রবিবার | জানুয়ারি ২৪, ২০২১ | ১১ মাঘ ১৪২৭

সিল্করুট

তিন টাওয়ারের চূড়ায় ইস্তানবুলের কিংবদন্তি-ইতিহাস

সেনা অলকান, অনুবাদ: হাসান তানভীর

ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অভাবনীয় সৌন্দর্যের মাধ্যমে চির বিনিদ্র শহর ইস্তানবুল তার দর্শনার্থী ও বাসিন্দাদের যুগের পর যুগ মায়াজালে জড়িয়ে রেখেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার সীমান্তে অবস্থিত একটি ল্যান্ডমার্ক হিসেবে ইস্তানবুল যেন বিশ্বকেই আলিঙ্গন করে রেখেছে। এ নগর অনেক সভ্যতা আর বহু সংস্কৃতিকে আলিঙ্গন করেছে। প্রত্যক্ষ করেছে অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে, যেমন সেই সুন্দরী নারী যার হূদয় সব রাজা বা সুলতান চুরি করতে চাইত। এমনকি আজো আপনি যখন এর রাস্তাগুলো দিয়ে হাঁটবেন তখন একটি অদৃশ্য শক্তি অনুভব করবেন, যা আপনাকে তাত্ক্ষণিকভাবে প্রভাবিত করবে। সাত পাহাড়ের এ নগরে মাঝে মাঝে আপনার দম বন্ধ হয়ে আসতে পারে, তবে খানিক পরেই বুঝতে পারবেন আপনি আসলে শহরটাকে কতটা ভালোবাসেন। এটি যেন সেই নারীর মতো, যে অবগুণ্ঠনমুক্ত হওয়ার জন্য প্রতীক্ষা করছে।

আপনি যখন এর পুরনো কোনো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবেন বা নৌকায় করে বসফরাস প্রণালি পার হবেন, তখন ইস্তানবুলের সৌন্দর্য নিয়ে রচিত একটি গান আপনাকে স্পর্শ করে যাবে। আপনি বুঝতে পারবেন কেন লাখ লাখ মানুষ এ পুরনো, সুন্দর শহরটি ছেড়ে যায় না। যন্ত্রণা, দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেও কেন মানুষ এখানে থেকে যায়। নিচের গানটি গেয়েছেন তুর্কি সংগীতশিল্পী লেভেন্ত উকসেল। যার সারমর্ম অনেকটা এ রকম—


বাতাস তোমার চুল সাত পাহাড়ের ওপর দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যায়

স্মৃতিগুলো ইতিহাসের ছাই ছড়িয়ে দেয়

ঘোটকীর মতো কোমরের নারী, আমাকে তোমার সরু কোমর আলিঙ্গন করতে দাও

ইস্তানবুল, আমার ভালোবাসা, আমাকে তোমার গ্রীবায় চুমু দিতে দাও

ক্ষয়ে যাওয়া জীবনের মতো এই বাড়ি, জানালা, দরজা, এই রাস্তা

নীল সমুদ্রের মতো, সুখের মুহূর্তগুলোর মতো সময় ভেসে যায়

ইস্তানবুল, আমার ভালোবাসা, আমাকে তোমার গ্রীবায় চুমু দিতে দাও।


বিশ্বের প্রতিটি শহরের একটি বা দুটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ইস্তানবুলের বিষয়টি অন্যরকম। এর সাত পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য স্মারক চিহ্নের তালিকা তৈরি করা সম্ভব নয়। মিনার, গির্জা, টাওয়ার, দুর্গ, পুরনো রাস্তা, সেতু সবই ইস্তানবুলের নিদর্শন। এদের সবারই দর্শনার্থীদের বলার মতো নিজস্ব গল্প রয়েছে। আজ আমরা শুধু সেভেন হিল টাওয়ারগুলোর ওপর নজর দেব। এদের গল্পগুলো শুনলে আপনি এ মেগা সিটিতে অতি দ্রুত ছুটে আসতে চাইবেন।


১. মেইডেন’স টাওয়ার: বছরের পর বছর মানুষ ইস্তানবুলের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য উপভোগ করে আসছে। মেইডেন’স টাওয়ার (কিজ কুলেসি) এর মধ্যে একটি। এটি বসফরাসের মাঝে অবস্থিত একটি টাওয়ার। এটাকে দেখে মনে হবে একটি সুন্দরী মেয়ে ইস্তানবুলের সৌন্দর্য প্রদর্শন করছে। বসফরাসের দুই পাশে ইস্তানবুলের একটি স্মারক হিসেবে টাওয়ারটি ২ হাজার ৫০০ বছর ধরে এক রহস্যে ঢাকা ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব করছে। ইস্তানবুলের প্রায় সব ছবিতে দেখতে পাওয়া এ আকর্ষণীয় টাওয়ারটি সম্পর্কে দুটি কিংবদন্তি রয়েছে। প্রথমটি একজন সুন্দরী বাইজেন্টাইন রাজকন্যার গল্প। কিংবদন্তি অনুসারে, জ্যোতিষীরা সাপের কামড়ে মারা যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করায় এ রাজকন্যাকে একবার টাওয়ারটির মধ্যে সুরক্ষিত রাখা হয়েছিল। তার বাবা সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন কন্যাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। বর্তমান টাওয়ারটির পাশে তিনি একটি বর্ধিত দুর্গ তৈরি করেছিলেন এবং এ মারাত্মক পরিণতি এড়াতে নিজ কন্যাকে সেখানে রেখেছিলেন। কিন্তু মেয়েটি তার ভাগ্য এড়াতে পারেনি। তাকে একটি সাপ কামড় দিয়েছিল, যা আঙুরের ঝুড়িতে দুর্গে প্রবেশ করেছিল।

দ্বিতীয় কিংবদন্তি হিরো ও লিয়ান্ডার নামক দুই প্রেমিকযুগলের প্রণয়ের কথা বলে। একজন বাইজেন্টাইন সম্রাট তার কন্যা হিরোর জন্য বর্তমান টাওয়ারের পাশে একটি দুর্গ তৈরি করেছিলেন। সম্রাট যখন জানতে পারলেন যে তার মেয়ে লিয়ান্ডার নামক একজন সাধারণ যুবকের প্রেমে পড়েছে, তখন তিনি হিরোকে দুর্গে বন্দি করেন। কিন্তু লিয়ান্ডার দমে যায়নি। সে হিরোকে দেখতে হেলসপন্ট প্রণালি পাড়ি দিতে যায়। এক ঝড়ের রাতে পথ দেখার মতো আলো না থাকায় সে পানিতে ডুবে মারা যায়। তার মৃত্যুর কথা শুনে হিরো সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। বর্তমানে টাওয়ারটি একটি ক্যাফে এবং রেস্তোরাঁয় রূপান্তরিত হয়েছে। এখানে রোমান্টিক সময় কাটানো এবং অটোমান ও আন্তর্জাতিক রীতির খাবার উপভোগের সুব্যবস্থা রয়েছে। নস্টালজিক পরিবেশে রোমান্টিক ডিনারের ভেন্যু ছাড়াও টাওয়ারটি একটি স্মরণীয় বিবাহের স্থান হিসেবে ব্যবহূত হয়।

২. গালাতা টাওয়ার: গোল্ডেন হর্নের উত্তর তীরে গালাতা টাওয়ার অবস্থিত। ল্যাটিন ভাষায় এটি ক্রিস্টিয়া ট্যুরিস নামে পরিচিত। এটি ১৩৪৮ সালে জেনোসদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। এর নামকরণ নিয়ে কয়েকটি মতামত প্রচলিত রয়েছে। ইতালিয়ানদের মতে, নামটি এসেছে ‘ক্যালাটা’ শব্দ থেকে, যার অর্থ ঢালু স্থান। এমন নাম হওয়ার কারণ এর আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে ভূমি ঢালু হয়ে সমুদ্রে নেমে গেছে। অন্যদিকে গ্রিকরা বিশ্বাস করে যে নামটি এসেছে ‘গ্যালাকটোস’ থেকে, যার অর্থ দুধ। কারণ অঞ্চলটি মধ্যযুগের শুরুতে মেষপালকদের দ্বারা ব্যবহূত হতো। আবার ‘গ্যালাত’ শব্দ থেকেও এর উত্পত্তি হতে পারে। কারণ শব্দটি গ্যালাটিয়ানদের কেল্টিক উপজাতিদের বোঝায়। বিশ্বাস করা হয় যে আনাতোলিয়ার গ্যালাটিয়ায় স্থানান্তরের আগে হেলেনীয় যুগে তারা সেখানে বসবাস করত।

গালাতা টাওয়ারের কিংবদন্তি অনুসারে আপনি যাকে নিয়ে এ ঐতিহাসিক টাওয়ারটিতে আরোহণ করবেন, তার সঙ্গেই আপনার বিয়ে হবে। এজন্য বর্তমানে একটি ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, যেখানে সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছে বলে বিশ্বাস করা মানুষ তাদের প্রিয়জনের সঙ্গে এ টাওয়ারে ওঠে। মূলত পর্যবেক্ষণ টাওয়ার হিসেবে নির্মিত মধ্যযুগীয় স্থপনাটি ৬৬ দশমিক ৯ মিটার উঁচু। শহরের দীর্ঘতম এ স্থাপনা ছিল গোল্ডেন হর্নের বিপরীত দিকে ছড়িয়ে থাকা পুরনো ইস্তানবুল শহর দেখার জন্য একটি সুবিধাজনক স্থান। একটি লিফট টাওয়ারটির সপ্তম তলা পর্যন্ত যায়। বাকি দুই তলায় দর্শনার্থীদের হেঁটে উঠতে হয়। টাওয়ারের ওপরে থাকা রেস্তোরাঁগুলো আপনার ক্ষুধা দূর করে দেবে। এখান থেকে আপনি ৩৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে ইস্তাম্বুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। এখান থেকে দেখা যাবে বসফরাস, গোল্ডেন হর্ন, নীল মসজিদ এবং অন্যান্য অনেক স্মৃতিচিহ্ন, যা আপনাকে মুগ্ধ করবে। আপনি যদি সন্ধ্যায় আসেন, তবে আপনি রাতে তুর্কি সংগীতের তালে নাচতেও পারবেন।

৩. বায়েজিত টাওয়ার: বায়েজিত টাওয়ার ৮৫ মিটার লম্বা একটি অগ্নি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। এটি বায়েজিত স্কয়ারের ইস্তানবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ক্যাম্পাস চত্বরে অবস্থিত। এটি শহরের অন্যতম আকর্ষণীয় একটি স্মারক চিহ্ন, যেখান থেকে আপনি এ অসাধারণ শহরটির প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। এটি সাত পাহাড়ের একটির শীর্ষে অবস্থিত। তাই আপনি যখন এর শীর্ষে উঠবেন, তখন আপনি সেসব পাহাড় দেখতে পাবেন, যার ওপর মহান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন শহরটি নির্মাণ করেছিলেন। বর্তমানে এটি শুধু ইস্তানবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। তবে এটিকে জাদুঘরে পরিণত করার এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আপনি যদি ভাগ্যবান হন, তবে আপনার ইস্তানবুল ভ্রমণের সময় এটি উন্মুক্ত থাকতে পারে। এখান থেকেও আপনি ৩৬০ ডিগ্রি কোণে শহরের সৌন্দর্য দেখতে পারবেন। এর মূল কাজ ছিল শহরে আগুন শনাক্তকরণ। কিন্তু পরবর্তী সময় ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত টাওয়ারটি বিভিন্ন রঙের মাধ্যমে আবহাওয়ার পরিস্থিতি নির্দেশ করার জন্য ব্যবহূত হয়েছে। লাল রঙ দিয়ে তুষারপাত, নীল দিয়ে সুন্দর ও পরিষ্কার আবহাওয়া, সবুজ রঙ দিয়ে বৃষ্টি এবং হলুদ রঙ দিয়ে কুয়াশা বোঝানো হতো। পূর্ববর্তী সময়ে টাওয়ারটিকে ‘আগুন ঘর’ বলা হতো। এখানে সবসময় আগুনের খোঁজে একজন কর্মী থাকত। মিনারটির ঐতিহ্য অনুসারে আগুন লাগার সময় প্রহরী চিত্কার করে বলে উঠত, ‘আগা আপনার একটি বাচ্চা হয়েছে!’ এর অর্থ ইস্তানবুলের কোথাও আগুন লেগেছে। আগা জিজ্ঞেস করত, ‘এটি কি মেয়ে না ছেলে?’ আগুন যদি আনাতোলিয়ার দিকে বা বায়োয়ালু কিংবা বসফরাসের দিকে হতো, তবে উত্তরটি হতো ‘মেয়ে’। আর আগুন ইস্তানবুলের কেন্দ্রে থাকলে বলা হতো ‘ছেলে’। এরপর আগা জনগণকে আগুনের কথা জানাত।

ডেইলি সাবাহ