বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২৬, ২০২০ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

দোকান ও বাজার: গ্রামীণ সমাজে শহুরে হাওয়া

তানভীর শাতিল

সাতচল্লিশের পর থেকে মোটাদাগে হিসাব করলে আজকের বাংলাদেশ তথা একাত্তর-পূর্ববর্তী পূর্ব পাকিস্তান যে ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে তার ইতিহাস নিরেট শোষণের ইতিহাস। সত্তরের সাইক্লোন, একাত্তরের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধের বিভীষিকা, যুদ্ধপরবর্তী দেশ পুনর্গঠন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশ ও সমাজে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থাকে তা সামলে উঠতে না উঠতেই, বাঙালি জাতির জাতীয় জীবনে নেমে আসে রাজনৈতিক অস্থিরতা আর স্বার্থান্বেষী অপরাজনীতি। 

সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ একাত্তর-পরবর্তী দীর্ঘ সময় নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে। গ্রামীণ কৃষিনির্ভর জাতীয় অর্থনীতি নিদারুণ সংকটে ধুঁকেছে। কিন্তু কৃষিনির্ভর বাঙালি সমাজ দারিদ্র্যের কষাঘাতে একপেট-আধপেট খেয়ে, দুর্ভিক্ষের মতো নিরক্ষরতা, কলেরা, ডায়রিয়া, টায়ফয়েড, হাম, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, অধিক জনসংখ্যার চাপ (জন্মনিয়ন্ত্রণ) এমন অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ধীরে ধীরে আজকের অবস্থায় এসেছে। কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে বাংলাদেশ অনেকাংশেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। মাঝে মাঝে পিঁয়াজের মতো পণ্যের সুষ্ঠু বাজারনীতি না থাকার কারণে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা যায় না, যত ধরনের উন্নয়নের তকমা রাষ্ট্রের গায়ে লাগুক না কেন। এখনো অতিদরিদ্রের হার ১৮ শতাংশের ওপরেই আছে। আর কর্মসংস্থানের দিকে নজর দিলে আরো ভয়াবহ চিত্র চোখে পড়ে। শিক্ষিত বেকার সমস্যা আজ জাতীয় বোঝা। যদিওবা সনাতনী কৃষিতে বাণিজ্যিকায়নের ছোঁয়া লেগেছে, তৈরি পোশাক কারখানা থেকে শুরু করে নানান শিল্পায়ন অনেক হতদরিদ্র নারী-পুরুষ ও তাদের পরিবারের জীবিকার ব্যবস্থা করেছে। তবে এ শিল্পায়নের যে ধারা সেখানেও নানা সময়েই নানাবিধ শোষণের চিত্র বর্তমান।

বিগত এক যুগ ধরে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ইশতেহারে চলা বর্তমান বাংলাদেশে অনেক উন্নয়নে সাফল্যগাথা রয়েছে। আর বর্তমান সময়ে ‘সকল গ্রাম হবে শহর’ ধারণার বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজেও এক নতুন শহুরে হাওয়া লেগেছে। গ্রামের মানুষ যেভাবে ডিজিটাল সংস্কৃতির আবহে এসেছে সেই সঙ্গে কৃষিনির্ভরতার জায়গা থেকেও নানাবিধ (চলতি ‘উন্নয়ন’ ধারার) অ-কৃষিজ কাজের দিকে ঝুঁকেছে।

একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ও নৃবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে কাজ করার প্রেক্ষিত থেকে বাংলাদেশের আনাচকানাচের নানা গ্রামে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। আর তাছাড়া নাড়িও তো গ্রামেই পোঁতা, এখনো ব্যক্তিগত জীবনে গ্রামের সাথে যোগাযোগ আছে। ঈদ, পার্বণ কিংবা সুুযোগপ্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামে যাওয়ার সুুযোগ প্রায়ই হয়। গ্রামের নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেকের সঙ্গেই বিভিন্ন সময়ে। কারো সঙ্গে হয়তো কোনো বিষয়ে গবেষণার মাঠকর্মকালীন আলাপচারিতা, আবার কারো সঙ্গে নিছক আড্ডা আর সামাজিক আলোচনার প্রেক্ষিত থেকে বর্তমান সময়ে অ-কৃষিজ খাতে গ্রামীণ (কৃষিভিত্তিক) সমাজে নানান বহুমুখিতা বিষয়ে জানা যায়। আর তার সঙ্গে সঙ্গে সমাজের একজন মানুষ হিসেবে, রাষ্ট্রের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে নিজস্ব কিছু পর্যবেক্ষণের প্রতিফলনও হয়। 

সেই নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও ভাবনার প্রতিফলনের জায়গা থেকে আজকে আমার মনে হয় বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজটা তার যে চিরায়ত সাংস্কৃতিক আবহ, তার যে উৎপাদন ব্যবস্থা সবই কেমন জানি উন্নয়নের মহাবয়ানে নতুন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন এক বাস্তবতায় উপনীত হচ্ছে। সেদিকে আলোচনা করলে অনেকগুলো বিষয়ের অবতারণা হতে পারে। যেমন ‘সকল গ্রাম হবে শহর’ স্লোগান নিয়ে বাংলাদেশ যখন এগোচ্ছে তখন আমরা দেখতে পাই আসলে গ্রাম কীভাবে শহর হয়। আমরা কি উন্নয়ন বলতে নগরায়ণকে বুঝি। আমরা উন্নয়ন বলতে বিদ্যুৎ, ভালো পিচঢালা রাস্তা, পুল, কালভার্ট, কল-কারখানা, শ্রমিক হয়ে জীবন কাটানোর পথ করে দেয়া, বেকারত্বের কর্মসংস্থান ইত্যাদিকেই বুঝি।

বাংলাদেশের গ্রামের যে জীবনযাত্রার মান ছিল (চার-পাঁচ দশক আগে) তার যে পরিবর্তন হয়েছে, এর জন্য গবেষণা করে বুঝতে হয় না। মানুষের বর্তমান প্রাত্যহিক জীবনযাপনকে বিগত দশকগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে একটা ধারণা করা যায়। আগে মানুষের যেভাবে জীবনযাপন করতে হতো তার যদি একটা বর্ণনা আমার ছোটবেলার গ্রামে বেড়ে ওঠার স্মৃতি থেকে তৈরি করতে চাই স্মৃতিচারণের প্রেক্ষিত থেকে, তবে আমার এখনো মনে আছে আমাদের জেলা শহরের সঙ্গে গ্রামের যে যোগাযোগ পথ তার কিছু ইটের সলিং, কিছু কাঁচা, কিছুটা বা কোনো রকমে বিটুমিনাবৃত সরু রাস্তা। বর্ষার সময়ে পানি জমে গেলে রাস্তায় যে খাল-খন্দকগুলো হয় সেগুলো ডিঙ্গিয়ে ‘মুড়ির টিন’ বাসগুলো এদিক-ওদিক কাত হয়ে কোনো কোনো সময় যাত্রীদের নামিয়ে সবাই মিলে ঠেলা দিয়ে খন্দক থেকে তুলে নিয়ে আবার চলতে শুরু করে। এভাবে জেলা সদর থেকে গ্রামের বাজারে পৌঁছতে সময় লাগত দুই-আড়াই ঘণ্টা আর চরাঞ্চল বা পাহাড়ি দুর্গম জায়গায় পৌঁছানোর বিষয় সহজেই অনুমেয়। এর পাশাপাশি ছিল হাতে টানা ঠেলাগাড়ি। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় মালপত্র, কৃষিজ উৎপাদন বাজারে নেয়ার ক্ষেত্রে এই ‘ঠেলাগাড়ির’ ব্যাপক ব্যবহার দেখা যেত। এর পাশাপাশি গরুর গাড়ি এমনকি পালকিরও চল ছিল সীমিত আকারে। আমার ছোটবেলার স্মৃতিতে পালকি দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তবে হাতে টানা ঠেলাগাড়িতে বাঁশের ছই লাগিয়ে তার ভেতর যাত্রী বসিয়ে এদিক-সেদিক যাতায়াত করার বাহন হিসেবে দেখতে পেয়েছি। গ্রামের রাস্তায় বিশেষ করে হেমন্ত আর শীতের সময়ে হাঁটু অব্দি ধুলা থাকত আর বৃষ্টিতে থাকত কাদা। বড় একটা ইউনিয়ন পর্যায়ের বাজারে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এ বাজারে আসত। আদিবাসী জনগোষ্ঠী যারা আছে তারাও তাদের প্রয়োজনে এ বাজারগুলোতে আসত। বেশির ভাগ মানুষ হেঁটে আসত, কেউ কাঁধে ‘বাইঙ্কা’ (বাঁশের তৈরি কাঠে বহন করার জন্য একটা গ্রামীণ লোকজ প্রাত্যহিক ব্যবহার্য অনুষঙ্গ) নিয়ে উৎপাদিত জিনিস হাটে নিয়ে আসত। (আদিবাসী ও স্থানীয় হতদরিদ্ররা হয়তো) বেশির ভাগ মানুষ হেঁটেই যাতায়াত করত। তারপর ধীরে ধীরে ইটের সলিং দেখা গেল। রাস্তা ইটের সলিং হওয়ায় পরবর্তী সময়ে প্যাডেলচালিত তিন চাকার রিকশার প্রচলন শুরু হলো। এরপর ধীরে ধীরে সরু হয়ে পিচঢালা হলো, গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন যান্ত্রিকতার ছোঁয়া লাগল। গরুর গাড়ি, মহিষের গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি ধীরে ধীরে উঠে গেল। এর মাঝে গ্রামীণ কৃষি সংস্কৃতিতেও যান্ত্রিকতার প্রসার ঘটে। বিশেষ করে পাওয়ারটিলার যন্ত্রটিও বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে ব্যাপক এক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ঢেঁকিতে ধান ভানা গৃহস্থালির একটা কাজ, সেটাও এক ধরনের সেবা প্রদানকারী ব্যবসার আওতাভুক্ত হয়ে যায়। এমনভাবেই নানাভাবে এ যান্ত্রিকায়ন চিরায়ত গ্রামীণ ‘অ-যান্ত্রিক’ সমাজে এক নিবিড় পরিবর্তন বয়ে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে এই একমাত্র পাওয়ারটিলার যন্ত্রটি এত বিবিধ ব্যবহারে ব্যবহূত হয়েছে তা বুঝতে সত্যি এক গবেষণা প্রয়োজন। ‘আমার সন্দেহ জাগে পাওয়ারটিলার আবিষ্কারক নিজেও হয়তো ভাবতে পারেনি এর এত বহুবিধ ব্যবহার বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে কত বহুমাত্রিকতায় ব্যবহূত হতে পারে।’ এই হাল চাষ করার যন্ত্রটি করিমন, নছিমন, ভটভটিসহ নানান আঙ্গিকে ও প্রয়োজনীয় বাহন হিসেবে কাজ করেছে গ্রামীণ সমাজে। লোক পরিবহন থেকে শুরু করে মালামাল পরিবহনে ব্যবহূত হয়। এ খাতে রাস্তাঘাট উন্নয়ন ও যান্ত্রিকতার মিশেলে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এর পাশাপাশি যদি আমরা গ্রামীণ মানুষের আর্থসামাজিক বাস্তবতার দিকে তাকাই তবে এখানে একটা পরিবর্তন দেখতে পাই, যা আসলে ব্যক্তিগতভাবে আমাকে দ্বিধান্বিত মিশ্র একটা জায়গায় ফেলে, আসলে এ পরিবর্তন যেটা ‘উন্নয়নের’ ফলাফল হিসেবে দেখা যাচ্ছে তা কতটুকু জুতসইভাবে সমন্বিত হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে।

এখানে গ্রামীণ কৃষিনির্ভর যে সংস্কৃতি ও পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রামীণ পেশা যেমন কুমার, কামার, তাঁতি, বাঁশের তৈজসপত্র বা কৃষিজ যন্ত্রাদি বানানো পেশার মানুষেরা বাজার অর্থনীতির ‘উন্নয়নে’র নানামুখী প্রেষণায় পেশা পরিবর্তন করেছে। যেখানে অনেক পেশা আছে এটা কেবল পেশা না, এর সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রেক্ষিত জড়িতও আছে।

কিন্তু বর্তমানে বাজারনির্ভর শিল্পায়নভিত্তিক উন্নয়ন গ্রামীণ পেশাজীবীদের তাদের চিরায়ত পেশা থেকে বিচ্যুত করে শ্রমজীবী হওয়ার প্রস্তাব সামনে নিয়ে এসেছে। গ্রামের মানুষ শহরমুখী হয়েছে জীবিকার তাগিদে। শহরের সঙ্গে গ্রামের যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপক হারে। পাঁচ দশক আগের সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমান সময়ে গ্রামীণ মানুষের সঙ্গে শহরের মানুষের কিংবা গ্রামের সঙ্গে শহরের বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই যোগাযোগ নিদেনপক্ষে শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, এটা চোখ বন্ধ করেই বলা যায়। আর তার সঙ্গে ভার্চুয়াল প্লাটফর্ম আর ডিজিটালাইজেশনের ফলে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক সবদিক থেকেই যুক্ততা বাড়িয়েছে। যোগাযোগ হয়েছে সহজতর ও দ্রুততর, মোবাইল ও মোবাইল ব্যাংকিং, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ডিজিটাল টেকনোলজিভিত্তিক বিনোদনসহ সব মিলিয়ে এক নতুন সংযুক্ততার মাত্রা দাঁড় করায় গ্রামীণ সমাজে। এ ডিজিটাল ঢেউয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এ ডিজিটাল টেকনোলজি বিষয়ক ছোট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে যেমন মোবাইলের দোকান, ম্যাকানিকের দোকান, গান ডাউনলোডের দোকান, অনলাইনে কোনো তথ্য জানার জন্য ইউনিয়নভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহারকে কেন্দ্র করে নতুন কর্মসংস্থানের একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

আবার যদি হাট বাজার মার্কেটের বিষয়ে পর্যবেক্ষণ থেকে আলোকপাত করি তবে দেখতে পাই বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে আনাচকানাচে অনেক দোকান যেমন বেড়েছে, আঞ্চলিক হাটবাজারও বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের মাঝে শিক্ষার হার বৃদ্ধি হয়েছে, যেমন কৃষি খাত থেকে অ-কৃষি খাতে মানুষের যুক্ততাও বৃদ্ধি পেয়েছে। 

চায়ের দোকান, কেজি স্কুল, প্রাইভেট স্কুল, মাদ্রাসা, বিউটি পার্লার, মোকানিকের দোকান, কম্পিউটারের দোকান বৃদ্ধি পেয়েছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। আবার যদি বাংলাদেশের বর্তমান রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো সেবার প্রেক্ষিত থেকে দেখা যায়, গ্রামের পরিবহন ক্ষেত্রে এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন গ্রামেগঞ্জে জেলা সদর, থানা সদর থেকে ইউনিয়নের গ্রাম পর্যায়ে ইলেকট্রিক মোটরচালিত ইজিবাইক, সিএনজি, ইঞ্জিন রিকশা অনেক কিছুই আছে। আর এগুলো স্থানীয় মানুষকে কর্মক্ষেত্রের একটা ক্ষেত্রে তৈরি করেছে। অনেকেই এখন একটা ইজিবাইক, রিকশা কিংবা সিএনজি কিনে নিয়ে পরিবহন ক্ষেত্রে কাজ করছে। আমি এমন একজনের সঙ্গে কথা বলেছি তার জীবিকা নির্বাহের প্রক্রিয়াটিকে একটি কেস হিসেবে পাঠ করলে দেখা যাবে যে সে মূলত একজন বর্গাচাষী যার নিজের কোনো জমি নেই। অন্যের জমি বর্গা বা লিজ নিয়ে কৃষিকাজ করত। পাশাপাশি কৃষি দিনমজুর হিসেবে অন্যের জমিতে কাজ করত। গ্রামীণ জীবন বাস্তবতায় তার আর অন্য কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে বর্তমান সময়ে সে তার কৃষি মজুর, বর্গাচাষীর কৃষিভিত্তিক কাজের পাশাপাশি মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠান থেকে লোন নিয়ে ইঞ্জিনচালিত একটা রিকশা ভ্যান কিনেছে। তার মাধ্যমে জীবিকা উপার্জনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে যে পরিবর্তনটা এসেছে তা একভাবে বলা যায় যে মানুষের আয়-রোজগারের ক্ষেত্র প্রসারিত করেছে; আবার অন্যদিকে কুটির শিল্পভিত্তিক গ্রামীণ যে উৎপাদন ব্যবস্থা তা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হয়েছে; বেশির ভাগের দৌড় শহরের জীবন ও যান্ত্রিক শ্রমিক হওয়ার দৌড়ে। 

এ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, পরিবহন ক্ষেত্র, যন্ত্র মেরামত খাত সব মিলিয়ে বিগত দশকগুলোতে গ্রামীণ অ-কৃষিজ খাতে অনেক নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সামনে হাজির হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রবাসী শ্রমিক হওয়ার হারও ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে অ-কৃষিজ খাতে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো নানাবিধ কার্যক্রমও পরিচালিত করছে। এক্ষেত্রে ব্র্যাকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিত থেকে বলতে পারি, ব্র্যাক অনেক বিষয়েই বেসরকারি পরিপ্রেক্ষিতে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। 

তবে সাম্প্রতিক করোনা মহামারীর পরিপ্রেক্ষিতে এসব গ্রামীণ অ-কৃষিজ খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সামনের সময়ে দ্বিতীয় দফায় যদি শীতে করোনা আরো ব্যাপকতা পায় তাহলে উন্নয়নের মহাবয়ান ভেঙে যেতে পারে। আর সে লক্ষ্যে করোনা মোকাবেলায় প্রধান তিনটি প্রতিরোধমূলক চর্চায় প্রাত্যহিক ব্যবহারিক জীবনে অভ্যস্ত হতে হবে সমাজের সবাইকে। এ বিষয়ে সচেতনতা, সমন্বিত উদ্যোগ ও সামাজিক তৎপরতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। 

তানভীর শাতিল: উন্নয়ন গবেষক, বিআইজিডি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়