শনিবার | মে ০৮, ২০২১ | ২৫ বৈশাখ ১৪২৮

বিশেষ সংখ্যা

বঙ্গাব্দের উৎপত্তি—মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব

গৌতম রায়

বঙ্গাব্দের উদ্ভব ঠিক কবে থেকে, নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কিছু বলা যায় না। ঐতিহাসিকদের ভেতরে বঙ্গাব্দের প্রচলন ঘিরে সাধারণভাবে দুটি মত আছে। একাংশের ইতিহাসবিদরা মনে করেন; শশাঙ্কের রাজত্বকালে বঙ্গাব্দের প্রথম প্রচলন হন। ইতিহাসবিদরা আনুমানিকভাবে ৫৯০ থেকে ৬২৫ খ্রিস্টাব্দ সময়কালে শশাঙ্ক রাজত্ব করেছিলেন বলে মনে করেন। সপ্তম শতাব্দীতে শশাঙ্কের শাসনকাল বাংলার ইতিহাসে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সময়। ভারতে এখন ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিকভাবে বিহার অঞ্চলটি শশাঙ্কের সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। জুলীয় বর্ষপঞ্জির ১৮ মার্চ ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে এইবঙ্গাব্দে সূচনা বলে একাংশের ইতিহাসবিদদের ধারণা। দিনটি গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ।

অনেকের অনুমান মুসলমান শাসকদের সময় যে হিজরি পঞ্জিকার প্রচলন ছিল, তার ফলে নিত্যনৈমিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হতো। কারণ, চান্দ্র মাসকে ভিত্তি করে হিজরি পঞ্জিকা পরিচালিত হয় (এখানে বলা দরকার, ভারতের উতাতর প্রদেশ, বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হিন্দিভাষী যে হিন্দুরা আছেন, তাদের ভেতরেও চান্দ্রমাস অনুসরণে পঞ্জিকা ব্যবহারের রীতি আছে) সৌর বছরের তুলনায় চান্দ্র বছর সাধারণত এগারো থেকে বারো দিন কম হয়। সৌরবছর হলো ৩৬৫ দিনের। আর চান্দ্র বছর হলো ৩৫৪ দিনের। তাই চান্দ্র বছরকে নির্ভর করলে ঋতু পরিবর্তনের সময়কাল নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটা সমস্যা তৈরি হয়। আর বাংলা তথা ভারতের অর্থনীতি সেই সময়ে ছিল পুরোপুরিই কৃষিনির্ভর।

মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে যে হিজরি পঞ্জিকার প্রচলন ছিল, সেটিকে অর্থাৎ, চান্দ্র পঞ্জিকাকে রূপান্তরিত করা হয় সৌর পঞ্জিকাতে। সম্রাট আকবর সেই সময়ের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতুল্লাহ শিরাজিকে চান্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌর বর্ষপঞ্জিতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। শিরাজি সুদূর ইরান থেকে সম্রাট আকবরের রাজসভা অলংকৃত করতে এসেছিলেন। শিরাজি সুপারিশ করেন; পারস্য দেশে যে ফার্সি বর্ষপঞ্জির প্রচলন রয়েছে, সেই বর্ষপঞ্জির অনুসরণে হিজরি চান্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌর বর্ষপঞ্জির প্রচলন করতে। সম্রাট আকবর শিরাজির সুপারিশ কিছুটা পরিবর্তিত আকারে মেনে নেন। সম্রাট সেই সময় থেকে ঊনত্রিশ বছর আগে, যখন তিনি সিংহাসনে বসেছিলেন, সেই সময়কালটিকেই সেই ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দটিকে হিজরি সৌর বর্ষপঞ্জি হিসেবে প্রচলন করেন। কারণ থেকেই হিজরি ৯৬৩ থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। সেই বছর পবিত্র মহররমের মাস ছিল বৈশাখ। এখান থেকেই বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস হিসেবে বৈশাখকে ধরা হয়। আর নববর্ষ হিসেবে ধরা হয় পহেলা বৈশাখকে। তবে বঙ্গাব্দ ঘিরে ইসলামীয় প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই বৌদ্ধ প্রভাবের একটা ভাবনার কথাও বলে থাকেন। মধ্যকালীন ভারতে বহুত্ববাদী ভাবধারার চর্চার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বঙ্গাব্দের সূচনাকাল, বাংলা নববর্ষ ঘিরে অনুপুঙ্খ আলোচনা বাঙালির চিরকালীন ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক চরিত্রচিত্রণের একটি দিকদর্শী ধারা হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

এই যে সন বা সাল শব্দটি আমরা ব্যবহার করি, এই শব্দযুগলের ব্যবহার হিন্দু-মুসলমানের যৌথ সাধনার একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অঙ্গ। সন শব্দটি এসেছে আরবি থেকে আর সাল শব্দটির উৎপত্তি ফারসি থেকে। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সংস্কৃতি বাংলার সামাজিক পরিবেশকে যুগ যুগ ধরে কীভাবে ঋদ্ধ করেছে শব্দ দুটির উৎপত্তি এবং বহুল প্রচলনের ভেতর দিয়েই তা পরিষ্কার হয়ে যায়। সন এবং সাল শব্দ দুটি যেভাবে বঙ্গাব্দের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছে, বাংলা নববর্ষ, পহেলা বৈশাখের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে, সেভাবে কিন্তু শব্দ দুটির উৎপত্তি ঘিরে দুই বাংলাতেই আলাপ-আলোচনা হয় না। পবিত্র ইসলাম বাংলার সংস্কৃতিকে কীভাবে সমৃদ্ধ করেছে, বাংলা নববর্ষের, বঙ্গাব্দের আলোচনা প্রসঙ্গে বিষয়গুলো খানিকটা অনালোচিতই থেকে যায়। রাজা শশাঙ্ককে ঘিরে আবেগ তৈরি করতে গিয়ে বঙ্গাব্দ ঘিরে বহুল প্রচলিত সন, সাল শব্দ দুটির প্রতি সমাজতাত্ত্বিকরা সেভাবে নজরই দেননি। ফলে হিন্দু-মুসলমানের প্রভাবহীন মিশ্র সংস্কৃতি বাংলার সাংস্কৃতিক চেতনাকে মধ্যকালীন সময়কালে বঙ্গাব্দের সূচনাকে কেন্দ্র করে কতখানি উচ্চসুরে বেঁধেছিল, তার সম্যক চর্চা প্রায় হয়ইনি।

আকবরের সময়কালে বঙ্গাব্দকে তারিখ ইলাহি বলার প্রচলন ছিল বলেও অনেকের অভিমত। সেখান থেকে সম্রাট শাহজাহানের সময়কালে রোববারকে কেন্দ্র করে সপ্তাহের সাতটি দিন নির্ধারিত হতে শুরু করেএমনটাও একাংশের ইতিহাসবিদদের অভিমত। মোগল শাসনকালে যে চান্দ্র বর্ষপঞ্জিকে কেন্দ্র করে প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করা হতো, সেই চান্দ্রমাসের হিসাব থেকে বেশকিছু জটিলতা দেখা দিত। চান্দ্রমাসকে কেন্দ্র করে ঋতুজনিত যে ফারাকটা তৈরি হতো, সেই ফারাকের কারণে ফসল তোলার সময়ের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময়েই সামঞ্জস্য থাকত না। আর সামঞ্জস্য না থাকার কারণে খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হতো। সেই সমস্যার নিরসনের বাস্তব প্রয়োজন থেকে সৌর বর্ষপঞ্জির প্রচলন, বঙ্গাব্দ, বাংলা নববর্ষের রেওয়াজ চালুর একটা বড় রকমের আর্থসামাজিক তাৎপর্যও রয়েছে। এই সৌর বর্যপঞ্জি বা বাংলা সালকে ধরে বঙ্গাব্দ শব্দটির প্রচলনের সঙ্গেই খাজনা প্রদানের উৎসবের আয়োজন সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই শুরু হয়।

খাজনা প্রদানকে কেন্দ্র করে যে উৎসবের প্রচলন সম্রাট আকবরের আমলে শুরু হয়েছিল, সেটিই কোনো রকম ধর্মীয় দ্যোতনা ব্যতিরেকে, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালির কাছে একটি অন্যতম প্রধান সামাজিক উৎসব হিসেবে ক্রমে পরিগণিত হতে শুরু করে। ইরানীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতুল্লাহ সিরাজি চান্দ্র ইসলামীয় বর্ষপঞ্জির সঙ্গে সৌর বর্ষপঞ্জির অভূতপূর্ব সেতুবন্ধন করে যে বর্ষপঞ্জি তৈরি করেছিলেন তা বাঙালি সংস্কৃতিকে ধর্মীয় নিগড়ের বাইরে একটা সাংস্কৃতিক, সামাজিক পটভূমিকার ওপর স্থাপিত করতে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল।৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ যে সাংস্কৃতিক ভিত্তির ওপর বাঙালি জাতিসত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, সেই জাতিসত্তার অঙ্কুর স্থাপিত হয়েছিল সম্রাট আকবরের শাসনকাল, মধ্যকালীন ভারতে বঙ্গাব্দের প্রচলনের ভেতর দিয়ে।

মোগল প্রতিনিধি হিসেবে মুর্শিদকুলী খাঁ পুণ্যাহের রীতির যে প্রচলন করেছিলেন, সেই রীতি সময়ের নিরিখে সামন্ততান্ত্রিক শোষণের একটি ধারাতে পরিণত হলেও নতুন বছরের শুরুকে কেন্দ্র করে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ব্যতিরেকে একটা সামাজিক প্রথার প্রচলন সেখান থেকেই শুরু হয়। এখন হিন্দু সমাজের ভেতরে নববর্ষ আর হালখাতাকে কেন্দ্র করে নতুন খাতার পূজার্চনার সঙ্গে যে দেব-দেবীদের সম্পৃক্ত করে ফেলা হয়েছে, সেটি পরবর্তী সময়ের সংযোজন। নববর্ষের সূচনায় যে খাজনা প্রদানের রীতি বা পুণ্যাহের রীতি অভিভক্ত বাংলায় জমিদারি প্রথার সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেগুলোর সঙ্গে দেব-দেবীর পূজার্চনার কোনো সম্পর্ক ভারতভাগের আগে পর্যন্ত সচরাচর দেখা যায়নি। প্রবন্ধকারের পিতা ১৯৪৪ সালে তাঁদের এস্টেট অবিভক্ত পাবনার সাফল্লাতে নিয়মিত পুণ্যাহে অংশ নিয়েছিলেন। সেই সময়ের প্রচলিত পুণ্যাহের সঙ্গে এতটুকু ধর্মীয় অনুষঙ্গের যোগ ছিল না। ছিল সামাজিক বন্ধনরি যোগ। খাওয়া-দাওয়া, কুশল বিনিময় ইত্যাদি। নববর্ষের সঙ্গে হালখাতাকে সংযুক্ত করে তার ধর্মীয় অনুষঙ্গ দানের বিষয়টি নির্মিত হয়েছে মূলত বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীদের ভেতর থেকে। তত্কালীন পূর্ববঙ্গের গন্ধবণিক, স্বর্ণবণিক ইত্যাদি যে ব্যবসায়ীরা ছিলেন, তারা গন্ধেশ্বরী দেবীর পূজার্চনাকে কেন্দ্র করে তাদের ব্যবসায়ের নতুন খাতা শুরু করতেন। প্রথা তারা ভারতভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে এসেও বজায় রেখেছেন। কলকাতাকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা হালখাতা বিষয়টির সঙ্গে বিশেষ বিশেষ মন্দিরে পুজো দেয়া, নিজেদের দোকানে পুজো করা ইত্যাদির ভেতর দিয়ে এটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের নিগড়ে পরিবর্তিত করেছেন।

গৌতম রায়: লেখক ইতিহাস বিশ্লেষক