সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

সিল্করুট

সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে সম্রাজ্ঞী নূরজাহান

ফজল হাসান

কিংবদন্তি সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ছিলেন মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রেয়সী স্ত্রী। বিয়ের পর পরই (১৬১১ সালে) জাহাঙ্গীর তার রূপসী বিশ্বস্ত স্ত্রীকেনূর মহলবারাজপ্রাসাদের আলোউপাধি দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে (১৬১৬ সালে) জাহাঙ্গীর আবার নূর মহলের নাম রাখেননূরজাহানঅর্থাৎদুনিয়ার আলো

সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের জীবনের নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় একাধিক ফিকশন এবং ননফিকশন গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তাকে উপজীব্য করে প্রথম উপন্যাস নূর মহল রচনা করেন আমেরিকান ইতিহাসবিদ, চিত্রনাট্যকার, ছোটগল্প লেখক ঔপন্যাসিক হ্যারল্ড ল্যাম্ব (১৮৯২-১৯৬২), যা ১৯৩২ সালে প্রকাশিত হয়। ঢাউস সাইজের (মোট ৩২৫ পৃষ্ঠা) উপন্যাসে লেখক নূরজাহান সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রেম কাহিনী তুলে ধরেছেন। সম্প্রতি ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নারী লেখক এবং স্বনামধন্য ঐতিহাসিক উপন্যাস রচয়িতা ইন্দু সুন্দরস্যান তাজমহল ট্রিলজি শিরোনামে তিনটি উপন্যাসের মধ্যে নূরজাহানের জীবন কাহিনী নিয়ে দুটি উপন্যাস দ্য টোয়েন্টিয়েথ ওয়াইফ (২০০২) দ্য ফিস্ট অব রোজেস (২০০৩) রচনা করেন। বলাবাহুল্য, ধারাবাহিকতার বিবেচনায় মমতাজের কন্যা জাহানারার জীবনভিত্তিক তৃতীয় উপন্যাসটি (‘শ্যাডো প্রিন্সেস’, ২০১০) রচিত হয়। দ্য টোয়েন্টিয়েথ ওয়াইফ উপন্যাসে লেখিকা মেহেরুননিছা নামে পরিচিত একজন বিধবা তরুণীর গল্প বলেছেন, যিনি ছিলেন পারস্য থেকে আসা একজন উদ্বাস্তু এবং আফগান সেনাপতির স্ত্রী, পরবর্তী সময়ে নূরজাহান নাম নিয়ে মোগল সাম্রাজ্যের কিংবদন্তি সম্রাজ্ঞী হয়েছিলেন। উপন্যাসেও সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে নূরজাহানের প্রেমের উপাখ্যান স্থান পেয়েছে।

উল্লেখ্য, দ্য টোয়েন্টিয়েথ ওয়াইফ উপন্যাসের জন্য ইন্দু সুন্দরস্যান ২০০৩ সালে ওয়াশিংটন স্টেট বুক অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় উপন্যাসে দ্য ফিস্ট অব রোজেস সম্রাট জাহাঙ্গীরের হেরেমে ২০তম এবং সর্বশেষ স্ত্রী হয়ে আসা মেহেরুননিছা অর্থাৎ নূরজাহানের সঙ্গে সম্রাটের দাম্পত্য জীবন এবং সম্রাটকে রাজ্য পরিচালনায় তার সরাসরি হস্তক্ষেপের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। ২০০৮ সালে উপন্যাস রেনি ইন্দরদিনির অনুবাদে নূরজাহান: দ্য কুইন অব মোগল শিরোনামে ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় প্রকাশিত হয়।

নূরজাহানের জীবনী নিয়ে অধ্যাপক রুবি লাল রচনা করেন এম্প্রেস: দ্য অ্যাস্টোনিশিং রেইন্ অব নূরজাহান। গ্রন্থটি সমালোচকদের প্রশংসা মনোযোগ পেয়েছে। জীবনীগ্রন্থে নূরজাহানের ক্ষমতা আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। একই বিষয় নিয়ে জুবেইদা দোশাল রচনা করেন নূরজাহান: দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস অব মোগল এম্প্রেস

মাদকের প্রতি প্রবল আসক্তি অতিরিক্ত আফিম সেবনের জন্য একসময় সম্রাট জাহাঙ্গীর রাজ্য শাসনের ভার নূরজাহানের ওপর ন্যস্ত করেন। সেই সময়কে কেন্দ্র করে সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের জীবনভিত্তিক উপন্যাস নূরজাহান: এম্প্রেস অব মোগল ইন্ডিয়া রচনা করেন এলিসন ব্যাংকস ফিনলে, যা ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়। গত বছর সম্রাট জাহাঙ্গীর নূরজাহানের জীবন সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে টরি রাওস্তোর উপন্যাস কুইন অ্যান্ড এম্পায়ার।

২০১৭ সালে প্রকাশিত রিং অব ফায়ার সিরিজের ২৩তম খণ্ড ১৬৩৬: মিশন টু দ্য মুঘলস গ্রন্থের অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন নূরজাহান। এছাড়া ২০০৫ সালে তনুশ্রী পোদ্দার নূর জাহান ডটার শিরোনামে ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখেন। লেখিকা বইয়ে নূরজাহানের কন্যা লাডলি বেগমের বয়ানে সম্রাজ্ঞীর জীবনচরিত তুলে ধরেছেন। ২০১৪ সালে প্রকাশিত রুচির গুপ্তার মিস্ট্রেস অব দ্য থর্ন ঐতিহাসিক উপন্যাসটিতেও নূরজাহানের সরব উপস্থিতি দেখা যায়।

যাহোক, ইংরেজি ছাড়াও উর্দু হিন্দি ভাষাতেও বিখ্যাত মোগল রোমান্স অর্থাৎ নূরজাহান সম্রাট জাহাঙ্গীরের ঐতিহাসিক প্রেম কাহিনী নিয়ে উপন্যাস রচিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে মেওয়ারাম রচিত হিন্দিতে নূরজাহান (২০১৬) এবং উর্দুতে আসলাম রাহির জাহাঙ্গীর নূরজাহান। নূরজাহানকে উপস্থাপন করে কিশোরদের জন্য শিরিন ইম ব্রিজেস রচনা করেন নূরজাহান অব ইন্ডিয়া, যা ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া কিশোর উপযোগী দিনপঞ্জি আকারে দীপা আগরওয়াল রচনা করেছেন দ্য টিনএজ ডায়েরি অব নূরজাহান (মেহের-উন-নিছা)

নূরজাহানকে উপস্থাপন করে একাধিক ভাষায় (ইংরেজি, উর্দু হিন্দি) ইউটিউবে অনেক ভিডিও আছে, যেগুলো তার ধন্যাঢ্য জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি ভিডিওর শিরোনাম উল্লেখ করা যেতে পারে, যেমন নূরজাহান: দ্য মোগল কুইন, হিস্টরি অব কুইন নূরজাহান, দ্য মোস্ট পাওয়ারফুল মোগল কুইন নূরজাহান এবং আনবিলিভ্যাবল হিস্টরি অব কুইন নূরজাহান।

নূরজাহানকে উপজীব্য করে শুধু কি ফিকশন এবং ননফিকশন বই লেখা হয়েছে? আসলে নূরজাহানকে নিয়ে অনেক কবি গীতিকার কবিতা-গান লিখেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতীয় উর্দু কবি মুন্সি তিলক চাঁদ মেহরুমের (১৮৮৭-১৯৬৬) শারমায়--আদব কবিতাটি গাঞ্জ--মানি কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত, যা একসময় ভারতে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার জন্য পাঠ্য ছিল।

এছাড়া নূরজাহানকে নিয়ে ভারতীয় কিংবদন্তি কবি গীতিকার সাহির লুধিয়ানভি (আসল নাম আব্দুল হাই, জন্ম ১৯২১ মৃত্যু ১৯৮০) নূরজাহানের মাজারে [উর্দুতেনূরজাহানকে মাজার পার’] শিরোনামে কবিতা রচনা করেন। কবিতাটির শেষ চার লাইন বাংলায় তরজমা করলে মোটামুটি রকম দাঁড়ায়:

তুমি, আমার ভালোবাসা, দেখো না সেই সব চমক

আমরা কেউই নূরজাহান কিংবা জাহাঙ্গীরের মতো নই,

তুমি যদি চাও তবে আমাকে ছেড়ে যেতে পারো, দিতে পারো পিষে,

তোমার হাতে আছে আমার হাত, তোমাকে থামানোর মতো কোনো শেকল নেই।

এছাড়া বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি কাজী নজরুল ইসলামও নূরজাহানকে নিয়ে গান রচনা করেছেন। গানের প্রথম কয়েক পঙিক্ত:

নূরজাহান! নূরজাহান!

সিন্ধু নদীতে ভেসে,

এলে মেঘলামতির দেশে,

ইরানি গুলিস্তান।।

সাহিত্য, সংগীত ছাড়াও নূরজাহান বিভিন্ন সময়ে চলচ্চিত্র, টেলিভিশনে ধারাবাহিক নাটক এবং মঞ্চনাটকের বিষয়বস্তু হয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি চলচ্চিত্র নাটকের নাম উল্লেখ করা হলো:

n   ১৯৩১ সালেনূরজাহানশিরোনামে একটি মূক চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। এতে নূরজাহানের চরিত্রে অভিনয় করেন জিল্লো বাই।

n   সোহরাব মোদী পরিচালিত ১৯৩৯ সালে মুক্তি পাওয়া পুকার চলচ্চিত্রে নূরজাহানের চরিত্রে অভিনয় করেন নাসীম বানু।

n   নন্দলাল জয়ন্তলালের যৌথ পরিচালনায় ১৯৫৩ সালে মুক্তি পায় কালজয়ী সিনেমা আনারকলি। এতে নূরজাহানের চরিত্রে অভিনয় করেন অভিনেত্রী নূর জেহান।

n   ১৯৬৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাজ মহল চলচ্চিত্রের পরিচালক ছিলেন এম সাদিক। এতে নূরজাহানের চরিত্রে অভিনয় করেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী ভীনা।

n   ‘নূর জেহানচলচ্চিত্রে নূরজাহানের চরিত্রে অভিনয় করেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী মীনা কুমারী। জাহাঙ্গীর শের আফগানের চরিত্রে অভিনয় করেন যথাক্রমে প্রদীপ কুমার শেখ মুখতার। ছবিটির পরিচালক ছিলেন এম সাদিক। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি ছিল শেখ মুখতারের স্বপ্ন। তিনি ভেবেছিলেন যে বিখ্যাত চলচ্চিত্রমুঘল- আজম’-এর মতো ছবিটিও ব্যবসাসফল হবে। বাস্তবে তা হয়নি। বলা হয়, অভিমানে শেখ মুখতার মধ্য-সত্তরের কোনো এক সময় সিনেমার আসল প্রিন্ট নিয়ে চিরদিনের জন্য পাকিস্তান চলে যান।

n   ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউডের ঐতিহাসিক সিনেমা তাজ মহল: অ্যান এটারনাল লাভ স্টোরিতে সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের চরিত্রে অভিনয় করেন অভিনেত্রী পূজা বাটরা।

n   ২০০০-২০০১ সালে সম্রাজ্ঞী নূরজাহান সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রেম কাহিনী নিয়ে নির্মিত সিরিজ নূরজাহান ভারতের দূরদর্শন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হয়। এতে নূরজাহানের চরিত্রে অভিনয় করেন গৌরী প্রধান এবং জাহাঙ্গীরের চরিত্রে অভিনয় করেন মিলিন্দ সোমান।

n   ২০১৫ সালে ইন্দু সুন্দরস্যানের দ্য টোয়েন্টিয়েথ ওয়াইফ উপন্যাসের কাহিনী নিয়ে ঐতিহাসিক নাটক সিয়াসাত এপিক টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হয়। মেহেরুন্নেছা/নূরজাহানের চরিত্রে অভিনয় করেন দুজন এবং তারা হলেন জান্নাত যুবায়ের রাহমানি চারু শংকর।

n   মেহেরনামা-নূর জাহান কি কাহানি শিরোনামের মঞ্চনাটকটি পরিচালনা করেন আমির রাজা হোসেইন। ২০১৫ সালে নাটকটি ভারতের জয়পুরে মঞ্চস্থ হয়। নাটকটিতে নূরজাহান জাহাঙ্গীরের অমর প্রেমসহ মোগল বংশের তিন প্রজন্মের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে।

n   ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন পরিচালক চিত্রনাট্যকার নাজলা জাইদির পরিচালনায় ইটারন্যাল স্প্রিং চলচ্চিত্র নির্মাণ করার ঘোষণা দেন। ঘোষণায় বলা হয়েছে, চলচ্চিত্রের মূল বিষয় হবে নূরজাহান জাহাঙ্গীরের প্রেম, যা একসময় ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের চালচিত্র বদলে দিয়েছিল।

কিংবদন্তি সম্রাজ্ঞী নূরজাহানকে উপজীব্য করে এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তার গভীর প্রেম প্রণয় কাহিনী নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে, নির্মিত হয়েছে একাধিক চলচ্চিত্র নাটক। তবে বিদূষী নারীকে নিয়ে ভবিষ্যতে যে আরো নতুন নতুন ফিকশন, ননফিকশন, কবিতা রচনা কিংবা নাটক চলচ্চিত্র তৈরি হবে, তা বলাই যায়।

 

ফজল হাসান: লেখক অনুবাদক