় জড় স্থাপনার জীবন্ত সৌন্দর্যের দিকে তার অনেকই নির্মাণ করান আসফউদ্দৌলা। হালীম শরর লিখেছেন, এই বিলাসিতার ফল: লক্ষ্ণৌ বহিরঙ্গ-সমৃদ্ধি। দরবারের জাঁকজমক এতো বেড়ে গেল, অন্যত্র, অন্য দরবারে তা দুর্লভদর্শন। বিলাস ভোগের এতো সামগ্রী জড়ো হলো, আর কোথাও সে রকম দেখা যায় না। লক্ষ্ণৌ শহরের উন্নতি সৌন্দর্য ঔত্কর্ষের এমন এক পর্যায়ে উপনীত হলো, শুধু হিন্দুস্তানের নয়, হয়তো সারা দুনিয়ার কোনো শহরই তার সামনে দাঁড়াতে পারত না।

অবশ্য আসফউদ্দৌলা জমানার আগেই লক্ষ্ণৌতে জ্ঞান, সাহিত্যের চর্চা যথেষ্ট বিকশিত হয়েছিল। আওরঙ্গজেবের আমলে মুল্লা নিজামউদ্দীন সিহালভী ফিরিঙ্গি মহলের বাড়িকে রীতিমতো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করেছিলেন। বলা হয় এর সামনে হেরাত, বুখারা, খোরাসান কাবুলও মাথা নিচু করত। দর্শন, ইসলামী ধর্মশাস্ত্র, তর্কশাস্ত্রে বিদ্যায়তন লক্ষ্ণৌকে এসব বিদ্যার কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। প্রতিষ্ঠানটি অবশ্য দরবারের কোনো সহায়তা ছাড়াই গড়ে ওঠে।

দিল্লি থেকে একসময় হাজির হলো উর্দু ভাষা। আর সে তো ছিল কবিতা, শায়েরীর যুগ। একসময় অবস্থা এমন হয়েছিল যে শের বলা লক্ষ্ণৌ চাল হয়ে ওঠে। শরর লিখেছেন, কবিদের সংখ্যা হয়ে দাঁড়াল গণনার অতীতঅন্য কোনো ভাষায় বোধহয় রকম দেখা যায় না। মহিলা মহলেও শের-শাইরীর চর্চা হতে লাগল। এমনকি অশিক্ষিতদের কথাবার্তায়ও কাব্যিক ভাব, উপমা অলংকারের ঝলক দৃষ্টিগোচর হতে লাগল।

কাব্যের সঙ্গে সঙ্গে সংগীতেরও দারুণ বিকাশ হয়েছিল লক্ষ্ণৌতে। সুজাউদ্দৌলার নাচ-গানের শখ ছিল। তার শাসনামলে দিল্লি অন্যান্য অঞ্চল থেকে হাজির হয়েছিল অগণিত গায়ক-গায়িকা। অভিজাতরা কোথাও যাত্রা করলে তাদের সঙ্গে যেত গায়কদের দল। নবাব আসফউদ্দৌলার সময়ে ফারসি ভাষায় রচিত হয় উসুল-উল-নগ্মাত-উল-আসফিয়া বলা হয় ভারতীয় সংগীতের ওপর এর চেয়ে ভালো বই আর লেখা হয়নি।

লক্ষ্ণৌ নাচেরও শহর ছিল। সুজাউদ্দৌলার সময়ে যথারীতি নানা রকম নৃত্যশিল্পীরা জড়ো হচ্ছিলেন। এখানে দুই ধরনের নাচের প্রচলন ছিলহিন্দুস্তানি কত্থক রাসধারী এবং কাশ্মীরী ভাণ্ড অবশ্য রীতিবদ্ধ নাচ বলতে ছিল কত্থকই। অষ্টাদশ ঊনবিংশ শতাব্দীতে নবাবি আমলে হিন্দু কত্থকের কোনো না কোনো বিশারদ। সুজা আসফউদ্দৌলার আমলে ছিলেন খুশী মহারাজ। নবাব সাদত আলী খাঁ, গাজীউদ্দীন হায়দার নাসিরউদ্দীন হায়দারের সময়ে ছিলেন হিলালজী, প্রকাশজী দায়লুজী। মুহম্মদ আলী শাহ থেকে ওয়াজিদ আলী শাহ পর্যন্ত প্রকাশজীর দুই পুত্র দুর্গাপ্রসাদ ঠাকুরপ্রসাদের নাচের খুব নামডাক ছিল। দুর্গাপ্রসাদ ছিল স্বয়ং ওয়াজিদ আলী শাহর নৃত্যশিক্ষক। দুর্গাপ্রসাদের দুই পুত্র কাল্কা বান্দাদীন প্রসঙ্গে বলা হয় তখনকার ভারতে তাদের চেয়ে ভালো নৃত্যশিল্পী আর কেউ ছিলেন না।

ভাণ্ড মানে ভাঁড়। নৃত্য ছিল উদ্দাম। কিশোর-তরুণরা মেয়েদের মতো লম্বা চুল লাগিয়ে, জমকালো শাড়ি পরে, পায়ে ঘুঙুর বেঁধে নাচত। উল্লাস, হল্লোড় ছিল দলীয় নৃত্যের বৈশিষ্ট্য।

লক্ষ্ণৌ নাচের উত্কর্ষে পুরুষ শিল্পীদের পাশাপাশি বিশেষ ভূমিকা ছিল বারবণিতাদের। এরা নাচ গানে পটীয়সী ছিলেন। লক্ষ্ণৌতে তাদের সংখ্যা যত ছিল তখন ভারতের আর কোনো শহরে সে রকমটা ছিল না।

গাইয়ে-নাচিয়েদের বাইরে লক্ষ্ণৌতে আরেকটি বিশেষ গোষ্ঠী ছিলরাসওয়ালা। এই রাস ছিল মূলত মথুরা ব্রজের শিল্পরীতি। সেখান থেকেই লক্ষ্ণৌতে এর আগমন। নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ রাস খুব পছন্দ করেছিলেন। তিনি নিজেই একটি রাস লিখেছিলেন। প্রেমকে তিনি স্বর্গের পরীদের জগৎ থেকে ধরণিতে নামিয়ে আনলেন। নতুন চিত্রকল্প দর্শকদের খুব মনে ধরে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কবি মিয়াঁ আমানত লিখলেন ইন্দর সভা। হিন্দু পুরাণ ফারসি রুচির ছিল প্রথম সমন্বয়। ইন্দর সভা প্রদর্শনের পর লক্ষ্ণৌ শহরে রীতিমতো ঝড় উঠল। দ্রুততম সময়ে রাস জনপ্রিয়তা পেয়ে গেল। এটি ছিল নাটক-থিয়েটারের পূর্বাভাস। বলা হয় নবাবি শাসন আরো কিছুদিন টিকলে ভারতীয় নাটক এক নতুন রূপ পেয়ে যেত।

লক্ষ্ণৌতে মাটির তৈরি বাসন, খেলনা, ফুলদানি, নানা রকম সামগ্রী তৈরির শিল্প বিকশিত হয়েছিল। মুসলমানদের মধ্যে যে গোষ্ঠী কাজ করত তাদের বলা হতো কাসগর লক্ষ্ণৌ মাটি মৃিশল্পের জন্য বিশেষ উপযোগী ছিল। এমন হাল্কা, সুন্দর বাসন তখন নাকি ভারতের আর কোথাও তৈরি হতো না। লক্ষ্ণৌ ঘড়া আর বদনারও সুনাম ছিল। সঙ্গে আরো তৈরি হতো সুরাহী, ঝাঁঝরী, হুঁকো, আবখোরা, খীর কি হাণ্ডিয়া। আবখোরা হচ্ছে পানি পানের গ্লাস। হালীম শরর লিখেছেন, মাটির খেলনায় যে কারিগরি এখানকার অশিক্ষিত, মুর্খ কুমোররা দেখাচ্ছে, গ্রীকদের কৃতিত্বের চেয়ে তা এতটুকু কম নয়। এরা মানুষকে দেখে তার শরীর যতটা, ততটা বড় আকারের আস্ত মূর্তি তৈরি করে দেয় এবং ছোট-ছোট মূর্তির মধ্য দিয়ে সব শ্রেণীর নানা ধরনের লোকদের এমন প্রতিমূর্তি তৈরি করে দেয়, যা একেবারে আসলের মতো। এই কলাকৃতি থেকে এদের মধুর কল্পনা শৈল্পিক ক্ষমতার পরিচয়ও পাওয়া যায়। দেওয়ালীতে হিন্দুরা অনেক খেলনা কেনে বিতরণ করে। এই প্রয়োজন মেটাবার জন্যে, প্রতি বছর এই মরশুমে এখানকার কুমোররা স্বকীয় শিল্পে নতুন নতুন আবিষ্কার সূক্ষ্ম কল্পনা প্রকাশের সুযোগ পায়।

লক্ষ্ণৌ সেকালের আদবকায়দা নিয়ে দুকথা না বললে তার সংস্কৃতির অপূর্ণ কথনে আরো আফসোস রয়ে যাবে। হালীম শরর বলেছিলেন, তখনো লক্ষ্ণৌতে শিষ্টাচারের যে চর্চা হতো তা হয়তো আর কোথাও দেখতে পাওয়া যাবে না। কাউকে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানানো, বসার জন্য ভালো আসনটি ছেড়ে দেয়া, হাসিমুখে কথা বলা, একসঙ্গে যাওয়ার সময় প্যাহলে আপ তশরীফ লে চলে (প্রথমে আপনি চলুন), অপ্রিয় কথা না বলা রকম সব চর্চা ছিল তখন জনজীবনের জরুরি বিষয়।

এসএম রশিদ: নন-ফিকশন লেখক