সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

সিল্করুট

ইতিহাস ও রাজনীতিতে নূরজাহানের প্রভাব

ইবনে মোতালিব

[হিস্ট্রি ডিসকাশন নেটওয়ার্ক থেকে গৃহীত নিবন্ধ নূর জাহান ইনফ্লুয়েন্স অন হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস অব ইন্ডিয়া  অনুসরণে বর্তমান লেখক নিবন্ধটি প্রণয়ন করেছেন]

 

সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে তার জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর অন্যতম নূরজাহানের সঙ্গে তার বিয়ে। নূরজাহানের বাবা মির্জা গিয়াস বেগ ইরানের তেহরান শহরের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান এবং দাদা পারস্যের ইয়াজদের গভর্নর ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর মির্জা গিয়াস বেগ দুর্বিপাকে পড়ে গেলেন, ভাগ্যান্বেষণে সস্ত্রীক দিল্লি রওনা হলেন। পথে তার স্ত্রীর প্রসব বেদনা শুরু হলো এবং তিনি একটি কন্যা সন্তান প্রসব করলেন, তখন ১৫৭৭ সাল। তার নাম রাখা হলো মেহের-উন-নিসা, তিনিই পরবর্তী কালের ভারত সম্রাজ্ঞী নূরজাহান। পরিবারটির বিপন্ন দশায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন দিল্লিগামী কাফেলার দলপতি মালিক মাসুদ।

মালিক মাসুদই মির্জা গিয়াসকে সম্রাট আকবরের দরবারে উপস্থাপন করে তার জন্য চাকরির প্রার্থনা জানান। আকবর তাকে চাকরি দিলে মেধাবী মানুষটি শিগগিরই তার যোগ্যতা দক্ষতায় সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলেন। তাকে প্রথমে কাবুলের দেওয়ান নিযুক্ত করা হলো, পরে তাকে সম্রাটের গার্হস্থ্যবিষয়ক দেওয়ান হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তাকে ইতিমাদ-উদ-দৌলা খেতাব দেয়া হয়। ১৫৯৪ সালে মেহের-উন-নিসাকে আফগান যুবক আলী কুলি বেগের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়। আলী কুলি বেগ একাই একটি বাঘ শিকার করার মতো সাহসিকতা প্রদর্শন করায় যুবরাজ সেলিম, পরবর্তী কালে সম্রাট জাহাঙ্গীর তাকে শের আফগান উপাধি দেন, কালক্রমে তা- নামে পরিণত হয়। যখন ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়, শের আফগান শাহজাদা সেলিমকে ছেড়ে বাদশাহ আকবরের প্রতি আনুগত্য পোষণ করেন এবং তার পক্ষে সক্রিয় থাকেন। ফলে তাদের সম্পর্কে চিড় ধরে।

কিন্তু আকবরের মৃত্যুর পর শাহজাদা সেলিম ক্ষমতা দখল করেন, জাহাঙ্গীর উপাধি গ্রহণ করেন এবং শের আফগানকে ক্ষমা করে তাকে বাংলার বর্ধমানের জায়গিরদার নিয়োগ করেন। পদাবনতি তাকে অসন্তুষ্ট ক্ষুব্ধ করে তোলে। তিনি নতুন সম্রাটের পক্ষে সক্রিয় থেকে সেখানকার আফগানদের বিদ্রোহ দমনে নিষ্ক্রিয় রইলেন। ১৬০৬ সালে রাজা মান সিংহকে অপসারণ করে কুতুব-উদ-দীনকে বাংলার গভর্নর করা হয়। একই সময়ে শের আফগানের বিরুদ্ধে আনুগত্যহীনতার অভিযোগ এনে তাকে কুতুব-উদ-দীনের কাছে হাজির হতে নির্দেশ দেয়া হয়। কুতুব-উদ-দীন নিহত হন, কিন্তু তার অনুচর অনুসারীরা শের আফগানকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে।

শের আফগানের স্ত্রী মেহের-উন-নিসা কন্যা লাডলি বেগমকে বন্দি করে আগ্রার কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সুন্দরী করিত্কর্মা মেহের-উন-নিসাকে সম্রাট আকবরের বিধবা স্ত্রী সালিমা বেগমের দেখভাল করার জন্য তার অনুচর হিসেবে নিযুক্ত করা হয় ১৬১১ সালে নওরোজ উৎসব অনুষ্ঠানে সম্রাট জাহাঙ্গীর প্রথমবারের মতো মেহের-উন-নিসাকে দেখেন। তিনি তাকে সে বছরই বিয়ে করেন এবং তাকে প্রথম নূর মহল পরে নূরজাহান (দুনিয়ার আলো) খেতাব দেন।

জাহাঙ্গীরের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক

শের আফগানের মৃত্যু জাহাঙ্গীরের সঙ্গে মেহের-উন-নেসার বিয়ে নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন ১৬১১ সালেই মেহের-উন-নিসার সঙ্গে জাহাঙ্গীরের প্রথম সাক্ষাৎ হয় এবং সে বছরই তারা বিয়ে করেন। তার স্বামীর মৃত্যুর সঙ্গে তিনি কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট নন।

অন্যদের ভাষ্য, রাজপুত্র থাকা অবস্থায়ই হেরেমে এই সুন্দর মুখশ্রী তার চোখে পড়েছে, তখন থেকেই তাদের ভালোবাসাবাসি; কিন্তু পিতা সম্রাট আকবর সম্মত না হওয়ায় তাদের বিয়ে হয়নি। আকবরের মৃত্যুতে তাদের বিয়ের পথ খুলে যায়। জাহাঙ্গীর কখনো মেহের-উন-নিসাকে ভোলেননি। তার স্বামীর হত্যাকাণ্ডের পেছনে জাহাঙ্গীরের হাত থাকতে পারে কিংবা তিনিই তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন।

ঐতিহাসিক বেণী প্রসাদ মনে করেন, রাজপুত্র থাকা অবস্থায় তিনি মেহের-উন-নিসাকে চিনতেন না। তার যুক্তিগুলো হচ্ছে:

. রাজপুত্র হিসেবে দুজনের ভালোবাসার সমর্থনে কোনো প্রামাণ্য দলিল কেউ হাজির করতে পারেননি।

.         সম্রাট শাহজাহানের সময়কার কোনো রচনা দলিলে তাদের প্রণয়ের উল্লেখ নেই।

.        কোনো ইউরোপীয় লেখক কিংবা বিদেশী পর্যটক তাদের ভালোবাসার সমর্থনে কিছু  লেখেননি।

.         সে সময় মুসলমানদের মধ্যে এবং রাজপরিবারে বহুবিবাহ প্রচলিত গৃহীত বিষয় ছিল। তাদের বিয়েতে আকবরের আপত্তি থাকার কথা নয়।

.        জাহাঙ্গীর মেহের-উন-নিসার প্রেমে মজে থাকলে আকবর শের আফগানকে সেলিমের অধীনে চাকরিতে বহাল করতেন না এবং সেলিম সম্রাট জাহাঙ্গীর হিসেবে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর শের আফগানকে পদায়ন করতেন না।

.        বাদশাহ আকবরের পুত্র খসরুর সঙ্গে জোট পাকানোর অভিযোগে রাজা মান সিংহকে বদলি করা হয়েছিল, কুতুব-উদ-দীনকে কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়নি।

.         শের আফগানের হত্যাকাণ্ডে জাহাঙ্গীর জড়িত থাকলে দৃঢ়চেতা নারী নূরজাহান তাকে ভালোবাসতেন না।

    বেনী প্রসাদ সেলিম মেহের-উন-নিসার প্রণয়কাহিনী উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে ঈশ্বরী প্রসাদ দুজনের পূর্ব প্রণয়নের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন;

. বেনী প্রসাদের যুক্তিগুলো ঋণাত্মক প্রকৃতির।

. সে সময়কার ঐতিহাসিকদের সম্রাটের ব্যক্তিজীবন নিয়ে লেখা বা মন্তব্য করার কোনো সুযোগ ছিল না।

.        শের আফগানকে সন্দেহজনক বিবেচনা করেই তাকে শায়েস্তা করতে সম্রাট কুতুব-উদ-দীনকে গভর্নর করেন, তবে শের আফগানের প্রতি সম্রাটের অসন্তুষ্টির কোনো কারণ কুতুব-উদ-দীনও জানতেন না।

.         জাহাঙ্গীর তার ডায়েরিতে নিত্যদিনের সব খুঁটিনাটি বিষয়ের উল্লেখ করলেও মেহের-উন-নিসার সঙ্গে তার সম্পর্ক বা শের আফগানের মৃত্যু নিয়ে কিছুই উল্লেখ করেননি, সম্ভবত তিনি তা সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন।

.        যেখানে মেহের-উন-নিসার বাবা ভাই সম্রাটের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন, সেখানে তাকে হেরেমে নিয়োগ প্রদান সন্দেহ সৃষ্টি করে।

.        শের আফগানের মৃত্যুর পর তিনি চার বছর অপেক্ষা করেন এবং মেহের উন নিসাকে শোক সামলে ওঠার পর্যাপ্ত সুযোগ দিয়ে অতঃপর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেন।

ঈশ্বরী প্রসাদ লিখছেন, জাহাঙ্গীর শের আফগানকে হত্যা করেছেন বা হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। এই অপরাধে তাকে দোষী সাব্যস্ত করার উপায় নেই, তবে তার মৃত্যুতে তিনি লাভবান হয়েছেন। ওলন্দাজ লেখক দে লায়েত প্রিন্স সেলিম মেহের-উন-নিসার প্রেমকাহিনীতে লিখেছেন, শের আফগানের সঙ্গে বিয়ের সূত্রে আবদ্ধ থাকার কারণেই আকবর রাজপুত্রকে বিয়ের অনুমতি দেননি কিন্তু সেলিম তার প্রেমকে বিস্মৃতও হতে দেননি।

আকবর যে বিয়েতে বাধা দিয়েছেন, তা আকবরের সভাসদ আবুল ফজলের গ্রন্থে স্পষ্টভাবেই উদ্ধৃত হয়েছে। শ্রীবাস্তব বলেছেন, শের আফগানকে প্রত্যাখ্যান করে সেলিমকে বিয়েতে সম্মত করানোর জন্যই তাকে হেরেমে সালিমা বেগমের সেবায় নিয়োজিত করা হয়েছে। শের আফগানের হত্যাকাণ্ডে জাহাঙ্গীরের ভূমিকাকে তিনি সন্দেহজনক বিবেচনা করেন।

নূরজাহান যখন জাহাঙ্গীরকে বিয়ে করেন, তার বয়স ৩৪ বছর। বয়সেও অত্যন্ত সুন্দরী ছিলেন, সেই সঙ্গে তিনি সুশিক্ষিত, সংস্কৃতমনা, উচ্চ ধীশক্তির অধিকারী, কবিতা, সংগীত চিত্রকলায় বিশেষ আগ্রহী। তিনি ফারসি ভাষায় কবিতা লিখতেন। তিনি একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে সেকালের শ্রেষ্ঠ বইগুলোর সমাহার ঘটান। তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল আবিষ্কারপ্রবণ। নতুন ধরনের পোশাক, নতুন ধরনের অলংকার, নতুন ফ্যাশন অভ্যন্তরীণ সজ্জা উদ্ভাবনে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।

জাহাঙ্গীরের সঙ্গে বিয়ের সময় কনে হিসেবে নিজের পোশাক নূরমহলী তিনি নিজেই তৈরি করেছিলেন। ডিজাইন শত বছর ধরে অভিজাত ভারতীয় সমাজে সমাদৃত ছিল।

রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালনায় তিনি আগ্রহী ছিলেন এবং সমস্যার দ্রুত সমাধানে সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন। তার সাহস, ধৈর্য, দয়া, সামাজিক সদ্ভাব, ধর্মীয় কাজে সম্পৃক্ততা এবং দরিদ্র প্রান্তজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব, সে সময়ই তাকে প্রবাদপ্রতিম নারীতে পরিণত করে। তিনি শত শত দরিদ্র তরুণীর বিয়ের আয়োজন করেন। দেশের সুশিক্ষিত পণ্ডিতজনের সঙ্গে সখ্য স্থাপন করেন। জাহাঙ্গীরকে তিনি অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং ধীরে ধীরে তার সুরা পানাভ্যাস কমিয়ে আনেন।

একই সঙ্গে তিনি উচ্চাভিলাষীও ছিলেন। প্রশাসনিক কাজে নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে সিদ্ধান্ত জানাতেন, সে সময়কার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতেন। ধীরে ধীরে রাষ্ট্রক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করতে থাকেন, রাষ্ট্রযন্ত্রে তার ছায়া প্রবলভাবে অনুভূত হতে থাকে। তখনকার ইতিহাস রাজনীতিতে তার প্রত্যক্ষ পরোক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু হয়।

১৬১১ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরকে বিয়ের সঙ্গেই সঙ্গেই রাজপ্রাসাদের ভেতর বাইরে তার নীরব উপস্থিতি স্পষ্ট হতে শুরু করে। ১৬১৩ সালে তাকে অধিকতর সম্মানিত ক্ষমতাশীল করে পাদশাহ বেগম খেতাব দেয়া হয়, তার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাজে সংযুক্ত তার আত্মীয়স্বজনও পদোন্নতি লাভ করেন। নূরজাহানের বাবা ইতিমাদ-উদ-দৌলা এবং ভাই আসফ খান অত্যন্ত যোগ্য কর্মকর্তা ছিলেন, নিয়ে বিতর্ক নেই, কিন্তু সম্রাজ্ঞীর প্রভাবে তাদেরও অভাবনীয় উত্থান ঘটে। সম্রাটের সঙ্গে এই প্রথম সম্রাজ্ঞীও ঝরোকা দর্শনে হাজির হতে থাকেন; তার নাম মুদ্রায় খোদিত হয়, তিনি সম্রাটের নামে ফরমানও স্বাক্ষর করতে শুরু করেন।

কার্যত তিনি প্রশাসন হাতে তুলে নেন। তার সম্মতি ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না।

এদিকে বয়স বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যের অবনতি এবং রাষ্ট্রীয় কাজের চাপ গ্রহণে অনীহা থেকে সম্রাট তার বুদ্ধিমতী কঠোর পরিশ্রমী স্ত্রীর হাতে বিভিন্ন বিষয়ের ক্ষমতা হস্তান্তর করতে শুরু করেন। তিনি আশ্বস্ত ছিলেন যে নূরজাহানের প্রশাসন শক্ত হাতের প্রশাসন, ভেঙে পড়বে না। তিনি বলতেনও সুরা সুরুয়ার বিনিময়ে নূরজাহানকে রাজত্ব দিয়ে দিয়েছেন।

নূরজাহানের রাজনৈতিক জীবন দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। ১৬১১ থেকে ১৬২২, যখন তার বাবা মা জীবিত ছিলেন; তার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে তারা প্রণোদিত করেছেন। তার মা আসমত বেগম ১৬২১ সালে এবং বাবা ইতিমাদ-উদ-দৌলা ১৬২২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার রাজনৈতিক জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় ১৬২২ থেকে ১৬২৭; যখন সম্রাটের সাহচর্য তার নিজস্ব যোগ্যতা তাকে সত্যিই অসীম ক্ষমতাশীল করে তুলেছেসিংহাসন দখলের উচ্চাশাও তাকে পেয়ে বসে। স্বামী জাহাঙ্গীরের অসুস্থতার সময় ক্ষমতা দখলের জন্য তিনিডিভাইড অ্যান্ড রুল অনুসরণ করেন। প্রাসাদ ঘিরে একটিনূরজাহান চক্রগড়ে ওঠে। এই চক্রে ছিলেন তার বাবা-মা এবং দেবর খুররম (যিনি পরবর্তীকালে সিংহাসনের অধীশ্বর হন এবং শাহজাহান নাম ধারণ করেন) চক্রের সবাই যথেষ্ট ক্ষমতাধর ছিলেন। খুররম নূরজাহানের ভাই আসফ খানের কন্যা আরজুমান্দ বানু বেগমকে বিয়ে করেন (তিনি পরবর্তীকালের খ্যাতিমান মমতাজ মহল) অধ্যাপক নুরুল হাসান মনে করেন, ক্ষমতা দখলের জন্য এবং ক্ষমতা কাঠামোর কাছাকাছি থাকার জন্য বহুসংখ্যক স্বার্থান্বেষী পরস্পরবিরোধী গোষ্ঠী নূরজাহান জাহাঙ্গীরের বিয়ের আগে থেকে সক্রিয় ছিল। তিনি মনে করেন, নূরজাহান শুরুতে কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, এমনকি জাহাঙ্গীরও ধরনের দলাদলি প্রশ্রয় দিতেন না। পিতার মৃত্যুর পরই নূরজাহান রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।

১৬২১ সালে শের আফগান তার কন্যা লাডলি বেগমকে নূরজাহান জাহাঙ্গীরের কনিষ্ঠ পুত্র শাহজাদা শাহরিয়ারের সঙ্গে বিয়ে দেনএই বিয়েই তাকে ক্ষমতার রাজনীতিতে টেনে আনে। তিনি আশা করেন, শাহরিয়ারই ক্ষমতায় আসীন হবে। এক সময় তার ভক্ত হলেও শাহজাদা খুররম তার হাতের পুতুল হয়ে থাকতে রাজি নন, ক্ষমতার জন্য তিনিও মরিয়া হয়ে উঠলেন, তার পেছনে আছেন শ্বশুর আসফ খান। তিনি বিদ্রোহ করলেন। বিদ্রোহী হয়ে উঠলেন সম্রাটের অন্য ক্ষমতাধর অনুচর মহব্বত খান। সম্রাটের অনুগত হলেও তিনি নূরজাহানের ক্ষমতা খর্ব করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। শাহজাহানের বিদ্রোহ দমন করে মহব্বত খান আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন। নূরজাহানও মহব্বতকে এক হাত দেখে নিতে চাইলেন কিন্তু ততদিনে বিদ্রোহী মহব্বত খান সম্রাট জাহাঙ্গীরকে বন্দি করে ফেললেন। নূরজাহান শুরুতে পরাস্ত হলেও সৈন্যদল পুনর্গঠন করে সম্রাটকে উদ্ধার করলেন, মহব্বত খান পালিয়ে গেলেন। মহব্বত খানের বিদ্রোহী হয়ে ওঠার পেছনের মানুষটি আসফ খান। প্রাসাদ রাজনীতিতে জয়ী হলেন শাহজাদা খুররম। বন্দি নূরজাহানের ঠাঁই হলো লাহোর দুর্গে।

নূরজাহানের শেষ বছরগুলো কেটেছে কাব্য চর্চা করে, বাগান করে, পিতার সমাধিসৌধ নির্মাণ, তত্ত্বাবধান করে। মোগল শাসনামলে একজন প্রকৃত সম্রাজ্ঞী যদি থেকে থাকেন, তিনি নূরজাহান।

ইবনে মোতালিব: লেখক