শুক্রবার | মে ২৯, ২০২০ | ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

বাংলাদেশে ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থায় ডিমানির কার্যক্রম

আরেফ আর বশির

মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) মূলত এমন একটি মূল্য পরিশোধের পদ্ধতি বা আর্থিক লেনদেনের সেবা, যেখানে মোবাইল ডিভাইস মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হয়। সেবাটি একটি ওয়ালেট বা এক ধরনের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এটি খোলা একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার চেয়ে সহজ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন লাইসেন্স রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো এমএফএস লাইসেন্স পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) বা -ওয়ালেট লাইসেন্স। লাইসেন্স ক্ষেত্রটি নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিটি লাইসেন্সের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা নির্দেশিকা রয়েছে।

ডিমানির পিএসপি লাইসেন্স রয়েছে, যা গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট খুলতে, নিবন্ধন করতে একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সার্ভিসগুলো গ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছে।

বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে মোবাইল ওয়ালেট বা এমএফএস-ভিত্তিক কার্যক্রম চালু রয়েছে। সেক্টরে কয়েকটি কোম্পানি এরই মধ্যে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে গ্রাহকদের এমন একটি সেবার চাহিদা রয়েছে, যেখানে দ্রুত অ্যাকাউন্ট খোলা সক্রিয় করা যায়, অ্যাকাউন্টটি একটি ব্যাংক বা কার্ডের সঙ্গে যুক্ত করা যায় এবং তাতে অর্থ জমা করা যায়। তাই গ্রাহকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে আরো সহজ করার জন্য অ্যাপটিতে ডিজিটাল লাইফস্টাইল উপযোগী বিভিন্ন পরিষেবা থাকা প্রয়োজন।

 

ডিমানি কী সেবা নিয়ে এসেছে?

উপরোল্লিখিত গ্রাহক চাহিদার কথা বিবেচনা করে ডিমানি এমন একটি ডিজিটাল ওয়ালেট নিয়ে এসেছে, যা একটি অ্যাপের মাধ্যমে পেমেন্ট, লাইফস্টাইলের নানা সুবিধা আর্থিক লেনদেনের সেবা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা তাদের দৈনন্দিন সব ডিজিটাল চাহিদা প্রয়োজনীয়তাগুলো সহজে, নিরাপত্তার সঙ্গে, ঝামেলামুক্ত থেকে পূরণ করতে পারবেন।

 

ডিমানি ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯- কার্যক্রম শুরু করেছে। এটি একটি শতভাগ বাংলাদেশী অ্যাপ্লিকেশন, যা স্থানীয় প্রকৌশলীদের একটি দল দ্বারা বাংলাদেশের জন্য নির্মিত হয়েছে। এটি বাংলাদেশে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের উন্নয়ন করতে নগদ ক্যাশ থেকে ডিজিটাল কারেন্সিতে রূপান্তরে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করার চেষ্টা করছে।

ডিমানি অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, বন্ধুবান্ধব পরিবারের মধ্যে অর্থ প্রেরণ গ্রহণ করতে পারবেন। সব টেলিফোন কোম্পানির সঙ্গে মোবাইল টপ-আপ উপভোগ করতে পারবেন। ইউটিলিটি, ইন্টারনেট, যানবাহন ট্র্যাকিং, ক্রেডিট কার্ডের বিল প্রদান করতে পারবেন এবং সাফাই, বিদ্যুত্ পেইন্টিংয়ের মতো বিভিন্ন চাহিদাসম্পন্ন পরিষেবা গ্রহণ করতে পারবেন।

ব্যবহারকারীরা যেকোনো -কমার্স পোর্টাল, লাইফস্টাইল অ্যাপ বা ডিমানি অ্যাপে সংযুক্ত ব্যবসায়ীদের থেকে অনলাইনে কেনাকাটা করতে পারবেন। ব্যবসায়ীদের বাস্তব দোকান দেখতে এবং ডিমানি কিউআর দিয়ে মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন। বর্তমানে ডিমানিতে চার হাজার অফলাইন অনলাইন দোকান সংযুক্ত আছে।

আপনি বাসের বা সিনেমার টিকিট কিনবেন, দাতব্য সংস্থায় দান করবেন, বীমা পলিসি কিনবেন, প্রিমিয়ামের জন্য অর্থ প্রদান করবেনএক কথায় যা- করুন না কেন, কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমেই তা করতে পারবেন। রিকোয়েস্ট মানি ফিচারের মাধ্যমে একজন চাকরিজীবী অফিসে ভাউচারের টাকা চেয়ে পাঠাতে পারবেন। যেমন কেউ চাইলে তার ট্যাক্সি ভাড়ার রসিদ স্ক্যান করে তাত্ক্ষণিকভাবে অ্যাপের মাধ্যমে তা অফিসে পাঠিয়ে টাকা চাইতে পারবেন।

ডিমানির পিএসপি লাইসেন্স উচ্চসীমা পর্যন্ত লেনদেনের সুযোগ দেয়। বড় ট্রাঞ্জেকশনের মধ্যে বেতন পরিশোধকে উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে এমএফএস কার্যক্রমে মোবাইলের মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণের ক্ষেত্রে পারস্পরিক বোঝাপড়া থাকতে হবে। এমএফএস কার্যক্রম সবখানে ছড়িয়ে দেয়া জনগণের মধ্যে যারা সেবার আওতাধীন নয়, তাদের অন্তর্ভুক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার একমাত্র চাবিকাঠি হলো পারস্পরিক সহযোগিতা।

বাংলা কিউআর কাঠামো সফলভাবে মেনে চলা প্রথম সংস্থা (বাংলাদেশ ব্যাংক দ্বারা নির্ধারিত একটি কিউআর কাঠামো) ডিমানি আন্তঃব্যবহারযোগ্য কিউআর সরবরাহ করে। গ্রাহকরা ডিজিটাল পেমেন্টের জন্য যেকোনো সেবা প্রদানকারীর কাছেই ডিমানি কিউআর কোডটি ব্যবহার করতে পারবেন। সব ওয়ালেট অ্যাপ কিউআর কোড রিড করতে পারে না’—এমএফএস গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতাটি দূর করে দিয়েছে ডিমানি। আন্তঃব্যবহারযোগ্য ওয়ালেট ট্রান্সফারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের অন্য যেকোনো ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে অর্থ স্থানান্তর (প্রেরণ বা গ্রহণ) করার সুযোগ করে দিয়েছে এটি।

ডিমানি নিরাপত্তা গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গ্রাহকদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে এটি। এক্ষেত্রে ডিমানির প্রাথমিক উদ্যোগ হলো সব প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম কার্যকরী উপাদানগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ চলমান অডিট। এটি বছর পিসিআই-ডিএসএস আইএসও ২৭০০১ সার্টিফিকেট পাচ্ছে এবং বেশ কয়েকটি পয়েন্ট টু পয়েন্ট নিরাপত্তা সুরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করছে।

গ্রাহক অংশীদারদের কথা মাথায় রেখে তৈরি ডিমানি প্ল্যাটফর্মটি অত্যন্ত সুরক্ষিত, মজবুত, পরিমাপযোগ্য সহজেই ব্যবহার উপযোগী। এর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শৃঙ্খলা টিম গ্রাহকের নিরাপত্তা বিশ্বাস সুরক্ষিত রাখতে প্রতিটি পর্যায়ে প্ল্যাটফর্মটিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরীক্ষণ করে। গ্রাহকের তথ্য প্রতিটি পর্যায়ে সুরক্ষিত কোনো তৃতীয় পক্ষকে তা প্রদান করা হয় না। প্ল্যাটফর্মটির সুরক্ষা, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা দৃঢ়তা রক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়। ডিমানি প্ল্যাটফর্মটির পেশাদার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের একটি শক্তিশালী দল রয়েছে, যারা নিরলসভাবে অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা স্তরযুক্ত ডিমানি প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেছেন এবং গ্রাহকদের জন্য নিরাপদ ওয়ালেট সরবরাহ করতে অবিচ্ছিন্ন লেনদেনের সব সম্ভাব্য সমস্যার সমাধান করেছেন।

 

একটি ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি

একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ইকোসিস্টেম হিসেবে কাজ করার জন্য আমাদের একাধিক স্টেকহোল্ডারের মিথস্ক্রিয়ার পাশাপাশি বিধি আইনি কাঠামো, বিজনেস মডেল, উদ্যোক্তা সমাধান নীতিতে আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখা দরকার।

ডিমানি কেবল এমন কোনো ওয়ালেট বা অ্যাপ নয়, যা গ্রাহকদের প্রতিদিনের ডিজিটাল পেমেন্ট জীবনযাত্রার প্রযয়োজনীয়তাগুলো পূরণ করে।

ডিমানির সহপ্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরেফ আর বশির বলেন, ডিমানি ওয়ালেট দিয়ে বাজারের সেবা দেয়ার পাশাপাশি আমরা একটি ডিজিটাল ইকোসিস্টেম নির্মাণের জন্য প্রযুক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছি, যার অধীনে স্টেকহোল্ডাররা একত্র হয়ে একই প্ল্যাটফর্মে নানা ধরনের কাজ করতে পারবেন। আমাদের লক্ষ্য হলো স্টেকহোল্ডারদের আমাদের নেটওয়ার্কে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানিয়ে আন্তঃব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করা, যাতে গ্রাহকরা ডিমানি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত বহু অংশীদারের কাছ থেকে পরিষেবা সুবিধা পেতে পারেন।

ডিমানি ডাক টাকা নামে একটি ডিজিটাল ওয়ালেট পরিষেবা চালু করার জন্য বাংলাদেশ ডাক বিভাগের (বিপিও) সঙ্গে অংশীদার হয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়ের সুবিধাবঞ্চিত জনগণকে ব্যাংকিং সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করতে গ্রামীণ অঞ্চল থেকে ডাক পরিষেবা ডিজিটালি গ্রহণ করতে সহায়তা করবে।

ডিমানি শরিয়াহ অনুসারী গ্রাহকদের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে দেশের প্রথম ডিজিটাল ইসলামী ওয়ালেট চালু করার জন্য আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করেছে।

ডিমানি বিশ্বাস করে, এর মূল প্রতিযোগী হলো নগদ অর্থ বা ক্যাশ দেশে এখনো নিরাপদ ডিজিটাল পেমেন্ট সার্ভিসের ব্যাপক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং সেবার মান বৃদ্ধি মান নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাবনার প্রয়োজন রয়েছে, যার মাধ্যমে গ্রাহকরা নগদ অর্থ থেকে ডিজিটাল কারেন্সির দিকে যেতে অনুপ্রাণিত হবে। নগদ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরের বাধাগুলো অপসারণ করারও দরকার রয়েছে, যেটি ডিমানি প্রতিদিনই করে যাচ্ছে।

ডিমানি নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠী, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর ডিজিটাল লেনদেনে অন্তর্ভুক্তির দিকে মনোনিবেশ করার পাশাপাশি সরকার সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে পরিষেবাগুলো ডিজিটালাইজ করার প্রয়োজনীয়তার দিকে নজর দেয়। এর লক্ষ্য হলো বিষয়টাকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি থেকে নাগরিকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে ঘুরিয়ে দেয়া।

২০১৯-এর আগস্টে এপিএসি বিজনেস ম্যাগাজিনের ফিচারে ২০১৯ সালের শীর্ষ ১০ সবচেয়ে সুবিধাজনক ওয়ালেট-এর তালিকায় ডিমানি স্থান পেয়েছে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়া থেকে স্থান পাওয়া একমাত্র ওয়ালেট ছিল এটি।

বছরের নভেম্বরে ডিমানি -এশিয়া গোল্ড অ্যাওয়ার্ড ২০১৯ (ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন: প্রাইভেট সেক্টর বিভাগ) বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে। প্রতিযোগিতাটি এশিয়ার ২৪টি দেশের টেক জায়ান্টদের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং ডিমানি তার প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে অবদানের জন্য স্বীকৃত হয়েছিল। এটিই সেক্টরে বাংলাদেশের প্রথম গোল্ড অ্যাওয়ার্ড।

 

আরেফ আর বশির: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডিমানি