বৃহস্পতিবার | এপ্রিল ২২, ২০২১ | ৯ বৈশাখ ১৪২৮

বিশেষ সংখ্যা

বাংলার প্রতি তর্কবাগীশের ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম

সৈয়দ আবুল মকসুদ লেখক গবেষক জনপ্রিয় কলামিস্ট তিনি মানবাধিকার, পরিবেশ সামাজিক আন্দোলনের একজন শীর্ষ নেতাও জন্ম মানিকগঞ্জে স্নাতক স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরবর্তী সময়ে পশ্চিম জার্মানি থেকে সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা ডিগ্রি নেন কবিতা, দর্শন, ভ্রমণকাহিনী, সমালোচনা, প্রবন্ধ প্রভৃতি গ্রন্থের সংখ্যা ৩৫টি ছিলেন একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার বার্তা সম্পাদক হিসেবেও পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ নানা পদক উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জীবন সাহিত্য এবং ঢাকার বুদ্ধদেব বসু জীবনীগ্রন্থ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তার একটি মৌলিক কাজ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের ভূমিকা বিস্মৃত বলা যায় আপনার দৃষ্টিতে তিনি কেমন ছিলেন?

মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের জন্ম গত শতাব্দীর শুরুতে সিরাজগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত পীর পরিবারে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে উনিশ এবং কুড়ি শতকে বহু পীর ধর্মীয় নেতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তাদের রাজনীতির চরিত্র ছিল প্রগতিশীল যশোরের খড়কির পীর সাহেবের তিন ছেলেই প্রগতিশীল রাজনীতি করেছেন কেউ আওয়ামী লীগের নেতা, কেউ কমিউনিস্ট পার্টির মাওলানা তর্কবাগীশ দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় মহাত্মা গান্ধী, মাওলানা মুহাম্মদ আলী মাওলানা শওকত আলীদের অসহযোগ আন্দোলনে একজন কর্মী হিসেবে যোগ দেন গ্রাম এলাকায় কৃষকদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রচার করেন সিরাজগঞ্জের সলঙ্গাহাটে তিনি কংগ্রেসের অফিস স্থাপন করেন ১৯২২ সালে ওই অফিস থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয় তাকে আর্মড ফোর্স ক্যাম্পে নিয়ে আটক রাখা হলে জনগণ ক্যাম্প ঘেরাও করলে সেনাসদস্যদের গুলিতে সাতজন নিহত হয় তিনি মুক্তি পান বটে, কিন্তু সারা দেশে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে গোলযোগ সৃষ্টির অভিযোগে তার ছয় মাসের জেল হয়

জেল থেকে ছাড়া পেয়ে লাহোরে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ করেন সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রচার করতে গিয়ে গ্রামের কৃষকের দুরবস্থার সঙ্গে পরিচিত হন তিনি জমিদার জোতদার মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করেন ১৯৩৬ সালে সোহরাওয়ার্দীর আহ্বানে তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন পাকিস্তান আন্দোলনে সাবলীল ভূমিকা পালন করেন ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হন

ভাষা আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করে গণ পরিষদের অধিবেশন থেকে বেরিয়ে মাঠের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন পরবর্তীতে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণও করেন

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে মাওলানা তর্কবাগীশের ভূমিকা অবিস্মরণীয় আমাদের তরুণদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হওয়ার কথা শোনামাত্র আইন পরিষদ থেকে ওয়াকআউট করেন শুধু তাই নয় মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি পার্টি থেকেও পদত্যাগ করেন সেটা ছিল পাকিস্তান সরকারের মুখে চপেটাঘাত ভাষা আন্দোলনে সংহতি প্রকাশের জন্য তিনি কারাবরণ করেন

যে আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য তর্কবাগীশের মতো নেতারা পাকিস্তান আন্দোলন করেছিলেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দেখা গেল সেই আদর্শ থেকে শাসকশ্রেণী দূরে সরে গেছে ছাত্র-যুবকেরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করলে তাতে সমর্থন দেন তর্কবাগীশ

জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি মুসলিম লীগ ত্যাগ করেন এবং ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন এক দশক তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন সাধারণ সম্পাদক দুজনে মিলে দলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান

জনমানুষের নেতা হিসেবে মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

চুয়ান্নর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন সময়ে তিনি মওলানা ভাসানী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পূর্ব বাংলায় স্বাধিকারের জন্য আন্দোলন করেন

ঊনসত্তর থেকে আমি মাওলানা তর্কবাগীশকে খুব কাছ থেকে দেখেছি তিনি ছিলেন অত্যন্ত নীতিমান মানুষ তিনি জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতেন না তার মতো নীতিমান মানুষ আমি বিশেষ দেখিনি তিনি খুবই সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন


দীর্ঘ সময়ে মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাল ধরেন এবং এগিয়ে নিয়ে যান কেমন ছিল তার তখনকার নেতৃত্ব?

১৯৫৭ তে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে মওলানা ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করলে মাওলানা তর্কবাগীশ বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের হাল ধরেন বঙ্গবন্ধু তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন তার নৈতিক দৃঢ়তার জন্য সত্তরের নির্বাচনে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন ২৫ মার্চের পর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন

আশির দশকে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দুর্বল শরীর নিয়ে রাজপথে নেমেছেন ১৫ দলীয় জোটের তিনি ছিলেন একজন নেতা তার বাসভবনেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ওই জোট গঠিত হয়

 ধর্মীয় নেতা হিসেবে তার ভূমিকা কেমন ছিল?

একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে মাওলানা তর্কবাগীশের ভূমিকা ছিল প্রগতিশীল পড়ালেখা মাদ্রাসাকেন্দ্রিক হলেও বাংলার প্রতি তার আলাদা টান ছিল কারণে তিনি ধর্মীয় শিক্ষায় বাংলার সংযোজনে জোর দিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয়ভাবে মাওলানা সাহেবকে মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব প্রদান করা হয় দায়িত্বকে তিনি গুরুদায়িত্ব হিসেবেই গ্রহণ করেন এবং একজন প্রকৃত শিক্ষানুরাগী হিসেবেই মাদ্রাসা শিক্ষাকে বাস্তবধর্মী করে তুলতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে তার জীবনের আরেকটি স্বপ্ন সফল হয় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি প্রশাসনিক কাজকর্ম বাংলা ভাষায় সম্পাদন করার নির্দেশ দেন মসজিদ মাদ্রাসাগুলোর ব্যবস্থাপনায় নানা জটিলতা, অনিয়ম বিশৃঙ্খলা দেখে তিনি প্রশাসন ব্যবস্থাপনাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর ব্যবস্থা করেন

 মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ কেমন জীবনযাপন করতেন?

আব্দুল রশীদ তর্কবাগীশ খুবই সাধারণ জীবনযাপন করতেন তার বাসায় কোনো আসবাবপত্রই ছিল না এমন মহৎ ব্যক্তির এত সাধারণ জীবনযাপন আমাদের সবার অনুপ্রেরণা দেয় তিনি সারা জীবন মানুষের সেবায় উৎসর্গ করেছেন এমন নেতা বিশ্বেই বিরল কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে অনুসরণ করেছেন এক সঙ্গে আওয়ামী লীগকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন ৭০ সালের নির্বাচনে তর্কবাগীশ বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন ব্যক্তি স্বার্থে তিনি রাজনীতি করেননি দেশের স্বার্থে জনগণের সঙ্গে ছিল তার রাজনীতি ভাষা আন্দোলনে তার প্রতিবাদী ভূমিকা, স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে তার আপসহীন ভূমিকা, বঙ্গবন্ধুর ছয় দফাকে সমর্থন, মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকাএত ভূমিকা সত্ত্বেও জাতীয় ইতিহাসে যে মর্যাদা তার প্রাপ্য তা তিনি পাননি তবে ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে