বৃহস্পতিবার | এপ্রিল ২২, ২০২১ | ৯ বৈশাখ ১৪২৮

গোলটেবিল

সুষুম পরিবেশ পেলে নারীরা অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে

১৬ জানুয়ারি ২০২১ পিআরআই ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে ‘আর্থিক লেনদেনে জেন্ডার অসমতা দূরীকরণে প্রযুক্তির ভূমিকা’ শীর্ষক একটি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে এ ক্রোড়পত্র



দেওয়ান হানিফ মাহমুদ

সম্পাদক

বণিক বার্তা

আজ আমাদের আয়োজন আর্থিক লেনদেনে জেন্ডার অসমতা হ্রাসে প্রযুক্তির ভূমিকা। আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে রয়েছেন মাননীয় ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী জনাব মোস্তাফা জব্বার। সভাপতিত্ব করবেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। প্রবন্ধ উপস্থাপনা করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক।  

২০১১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা সাড়ে ১৬ কোটি। ২০২১ সালে আদমশুমারি হওয়ার কথা। মোট জনসংখ্যায় নারীর সংখ্যা আনুপাতিক হারে বাড়লেও আর্থিক খাতে নারীরা এখনো পিছিয়ে। ব্যাংক ওএমএফএস সেবা নেয়ার ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে কম। এক্ষেত্রে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রযুক্তি কীভাবে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়ে আজ আমরা আলোচনা করব।



আহসান এইচ মনসুর

নির্বাহী পরিচালক

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)

সবাইকে স্বাগত জানিয়ে আজকের আলোচনা শুরু করছি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমরা বৈঠক করছি এক বছর ধরে। আমাদের উদ্দেশ্য ফাইন্যান্সিয়াল ইনডিপেন্ডেন্স। আমাদের নারীদের কীভাবে ফাইন্যান্সিয়াল ইম্প্রেশনিজমের মধ্যে নিয়ে আসতে পারি, তা-ই আজকের মূল আলোচ্য বিষয়। আমরা জানি যে তিনটি জায়গায় যদি মেয়েদের আমরা উদ্বুদ্ধ করতে পারি, তাহলে অর্থনীতিতে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সেগুলো হলো ১. উচ্চশিক্ষা, যার কোনো বিকল্প নেই, ২. কার্যক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো ও ৩. আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। এখন পর্যন্ত আমরা যা দেখি, নারীদের ব্যাপকভাবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি করতে পারিনি। উদাহরণস্বরূপ আমি দেখার চেষ্টা করলাম, ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই খাতে কতজন নারী উদ্যোক্তা আছেন। দেখা গেল সাড়ে ৩ শতাংশ মাত্র, যা খুবই দুঃখজনক। সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের মতো নারী উদ্যোক্তা পেয়েছি। অন্যদের ক্ষেত্রে এটি এক/দেড় শতাংশ বা আরো কম, যা রীতিমতো হতাশাজনক। আমাদের এসএমই খাতে নারীদের পার্টিসিপেশন খুবই কম। আমাদের মাঝে উপস্থিত আলোচকবৃন্দ, যারা নিজস্ব বিজনেস ফিল্ডে খ্যাতিমান এবং তাদের মধ্যে অনেকেই নারী উদ্যোক্তাও আছেন, যারা নারীদের নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন। আমরা তাদের আলোচনা শুনব।


তানিয়া হক

অধ্যাপক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আমরা সবাই জানি যে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই করার ক্ষেত্রে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি একটি প্রমিজিং ফাইন্যান্সিয়াল মেথড। প্রত্যেক মানুষের ডিগনিটি অব লাইফকে এনশিওর করার ক্ষেত্রেও এটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে, যা জেন্ডার ইকুয়ালিটি ও উইমেন এম্পাওয়ারমেন্টের প্রাইম কনসার্ন। সরকারের উন্নয়ন দর্শন হচ্ছে, কাউকে পেছনে ফেলে এগোনো যাবে না। এ বিষয়টি ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন এবং ডিজিটালাইজেশনের ওপর সার্বিকভাবে নির্ভরশীল। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রগ্রেসিভ মেকানিজমের পাশাপাশি নানা রকম চ্যালেঞ্জেস আমরা দেখতে পাচ্ছি। যেমন ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনের প্রাইভেসিভ প্রবলেমগুলোর জন্য জেন্ডার ডাইমেনশনগুলো লক্ষ করতে পারছি। সংখ্যাভিত্তিক উপাত্তের ভিত্তিতে বলতে হয়, এখানে হিউজ একটি জেন্ডার গ্যাপ রয়েছে, যা ২০১৪-তে ছিল ৯ শতাংশ এবং ২০১৭ সালে এসে তা পৌঁছেছে ২৯ শতাংশে। এটা উইমেন ওয়ার্ম ব্যাংকিং ২০১৮-এর তথ্য। অন্যদিকে গ্লোবাল ফিল্ড ইনডেক্স তার গবেষণা থেকে আলোকপাত করেছে যে বাংলাদেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের ক্ষেত্রে পুরুষের সংখ্যা ৬৫ শতাংশ এবং নারীর সংখ্যা ৩৫ শতাংশ। একই সঙ্গে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীদের ক্ষেত্রে অবস্থা আরো শোচনীয়। কম্পিউটার নলেজের ক্ষেত্রে অসমতা বিদ্যমান। ৪৪ শতাংশ পুরুষের ইন্টারনেট জ্ঞান রয়েছে, অন্যদিকে নারীদের এ হার ২৫ শতাংশ। টেকনিক্যাল জ্ঞানের ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান বেশ দুর্বল। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অসমতা রয়েছে। ৩৬ শতাংশ পুরুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে আর নারীদের এ হার ১৬ শতাংশ। এভাবে জেন্ডার ডিজিটাল ডিভাইডের জায়গাটা তৈরি হয়েছে, যা সত্যই উদ্বেগজনক।

এটি ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেক্টরে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীর সংখ্যা কম। কভিড-১৯-এর সময়ে এসে এ ডিজিটাল ডিভাইডের জায়গাটা আরো সংকটময় হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল ডিমান্ডের জায়গাটা ম্যাসিভ স্কেলে বেড়ে গেছে। ব্যবসার ক্ষেত্রে ফাইন্যান্সিয়াল ইকোসিস্টেমকে এনশিওর করার জন্য পার্সিস্ট্যান্স জেন্ডার গ্যাপকে মিনিমাইজ করা প্রয়োজন। বিভিন্ন গবেষণা থেকে আমরা দেখতে পাই যে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে নারীরা অনেক দূরে রয়ে গেছে। তার অনেক কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে মোবিলিটি বা জিওগ্রাফিক্যাল চ্যালেঞ্জেস। কিন্তু ডিজিটাল ব্যাংকিং এ জিওগ্রাফিক্যাল চ্যালেঞ্জগুলোকে খুব সহজেই কমাতে পারে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে বেশকিছু পজিটিভ অপরচুনিটিজ রয়েছে, যা নারীর পক্ষে কাজ করতে পারে এবং পজিটিভ অ্যাটমসফিয়ার তৈরি করতে পারে। এটি অবশ্যই জিওগ্রাফিক্যাল চ্যালেঞ্জেসকে অপসারণ করতে এবং ব্যাংকিং সেক্টরের কস্ট বিয়ার করার সমঝোতা সাধন করতে পারে। কাস্টমাইজ ডিফারেন্ট কেসগুলোর ক্ষেত্রে ব্যাংকিং চাহিদা পূরণ করতে পারে এবং একই সঙ্গে সঞ্চয়ের ভালো সুযোগও তৈরি করতে পারে। আমরা জানি নারী উপার্জন করতে পারে কিন্তু আয়ের ওপর নারীর ক্ষমতা অনেক কম। সে জায়গায়ও ডিজিটাল ব্যাংকিং নারী-পুরুষের মাঝে বিরাজমান অসমতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ সরকার আরএমজি খাতে মজুরি প্রদানের ক্ষেত্রে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছে। ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন তৈরি পোশাক শ্রমিক তাদের বেতন ডিজিটাল প্রসেসের মাধ্যমে পাচ্ছেন। ২০২১ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ শ্রমিককে এর মধ্যে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল লক্ষ্য একটা ক্যাশলেস সোসাইটি তৈরি করা। এখানে যে বিষয়গুলোতে আলোকপাত করা প্রয়োজন তা হলো ব্যাংকিং সার্ভিস নেয়ার ক্ষেত্রে নারীদের এক ধরনের জেন্ডার বৈষম্যের শিকার হতে হয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা তৈরির কারণেই মূলত বিভিন্ন সেবা থেকে নারীরা অনেক দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। নারী যে শুধু জেন্ডারের কারণেই দূরে দাঁড়িয়ে আছে তা নয়। আমরা জানি যে শ্রমবাজারে নারীর সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তবে একই সঙ্গে এটাও জানি যে অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে তাদের ভূমিকা অনেক বেশি সক্রিয় এবং সেখানে তারা ওয়েজ ডিসক্রিমিনেশনের শিকার। তারা মোর সিজনাল ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করছে। ইনকাম আর্নিংয়ের ক্ষেত্রে তাদের ভালনারেবল কন্ডিশন যেটা তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ওপেন করার ক্ষেত্রে ইনক্যাপাবল ও আনউইলিং সিচুয়েশন তৈরি করে। 

বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গেছে, ফরমাল ব্যাংক থেকে ইনফরমাল ব্যাংকে আগ্রহী প্রার্থীর সংখ্যা বেশি। ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন গ্যাপের আরেকটি উদাহরণ নারীর আনপেইড কেয়ারওয়ার্ক। আমরা এখনো এটাই মানি যে নারী মানেই ঘরের কাজ। অর্থাত্ নারীদের বাইরের কাজ অনেক বেশি কন্ডিশনাল। ঘরের কাজ করেই তাকে বাইরের কাজ করতে হয়। ব্যাংকিং সিস্টেমের কাছে পৌঁছতে নারীদের নানা বিড়ম্বনা কাজ করে। আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে বাড়ির কাজ করতে গিয়ে বেশির ভাগ সময় নারীকে চাকরি ছাড়তে হয়। এটি তার সঞ্চয় ও আয়ের ক্ষেত্রে একটা দুর্বলতা তৈরি করে। নারীর হাতে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার জায়গাটি অনেক বেশি ভালনারেবল থাকে। 

ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্রিয়েশনকে করপোরেট করতে গেলে নারীর হাতে টেকনোলজি থাকা দরকার। নিজস্ব ফোনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, পুরুষের তুলনায় নারীর মোবাইল ফোনের সংখ্যা অনেক কম। শুধু তা-ই নয়, পুরুষেরা নারীদের ফোন কিনে দেয়। ৬০ শতাংশ স্বামী তার স্ত্রীকে ফোন কিনে দিচ্ছে। না হলে আত্মীয় তার ফোন কিনে দিচ্ছে। ১৫ শতাংশ নারী তার নিজস্ব ফোন কেনার এজেন্সি ক্রিয়েট করতে পেরেছে। আরো একটি ব্যাপার হলো ব্যাংকিং প্রোভাইডারদের মধ্যেও ল্যাক অব জেন্ডার সেনসিটিভিটি কাজ করে। যেটা নারীদের সেবা এনজিও থেকে বিচ্যুত করে এবং ফরমাল ফাইন্যান্সিয়াল গেট কিপিং ও অবস্টাকল তৈরি করে। আর্থিক জ্ঞানের দিক থেকে নারীর অবস্থান অনেক দুর্বল। নলেজ গ্যাদারিংয়ে নারীদের অবস্থান নড়বড়ে। একই সঙ্গে ডিজিটাল লিটারেসিতেও নারীদের অবস্থা করুণ। এ কারণে নারীদের মধ্যেও এক ধরনের নেগেটিভিটি কাজ করে। যেজন্য সে মনে করে ব্যাংক আসলে তার জন্য নয়। বেশির ভাগ নারীই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে এবং নারী নিজেও ব্যাংক খাত সম্পর্কে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী? গবেষণার বিভিন্ন দিক ও তথ্য-উপাত্তকে বিবেচনা করলে যে বিষয়টিকে আমাদের বোঝাপড়া করা প্রয়োজন তা হলো আমরা সবসময় পলিসি মেকারদের মধ্যে একটা বিষয় লক্ষ করি যে নারী হলো হোমোজেনাস। তাদের অবস্থা ও চাহিদা কিন্তু এক নয়। আমরা নারী-পুরুষের অসম ব্যবস্থাকে যেভাবে অ্যাড্রেস করতে পারি, সেভাবে নারীর সঙ্গে নারীর অসম অবস্থানকে সহজে অ্যাড্রেস করি না। এমতাবস্থায় জেন্ডার লেন্সের পাশাপাশি ইন্টারসেকশনালিটি লেন্সের মাধ্যমে নারীর প্রকৃত অবস্থানকে পর্যালোচনা করে তাদের চাহিদাগুলোকে সঠিকভাবে আমলে নেয়া এবং সে প্রেক্ষাপটে নিড বেজড অ্যাপ্রোচের মাধ্যমে পলিসি তৈরি এবং তা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।


সেলিমা আহমাদ, এমপি 

প্রেসিডেন্ট, বিডব্লিউসিসিআই

কভিড-১৯ সময়ে আমরা সবাই দেখেছি যে নারী উদ্যোক্তরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষ বলে, ডুবে গেলে খড়কুটো ধরেও বেঁচে উঠতে চায়। এখানে খড়কুটো বলতে ছিল ডিজিটাল প্লাটফর্ম। ডিজিটাল প্লাটফর্ম ধরতে পারেনি বলে অনেকেই ডুবে গেছে। ডিজিটাল জায়গায় যদি তাদের সক্ষমতা ও দক্ষতা থাকত, তাহলে তারা এগিয়ে যেতে পারত আরো দ্রুত। ডিজিটাল অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রকল্প নিয়ে আমরা কাজ করছি। এখানে জ্ঞান ও দক্ষতা দুটোই জরুরি। কম্পিউটার দক্ষতা ছাড়া নারীদের সক্ষমতা কোনোভাবেই বাড়ানো যাবে না। কীভাবে ডিজিটাল সুযোগের সদ্ব্যবহার করা যায়, সে সম্পর্কে নারীদের প্রশিক্ষিত করতে হবে। এক্ষেত্রে স্মার্টফোন অনেক নারীকে মোটামুটি এগিয়ে নিয়ে গেছে, আবার পিছিয়েও দিয়েছে। কারণ তারা কম্পিউটারের দক্ষতা আর বাড়াতে পারেনি। কারণ তারা ফোনের মধ্যে থেকেই যতটুকু যা যা করার সেসব করেছে। আমরা নারীদের তথ্যপ্রযুক্তির কোথায় কোথায় দেখতে চাই? বিভিন্ন সেগমেন্টে নারী শ্রমজীবী বা উদ্যোক্তারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের জন্য কী করা। আমি ব্যক্তিগতভাবে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সেভাবে আশানুরূপ কিছু দেখতে পাচ্ছি না। হ্যাঁ, এখন স্কুলে আপনারা ডিজিটাল ল্যাব খুলেছেন, কিন্তু বাস্তবায়ন যেভাবে হওয়া উচিত ছিল সে রকম হচ্ছে না। এই কভিড-১৯-এ প্রধানমন্ত্রী যে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন তা বাস্তবায়ন হওয়ায় তার সুফল আমরা পাচ্ছি। বাংলাদেশে প্রতি বছর একটা টার্গেট থাকা দরকার, যেখানে নারী উদ্যোক্তাদের কতটুকু তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞান দেয়া হবে। শ্রমিক নারী বা পেশাজীবী নারী তাদের আমি কতটুকু দিচ্ছি? একজন নারী উন্নয়নের পথরেখায় চললে সমতার জায়গাটি বিকশিত হয়। আমাদের সেই রোডম্যাপটা কোথায়? ডিজিটাল লিটারেসির জায়গায় নারী অনেক পিছিয়ে। আমার নারী উদ্যোক্তা প্রায় সাত হাজার। কিন্তু আমরা যখন ইমেইল পাঠাই তখন দেখা যায় ৫০০-৭০০ জন ইমেইল পাঠাতে পারে, বাকিরা এসএমএস পাঠায়। এতে বিরাট খরচও হয়। তারা কিন্তু অনেক তথ্য পাঠাতে পারে না। তথ্য যত বেশি পাবে তত বেশি সমতার জায়গায় বাংলাদেশ যাবে। নারীর সক্ষমতা বাড়বে। নারীরা কম্পিউটার ব্যবহার করতে চায় না, তাদের কনফিডেন্স নেই। কারণ সেভাবে তাদের কেউ মোটিভেট করেনি। তাদের ঠিকভাবে কেউ বোঝায়নি। কাউন্সেলিংটা খুবই প্রয়োজন। গ্রামের গরিব ঘরের একটি মেয়ে যখন এগিয়ে আসতে চাইবে তখন সে ডিজিটালাইজেশনের কী বুঝবে? একজন সক্ষম নারী বা গোষ্ঠী কিংবা সরকার যখন বোঝাবে তখন তারা দক্ষ হবে। আজ নারীরা গ্রামে গ্রামে পোলিও ভ্যাকসিন দিচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রচার-প্রসার হয়েছে। প্রচার-প্রসার দ্বারা নারীদের কনফিডেন্স লেবেল বাড়াতে হবে। সব পরিবার নারীদের এক রকম সহযোগিতা করে না। অথচ রাষ্ট্র বা সংবিধান কিন্তু সবাইকে সমান অধিকার দিয়েছে। পরিবার কিংবা সমাজ হয়তো সে সুযোগটা দেয় না। আমাদের সরকার, প্রধানমন্ত্রী নারীদের সফলতায় বিশ্বাসী। তাই আমাদের এ ক্ষেত্রটাকে প্রসারিত করতে হবে। প্রযুক্তিতে নারীদের অ্যাকসেস যত বাড়াতে পারব, তত আমরা এগিয়ে যাব। এখানে বুটিক উদ্যোক্তাদের কথা বলা যেতে পারে। তারা বলেন এখন আমাদের অনলাইন ব্যবসা অনেক বেড়ে গেছে। হাউজওয়াইফরা এখন অনলাইনে শপিং করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। এর সুবিধা উদ্যোক্তারা পাচ্ছেন অনলাইনে ব্যবসা করে। এখন এ জায়গাগুলোতে আমাদের সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও এটা লক্ষণীয়। ব্যাংকগুলোর আলাদা কমিটমেন্ট রয়েছে নারী উন্নয়নে। তারা কিন্তু আলাদা একটি গোষ্ঠী কাস্টমাইজড করছে, যারা কখনই তাদের কাস্টমার ছিল না। তৃণমূলের জায়গা থেকে ছোট ছোট মফস্বল শহর এখনো জেন্ডার সেনসিটিভ। পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের প্রত্যেকেরই অনেক বেশি কাজ করতে হবে। কভিডের এ সময়টিকে মোকাবেলা করার জন্য নারীদের তথ্যপ্রযুক্তিগত জ্ঞান বহুলাংশে বাড়াতে হবে। তাহলে নারী-পুরুষের অসমতার বিষয়টিকে এড়ানো সম্ভব হবে।


আরফান আলী

ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ব্যাংক এশিয়া

ড. তানিয়া হক যে প্রবন্ধ উপস্থাপন করলেন তাতে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে তা হলো, ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন, ডিজিটাল ব্যাংকিং, উইমেনস ইনডিপেন্সি ইত্যাদি। আমি কিছু তথ্য দিতে চাই, আমরা যে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রচলন করেছি তাতে ছয় লাখ কাস্টমার এখন সেবা নিচ্ছে। সেখানে ৬১ শতাংশ নারী ঋণ নিয়ে থাকেন। ন্যাশনাল অ্যাভারেজ ৩৫ শতাংশ, যেটা প্রবন্ধে উল্লেখ রয়েছে। পরিসংখ্যানে এজেন্ট ব্যাংকের সংখ্যাটা এগিয়ে। কাস্টমার বা এন্টারটেইনার যা-ই বলি, তাদের আমাদের ব্যাংকিং সিস্টেমের ভেতর আনার জন্য যে বিষয়গুলো আলোকপাত করা হয়েছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী যে শুধু ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাক্টিভিটি করেন তা না, তিনি কিন্তু ঘর-সংসারও সামাল দেন। আমি এ রকম এজেন্টও দেখেছি যে তিনি বলছেন টাকাটা জমা রাখেন, আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে, ভাত চুলায় রেখে এসেছি। এখানে বিষয় হচ্ছে, এই যে কাছাকাছি যাওয়া এবং তার যে সাংসারিক কাজকর্ম আছে সেটাকে সম্পাদন করা, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা মানুষের দোরগোড়ায় না পৌঁছানো পর্যন্ত সম্ভব ছিল না। আরেকটা বিষয় কাস্টমার সার্ভিসেস। সত্যিকার অর্থে ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা সেবা খুব বেশি কাস্টমাইজ করে না। তার কারণ যেভাবে আমরা সেবা দিতে চাই তার প্রয়োজনানুরূপ সাজানো ডিজিটাল ক্ষেত্রে অনেকাংশেই সম্ভব হয় না। ক্যাশলেস সোসাইটি তৈরির জন্য ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন জরুরি। আমরা এটা জানি যে জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশ ব্যাংকিং সেবার বাইরে। এ সেবার বাইরে থাকার অন্যতম কারণ হলো ডিফারেন্সিয়েশন। বিভিন্ন কারণে তারা ব্যাংকারদের মনোযোগ পায়নি। তার জন্য আনইকুয়াল পপুলেশন সৃষ্টি হয়েছে। খুব সম্প্রতি একটা ঘটনার কথা বলি। তিনদিন আগে ব্যাংকে ভাইভার জন্য লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রথম ২০ জনকে ডাকতে বললাম। আমি বললাম মেয়েদের আগে আসতে বলো। দেখলাম একজনের পর একজন মেয়েই আসছে। তখন প্রশ্ন করলাম এত মেয়ে? তখন আমাদের কর্মকর্তা জবাব দিল টপ-২০-এর ১২ জনই মেয়ে। এটা হলো পরিবর্তন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন একটি বাড়ি একটি খামার পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছিল। সেখানে আমার সুযোগ হয়েছিল সেবা দিয়ে কাজ করার। সেখানে ৬০ শতাংশ নারী ও ৪০ শতাংশ পুরুষ এই সেবা নেবে। অর্থাত্ ৬০ জনের মধ্যে ৪০ জন মহিলা অবশ্যই থাকতে হবে এবং পুরুষ ২০ জন। মেয়েদের এই ক্ষমতায়ন তৈরি করে দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে ডিজিটাল ব্যাংকিংটা রোল আউট করতে পারলে ডিজিটাল ডিভাইড কমে যাবে। সামনের দিনে ভয়েস ব্যাংকিং আসছে, ফেশিয়াল রিকগনাইজিং সিস্টেম আসছে, ফিঙ্গারপ্রিন্ট আসছে, তখন কিন্তু এ ধরনের পার্থক্য থাকবে না। সে যতটুকু প্রিভিলেজ পাওয়ার উপযুক্ত ততটুকু পাবে। বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, প্রেগন্যান্সি ভাতা এগুলো কিন্তু এখন ব্যাপক হারে দেয়া হচ্ছে এবং ১ কোটি ৪ লাখ বেনিফিশিয়ারি আছে। এখানে বড় সুযোগ আছে ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনের। আরো একটি অর্গানাইজেশন আছে, আই সোস্যাল, তাদের সঙ্গে আমরা কাজ করছি ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানোর জন্য। মেয়েরা এখনো ওপেন আপ হয়নি। তার কারণ তাদের কনফিডেন্স লেভেল সেভাবে বাড়েনি। ব্যাংকারদের অধিকাংশই কিন্তু পুরুষ। ফলে মেয়েরা তাদের গল্পগুলো অকপটে বলতে পারে না, যার জন্য তারা আর্থিক বিষয়টিও ডিসক্লোজড করতে চায় না। এখন যখন মেয়েদের সংখ্যা বাড়বে ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে, অটোমেটিক্যালি সেই সেবাটা হাউজওয়াইফ উইমেনদের কাছে পৌঁছে যাবে। আমরা সাড়ে ছয়শ পোস্ট অফিসে ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছি। সাড়ে আট হাজার পোস্ট অফিসে ব্যাংকিং সেবা নিয়ে যাব তিন বছরের মধ্যে ইনশাআল্লাহ। ২০২৪ সালের মধ্যে সবার জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব হবে। তখন আর আলাদা করে ছেলে-মেয়ে বাছাই করার প্রয়োজন পড়বে না।


রুবানা হক

প্রেসিডেন্ট

বিজিএমইএ

আমি মূলত দুটো পয়েন্ট বলব। কভিডের সময় আমরা আমাদের ফ্যাক্টরিগুলোতে একটা সার্ভে করেছিলাম। মোটামুটিভাবে ১ হাজার ৪৬৩টি কারখানা রেজিস্টার করছিল। সব কারখানার মধ্যে ৭৫২টি ফ্যাক্টরি সার্ভে করেছিলাম। দেখা গেল সেখানে ওয়ার্কারের সংখ্যা ১১ লাখ ৩৪২। তার মধ্যে মাত্র ৭ লাখ ১০ হাজার ৪৭১ জনের এনআইডি ছিল। ৪ লাখ ৭২ হাজার ২৭৩ জনের মধ্যে ৪৩ শতাংশ ওয়ার্কারের অ্যাকাউন্ট ছিল এমএফএসে। সাধারণত ৬৭ ভাগ ফ্যাক্টরি ক্যাশে বেতন দিচ্ছিল এবং এনএইচও দিচ্ছিল মাত্র ৫ শতাংশ এবং বাকি ২৩ শতাংশ হাইব্রিড। এই হলো অবস্থা। কিন্তু যখন প্রধানমন্ত্রী আমাদের বললেন এটা ডিজিটালাইজেশন হতেই হবে, বেতন ডিরেক্টলি ওয়ার্কারের কাছে যেতে হবে। তখন আমি চাপে পড়লাম। কেননা সবাই বলতে থাকল এখানে কোনো না কোনো গণ্ডগোল হবেই। তখন আমরা বড় ঝুঁকি নিয়েই চেষ্টা করেছিলাম অন্ততপক্ষে ডিজিটাল পেমেন্টটা ঠিকমতো হয়। আলহামদুলিল্লাহ, বিকাশ, রকেট, নগদ সবাই ছিল আমাদের সঙ্গে এবং আমরা দিন-রাত এক করে কাজটা শেষ করে ফেলেছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো যে মুহূর্তে লকডাউনের সময়টা শেষ হয়ে গেল তখন আবার আগের জায়গাতেই তারা ফেরত চলে গেছে। ব্যাপারটা এমন যে আমাদের ঘুরে দাঁড়াতেও সময় লাগে না, পিছিয়ে যেতেও সময় লাগে না। মাননীয় মন্ত্রীর কাছে একটা নালিশ না করে পারছি না, আমরা ডিজিটাল ওয়ালেট, ছোট্ট একটা পাইলট করেছিলাম এবং আমরা বাংলাদেশ ব্যাংককে বলেছিলাম আমাদের অন্তত একটা  লাইসেন্স দেন, আমাদের না দিলেও যাকে ইচ্ছা দেন, তাও হয়ে যাক, সেটা হয়নি। আমরা কিন্তু ছোট্ট পাইলটের মাধ্যমে প্রমাণ করে দিয়েছিলাম সোসাইটি ক্যাশলেস হওয়া সম্ভব। ওই ওয়ালেট থেকে সবাই কিন্তু টাকা রিসিভ করছিল, পাঠাচ্ছিল। এটি দিয়ে তারা বিলও গ্রহণ করতে পারতেন; চাল-ডালও কিনতে পারতেন। কিন্তু তা হয়নি। যা-ই হোক অত্যন্ত সুখের বিষয় বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আইসিটি মিনিস্ট্রি ডিজিটাল ট্রান্সপোর্ট প্রটোকল সাইন করেছে। এটা বাস্তবায়ন হলে ২০২১ সালের মধ্যে সবার দ্বারা ডিজিটাল পেমেন্ট অ্যাচিভ সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকসেসের কথা বলতে গেলে একটা কথা বলতেই হয় যে নারীরা করে বেশি পায় কম, যা রূঢ় বাস্তবতা। অনেককেই সহ্য করতে হয় এবং এটাও ঠিক যে ব্যাংকগুলো যদি একসঙ্গে অনেক সুবিধা দেয়, যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের একটা নিয়ম আছে যে শতকরা ১০ ভাগ লোন নিম্নবিত্ত নারীদের দিতে হবে, আল্টিমেটলি তা আদৌ আলোর মুখ দেখছে না। এক্ষেত্রে একটা ন্যাশনাল ক্রেডিট পোর্টাল যদি শুধু নারীদের জন্য করা যায়, তাহলে ভালো ফল মিলতে পারে। মাননীয় মন্ত্রী একটু চিন্তা করে দেখবেন এটা সম্ভব নাকি। শুধু নারীদের জন্য যদি অনলাইন ন্যাশনাল ক্রেডিট পোর্টাল হয়, তাহলে মেয়েরা অন্ততপক্ষে প্রযুক্তি অ্যাকসেস ফাইন্যান্স পাবে। আমার তরফ থেকে বেশি কিছু বলার নেই, শুধু এটুকুই যে আমরা পাশে আছি। আমরা আবার যেন এমএফএসে ফেরত যেতে পারি, তার জন্য কাজ করতে হবে। এর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যদি একটু ইনসেনটিভ দেয়া যায়, তাহলে ভালো হয়। ভারত কিন্তু প্রচুর উত্সাহ দিচ্ছে ক্যাশলেস ব্যবস্থা এগিয়ে নিতে। আমরাও চাই আমাদের শ্রমিকরা ক্যাশলেস সুবিধা পাক। সবশেষে বলতে চাই, আমাদের সংস্থা থেকে আমরা পুরোটাই দিতে প্রস্তুত তথ্য-ডাটাবেজ প্রভৃতি। সবার সমান সহযোগিতা কামনা করছি।


কামাল কাদীর

সিইও, বিকাশ

এখানে ডিজিটালাইজেশনের যে সীমাবদ্ধতাগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলোকে যদি সঠিক একটা ডিজাইনের মধ্যে ফেলা যায়, তাহলে কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সুবিধা পাওয়া সম্ভব। আমি একটা সুস্পষ্ট উদাহরণ দিয়ে বলি, এমএফএস যখন শুরু করি তখন মেয়েদের অংশগ্রহণ ছিল বেশি। তার পরও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল এবং এক্ষেত্রে একটা চ্যালেঞ্জ আমরা বারবার দেখছিলাম যে নারীদের রেজিস্ট্রেশন করাতে গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএফআই (বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স) ইউনিটের একটা অত্যাবশ্যকীয় ডকুমেন্ট প্রত্যেকেরই একটা কেওয়াইসি করতে হবে। এটা করতে গিয়ে দেখা গেল, এজেন্ট পয়েন্টে নারীরা তথ্য দিতে রাজি হচ্ছে না, নিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকছে। অনেক প্রাইভেসির ব্যাপার আছে এবং তারা তথ্য দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিল না। এটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বিএফআইকে জানানো হলো এবং এখান থেকে বেরিয়ে আসতে কী কী প্রযুক্তি আছে সেটা তুলে ধরা হলো। সমাধান হিসেবে ডিজিটাল কেওয়াইসি করা হলো। সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্রের কোনো ফটোকপি অথবা কোনো ছবি দিতে হচ্ছে না। স্মার্টফোন থাকলে খুবই ভালো কথা, স্মার্টফোন না থাকলেও দেশে ৬০ হাজার কেওয়াইসি সেন্টার আছে বিভিন্ন সংস্থার। সেখানে গিয়ে একজন নারী কিন্তু এমএফএস অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছে। 

ন্যাশনাল ডেটাবেজের সঙ্গে ক্রস ম্যাচ করে ১ মিনিটের মধ্যেই নারী বা পুরুষ এমএফএস অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছে। নারীরা বা ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বার দিতে চাচ্ছে না, ন্যাশনাল আইডি নাম্বার দিতে চাচ্ছে না বা তার ছবি দিতে চাচ্ছে না। এ সবকিছুই কিন্তু রাখা হচ্ছে; তবে সেক্ষেত্রে কোনো এজেন্টের কাছে ছবি বা ফটোকপি দিতে হচ্ছে না। এটাকে অ্যাভয়েড করার ফলে নারীদের পার্টিসিপেশন রাতারাতি বেড়ে গেল। দেশের মধ্যে কিন্তু বেশকিছু সম্পদ আছে, টেলিফোন কোম্পানির নেটওয়ার্ক আছে, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ লোকের কাছে স্মার্টফোন আছে। যদি প্রোপারলি ডিজাইন করা যায়, তাহলে আমাদের যে সম্পদ আছে তার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান সম্ভব। উদাহরণ দিয়ে বলছি, গত ১০ বছরে নারীদের অনেক উন্নতি হয়েছে। বিকাশে আজকে প্রায় ৫১ মিলিয়ন গ্রাহক ছাড়িয়েছে, যারা সেন্ট্রাল ব্যাংকের ফর্ম পূরণ করে ভেরিফায়েড কাস্টমার হয়েছেন, তার মধ্যে কিন্তু ৪৬ শতাংশ নারী। পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকেই এটা একটা   পজিটিভ নাম্বার।


শাহীন আনাম

নির্বাহী পরিচালক

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

আজকে এখানে যারা উপস্থিত তারা কমবেশি সবাই আমার পরিচিত এবং আমার থেকেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ। আমার খুব বেশি কিছু বলার নেই। আমি বলতে চাই, পুরো সিস্টেমকেই ব্যাংকিংয়ের সাথে সংযুক্ত করা দরকার। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে দেখতে হবে যে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কেমন। নারীর প্রতি সমাজের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। নারীরা কী করতে পারে আর কী করতে পারে না সেটা কিন্তু ছোটবেলা থেকেই নির্ধারণ করা হয়। ওই মাইন্ডসেট থেকে চলে আসে প্রযুক্তি নারীদের জন্য না! সে কারণেই অনেক অ্যাকসেস থেকে তারা বঞ্চিত হয়। উদাহরণ দিই, আমরা একটা প্রকল্প নিলাম ৩৫ হাজার নারীকে ক্যাশ ট্রান্সফার করব। ক্যাশ ট্রান্সফার যখন করেছি তখন আমাদের ইচ্ছা ছিল পুরোটাই ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে করব, কারণ এটাই নিরাপদ। কিন্তু এটি করতে গিয়ে আমাদের অনেক সমস্যা হলো। অনেক নারীর নিজের আইডি ছিল না, নিজের ফোন ছিল না, ফ্যামিলি ফোন ছিল এবং তারা নট ফিলিং সেফ। বেশির ভাগ আমাদের বলেছিল না, আমাদের দরকার নেই। আমরা এসে ক্যাশ নেব। আমি এটা বলছি না যে আমরা উন্নতি করিনি। রুবানা হকের কথায় বলতে চাইছি ফরমাল সেক্টরে যে নারীরা কাজ করেন তারা কিন্তু একটা লেভেল অব এম্পাওয়ারমেন্ট পেয়ে গেছেন। তারা ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুড হয়েছেন। কিন্তু যারা আনপেইড কেয়ারওয়ার্কার, ছোট ছোট উদ্যোক্তা, যারা গ্রামে হাঁস-মুরগি লালন-পালন বা সবজি বাগান করেন তাদের কী অবস্থা, তারা কতটা ক্ষমতায়নে আছেন। তাদের যদি আমরা উপেক্ষা করে শুধু আনুষ্ঠানিক খাতের নারীদের কথা ভাবি, তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন হবে না। সেলিমা আহমাদ যেটা বললেন, ছোট ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিয়ে ভাবতে হবে। এখানে বলে রাখি যে ৪৪টি মন্ত্রণালয় জেন্ডার রিসেপ্টিভ বাজেট প্রত্যেক বছর বরাদ্দ করছে। যারা আনপেইড, যারা কখনো বাইরে বেরিয়ে কাজ করবে না, তারা কেয়ার ইকোনমিতে ও রুরাল ইকোনমিতে অবদান রাখছে। কিন্তু তাদের কীভাবে আমরা প্রযুক্তির মাধ্যমে আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্ত করাতে পারি, তার ব্যবস্থা করতে হবে। আমি মনে করি এটা প্রয়োজন। কিন্তু তাদের নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনাই করা হচ্ছে না। নারীদের বাড়িতে সম্মান করতে হবে। সম্মান করার অর্থটা আসলে কী? তাদের গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের ওপর আস্থা রাখতে হবে যে তারা পারবে। এ ধারণা বাস্তবায়ন করতে হবে যে তারা কন্ট্রিবিউট করতে পারে আবার চেঞ্জ মেকারও হতে পারে। ড. তানিয়ার কথানুযায়ী, নারীরা তো হোমোজেনাস গ্রুপ না, তাই বিভিন্ন স্তরে তাদের স্থান বিভিন্ন রকম, সম্পদে তাদের অধিকার খুবই কম, তারা সম্পদ পান না। ক্ষমতায়ন কম। ডিজিটাল বাংলাদেশে আমরা অনেক দূর পর্যন্ত চলে এসেছি। কিন্তু যে গ্যাপগুলো আমরা দেখতে পাচ্ছি তা কীভাবে পূরণ করা যায় সেটা সিরিয়াসলি আলোচনা করতে হবে। পরিশেষে বলি আমাদের আরেকটি ক্যাম্পেইন হলো, আনপেইড কেয়ার ওয়ার্কারদের স্বীকৃতি। তাদের কাজকে জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদের কাজের মূল্যকে আর্থিকভাবে হিসাব করতে হবে। তাহলেই তাদের কাজের মূল্যায়ন হবে এবং মূল্য নির্ধারিত হলেই তাদের জন্য বিভিন্ন অপশন চিন্তা করা সহজ হবে—সেটা ক্যাপাসিটি বিল্ডিং হোক বা অ্যাকসেস টু ব্যাংকিং হোক।


ফাহমিদা খাতুন

নির্বাহী পরিচালক 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

এখানে একটি কথাই আলোচিত হচ্ছে যেটা সবসময়ই হয়ে থাকে ও মেয়েদের আর্থিক অগ্রগতির সুপারিশমালায় উল্লেখ আছে যে মেয়েদের অবশ্যই আর্থিক শিক্ষা দিতে হবে। তবে এটা ভুললেও চলবে না, বেশির ভাগ নারী কিন্তু তাদের পরিবারের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার। তারা কিন্তু আয়, ব্যয়, সঞ্চয় সবকিছুরই ব্যবস্থাপনা করে। সুতরাং ঘরের মধ্যে থেকে তারা শিক্ষিত বা অশিক্ষিত হয়েও আয় উপার্জনকারীদের মতো আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বেশ পারদর্শী। তাই আমি স্বীকার করি না যে তারা অজ্ঞ। তবে এ কথা সত্য, তারা ক্ষমতায়নের স্বীকৃতি পাচ্ছে না। আর ঘরের বাইরেও নারীদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা অনেক ভালো। পাঁচ দশক হতে ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে নারীরা যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসা করছেন, তার অধিকাংশই সফল। তারা স্বল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত হতে পারে, তবে তারা সুন্দরভাবেই আর্থিক ব্যবস্থাপনা করে ব্যবসা বাড়িয়ে নিয়েছেন। তাদের পরিবারের হাল ধরেছেন। এখন কীভাবে আমরা তাদের দক্ষতা বাড়াব এবং সমতাভিত্তিক জনগোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত করব, তার জন্য দুটি বিষয় ভাবতে হবে। একটি হলো প্রযুক্তিগত শিক্ষা, আরেকটি হলো আর্থিক সেবা। এই দুটো ক্ষেত্রে নারীরা এখনো পিছিয়ে আছে। আরেকটি বিষয় হলো নারীর শিক্ষার বিস্তারও জরুরি। সাধারণ শিক্ষার সাথে প্রযুক্তিগত শিক্ষাটাও খুব প্রয়োজন। আমরা এখন কভিড সময়ে বিরাজ করছি; তাই কভিডের এই রিকভারি সময়ে অর্থনৈতিক রিবাউন্ডের কথা যখন বলছি তখন অর্থনৈতিক ডিস্ট্রেসড সৃষ্টি হয়েছে সারা পৃথিবীতে। নারীর ক্ষমতায়ন যতটা ছিল সেটাও অনেকখানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষাক্ষেত্র থেকে মেয়ে শিশুদের ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। অনেকের বাবা-মা তাদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। আর্থিক সংকটে পড়ে মেয়েদের ঘরে বসিয়ে রাখতে চাইছেন না। আবার অনেকেই প্রযুক্তির অভাবে প্রযুক্তিগত শিক্ষাও গ্রহণ করতে না পেরে ঝরে যাচ্ছে। সুতরাং যখন রিকভার করব তখন এই নারীদের এমনভাবে শিক্ষিত করতে হবে যেন তারা প্রযুক্তিগত শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। পরবর্তী সময়ে আমাদের যখন নতুন কর্মজগত্ সৃষ্টি হবে তখন প্রযুক্তিভিত্তিক জগত্ তৈরি হবে, সেখানে নারীদের অন্তর্ভুক্তির জন্যই প্রযুক্তিগত শিক্ষার বিকল্প নেই। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এরই মধ্যে দেখিয়েছে যে গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্সে ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২০ সালে অনেক দেশ পিছিয়ে গেছে। সেখানে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৪৮তম আর ২০২০-এ তা ৫০তম। অন্যান্য অনেক দেশও পিছিয়েছে। জেন্ডার গ্যাপ যেটাকে আমরা পূরণ করে ক্রমান্বয়ে এগোচ্ছিলাম কভিডের কারণে সেখানেও পিছিয়ে যাচ্ছি। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আগামী পরিকল্পনাগুলো সাজাতে হবে। এখানে আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নর্মসের কথা বলা হয়েছে, যা সবকিছুর বাইরে একটি সিস্টেমেটিক বর্ডার লাইন। ব্যাংকিং সেবাটা এখনো সাধারণ মানুষের জন্য উন্নত হয়নি, যাতায়াত ব্যবস্থা অনুন্নত। গ্রামের দিকে ব্যাংকে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। 

সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য সেবা, প্রযুক্তি কিংবা প্রযুক্তির বাইরে তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি। যেসব নারী ব্যবসা বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তারা কিন্তু ব্যাংকের সুযোগ-সুবিধা নিতে পারছে না, তারা তাদের ব্যবসার মধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে জড়িত, তাদের অনেকের ট্রেড লাইসেন্স নেই, তাদের অনেকের ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার নেই। সুতরাং তারা যখন ব্যাংকে যায়, তখন এসব কাগজপত্র দিতে পারে না। ফলে অনেক সুযোগ থাকার পরও নারীরা সেগুলো নিতে পারছে না। সবশেষে বলতে চাই কভিডের সময় যে আর্থিক ভাতাগুলো নারীদের দেয়া হচ্ছে বা হবে তা যদি ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেয়া হয়, তাহলে কিন্তু তার বিনষ্ট হওয়া বা দুর্নীতির সুযোগগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। কারো হাতে যদি ৫০০ টাকা পৌঁছার কথা থাকে তাহলে সেটাই পৌঁছবে। ক্ষমতায়ন এবং প্রযুক্তি দুটিকে সমন্বয় করতে পারলে নারীরা এগিয়ে যেতে পারবে।


খন্দকার সাখাওয়াত আলী

ইমেরিটাস ফেলো

উন্নয়ন সমুন্নয়

খুব সুনির্দিষ্টভাবে আমি কিছু কথা বলব। টিম মেম্বার হিসেবে বিআইডিএসের সাথে আমার এমএফএস-বিষয়ক গবেষণা করার সুযোগ হয়েছিল। গবেষণার বিষয় ছিল, ‘ইমপ্যাক্ট অব মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ইন বাংলাদেশ-আ কেস স্টাডি অব বিকাশ’। এ গবেষণায় বিকাশকে কেস স্টাডি হিসেবে দেখা হয়েছে, যদিও গবেষণাটি ছিল সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের এমএফএস খাতের ওপর। আমরা গবেষণাটি যখন করি তখনো ‘নগদ’ বাজারে আসেনি। নগদ ছাড়া এ গবেষণায় সব মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। 

এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক, আমাদের আর্থিক খাতে নারীর অংশগ্রহণের দিকগুলো দেখতে হবে সত্যিকার অর্থে তৃণমূল পর্যায়ের বাস্তবতা থেকে। ডেভেলপমেন্ট সোসিওলজিস্ট হিসেবে ২৫ বছরের অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে আমি যদি ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্সিং দেখি, তবে তিনটি প্রজন্মের উপস্থিতি দেখতে পাই। প্রথমত, মাইক্রোফাইন্যান্স। দ্বিতীয়ত, এমএফএস এবং তৃতীয়ত, এজেন্ট ব্যাংকিং। 

বিআইডিএসের রিপোর্টে আর্থিক খাতে গ্রামীণ নারীদের অংশগ্রহণের দিকটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে। এ গবেষণায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সর্বোচ্চ হার আমরা নারীর মধ্যেই দেখি, অর্থাত্ ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ, যেখানে পুরুষরা ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এই হিসাবে ১৫-ঊর্ধ্ব নারীরাই অন্তর্ভুক্ত। এই নারী প্রোফাইলটার বড় অংশ ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবহারকারী। এরা আবার সরকারের সোস্যাল সেফটির আওতায় প্রধানত বাচ্চাদের বৃত্তির টাকাও পাচ্ছে। এছাড়া পরিবারগুলোতে প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্সের একটি অংশ আসছে এমএফএসের মাধ্যমে। 

এ সমীক্ষায় গ্রামীণ এমএফএস খাতের গ্রাহকদের খরচের বৈশিষ্ট্য ও আচরণের দিকটি উঠে এসেছে। গ্রামাঞ্চলে এমএফএসের মাধ্যমে গ্রাহকরা যে পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করে, তার একটি বড় অংশ খাবার খরচের জন্য ব্যবহার করে। আর নারীদের হাত দিয়েই এর বড় অংশটা খরচ হয়। আমি ড. ফাহমিদার সঙ্গে একমত যে নারীরাই আমাদের পরিবারের ভালো ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজার। সমীক্ষার ফলাফল অনুসারে, শতকরা ৬৮ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় খাবারের জন্য। খাবারের পর তারা রেমিট্যান্স ব্যবহার করে শিক্ষার জন্য, তারপর স্বাস্থ্য খাতে। সমীক্ষায় আরো দেখা যায়, এমএফএস খাতে গ্রহণকৃত অর্থের ৫৬ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থ নারীরা ব্যয় করছে। আর পুরুষরা করছে শতকরা ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ। সমীক্ষার পরিসংখ্যান থেকে বিষয়টি স্পষ্ট, আমাদের মা-বোনরা পারিবারিক পুষ্টির প্রতি প্রথম প্রাধান্য দেন। 

সমীক্ষার তথ্য ও বিশ্লেষণ থেকে আমাদের মা-বোনদের মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রতি স্বাভাবিক চেহারা বেরিয়ে আসছে। এ সমীক্ষা থেকে নারী ক্ষমতায়ন-বিষয়ক কিছু পরিসংখ্যান সামনে আনার সুযোগ নিতে চাই। প্রথমত, সামাজিক গতিশীলতার বিচারে যদি বিকাশের গ্রাহক কিংবা নন-বিকাশ বা নন-এমএফএস গ্রাহকদের মধ্যে আমরা পার্থক্য করি, তবে দেখা যাচ্ছে প্রায় ৩৫ শতাংশের বেশি গ্রাহক বাড়ির বাইরের বিভিন্ন কাজের সাথে যুক্ত। এদের মধ্যে ৩০ শতাংশ নারী পরিবারের আর্থিক ব্যয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাথে যুক্ত। বিকাশের গ্রাহকদের শতকরা ৪১ ভাগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত। 

সামাজিক সুরক্ষা খাতের সরকারি ভাতাগুলোর উপকারভোগীদের একটি বড় অংশ নারী। আমাদের প্রধানমন্ত্রী দরিদ্র ও নারীবান্ধব। কাজেই প্রযুক্তিকে নারীবান্ধব করতে হবে।


কেএএম মোর্শেদ

সিনিয়র ডিরেক্টর

ব্র্যাক

আমি প্রথমে দুই মিনিট সময় নিচ্ছি যে প্রবন্ধটা উপস্থাপিত হলো তার জন্য। প্রবন্ধে স্পষ্টভাবে যে দুটো বিষয়কে আলাদা করার চেষ্টা করা হয়েছে যেটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে যে অর্থনীতির অন্তর্ভুক্তির প্রথম অবস্থা আসলে নন টেকনিক্যাল। আমার টাকাই নেই, আমার টাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই, আমার বাজারে প্রবেশাধিকার নেই, তাহলে আমার তো ‘অর্থই’ নেই। শুধু অন্তর্ভুক্তি দিয়ে আমার লাভ কী। এটা হচ্ছে প্রথম সমস্যা। আমাদের জেন্ডার ন্যারেটিভে এখনো কর্মজীবী নারীদের শুনতে হয় আপনি কাজ করতে এসেছেন কেন? আপনার তো কাজের দরকার নেই। আপনার বাসায় তো সবই আছে। খামাখাই এসেছেন। আমাদের মানসিকতা বলে যে একটা মেয়ের আসলে অনেক টাকার দরকার নেই। তার আসলে নিজের বলে কিছু দরকার নেই। তাকে যে টাকা দেয়া হবে তা দিয়ে সে ছেলেমেয়ের খাবারের ব্যবস্থা করবে, পড়ালেখার ব্যবস্থা করবে। এটি হলো তার খরচের বিষয়। তারপর হচ্ছে তার অ্যাকসেস টু মার্কেট। অ্যাকসেস টু মার্কেটে আমরা এখনো গ্রামের প্রধান বাজারে যে অ্যাকসেসটা দেখি, নন-ডিজিটাল ফর্ম যেটা দেখি এখানে যারা ক্ষুদ্র শিল্প, কুটির শিল্পে জড়িত আছেন তারা তাদের কাঁচামাল কোনো ছেলের মাধ্যমে আনান। কারণ তার বাজারে যাওয়ার অধিকার নেই। আবার বিক্রিও করেন একজন ছেলের মাধ্যমে, কারণ তার বাজারে যাওয়ার অধিকার নেই। দুই জায়গাতেই ঠকেন। এটা যদি চলতে থাকে তাহলে এজেন্ট ব্যাংক বলি, এমএফএস বলি তা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ এ ব্যাপারটা নন টেকনিক্যাল। যারা শহরে থাকে তাদের সাথে গ্রামের লোকদের পার্থক্য আছে। ফরমাল ও ইনফরমাল সেক্টরের মধ্যে পার্থক্য আছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার পার্থক্য আছে। সর্বোপরি নারী-পুরুষের জেনারেল একটা পার্থক্য অ্যাকসেসের ক্ষেত্রে আছে। এই কনটেক্সটে আমরা যদি কম্পিউটার বা প্রযুক্তির কথা বলি, কম্পিউটারের ব্যবহার কোথায়? মানে একটা কম্পিউটার কোন কোন সময়ে কোন কোন কাজ ভালো করতে পারে? একটা কম্পিউটার কী ভালো করতে পারে? কম্পিউটার ২৪ ঘণ্টা চলতে পারে। তার মানে হচ্ছে কম্পিউটার মানুষের লাইফ স্টাইলের সাথে ম্যাচ করতে পারে। ছেলেদের অফিস আওয়ার সকাল থেকে শুরু হয়ে বিকালে শেষ হয়। কিন্তু নারীদের ফ্রি সময়টা আবার অন্য। তা হচ্ছে সন্ধ্যার সময়। সেই সময়টাতে অফিস বন্ধ। যদি আমি কম্পিউটার অ্যাকসেস করতে পারি তাহলে সারাক্ষণের জন্যই আমার অফিস খোলা থাকবে। যে সময়টা একটা নারীর দরকার হয় সে সময়টায় অফিস খোলা থাকবে। এখানে সুবিধা হচ্ছে সবার জন্য একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড খোলা থাকে। পুরুষরা যেহেতু অনেক বাধার দেয়াল তৈরি করে রাখে। যেমন নারী কোথাও যেতে পারে না বা নিজের কথা শেয়ার করতে পারে না, সেক্ষেত্রে তারা কম্পিউটারের সাথে শেয়ার করতে পারে। কম্পিউটার যেহেতু নারীও না, পুরুষও না, জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন করতে পারে না। তাই তার সাথে এই শেয়ারিংটা সোজা। এটা কম্পিউটারের একটা জেনারেল সুবিধা। কম্পিউটার ডিসক্রিমিনেশন করতে পারে না, কম্পিউটার ছেলেকে এক রকম মেয়েকে এক রকম সার্ভিস দিতে পারে না। কম্পিউটার যদি আমরা ব্যবহার করি, তাহলে প্রযুক্তি আমাদের এই সমস্যার সমাধান দিতে পারে। বাসা থেকে ব্যাংকে যাওয়া বা বাসা থেকে বাজারে যাওয়ার প্রশ্ন নেই। তাই নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে এটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে। এতে এখন যে ডিসক্রিমিনেশনটা হয় তা আর হবে না। করোনার মধ্যে যারা ফেসবুকে ব্যবসা করেছেন তাদের তেমন সমস্যা হয়নি। টেকনোলজির ওপর সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। এখানে মোবাইলের দাম একটা ইস্যু। মেয়েদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে টেকনোলজির দাম নিয়ে আসা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নারীদের কাছে যদি টেকনোলজি পৌঁছে দেয়া যায়, তাহলে বাকি কাজটুকু তারাই সমাধান করতে পারবেন।


মো. হুমায়ুন কবির

নির্বাহী পরিচালক

বাংলাদেশ ব্যাংক

কভিড পরিস্থিতিতে পৃথিবীর অন্যান্য যেকোনো ইকোনমির তুলনায় আমাদের সক্ষমতা ও সমস্যাগুলোকে সামনে রেখে যেভাবে সরকারের পরিকল্পনা, তারপর ইমপ্লিমেন্টারি এজেন্সিগুলোর অ্যাক্টিভিটিজ, এর ভেতরে সেন্ট্রাল ব্যাংক, ব্যাংক, এমএফএস, বিজনেস হাউজ, বিজনেস লিডারস সবাই মিলে পরিস্থিতিকে সামলাতে পেরেছি। এজন্য মহান স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। সরকারের পলিসির জন্য সরকারের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। আমাদের সামর্থ্য ও সক্ষমতার নিরিখে সমস্যা অনেক; কিন্তু ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়ে আমরা এগুলো সামাল দিতে পেরেছি। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনে নারী কীভাবে নিজেকে এগিয়ে নিতে পারে, তা-ই এখন বিবেচ্য বিষয়। মোর্শেদ ভাই যে কথাগুলো বলেছেন তিনি আসলে চুম্বক কথাগুলো বলেছেন বলে আমার মনে হচ্ছে। এখানে মূল সমস্যা শুধু প্রযুক্তি নয়, এখানে নারীর যে অর্থনৈতিক শক্তিমত্তা, নারীর যে অ্যাকসেস টু মার্কেট, তার যে সামাজিক অবস্থান, এটাই বড় ইস্যু। সেই ইস্যুগুলো সমাধানে অনেক জায়গাতেই প্রযুক্তি আমাদের হেল্প করেছে। বাসায় বসে নারী তার পণ্য বাজারজাত করতে পারছে। বাসায় বসেই সে তার ফাইন্যান্সিয়াল লেনদেনগুলো অনেকাংশে হ্যান্ডল করতে পারছে। এই জায়গায় প্রযুক্তিগত ইনস্ট্রুমেন্টকে তাদের জন্য যদি সহজলভ্য করা যায়, আরো কম দামে তার কাছে পৌঁছানো যায়, এটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাকে আরো বেশি অভ্যস্ত করে তোলা যায়, তাহলে প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা এ পর্যন্ত যে সুবিধাগুলো তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পেরেছি সেটাকে আরো এগিয়ে নিতে পারব। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিষয়ে কয়েকটি পরামর্শ এসেছে। তার মধ্যে একটি পরামর্শের ব্যাপারে আমি মনোযোগ আকর্ষণ করছি। যেটা সেলিনা আহমাদ, এমপি বলেছেন। তিনি বলেছেন নারীকে ব্যাংকিং সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা। আমাদের নিজস্ব চিন্তা ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডার ও থিংক ট্যাংক থেকে আমাদের কাছে যেসব বিষয় আসে, সেগুলো আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গ্রহণের চেষ্টা করি। এর মাধ্যমে আমরা এ পর্যন্ত যা অর্জন করেছি, এর বাইরে আরো যা যা নেয়ার সুযোগ আছে সেগুলো যদি কোনো কর্নার থেকে আমাদের কাছে পাঠানো হয়, আমরা সেগুলো নীতি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে গ্রহণের চেষ্টা করি সবসময়। এরপর রুবানা আপা বলেছেন। তিনি অবশ্য প্রশংসা করেছেন যে কভিড সিচুয়েশনের মধ্যে সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে বেতনের টাকা গার্মেন্টস কর্মীদের কাছে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে খুব অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক এমএফএস অ্যাকাউন্ট তৈরি করে তাদের ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের আওতায় এনে তাদের বেতনের টাকা তাদের হাতে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি। তার কথায় বেরিয়ে এসেছে এ অ্যাকাউন্টগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের আগের মতো আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে না। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে অনুরোধ করব, এ অ্যাকাউন্টগুলো তৈরি করতে আমাদের যথেষ্ট গলদ্ঘর্ম হতে হয়েছে। এটা একটা বড় অর্জন। এখন এ অর্জন ধরে রাখার ক্ষেত্রে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মালিকদের উদ্যোগী হতে হবে। কর্মীদের মোবাইল অ্যাকাউন্টে বেতনসহ সব ধরনের পাওনা পৌঁছে দেয়ার জন্য যেন তারা উদ্যোগ নেন। সেক্ষেত্রে এমএফএস, ব্যাংক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমাদের জন্য যদি কোনো পরামর্শ থাকে এবং তারা যদি তা আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়, তাহলে আমরা সহায়তা প্রদান ও সমাধানের চেষ্টা করব।


মোস্তাফা জব্বার

মন্ত্রী

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়

আমি এ আলোচনায় উপস্থিত থেকে সত্যিকারার্থে উপকৃত হয়েছি। কারণ এখানে বিপুল পরিমাণ তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে। যেভাবে সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়েছে সেটি অসাধারণ। আমাদের নারীদের সঙ্গে আর্থিক ব্যবস্থাপনার সম্পর্কগুলোকে সুন্দরভাবে এখানে তুলে ধরা হয়েছে। আমরা জানি, নারী-পুরুষ অথবা নারীদের অন্যান্য বিষয় নিয়ে যদি আলোচনা করতে চাই, তাহলে সেই ক্যানভাস এত বড় হবে যে ছোট পর্দায় এটার জায়গা হবে না। আমরা সীমিত পর্যায়েই যে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করছি সে আলোচনার জন্যই আমি বণিক বার্তা, পিআরআই ও আলোচক সবাইকে ধন্যবাদ দিতে চাই। আমার নিজের কাছে যেটি মনে হয়, আমি এখন যা দেখছি, সেটি বিস্ময়কর। আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছরে পা দিচ্ছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী পালন করছি। এর বেশির ভাগই শুধু কম্পিউটারের পর্দায় বা মোবাইলের পর্দায় চলছে। মাঠে থাকতে পারছি না। উল্লাস করতে পারছি না। আনন্দ করতে পারছি না। কিন্তু তাকে শ্রদ্ধার সাথে বুকের মধ্যে রেখে স্মরণ করছি। আমি শুধু প্রথমে এটুকু বলতে চাই, ৫০ বছর আগের বাংলাদেশ আর এখনকার বাংলাদেশ এক নয়। আমি হাওর এলাকার ছেলে। হাওর এলাকার একটু বর্ণনা দিতে চাই। আমার বাড়ি থেকে ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে ব্যাংক নামে কোনো প্রতিষ্ঠানই ছিল না। একই সাথে ৪০ কিমির ভেতরে কোনো হাইস্কুল ছিল না, যেখানে আমি ক্লাস সিক্সে পড়তে পারতাম। আর এখন যদি আপনি খোঁজ করেন তাহলে আমার বাজারের দোকানদার তো বটেই যে জেলে হাওরে মাছ ধরে তারও একাধিক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট পাবেন। প্রায় প্রত্যেক প্লাটফর্মেই বা অন্তত নগদে একটা অ্যাকাউন্ট আছেই। ঠিক এ রকম একটা রূপান্তর ৫০ বছরের ভেতরে আমরা দেখে যেতে পারব, তা আমি ২২ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সময়ও চিন্তা করিনি। প্রথমেই আমি এ অর্জনটুকুর প্রশংসা করি। এই অল্প সময়ে অগ্রগতির তিনটা স্টেজ রয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ’৭২-’৭৫ সালের মধ্যে ধ্বংসস্তূপ থেকে বাংলাদেশকে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। ’৯৬ থেকে ২০০১ আমাদের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে আবর্জনা পরিষ্কার করে একটা জায়গায় নিয়ে এসেছেন। আর ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা গতি লাভ করে। আমরা পৃথিবীর প্রথম জাতি যারা নিজেদের দেশের সাথে ডিজিটাল শব্দটা যোগ করেছিলাম। আপনারা সবাই বলেছেন যে এই ডিজিটাল শব্দ যোগ করার সুবিধা একটা লাঙল-জোয়ালের দেশ যে পেতে পারে এটা করোনা এসে মনে হয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে। আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি। তার সঙ্গে আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কারণ এত দূরদর্শী চিন্তাভাবনা করার ফলেই আজ আমাদের জীবন সচল আছে। নইলে আমাদের শুধু অচল না, স্রেফ বিচ্ছিন্ন একটা দেশ হিসেবে বসবাস করতে হতো। আমাদের জাতির পিতা মাত্র চারটা ব্যাংক পেয়েছিলেন যেগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত করতে হয়েছে। শিল্প-কলকারখানা নামে কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। সে রকম একটা দেশকে এ পর্যন্ত নিয়ে আসাটা কম নয়। বেসরকারি ব্যাংক ও সরকারি ব্যাংক মিলে একটি বিশাল কর্মকাণ্ডে পরিণত না হওয়ার আগ পর্যন্ত আসলে আমরা অনুভব করিনি যে আমরা কত বড় হয়েছি। আমরা এত বড় হয়েছি যে পৃথিবীতে এখন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে সম্ভবত দ্বিতীয় স্থান আমাদের। এমএফএসের মাধ্যমে আমরা প্রতিদিন যে পরিমাণ টাকা লেনদেন এমনিতেই করি সেটি অন্য যেকোনো দেশের কাছে আসলে চিন্তারও বাইরের বিষয়। সেটাও করেছি অল্প কিছুদিনের ভেতরে। এ জায়গার ক্ষেত্রে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সেটা হচ্ছে গ্রামের যে নারী তার পুত্র বা সন্তানের জন্য ভাতা পায় সে হয়তো নম্বরগুলো ঠিক চেনে না বা জানে না, কিন্তু অ্যাকাউন্ট থেকে টাকাটা তোলার মতো বা রিসিভ করার মতো জ্ঞান রাখে। আমাদের এই রূপান্তরটা বাংলাদেশ হিসেবে যদি বিবেচনা করেন তাহলে তা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি রূপান্তর। কারণ আমাদের ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসকে এ রকম অবস্থায় দেখতে পাব তা আমি চিন্তাও করতে পারিনি। আমার গ্রামে এখন তিন-চারটা এজেন্ট ব্যাংকিং আছে। তার মানে হচ্ছে বাংলাদেশের এই রূপান্তরে আমাদের ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের আজকের এই প্রবৃদ্ধির কথা বলেন বা আর যা-ই কিছু বলেন না কেন, তা হয়েছে এসব ইতিবাচক কারণের জন্য। আর দুটো বিষয় আমি উল্লেখ করতে চাই, প্রথমত, নারীদের অবস্থান, নারীদের ক্ষমতায়ন এবং নারীদের অংশগ্রহণ, নারীদের কর্মক্ষেত্র প্রভৃতি বিষয় কিন্তু অত্যন্ত জটিল এবং এগুলো ব্যাপকভাবে আলোচনার অধিকার রাখে। কী কারণে রাখে, আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়েছি তখন আমার একজন মেয়ে সহপাঠীও ছিল না। অর্থাত্ ১ শতাংশ মেয়েও আমার এলাকায় পড়ালেখা করেনি। ক্লাস ওয়ানে যে মেয়ে আমাদের সঙ্গে ছিল সে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে পড়েছে, তারপর তাকে বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। সেই বাংলাদেশ আর এখনকার বাংলাদেশের অনেক পার্থক্য। শ্রেণীকক্ষে ২০ জনের মধ্যে ১২ জনই মেয়ে। আমার কাছে এ রকম অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে যেখানে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা অনেক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক বেশি নারীভক্ত তার কারণটা হচ্ছে আমার জীবন গড়ে তুলেছে মা। আমি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করি তাকে, তিনি আমার আদর্শ। আমার সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছে আমার কন্যারা। একই সাথে আমি লক্ষ করেছি আমার কর্মক্ষেত্রে যেসব মেয়ে কাজ করছে তারা যদি একটু নিরাপত্তা পায় কাজ করার পরিবেশটা পায় তাহলে যা করতে পারে সেটি অন্য কারো কাছ থেকে আপনি আশাও করতে পারবেন না। সে কারণেই আমি মনে করি আমাদের এই রূপান্তরে বড় অবদান রেখেছে আমাদের মেয়েরা। আমাদের জেনারেশনে আমরা আসলে সেভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। আমরা কিন্তু আমাদের বাবা-মায়ের মতো ছিলাম না। আমাদের সময়ে এসে আমরা কিন্তু ছেলে-মেয়ে আলাদা করে দেখিনি। আমরা আলাদা করে দেখিনি বলেই কিন্তু তানিয়াদের জেনারেশনের জন্ম হয়েছে। নইলে কিন্তু তানিয়ারা হাঁড়ি ঠেলত এবং মাছ কুটা ছাড়া আর কোনো কাজ খুঁজে পেত না। আজকের বাংলাদেশে যে অবস্থা বিরাজ করছে এটা ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে যদি নেন তবে নেবেন, ১০ বছর পর বাংলাদেশের এ অবস্থাও থাকবে না। বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্র থেকে আরম্ভ করে সামগ্রিক ক্ষেত্র যদি আপনি উদ্যোক্তা হিসেবে দেখেন ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্র দেখেন অথবা শিক্ষার ক্ষেত্র দেখেন, জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র দেখেন, প্রযুক্তির ক্ষেত্র দেখেন, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে মেয়েরা পেছনে থাকবে না। সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবে। তাদের যে মেধা, তাদের যে সৃজনশীলতা, তাদের যে দক্ষতা, তাদের যে আন্তরিকতা সেই বিষয়টাকে একেবারে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ থেকেই বিবেচনা করতে হবে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজই আসলে পৃথিবীর সভ্যতার ভিত্তি। এ কারণেই আমি মনে করি যে আজকের আলোচনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সে কারণে আমি মাত্র দু-একটা বিষয় নিয়ে কথা বলব। ফাইন্যান্সিয়াল চেঞ্জেস অথবা ক্ষমতায়ন অথবা অন্য কোনো বিষয় এসব ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হচ্ছে একটা। সেটি হচ্ছে বানের জল কেউ বাঁধ দিয়ে ধরে রাখতে পারে না। আমাদের যে কন্যারা এখন ঘর থেকে বাইরে পা ফেলা শুরু করেছে, শিখে ফেলেছে, জেনে ফেলেছে তাদের আপনি শিকল দিয়ে বেঁধেও ঘরের ভেতর ঢোকাতে পারবেন না। সেই অবস্থাটা বাংলাদেশে এখন বিরাজ করে না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী মেয়েদের যেভাবে এগিয়ে দিচ্ছেন সেটি অসাধারণ। গার্মেন্টসে কাজ করা মেয়েটা থেকে আরম্ভ করে তানিয়ার মতো মেয়েরা কর্মক্ষেত্রে যে জায়গা তৈরি করছে, যে সুযোগ-সুবিধাগুলো প্রসারিত করার চেষ্টা করছে আমার কাছে মনে হয় এটা একটা বড় ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশের সামনের যাত্রায়। আমরা কিন্তু মনে রাখি প্রথম শিল্প বিপ্লব মিস করছি, স্টিম ইঞ্জিনের ধারেকাছেও ছিলাম না। আমরা বিদ্যুতের বিপ্লবে ছিলাম না। কিন্তু তৃতীয় শিল্প বিপ্লব যেটা ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেটের মাধ্যমে শুরু হয়েছে তাতে যোগ দিয়েছি। আমাদের নেত্রী ১৯৯৬ সালে এসে প্রথম বাংলাদেশে মোবাইল সার্ভিস দেয়া শুরু করলেন। আমরা ধীরে ধীরে যে মোবাইল কথা বলার জন্য ব্যবহূত হতো তাকে এখন ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বড় পার্ট হিসেবে দেখা শুরু করেছি। তার মানে আমাদের রূপান্তরের শুরুটা ওই জায়গায়। আমাদের ব্যাংকগুলো প্রথাগতভাবে পশ্চাত্ চিন্তা করে। আমি ইএফ ফান্ডের সাথে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলাম। তারা আপনার বাড়ির জন্য মূল্যায়ন করবে, আপনার মেধার জন্য মূল্যায়ন করবে না। কেউ জমি বন্ধক রাখলে তাকে ঋণ দেবে। কিন্তু আমার মেধা সম্পদের মূল্য যে কোটি কোটি টাকা সেই কোটি টাকাকে তারা একটি পয়সাও গণ্য করে না। এই মানসিক পরিবর্তনটা এখনো আমাদের ব্যাংকারদের হয়নি। কারণ তারা প্রথাসিদ্ধ ব্যাংকিং করেছে। তার মধ্য থেকেও নীতিগত এবং সমগ্র দিকে আমূল পরিবর্তন এসেছে। হয়তো অনেক ত্রুটি এখনো রয়ে গেছে, কিন্তু এ ত্রুটিগুলোর মাঝখান থেকেও যেটুকু পরিমাণ পরিবর্তন বাংলাদেশ ব্যাংক করেছে আমি মনে করি যে এটা বাংলাদেশের মতো একটি দেশে দুঃসাহসিক কাজ। তারা এ রকম দুঃসাহসী কাজগুলো আরো করবে এটি আমার বিশ্বাস। ড. তানিয়া সুন্দর করে একটা প্রেজেন্টেশন দিয়েছে। এত অল্প কথায় এতগুলো ইস্যু আসলে তুলে ধরতে পারা সত্যই প্রশংসার দাবি রাখে। মোবাইল ইন্টার অপারেটবিলিটি নামের একটি চুক্তি আমাদের আইসিটি ডিভিশনের সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের হয়েছে বলে শুনছি। এ কাজটা চ্যালেঞ্জিং। কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা গেলে একটা ফ্ল্যাট গেট খুলে যাবে। বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি আমূল পরিবর্তন ঘটবে। আমি আমার নগদের টাকা বিকাশে পাঠাতে পারব। বিকাশের টাকা শিওরক্যাশে পাঠাতে পারব।

আপনারা গ্রাহককে তথ্যগুলো দিচ্ছেন ইংরেজিতে। কিন্তু দেশের ৩ শতাংশের বেশি লোক ইংরেজি বোঝে না। সেই দেশে ১০০ শতাংশ ইংরেজিতে মেসেজ পাঠানো কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। গার্মেন্টসের নারীরা ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাংকিং সার্ভিসে ঢুকবে অথবা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে কিংবা ব্যাংকে ঢুকবে তার কাছে মেসেজ পাঠানো হয় ইংরেজিতে। আমি গভর্নর সাহেবের সঙ্গে কমপক্ষে ১০ বার কথা বলেছি। বাংলায় এসএমএস পাঠানোর জন্য ৫০ শতাংশ চার্জ কমিয়ে দিয়েছি। আমরা আশা করি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হুমায়ুন কবির সাহেব একটু মাথায় রাখবেন যে আপনার দেশের ৯৬ শতাংশ মানুষ যে ভাষা বোঝে না সেই ভাষায় আপনি যদি মেসেজ দেন সেই মেসেজের কোনো মূল্য থাকে না। আমি মনে করি এটি একটি অনেক বড় রূপান্তর। ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ক্ষেত্রে আরো জরুরি। কারণ একজন মানুষ একটি এসএমএসের মাধ্যমে অনেক বেশি তথ্য পায়। কিন্তু মেসেজের মধ্যে যে তথ্য সে পায় তা যদি না বোঝে—টাকা পাঠানো হলো নাকি দেয়া হলো নাকি কী হলো, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। একসময় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়ালের কেওয়াইসি ফর্ম ইংরেজিতে ছিল। সেটাকে রূপান্তর করে আমরা পরিবর্তন করতে পেরেছি। একটি জায়গায় আমাদের উপলব্ধি করার বিষয় আছে। আগামী দিনের দুনিয়া ইংরেজির দুনিয়া না। আগামী দিনের দুনিয়া মাতৃভাষার দুনিয়া। পৃথিবীর সব দেশ তার মাতৃভাষায় যোগাযোগ স্থাপন করবে। তানিয়া জাপানিজে প্রেজেন্টেশন দেবে আমি সেটা বাংলায় বুঝব। মনসুর ভাই জার্মানি ভাষায় কথা বলবে আমি সেটা বাংলায় শুনব। অথবা আমি জার্মানিতে কথা বলব হুমায়ুন কবির সাহেব সেটা স্প্যানিশে শুনবেন। এই টেকনোলজি এখনই বিদ্যমান। এটা ভবিষ্যতের কোনো টেকনোলজি নয়। এটা আজকের টেকনোলজি। সারা পৃথিবীতেই এটা সহজলভ্য। শুধু আমাদের মধ্যেই বোধহয় উপনিবেশের প্রভাবটা রয়ে গেছে। এটাকে দূর করতে হবে। ব্যাংকগুলো মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে, শাখা বিস্তার করবে, সেবা দেবে। বহু সেবা ব্যাংককেই দিতে হবে। আমি তো একট এলসি একটা মোবাইল ফোন দিয়ে খুলতে পারব না। এর জন্য ব্যাংকের শাখায় যেতে হবে। ব্যাংকিং সার্ভিস থাকবে। কিন্তু জনগণের কাছে বিশেষ করে যদি আপনি নারীদের কথা চিন্তা করেন যে নারীরা আমাদের গৃহস্থালির ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজার এই নারীদের কাছে যদি আপনি ফাইন্যান্সিয়াল পাওয়ার দিতে চান, তাহলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কিছু না কিছু সাহসী ভূমিকা নিতে হবে। সেই সাহসী ভূমিকা রাখার জন্য আমরা টোটাল সিস্টেমে অনেক কিছু সহজ করে ফেলেছি। বাকিটুকু আপনারা উদ্যোগ নিলেই পারবেন। আমি কিন্তু এটা বলছি না যে আপনারা চুপ করে বসে আছেন। এটি বাংলাদেশের জন্য গর্বের, যে রূপান্তরটা করতে গেলে বছরের পর বছর সময় লাগত সে রূপান্তরটা আমরা এক যুগের মধ্যে করেছি। এখন একটি বিগ পুশ দরকার। যারা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অ্যাকাউন্ট খুলেছে কিন্তু ব্যবহার করছে না, তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে তা ব্যবহারে। হুমায়ুন কবির সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনারা এখন মনে করছেন যে আমাদের ব্যাংকারদের জন্য দরকার হাজার হাজার কোটি টাকার মালিকদের বা বড় বড় ধনী লোকদের। আগামী দিনের ব্যবসা-বাণিজ্য বা শিল্প-কলকারখানা এদের হাতে থাকবে না। এরা আসলে পশ্চাত্ ভূমিতে চলে যাবে। আমি একটা উদাহরণ দিই। আমার এক আত্মীয় থাকেন রাঙ্গামাটিতে। রাঙ্গামাটিতে আমি বেশ কয়েক বছর আগে গিয়েছি। ছেলেটি আমার ভাতিজা। আমি বৌমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মা কী করছ? শুধু রান্নাবান্নাই করো? সে বলল, না চাচা আমি একটা বুটিক শপ চালাই। পাহাড়ি মেয়েদের তৈরি কাপড়গুলো আমি সংগ্রহ করি। আর এখানে তো অনেক পর্যটক আসে তারা পাহাড়ি কাপড় কেনে। আমি তাদের কাছে এগুলো বিক্রি করি। করোনা শুরু হওয়ার পর হঠাত্ দেখি আমার বাসায় এক কেজি কাজু বাদাম এসেছে। আমি কাজু বাদাম পেয়েই ভাতিজাকে ফোন দিলাম, বাবা কী হয়েছে। তুমি কি ইন্ডিয়া গিয়েছিলে নাকি। কাজু বাদাম কিনে নিয়ে এসেছ চাচার জন্য। বিষয়টা কী। সে বলে না চাচা। এটা আপনার বৌমার কীর্তি। আপনার বৌমা খুঁজে বের করেছে পার্বত্য অঞ্চলে প্রচুর কাজু বাদাম চাষ হয়। কিন্তু এই কাজু বাদাম তারা মার্কেটিং করতে পারে না। সে স্থানীয় মেয়েদের দিয়ে এগুলো সংগ্রহ করে খোসা ছাড়ানো, হালকা লবণ দিয়ে আরেকটু সুস্বাদু করে তা বাজারজাত করে। শুরু করার পর প্রথম মাসেই তার বিক্রি হয়েছে সাড়ে ৪ লাখ টাকা। আমি বলেছি আমার বৌমাকে সালাম। এই বৌমারাই কিন্তু ভবিষ্যতের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করবে। এখন আমরা যেটাকে ই-কমার্স বলছি, প্র্যাক্টিক্যালি কমার্স বলতে তখন কিছু থাকবে না। তখন একটা ডিজিটাল কমার্স হবে। ডিজিটাল কমার্স করার জন্য কাউকে শপিং মলে যেতে হবে না। অথবা শোরুমে যেতে হবে না। জিনিস কেনার জন্যও না, বিক্রি করার জন্যও না। নারীরা কেবল মেধাবীই না, তারা অসম্ভব সৃজনশীল। এই সৃজনশীলতা তাদের এমন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, যা অনেকের কল্পনার বাইরে। আরেকটি উদাহরণ দিই। আমি জামালপুরের একটা মেয়ের গল্প টেলিভিশনে দেখেছি। মেয়েটা ইন্টারমিডিয়েট পাস। তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা সে ধার নিয়েছে। সে আর কিছু করছিল না। লেখাপড়া করার মতো অবস্থাও তার নেই। ১৫ হাজার টাকা ধার নিয়ে সে তার গ্রামের আশপাশের মেয়েদের একত্র করে সে নিজে যে কাজটা জানত সেই কাজটা শিখিয়েছে। সে কুশিকাঁটার কাজ করতে জানত। সুন্দর করে কুশিকাঁটার কাজ করতে পারে। আমি লাস্ট যে রিপোর্ট নিলাম তাতে জানতে পারলাম তার আগামী দুই মাসের এক্সপোর্ট বুকিং করা আছে। কুশিকাঁটার ডিজাইন থেকে শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত পুরোটাই হচ্ছে ইন্টারমিডিয়েট পাস করা ওই মেয়েটার মেধার দক্ষতায়। তাই আপনারা বড় বড় গ্রুপ অব কোম্পানিকে যে পরিমাণ খাতিরযত্ন করেন, টাকাপয়সা দেন, আমরা আবার এটাও জানি তারা হাজার হাজার কোটি টাকা মানি লন্ডারিং করে বা ঋণখেলাপি প্রভৃতি তথ্যও আমরা জানি। কিন্তু এই মেয়েগুলোর রিটার্ন দেয়ার হার হচ্ছে ৯৮ শতাংশ। যতক্ষণ তার ঋণ থাকে ততক্ষণ তার ঘুম হয় না। একটি পরিবর্তন আসবে। আর টেকনোলজির কথা যদি বলেন, বাংলাদেশের এক ইঞ্চি মাটি থাকবে না যে মাটিতে হাই স্পিড ইন্টারনেট থাকবে না। সহজ কথায় গ্রামের মানুষ গ্রামে বসে ডিজিটাল কমার্সে শুধু অংশ নেবে না বরং নেতৃত্ব দেবে। আমি মনে করি মেধা ও সৃজনশীলতা নিয়ে আমরা নগরকেন্দ্রিক যত চিন্তাভাবনা করছি তা নগরকেন্দ্রিক হবে না। মেধা ও সৃজনশীলতা ওই গ্রাম থেকেই আসবে। এটা সবচেয়ে আগে রিয়েলাইজ করেছে থাইল্যান্ড। থাইল্যান্ড আরো সাত-আট বছর আগে ঘোষণা করেছে ক্রিয়েটিভ থাইল্যান্ড। তাদের পলিসি, তারা যা-ই তৈরি করুক তাতে ১৫ শতাংশ ভ্যালু যোগ করবে তাদের ক্রিয়েটিভিটি দিয়ে। বাংলাদেশ কিন্তু সেই কাজটা করার মতো উপযুক্ত দেশ। বাংলাদেশের মেয়েদের সেই সক্ষমতা আছে।


আহসান এইচ মনসুর

নির্বাহী পরিচালক

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি গ্রামের নারীদের একটা অনীহা আছে। তারা যেতে চায় মাইক্রোফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশনের দিকে। সমাজের যারা উচ্চসুদে ঋণ দেয় সেখানে তারা যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কিন্তু ব্যাংকের কাছে যেতে চায় না। যেহেতু আমি একটা ব্যাংকের সাথে সম্পৃক্ত আছি সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এর সমাধান হচ্ছে প্রথমত, এজেন্ট ব্যাংকিং। এটাকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এজেন্টরা গ্রামেরই লোক। তারা তাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে ডিল করবে। সেখানেই তারা বিজনেস করবে। তাহলে এ দ্বন্দ্বটা কেটে যাবে যে আমাকে একটা অফিসে যেতে হবে। একটা ম্যানেজার সাহেব থাকবে। একটা দারোয়ান বন্দুক নিয়ে আছে। এ ধরনের জিনিস যেন না হয়। দ্বিতীয়ত, মোবাইল ব্যাংকিং। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যাংকের স্বচ্ছ হতে হবে দুটো বিষয়ের ক্ষেত্রে। একটা হলো ঋণ দিতে হবে। চেষ্টা করতে হবে নারীদের কিছু ঋণ দিতে। দ্বিতীয়ত, এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে নারী এজেন্ট নিয়োগ দেয়া হলে হয়তো বেশি ফলপ্রসূ হবে। তারা ঘরে গিয়ে নারীদের সঙ্গে বসে ব্যাংকিং কার্যক্রম শেষ করে আবার অন্য জায়গায় চলে যেতে পারবে। এ ধরনের কালচারাল সহজগম্যতার দিকে ব্যাংকগুলোকে নজর দিতে হবে। ব্র্যাক ব্যাংকের ক্ষেত্রে আমি বলছি তারা যেন এটা করে। অন্য ব্যাংকগুলোকেও আমি বলব তারা যেন এদিকে নজর দেয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটা ভালো ইতিবাচক অর্জন আছে। সেটা হচ্ছে স্কুলে মেয়েদের অংশগ্রহণ ছেলেদের চেয়ে ভালো। ওভারঅল পার্টিসিপেশন ভালো হয়েছে গত ১০-২০ বছরে। পার্টিসিপেশনটাকে যদি আমরা ব্যাংকমুখী করতে পারি, তাহলে অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসবে। প্রতিটি ব্যাংকেরই উচিত অন্ততপক্ষে তাদের কমিউনিটি এরিয়ায় স্কুলগুলোর সাথে সম্পৃক্ত হওয়া। এতে বিজনেস প্র্যাকটিস হয়। এটা আমি শিখেছি অ্যাপলের কাছ থেকে। অ্যাপল আমেরিকার প্রতিটা স্কুলে বিনা পয়সায় কম্পিউটার দিয়ে দিত। এতে কী হতো? প্রত্যেকটা ছেলেমেয়ে পরবর্তী সময়ে অ্যাপল কম্পিউটার ছাড়া আর কিছু ব্যবহার করে না। তারা মাইক্রোসফট বোঝে না। তাদের অ্যাপল কম্পিউটার থাকতে হবে। কারণ আপনি স্কুলে যেটা শিখবেন কার্যক্ষেত্রে সেটাই ব্যবহার করবেন। এই বিনিয়োগের কারণে অ্যাপল আজ ২ ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি। আমাকেও বিনিয়োগ করতে হবে ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলোতে। স্কুলে যেন তারা একটা ব্র্যান্ডিংয়ের সাথে পরিচিত হয়ে উঠতে পারে। আমরা তাদের হেল্প করলে পরবর্তীকালে যখন তারা কার্যক্ষম হবে আমাদের হেল্প করবে। আমাদের স্কুল সিস্টেমের ডিজিটাল ডিভাইড অনেক বড়। এই করোনাকালে এটা আরো বড় হয়ে গেছে, যে কারণে গ্রামের ছেলেমেয়েরা মোটেই লেখাপড়া করছে না। শহরের ছেলেমেয়েরা আংশিকভাবে লেখাপড়া করছে। ডিভাইডটা আরো বড় হয়ে গেছে। এ ডিভাইডটা দূর করতে হবে। রুরাল-আরবান, পাবলিক অ্যান্ড প্রাইভেট যে বিশাল ডিভাইড আছে সেই জায়গায় বিনিয়োগ করতে হবে আমাদের। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় যদি এক হয়ে কাজ করে তাহলে এটা দূর করা খুব কঠিন কিছু নয়। কভিডের সময় বেশকিছু অর্জন হয়েছিল আমাদের। সরকারকে উদ্যোগ নিয়ে এটাকে এগিয়ে নিতে হবে। ২০২১ সালে সব গার্মেন্টস কারখানা যেন এমএফএসের মাধ্যমে বেতন-ভাতা প্রদান করে, সে লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। সেই লক্ষ্য থেকে যেন আমরা বিচ্যুত না হই। সেটা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিজিএমইএ দুটো সংস্থা একসাথে হয়ে কাজ করলে এ ডিভাইড কমানো সহজ হবে। ন্যাশনাল যে ক্রেডিট প্লাটফর্মের কথা বলা হচ্ছে সেটি একটা ভালো কনসেপ্ট। ব্যাংকার্স পারসপেক্টিভে নারীরা বড় সম্পদ। নারীদের ঋণ দিলে ব্যাংকের জন্য ভালো। ব্যাংকারদের মাইন্ডসেট চেঞ্জ করা দরকার। কিছু বিনিয়োগ করার দরকার আছে। তাহলে অবশ্যই আমরা নারীদের ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরের মধ্যে নিয়ে আসতে পারব। সেটা থেকে ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরই কিন্তু বেনিফিটেড হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই না যে নারীরা সবসময় মাইক্রোফাইন্যান্সের সাথে থাকুক। ওই সমিতির সাথে থাকুক। কেন তারা ২৫ শতাংশ সুদে অর্থ নেবে তাদের পরিবারের জন্য, তাদের বিজনেসের জন্য। যেখানে ব্যাংকে এলে ৯ শতাংশ সুদে তারা অর্থ পেতে পারে। কাজেই আমি চাই এটা যেন সরকারি, বেসরকারি, ব্যাংকার, সামাজিক সংস্থা ইত্যাদির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের উত্সকে মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারি। আমরা যেন সুলভে তাদের ঋণ দিতে পারি। এটা তাদের জন্যও ভালো হবে, ব্যাংকারদের জন্যও ভালো হবে। কারণ নারীরা হচ্ছে গুড ক্লায়েন্ট। যে বিষয়টি না বললেই না, মেয়েদের ঝরে পড়ার হার বেড়ে গেছে। কভিডের কারণে ভয়ানকভাবে বেড়ে গেছে। কভিড-পরবর্তী সময়ে যখন স্কুল শুরু হবে কত মেয়েকে যে আমরা বিদ্যালয়ে পাব তা জানি না। অনেকেই একেবারে হারিয়ে যাবে স্কুল সিস্টেম থেকে। এটা একটা বিশাল ক্ষতি হয়ে গেল। চিন্তাভাবনা করতে হবে আগামী দিনের জন্য। আমরা চাই একটা জেনারেশনের একটা অংশ যেন হারিয়ে না যায়। 

শ্রুতলিখন: হাসান তানভীর