বৃহস্পতিবার | এপ্রিল ২২, ২০২১ | ৯ বৈশাখ ১৪২৮

বিশেষ সংখ্যা

মাওলানা তর্কবাগীশ ও অগ্নিগর্ভ বায়ান্নর একুশ

সৈয়দ হাদি তর্কবাগীশ

মাওলানা তর্কবাগীশ তখন সরকারি দলের পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের মুসলিম লীগ দলীয় সদস্য। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তখন ১৪৪ ধারা। আগের দিন পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিন ১৪৪ ধারা জারি করেন। ওইদিনই ডাকা হয়েছে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের বাজেট অধিবেশন। বৈঠকে যথারীতি উপস্থিত আছেন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নায়ক মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ।

পার্লামেন্টারি বৈঠক চলাকালে সহসা ভেসে এল গুলির শব্দ। চমকে উঠলেন তর্কবাগীশ। কেঁপে উঠল তার অন্তরাত্মা। অবাক বিস্ময়ে তিনি দেখলেন উপস্থিত সদস্যরা বিচলিত; কিন্তু মন্ত্রীরা নির্বিকার।

ভাষা আন্দোলনের নায়ক মাওলানা তর্কবাগীশ এক মুহূর্ত থাকতে পারলেন না। তিনি বেরিয়ে পড়লেন।

পরিষদ ভবনের সামনের রাজপথ জনশূন্য। অদূরে মেডিকেল কলেজের হোস্টেল থেকে মাইকে ভেসে আসছে ছাত্রদের অন্তর্ভেদী আর্তচিত্কার। তারা ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্যদের জানাচ্ছে অধিবেশন বর্জনের আহ্বান।

ভাষা আন্দোলনের নায়ক মাওলানা তর্কবাগীশ ছুটে চললেন সেদিকে। মেডিকেল হোস্টেল প্রাঙ্গণে এসে দেখলেন এক হূদয়বিদারক বীভৎস দৃশ্য।

রক্ত, মগজ হাড়ের গুঁড়ো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে রাজপথে। গুলির আঘাতে ঝাঁজরা হয়েছে কয়েকজন টগবগে তরুণের বুক, দেহ।

এরই মধ্যে নিভে গেছে কয়েকটা প্রাণপ্রদীপ। সাথী-বন্ধুদের মৃত্যু, চিত্কার আর রক্তের ফিনকি ছাত্রদের বুকের ভেতর জ্বেলে দিয়েছে অগ্নিশিখা।

সমাজ সংস্কারক গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা, ভাষা আন্দোলনের নায়ক মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের জবানিতেই সেদিনের ঘটনা তুলে ধরছি...

আমি তখন পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের সদস্য। ২০ ফেব্রুয়ারি নুরুল আমিন সরকার ঢাকায় জারি করেন ১৪৪ ধারা। কাজেই জনসভা, মিছিল ইত্যাদি নিষিদ্ধ ছিল। রাস্তায় রাস্তায় মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ মিলিটারি। এরই মধ্যে বেলা ২টার দিকে অ্যাসেম্বলি হাউজে মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি দলের সভা বসে।

আমার মনে পড়ে, একুশে ফেব্রুয়ারি পরিষদের সভা আহ্বান করা হয়। তখন বাইরে মুহুর্মুহু রাইফেলের গর্জন। কিন্তু কোনো মন্ত্রী কিংবা পরিষদের কোনো সদস্যের মধ্যে কোনো সাড়া নেই।

মাঝ মাঝে গুলি, কাঁদানে গ্যাস, শেল বর্ষণের শব্দে আমি শিউরে উঠছিলাম। একসময় হাউজ থেকে বেরিয়ে আসি। দেখি রাজপথ জনশূন্য। রাইফেল লাঠি হাতে স্থানে স্থানে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ সৈন্যরা।

আমি মেডিকেল কলেজের দিকে অগ্রসর হলাম।

কলেজের কাছে এসে আমি যে দৃশ্য দেখলাম তাতে আমি অশ্রু সংবরণ করতে পারিনি। ছাত্ররা চিত্কার করছে। দূর থেকে তারা আইনসভার সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে বেরিয়ে এসে পরিস্থিতি দেখার জন্য। আহত ছাত্ররা আর্তনাদ করছে। কারো কারো কাপড়ে ফেনাযুক্ত রক্ত। শুনতে পেলাম বহু ছাত্র হতাহত হয়েছে।

ব্রিটিশ আমলে আমার সক্রিয় রাজনীতির ৪০ বছরের জীবনে হাসপাতালের অভ্যন্তরে পুলিশের গুলিবর্ষণের এমন ঘটনা আমি দ্বিতীয়টি আর দেখিনি।

মর্মান্তিক দৃশ্য সহ্য করতে পারলাম না। হাউজের কাছে প্রতিবাদ জানানোর জন্য, অবস্থা বিবৃতি করার জন্য ছুটে এলাম অ্যাসেম্বলি হাউজে।

বেলা সাড়ে ৩টা। স্পিকার আব্দুল করিম আসন গ্রহণ করলেন। আমি তখন সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালাম।

মাননীয় স্পিকার, প্রশ্নোত্তরের আগে আমি আপনার কাছে একটা নিবেদন করতে চাই:

ভবিষ্যতের আশা-ভরসা দেশের ছাত্ররা যখন পুলিশের গুলিতে জীবন দিচ্ছে তখন আমরা এখানে বসে সভা করতে পারি না। আমার দাবি প্রথমে ইনকোয়ারি, তারপর হাউজ বসবে। এর আগে হাউজ বসতে আমি দেব না।

নিয়ে স্পিকারের সঙ্গে আমার দীর্ঘ বাগিবতণ্ডা হয়। তিনি বারবার আমাকে অ্যাসেম্বলির আইন মোতাবেক আচরণ করার কথা বলেন।

আমারও এক কথা, যে সরকার আমাদের সন্তানদের গুলি করে হত্যা করছে, সেই সরকারের আইন মানা যায় না। আমি মানব না। আগে প্রধানমন্ত্রীকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসে বিবৃতি দিতে হবে, তারপর অধিবেশন চলবে, তার আগে নয়।

আমি অধিবেশন চলবে দেব না।

তুমুল বাগিবতণ্ডার এক পর্যায়ে স্পিকার অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। মুলতবির পর অধিবেশন আবার শুরু হলে এক বিবৃতির মাধ্যমে এমন জুলুমের প্রতিবাদ জানিয়ে আমি পরিষদ ভবন ত্যাগ করি এবং চিরতরে মুসলিম লীগ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিই।

ভাষা আন্দোলনের নায়ক মাওলানা তর্কবাগীশ একাই পরিষদ ভবন ত্যাগ করে সরাসরি চলে আসেন মেডিকেল কলেজে। তিনি এখানে ছাত্রদের মিছিল সমাবেশে যোগ দেন।

মিছিলসহযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে যেখানে বর্তমান শহীদ মিনার, সেখানে যে টিনের হোস্টেল ছিল তার বারান্দায় দেখতে পান একজন শহীদ ছাত্রের মাথার খুলি বুলেটের আঘাতে উড়ে গেছে। ছাত্রদের মধ্যে চরম উত্তেজনা। হোস্টেলে সমাগত ছাত্রদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তিনি ভাষণে বলেন,

*** যার হাতে আমার জীবন-মৃত্যু সেই মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ পাকের কসম, শহীদদের পবিত্র রক্তের শপথ বাংলা ভাষাকে আমি রাষ্ট্রভাষায় পরিণত করবই ইন শাআল্লাহ... শৃঙ্খলার মাধ্যমে আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান মাওলানা তর্কবাগীশ।

*** উল্লেখ্য, বক্তৃতা দেয়ার সময় ভাষা আন্দোলনের নায়ক মাওলানা তর্কবাগীশের ডান হাতে শহীদদের পবিত্র রক্ত লেগেছিল।

একাই মুসলিম লীগ পরিষদ ভবন ত্যাগ করে ছাত্র-জনতার কাতারে শামিল হয়ে গেলেন।

এর জন্য তাকে রুদ্ধদ্বার কক্ষে বৈঠক কিংবা আলোচনায় বসতে হয়নি। কারো মতামতের জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি।

আজীবন বিপ্লবী মাওলানা তর্কবাগীশ নিজ বিবেকতাড়িত হয়ে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এক মুহূর্ত দ্বিধা করেননি।

আবার ভাষা আন্দোলনের নায়ক মাওলানা তর্কবাগীশের জবানিতেই বলি, পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি যথারীতি অধিবেশন বসেছে পরিষদের।

আমি প্রস্তাব উত্থাপন করলাম অধিবেশন মুলতবির। প্রস্তাবের প্রতি ৩৫ জন সদস্যের সমর্থন আছে কিনা সদস্যদের কাছে স্পিকার জানতে চাইলেন। কিন্তু খয়রাত হোসেন, খান সাহেব ওসমান আলী, আলী আহমেদ, আনোয়ারা খাতুন, মনোরঞ্জন ধর, ধীরেন দত্ত, গোবিন্দ বল্লভ ব্যানার্জী, বসন্ত কুমার দাস, মনির উদ্দিন আকন্দ, মনির উদ্দিন আকন্দ, সামসুদ্দিন আহমেদ, আলী আহমদ চৌধুরী, কবির চৌধুরী, ডা. ভোলানাথ বিশ্বাস, হারান চন্দ্র বর্মণ ছাড়া কেউ প্রস্তাবে সমর্থন করলেন না। ফলে মুলতবি প্রস্তাব স্পিকার নাকচ করে দিলেন।

*  অতঃপর আমি নুরুল আমিন সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করলাম।

২৩ ২৪ ফেব্রুয়ারি অধিবেশন মূলে ঘোষণা দেয়া হলো ২৫ ফেব্রুয়ারি নুরুল আমিন সরকারের বিরুদ্ধে আনীত অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে।

সারা দেশ তীব্র ক্ষোভ রোষে দাউ দাউ করে জ্বলছে। নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ধিক্কার দেশজুড়ে...

এরই মধ্য সরকার বাংলা ভাষা আন্দোলনের পেছনে বিদেশী হাত, বিশেষ করে অপসংস্কৃতির প্রভাব আবিষ্কার করল এবং আন্দোলনকে পাকিস্তানের ঐক্য সংহতি বিনষ্টের ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করল।

*  জাতির সন্ধিক্ষণে ভাষা আন্দোলনের নায়ক মাওলানা তর্কবাগীশ ২৩ ফেব্রুয়ারি মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন।

ভাষা আন্দোলনের নায়ক মাওলানা তর্কবাগীশ আইন পরিষদে নুরুল আমিন সরকারের বিরুদ্ধে যে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন তা সমর্থন করার জন্য ছাত্ররা এমএলএদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ব্যাপকভাবে অনুরোধ জানাতে লাগল।

পরিষদ সদস্যদের আবাসস্থল পার্টি হাউজের দোতলায় যে কক্ষটিতে ভাষা আন্দোলনের নায়ক মাওলানা তর্কবাগীশ থাকতেন, সেটাই তখন ভাষা আন্দোলন পরিচালনা এবং ছাত্রনেতাদের বৈঠক আলাপ-আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

ছাত্রদের ব্যাপক তত্পরতার পরিপ্রেক্ষিতে ধারণা বদ্ধমূল হলো, ২৫ ফেব্রুয়ারি নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়ে যাবে।

এরই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের পক্ষ থেকে মাওলানা তর্কবাগীশের কাছে অনাস্থা প্রস্তাব প্রত্যাহারের বিনিময়ে কিছু লোভনীয় প্রস্তাব এল।

ক্রুদ্ধ মাওলানা তর্কবাগীশ দৃঢ়তার সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করলেন। নুরুল আমিনের দূত ফিরে গেলেন, কিন্তু আবার এলেন আরো বড় প্রস্তাব নিয়ে। বৃহৎ আকারের ঢাকায় চারখানা বাড়ি এবং লাখ টাকা।

কিন্তু ভাষা আন্দোলনের নায়ক মাওলানা তর্কবাগীশ কৃত সংকল্প। জেল, জুলম, মৃত্যু, বাড়ি, টাকাপয়সা কিছুই পরোয়া করেননি অকুতোভয় মাওলানা তর্কবাগীশ। তাকে কোনো কিছুতেই যখন টলানো গেল না, অবশেষে ২৪ ফেব্রুয়ারি শেষ রাতে পুলিশ এসে ভাষা আন্দোলনের নায়ক মাওলানা তর্কবাগীশ তার জ্যেষ্ঠ পুত্র ভাষা সৈনিক এসএম নুরুল আলমকে গ্রেফতার করে ১৮ মাস কারাগারে আটক করে রেখেছিল।

২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে গভর্নর ফিরোজ খান নূন বিশেষ ক্ষমতাবলে অর্ডিন্যান্স জারি করে আইন পরিষদের অধিবেশন বন্ধ কর দেন। এভাবে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন গণতন্ত্রের সূচনাকে রুদ্ধ করে হত্যা করা হলো। অঙ্কুরিত হলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বীজ।

সৈয়দ হাদি তর্কবাগীশ: মাওলানা তর্কবাগীশের পৌত্র