সোমবার | আগস্ট ১০, ২০২০ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭

বিশেষ সংখ্যা

বেসরকারীকরণ

রাজনৈতিক প্ররোচনা দ্বারা প্রভাবিত

রেহমান সোবহান

বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে আর্বিভূত হয়েছে। এ প্রক্রিয়া শিল্প ও আর্থিক খাতে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ঐতিহ্যগতভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো নির্মাণের মতো বিষয় রাষ্ট্রের অধীনে থেকে গিয়েছিল। প্রক্রিয়াটির বিদ্যমান ডিনামিকস রাজনৈতিক অর্থনীতির শিক্ষার্থী ও উন্নয়ন প্রশাসনসংশ্লিষ্টদের গভীর আগ্রহের বিষয়ও বটে। এ নিবন্ধে বেসরকারীকরণের প্রকৃত অভিজ্ঞতা, সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে।

) বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার

রাষ্ট্রের ভূমিকা

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন সরকারি কর্মকাণ্ড দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। যতক্ষণ অর্থনীতির প্রধান খাত ছিল কৃষি (এবং থাকে), ততক্ষণ এটি অর্থনীতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের অবদান সীমিত করেছে। কৃষির কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে গেছে ব্যক্তিমালিকানার অধীনে; যেমন থাকে ক্ষুদ্র ও গ্রামীণ শিল্প, ক্ষুদ্র বাণিজ্য ও পরিবহন সেবা। এভাবে ১৯৭৪ সালে সরকারি খাতের সম্প্রসারণের সর্বোচ্চ চূড়ায় মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর (এসওই) অবদান দাঁড়িয়েছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ (সোবহান ও আহমেদ)। আমরা যদি অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা যাচাইয়ের আরেক পরিমাপক হিসেবে জিডিপির তুলনায় সরকারি ব্যয়ের অংশ দেখি, তাহলে দেখা যাবে, এক্ষেত্রে অর্থনীতিতে সরকারের অংশ ১৯৭২ সালে ৯ দশমিক ২ থেকে ১৯৯৫-৯৬ সালে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এটি অবশ্য অনেক উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর (এসওই) পরিধি সীমিতকারী কাঠামোগত প্যারামিটারগুলো বাদ দিলেও গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়নে তারা ঐতিহ্যগতভাবে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। উচ্চফলনশীল (এইচআইভি) প্রযুক্তির সম্প্রসারণে সার ও সেচের ব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৬০-এর দশকে দেশে সবুজ বিপ্লব শুরু হয়। প্রযুক্তি বিস্তার, সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে ব্যাপকভাবে ভর্তুকিকৃত মূল্যের সার বণ্টনে বিভিন্ন সরকারি করপোরেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একীভূত গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্র সমর্থিত বিভিন্ন উদ্যোগের অধীনেও রাষ্ট্রীয় তহবিল ব্যবহূত হয়। এর একটা অংশ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ হিসেবেও ব্যবহার হয়। শুরু থেকে রাষ্ট্রীয় খাত জ্বালানি, গ্যাস, নগরে পানি সরবরাহ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন, সড়ক, বিমান ও নদী যোগাযোগ ও টেলিকমিউনিকেশনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। রাষ্ট্রীয় তহবিল প্রধানত সব পর্যায়ের সরকারি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নেও বিনিয়োগ হয়েছে। অর্থনৈতিক পরিসরে ১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকে উল্লিখিত ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকাণ্ড একচেটিয়া অবিতর্কিত বিবেচিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পেশাজীবী (সরকারি ও দাতাদের) দ্বারা নীতি গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত ধারণা ছিল, এসব উন্নয়ন অবশ্যই হতে হবে সরকারি কর্মকাণ্ড ও ব্যয় থেকে।

শিল্পোৎপাদন ও অর্থায়নের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিসর সৃষ্টির ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে পাট ও বস্ত্র খাতের উন্নয়নে পাকিস্তান শিল্পোন্নয়ন করপোরেশনসহ (পিআইডিসি) বিভিন্ন ডেভেলপমেন্ট ফিন্যান্স ইনস্টিটিউট (ডিএফআই) অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এ যৌথ উদ্যোগে ১৯৫০-এর দশকে প্রথমে সূচনা করা হয় অবাঙালি উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং পরে ১৯৬০-এর দশকে বাঙালি উদ্যোক্তা উন্নয়নে ইকুইটি সাপোর্ট ও ঋণ অর্থায়ন শুরু হয়। তত্কালীন পাকিস্তানে— বর্তমানে বাংলাদেশ— সব প্রধান খাত সম্প্রসারণে রাষ্ট্র নেতৃত্বের ভূমিকায় অবর্তীণ হয়। সেই যুগের বিদ্যমান উন্নয়ন প্যারাডাইম থেকে, যা সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অগ্রণী ভূমিকা ন্যস্ত করেছিল, যেখানে ইকুইটি বিনিয়োগকারী হিসেবে ঝুঁকি গ্রহণে ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের অসমর্থ বা অনিচ্ছুক হিসেবে দেখা হয়েছিল। শিল্পোৎপাদন ও অর্থায়নের বাইরে উন্নয়নের অনুঘটক হিসেবে রাষ্ট্রের চরিত্র সহায়তা দাতাদের বিচিত্র রাজনৈতিক প্ররোচনা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল।

শিল্পোন্নয়ন ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের তাত্ক্ষণিক গ্রহণযোগ্যতা ছিল এবং তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) রাষ্ট্রের বড় ভূমিকা পালন করেছে। বিভিন্ন মাধ্যমে বিনিয়োগ এবং ইস্ট পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (ইপিআইডিসি) কর্তৃক স্থাপিত ভারী শিল্প সুরক্ষায় বিশ্বব্যাংক, জার্মানি, জাপান, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া), পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা অর্থায়ন করেছিল।

বাংলাদেশে ব্যক্তি উদ্যোগ উন্নয়নে ডিএফআইয়ের মাধ্যমে তহবিল জোগানে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো বহুপক্ষীয় সংস্থা বড় ভূমিকা পালন করে। অর্থনীতিতে অংশ বাড়াতে ও শিল্পায়নে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় বাঙালি বুর্জোয়াদের উৎসাহিত করতে সরকারি সম্পদ বিনিয়োগ ছিল ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতামূলক একটি কৌশল। ১৯৬০-এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে তত্কালীন বাংলাদেশের প্রধান শিল্প পাটে বাঙালিদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রধান অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে ইপিডিআইসি। ইপিডিআইসি কিছুসংখ্যক প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ইকুইটি বিনিয়োগ করেছিল। এ প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে ডিএফআইগুলোও মেয়াদি ঋণ (টার্ম লোন) দিয়েছিল। ফলে ৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পাটকল সম্ভাবনাময় বাঙালি ব্যবসায়ীদের হাতে ন্যস্ত করা হয়, যাদের বিনিয়োগ ছিল একটি পাটকলের খরচের মাত্র ১০ শতাংশ।

উদ্যোগের উত্তরাধিকার

ব্রিটিশ শাসন থেকে ১৯৪৭-৭১-এর মধ্যকার পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রের নেতৃত্বের ভূমিকা উদ্ভূত হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিসরে অবাঙালি উদ্যোক্তা শ্রেণীর ঐতিহাসিক আধিপত্য থেকে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান শাসন থেকে বাংলাদেশের মুক্তির সময়ে আধুনিক উৎপাদন খাতে মালিকানা কাঠামো ছিল নিম্নরূপ:

ব্যাংকিং, বীমা, জাহাজ, অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন, বিদেশী সহায়তা, ইন্টারউইং বাণিজ্য, অভ্যন্তরীণ পাইকারি বাণিজ্য, বৃহৎ খুচরা কারবারের মতো ক্ষেত্রে ব্যক্তি ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড প্রধানত অবাঙালি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের প্রাক্কালে বাংলাদেশ থেকে এ অবাঙালি ব্যবসায়ী শ্রেণী পাইকারি হারে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এ শ্রেণী নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ছিল। পাকিস্তানি উদ্যোক্তা শ্রেণীর এ অবিবেচনাপ্রসূত তাত্ক্ষণিক চলে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের উদ্যোক্তাশূন্যতা তৈরি করেছিল। এসব অবাঙালি ব্যবসায়ীরা প্রধানত এসেছিল ব্যবসা-বাণিজ্যে পারঙ্গম কিছু জাতিগত সম্প্রদায় থেকে। তাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো ঐতিহ্যগতভাবে পরিচালিত হতো পরিবার নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মাধ্যমে, কেবল প্রধান উদ্যোক্তাই নয়, উপরন্তু ওইসব প্রতিষ্ঠানের উচ্চ থেকে নিম্নপদে নিজেদের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হতো। এভাবে উদ্যোগ সক্ষমতা অলস রেখে, স্বল্প বিনিয়োগ, ইনভেন্টরি প্রভৃতি স্বাধীনতার সময়ে শিল্পগুলো কেবল ভৌতগতভাবে নয়, ব্যবস্থাপনাগতভাবেও পরিত্যক্ত হয়ে যায়। একইভাবে ব্যাংক, বীমা কোম্পানি ও অধিকাংশ বাণিজ্য অর্থনীতি পরিত্যক্ত হয়। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিশীলতা রুদ্ধ করে দেয়।

চলে যাওয়া পাকিস্তানিদের শূন্যস্থান পূরণে অর্থনৈতিক পরিসরে বাংলাদেশের হাতে প্রস্তুত কোনো বাঙালি উদ্যোক্তা শ্রেণী ছিল না। মোট শিল্পসম্পদের মধ্যে বাঙালি উদ্যোক্তাদের অংশ ছিল ১৮ শতাংশ; যাদের অধিকাংশেরই বিনিয়োগ ছিল মূলত পাট ও বস্ত্র শিল্পে। এক দশকের কম সময়ে মাঝারি আকারের উৎপাদন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অধীনে এখানে প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তা শ্রেণীর বিকাশ ঘটে। একটি ক্ষুদ্র শ্রেণীর বাঙালি জনগোষ্ঠী ১৮ শতাংশ আমানতধারী বাঙালি মালিকানার ব্যাংকিং খাতে অগ্রসর হয়; যেখানে পাকিস্তানি মালিকানার ব্যাংকে আমানতের অংশ ছিল ৭০ শতাংশ (সোবহান ও আহমদ)। ১২টি বাঙালি পরিবার বীমা ব্যবসায় নিয়োজিত ছিল, যাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল সংশ্লিষ্ট ব্যবসার খুবই ক্ষুদ্র অংশ। বীমা ব্যবসাও ব্যাপকভাবে পাকিস্তানি কোম্পানিগুলো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল।

রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সম্প্রসারণের পরিপ্রেক্ষিত

পাকিস্তানি উদ্যোক্তাদের চলে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণে সীমিত ব্যক্তি উদ্যোক্তা সক্ষমতার কারণে বাংলাদেশ সরকারকে পরিত্যক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে হয়েছিল। এটি ঐতিহ্যগত বা গতানুগতিক ব্যক্তি উদ্যোগের পরিসরে সরকারি খাতের অসমানুপাতিক সম্প্রসারণ করেছিল। ইপিডিআইসির মালিকানার অধীনে ৩৪ শতাংশ ছাড়াও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সরকার নিজেই আধুনিক শিল্পোৎপাদন সক্ষমতার ৪৭ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছিল। এর মধ্যে ছিল আর্থিক খাত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এস্টাবলিশমেন্ট) বিপুল অংশ।

১৯৭২ সালে রাষ্ট্রীয় খাতের আকার বৃদ্ধিতে সরকারের নেয়া নীতি-আদর্শ বড় ভূমিকা পালন করে। বাঙালি ও অবাঙালি পরিচালিত প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই অধিগ্রহণ করে সরকার। বাঙালিদের পরিচালিত পাট ও বস্ত্র এবং ব্যাংকিং ও বীমা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো অধিগ্রহণ হয় কয়েক মাস পর। বিষয়টি নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বও তৈরি হয়েছিল। বাঙালিদের শিল্পকারখানা অধিগ্রহণ হয়েছিল সম্ভবত ১৯৭২ সালের মার্চে। এটি হয়েছিল জাতীয়করণের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং ২০নং প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের (পিও) অধীনে বিধিবদ্ধ করার মাধ্যমে। এটি অবশ্য স্পষ্ট যে, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বিকাশ শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা দ্বারা সৃষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতি থেকে।

আমাদের যদি পরবর্তী বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করতে হয়, তাহলে অবশ্যই স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় খাতের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করতে হবে। আমরা দেখেছি, স্বাধীনতা-পূর্ব উত্তরাধিকার থেকে রাষ্ট্রীয় খাতের সম্প্রসারণের শুরু। তখন বিদেশী বা অবাঙালি ব্যবসায়ী শ্রেণীর হাতে ছিল ব্যক্তিপরিসরের নিয়ন্ত্রণ, যাদের ত্বরিত প্রস্থান উদ্যোক্তাশূন্যতা সৃষ্টি করে। এ শূন্যতা পূরণ করা হয় রাষ্ট্র ও অনুন্নত বা অবিকশিত বাঙালি ব্যবসায়ী দ্বারা, শিল্প ব্যবস্থাপনায় যাদের প্রকাশ ছিল প্রথম প্রজন্ম স্তরে।

স্বাধীনতা-উত্তর সরকারের কাছে এটি স্পষ্ট ছিল, আদর্শিক প্রভাব যা-ই হোক না কেন, পাকিস্তানিদের রেখে যাওয়া ৭২৫টি উদ্যোগ-প্রতিষ্ঠানের ওপর নিজেদের দায়িত্ব বা কর্তৃত্ব বজায় রাখার কোনো উপায় নেই। প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারে উৎপাদন খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের পরিধির সংজ্ঞায়ন পরিত্যক্ত উদ্যোগগুলো অধিগ্রহণ ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন টাকার অধিক স্থির বা স্থাবর সম্পদের অধিকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র অধিগ্রহণ করেছিল ২ হাজার ৬৩০ মিলিয়ন টাকার সমমূল্যের ২৬৩টি প্রতিষ্ঠান। ২৫৬ মিলিয়ন টাকার সম্পদমূল্যের ৪৬২টি প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রকে ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দিতে হয়েছিল। এছাড়া সংশ্লিষ্ট উৎপাদন এস্টাবলিশমেন্টের মধ্যে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনের অধীনে পাকিস্তানি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। সরকার সেগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রাখার পর্যায়ে ছিল না। কাজেই স্বাধীনতা-উত্তর সরকার সম্পূর্ণ নির্বিচারে এমনকি পান দোকান পর্যন্ত জাতীয়করণ করেছিল, এ জনপ্রিয় বয়ানের ভিত্তি নেই। এ বয়ানে রাষ্ট্রের নীতি কিংবা তখনকার সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন নেই।

যুদ্ধের কারণে অবকাঠামোর বিপুলাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতার তাত্ক্ষণিক পরে বন্ধ কলকারখানার কর্মীরাও খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হয়। তখন সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল মানুষকে বাঁচানো এবং শ্রমিক ও ভোক্তাদের মৌলিক চাহিদা মেটানো। ওই পর্যায়ে মালিকানা প্যারামিটার কিংবা ব্যবস্থাপনা নীতিমালা নির্ধারণে কোনো নির্দেশনা বা কৌশল ছিল না। পরিত্যক্ত ইউনিটগুলোর বিপুলাংশ জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত সেসব প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ ভাগ্য নির্ধারণের জন্য পিও ২৭-এর অধীনে একটি নীতি কাঠামো প্রণয়ন করা হয়। পিও ২৭ কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সীমানা সম্প্রসারণ করেনি; উপরন্তু স্বল্প সময়ের জন্য সরকারি প্রশাসনের অধীনে থাকা ইউনিটগুলো ছেড়ে দেয়ার প্রধান কাজটিও সরকারের ঘাড়ে বর্তায়।

তবে বৃহৎ ঋণে জর্জরিত, ইনভেন্টরিবিহীন ও দুর্বল ব্যবস্থাপনায় থাকা বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান সরকারি প্রশাসনের অধীনে আনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বিশ্বব্যাংকের প্রাইভেটাইজেশন ডিভিশন যেমন ভেবেছিল তার চেয়ে কঠিন ছিল। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে এসব শিল্প ইউনিট তত্কালীন সরকারের সাহায্যপ্রাপ্ত নানা মানুষের সাময়িক ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। এসব ইউনিটের অনেকগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নিযুক্ত প্রশাসকের অধীনে রাখা হয়। এসব প্রশাসকের কেউ কেউ ছিলেন সরকারি চাকুরে, কেউ কেউ ছিলেন তখনকার সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। কিছু দেয়া হয় পরিত্যক্ত প্রতিষ্ঠানের তত্কালীন মালিক দ্বারা নিয়োগ পাওয়া জুনিয়র ম্যানেজারদের ব্যবস্থাপনায়। এমনকি কিছু কারখানা পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় সংশ্লিষ্ট কারখানার শ্রমিকদের।

অস্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপকদের নৈপুণ্যের দুর্বলতা ছিল মিশ্র। ওই সময় ভীষণ জটিল বাস্তবতায়ও কিছু ব্যবস্থাপক খুব ভালো করেছেন। কেউ কেউ খুবই খারাপ করেছেন হয় অনভিজ্ঞতা বা দুর্নীতি অথবা উভয়ের কারণে। এসব ব্যবস্থাপকের কারো কারো লুণ্ঠন প্রবণতাই তত্কালীন সরকারকে প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে উদ্ভুধ করার অন্যতম কারণ। সব ইউনিটের মধ্যে জাতীয়করণকৃত ইউনিটের স্থির সম্পদমূল্য ছিল ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন টাকার সমপরিমাণ। বৃহৎ পাট ও বস্ত্র কারখানা কিংবা দাউদ গ্রুপের মালিকানায় কর্ণফুলী কাগজ মিলের মতো ইউনিটের অনেকগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিপুল অবদান রেখেছে। সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এসব উচ্চ উৎপাদন সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি পাবলিক বডির অধীনে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিতদের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১১টি সেক্টর করপোরেশন স্থাপন করা হয় এবং জাতীয়করণকৃত ২৬৩টি পরিত্যক্ত প্রতিষ্ঠান এসব করপোরেশনের অধীনে আনা হয়। এর মধ্যে ইপিডিআইসির মালিকানায় থাকা ৫৩টি প্রতিষ্ঠান, পাট ও বস্ত্র খাতের বাঙালি মালিকের ৭৫টি প্রতিষ্ঠান ও বাঙালি মালিকের একটি চিনিকলও ছিল।

বলা হয়, পরিত্যক্ত ইউনিটগুলোর সেক্টর করপোরেশনের মালিকানার আওতায় এনে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার এ একক কাজটি একসময়ের টেকসই পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসায়িক বিভাজন থেকে বাঁচিয়েছে। এসব ইউনিটের অনেকগুলো (একসময় সরকারি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে রেখে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছিল; কারণ সেগুলোয় পাকিস্তানি মালিকরা নতুন বিনিয়োগ করেনি) তাদের মুনাফা পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়মিত পাঠাত। তবে করপোরেশনের অধীন সব ইউনিটই কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়নি; যেমনটি আগের মালিকদের অধীনে পরিচালিত হয়েছিল। নতুন ব্যবস্থাপকরা অভিজ্ঞতার ঘাটতি ও কিছু ক্ষেত্রে মালিকদের প্রণোদনার ঘাটতিতে ভুগছিল। কিন্তু এটি ছিল ব্যতিক্রম এবং অনেক প্রতিষ্ঠানই প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানি মালিকদের চেয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনার অধীনে অতিরিক্ত বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি, এমনকি অধিক পেশাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার দিক থেকে উন্নতি করেছে। ভীষণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও প্রাথমিক বছরগুলোয় অনেক করপোরেশনের নির্বাহী ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকরা ব্যাপক ত্যাগ ও দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে কোনো বস্তুগত প্রণোদনা ছাড়া দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কাজ করেছেন।

) বেসরকারীকরণে বাংলাদেশের অ্যাপ্রোচ

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে পরিবর্তনশীল দৃষ্টিভঙ্গি

স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর রেকর্ড নৈপুণ্য বরং ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা ও সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শাসনক্ষমতা পরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে জনবয়ানে বদলে যায়। তখন থেকে একটি জনপ্রিয় ধারণার সূচনা হয়, করপোরেশনের অধীন সব প্রতিষ্ঠান খারাপ করেছে সেগুলো সরকারি মালিকানায় রাখার কারণে। এ জনধারণা— যেটি ১৯৭০-এর মাঝামাঝি থেকে তৈরি হয়েছে— উত্তরসূরি নীতিনির্ধারকদের নীতি ওরিয়েন্টেশনে গেঁথে গেছে, যারা নিজেরাই তর্ক তোলা শুরু করল, সব রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানই খারাপ পারফরমেন্স করছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন করপোরেশনের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্য, বাস্তব অর্থনৈতিক নৈপুণ্য বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার পার্থক্যসহ বাজার ব্যবস্থা ও পরিচালনগত পরিবেশ বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এ দৃষ্টিভঙ্গি বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থা থেকে উদ্ভূত উন্নয়নমূলক ভিশনে পরিবর্তন দ্বারা পুনরায় শক্তিশালী হয়; যারা বলতে শুরু করে, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যক্তিখাতে ছেড়ে দিয়ে সরকারের ‘ব্যবসা’ প্রত্যাহার করা উচিত। এ দৃষ্টিভঙ্গি ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘ব্যুরোক্র্যাটস ইন বিজনেস’ গবেষণার মাধ্যমে আরো প্রতিষ্ঠিত হয়।

বেসরকারীকরণ নীতির বিবর্তন

বাংলাদেশের বেসরকারীকরণ নীতির বিবর্তন ১৯৭৫-পরবর্তী শাসনক্ষমতা পরিবর্তনের ফল এবং ওই বিষয়ে দাতা সংস্থাগুলোর চিন্তার ক্রমবদলে প্রতিফলিত হয়। ১৯৫০-৬০-এর দশকে পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগগুলোর ক্ষেত্রে নেয়া রাষ্ট্রীয় নীতি বাস্তবভিত্তিক ছিল। পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রীয় খাতে অ্যাপ্রোচ ছিল শিল্প স্থাপন, যেখানে ব্যক্তি উদ্যোগ তখনো আসেনি এবং ব্যক্তি এজেন্টের কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণের চল শুরু হয়নি। পাকিস্তানে একটি পাট শিল্প স্থাপনের ইপিডিআইসির জোর প্রচেষ্টা সে সময়ের নেতৃস্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে সংস্থাটির অংশ বিনিময়ে পর্যবসিত হয়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোয় বৃহৎ সরকারি প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী পেপার মিল বাজারমূল্যের কম দামে (সাব-মার্কেট প্রাইস) পাকিস্তানি নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ী পরিবার দাউদ গ্রুপের কাছে বিক্রি করা হয়। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে বস্ত্র ও চিনি খাতের কিছু ইউনিট বাঙালি উদ্যোক্তাদের কাছে ছেড়ে দেয়া হয়। স্বাধীনতা অর্জনের তাত্ক্ষণিক পরের নীতি অল্প সময়ের জন্য অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় খাতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। অবশ্য এমনকি এ সময়েও আমরা দেখেছি, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রের প্রাধান্য প্রধানত আদর্শের চেয়ে ঐতিহাসিক পরিস্থিতি দ্বারা অধিক অনুপ্রাণিত ছিল।

প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার ২৭-এ অন্তর্ভুক্ত না হওয়া বিনিময় প্রক্রিয়া (ডাইভেস্টমেন্ট প্রসেস) ১৯৭২ সালে শুরু হয়। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭২-৭৫ সালের মধ্যে ৪১ মিলিয়ন টাকার বিক্রয়মূল্যের ১১৪টি ইউনিট ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়। গড়ে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার সমপরিমাণ মূল্য নিয়ে এগুলো ছিল ক্ষুদ্র ইউনিট। ১৯৭০-এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে এ বিনিময় প্রক্রিয়া আরো জোরালো হয় জুট স্পিনিং মিল ও বিশেষায়িত বস্ত্র ইউনিট ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। এটি এজন্য করা হয়, যাতে সেগুলো ১৯৭২ সালের মার্চের জাতীয়করণ আদেশে কভার করা হয়; যা সম্প্রসারিত ছিল কেবল পাট ও বস্ত্র কারখানার ক্ষেত্রে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশ সরকারের অ্যাপ্রোচ ছিল, ডিএফআইয়ের মাধ্যমে মেয়াদি ঋণ প্রদানপূর্বক সরাসরিভাবে ব্যক্তি উদ্যোগ উন্নয়ন; যা বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও অন্য দাতাদের কাছ থেকে ঋণ নেয়ারও পূর্বশর্ত ছিল। এ অ্যাপ্রোচ ব্যক্তি উদ্যোগ উন্নয়নে সক্রিয় আনুষ্ঠানিক নীতির সঙ্গে একটি সম্প্রসারিত রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সহাবস্থান নিশ্চিত করেছিল।

জিয়াা শাসনামলের শেষের দিকে একসময় বাংলাদেশীদের মালিকানায় থাকা পাট ও বস্ত্র কারখানাগুলো আবার ফিরিয়ে নেয়ার আলোচনা শুরু হয়, যেগুলো পিও ২৭ অর্ডারের অধীনে জাতীয়করণ করা হয়েছিল। ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে একপর্যায়ে বলা হয়েছিল, ১৯৭২ সালের মার্চে বাঙালিদের কাছ থেকে জাতীয়করণকৃত পাটকলগুলো নিজ নিজ মালিকদের ফিরিয়ে দেয়া হবে। তবে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের অধীনে যখন ১৯৭৯-৮০ সালে পাটকলগুলো ১ হাজার ৬২ মিলিয়ন টাকা ও ১৯৮০-৮১ সালে ৩৩৮ মিলিয়ন টাকার মুনাফা করে, তখন সরকারের এ অবস্থান কিছুটা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। 

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বেসরকারীকরণ নীতিতে এসওই খাতকে ছেড়ে দেয়া হয়, যা করপোরেশনের অধীনে মুনাফা করছিল। এমন অ্যাপ্রোচের অধীনে সব খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগ নির্দেশ করে, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও বাজার সুবিধা নিয়ে সেগুলো লাভজনক হতে পারে। এ ধরনের নীতি ব্যবস্থায় এটি বিস্ময়কর ছিল না, বেসরকারীকরণ কোনো তাত্পর্যপূর্ণ মোমেন্টামের রূপ গ্রহণ করেনি। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার পর, যখন বিএনপি ১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থান দ্বারা ক্ষমতা থেকে অপসারিত হয়, আক্ষরিক অর্থে আওয়ামী লীগ আমলের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আলোচ্য শাসনামলের সব এসওই প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের মধ্যে রয়ে যায়। একইভাবে ১৯৭২ সালে অধিগ্রহণ করা সব ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিও রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থেকে যায়। ব্যক্তিমালিকানার কিছু ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির উত্থানের মধ্য দিয়ে এসওই খাতের সংরক্ষণের মর্যাদা শিল্পে ব্যক্তিগত উদ্যোগের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে। ব্যক্তি উদ্যোগে পৃষ্ঠপোষকতা জোগানোর এসব প্রচেষ্টা ১৯৮২ সালে আধুনিক শিল্প ও আর্থিক উভয় খাতে রাষ্ট্রীয় খাতকে প্রাধান্যমূলক উদ্যোক্তা হিসেবে রেখে দেয়।

কৃষি খাতে ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে বিশ্বব্যাংক ও ইউএসএইডের সহায়তা গ্রহণের শর্ত হিসেবে বাংলাদেশ সরকারকে কৃষি উপকরণ (ইনপুট) বণ্টন বেসরকারীকরণে চাপ দেয়, যেখানে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) একচেটিয়া প্রভাব ছিল। ১৯৮০-এর দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া ত্বরায়নে বাংলাদেশের ব্যক্তিখাতের দিক থেকে কোনো তাত্পর্যজনক চাপ ছিল না। ডিএফআইয়ের উদার ঋণ প্রদান নীতির মধ্য দিয়ে ব্যক্তি উদ্যোগে যুক্তরা গ্রিনফিল্ড এন্টারপ্রাইজে বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিল। অন্যদিকে পাট ও বস্ত্র কারখানার বাঙালি মালিকরা কখনো তাদের জাতীয়কৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর রিটার্ন ছেড়ে দেয়নি, যাদের অধিকাংশই ব্যবসার অন্য ক্ষেত্রগুলোয় চলে গিয়েছিল এবং তাদের কারখানাগুলো অত্যধিকভাবে বেসরকারীকরণ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

বিনিময় প্রক্রিয়া (ডাইভেস্টমেন্ট) থেকে বেসরকারীকরণ

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের শুরু থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত (জিয়াউর রহমানের শাসনামলও অন্তর্ভুক্ত) ৫২৯ মিলিয়ন টাকার বিক্রয়মূল্যের ২৪৭টি পরিত্যক্ত প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগ বেসরকারীকরণ হয়। এসব বিক্রির মাধ্যমে ইউনিটপ্রতি মূল্য আসে ২ দশমিক ১ মিলিয়ন টাকা, যা নির্দেশ করে, প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশই এখন বেসরকারীকরণ হচ্ছে। অবশ্য জিয়াউর রহমানের পুরো আমলেই অধিকতর বৃহৎ ইউনিটগুলো সেক্টর করপোরেশনের অধীনে থেকে যায়। এভাবে বিনিময় প্রক্রিয়া প্রকৃত অর্থে শুরু হয়, ১৯৮২ সালের মার্চে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল এরশাদের শাসনক্ষমতা দখলের সময় থেকে। ১৯৮২-৯১ দশকে কেবল ১২৫টি প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেয়া হয় বা বিনিময় করা হয়। তবে প্রতি ইউনিট ১০ দশমিক ১ মিলিয়ন সম্পদমূল্য নিয়ে এসব ইউনিটের মূল্য ছিল ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন টাকা। এটি ইঙ্গিত করে, বেশির ভাগ সেক্টর করপোরেশন থেকে প্রাপ্ত আরো বড় আকারের প্রতিষ্ঠান বিনিময়ের জন্য রাখা হয়েছিল।

বাংলাদেশে বেসরকারীকরণের প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে এরশাদের আমল থেকে শুরু হয়েছিল, যখন প্রথমবারের মতো পিও ২৭-এর অধীনে যেসব প্রতিষ্ঠান সরাসরি সরকারের মালিকানায় আনা হয়েছিল, সেগুলো ব্যক্তিক্রেতাদের কাছে ছেড়ে দেয়া হয়। ওই সময়ের আগে এসওই খাতে শ্রেণীবদ্ধ ৩৬১টি প্রতিষ্ঠান যতটা বেসরকারীকরণ হয়েছিল বা অযথাযথভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়েছিল, সেগুলো তাদের সাবেক মালিকদের কাছে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। এভাবে সরকার দ্বারা পরিচালিত পরিত্যক্ত ইউনিটগুলোর বিনিময় ধাপ ও রাষ্ট্রায়ত্ত আইনগত মালিকানার অধীনে এসওইগুলোর বাস্তবিক বেসরকারীকরণের মধ্যে ১৯৮২ সাল একটি বিভাজক রেখা হিসেবে কাজ করে।

এখন পর্যন্ত সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা ইউনিটগুলোর বেসরকারীকরণে এরশাদ সরকারের সিদ্ধান্ত অবশ্য কোনো স্পষ্ট নীতি ভিত্তি থেকে আসেনি। এক্ষেত্রে ১৯৮২ সালের নতুন শিল্পনীতি (এনআইপি) ও বিশ্বব্যাংকের স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট রিফর্মসের (এসএআর) ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এটি ছিল প্রথম সামগ্রিক নীতি বিবৃতি, যা কেবল ব্যক্তিখাত উন্নয়নে একটি নীতির কথাই বলেনি; উপরন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেসরকারীকরণে একটি পাসিং রেফারেন্সও তৈরি করেছিল। এনআইপি কোন ক্ষেত্রগুলো বেসরকারীকরণে উন্মুক্ত হবে এবং কোন খাতগুলো সরকারি মালিকানায় থাকবে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো নীতি নির্দেশনা দেয়নি। সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগের বেসরকারীকরণের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল অস্থায়ী ভিত্তিতে, যা প্রতিষ্ঠানবিশেষের নির্বাহী আদেশ কিংবা বিশ্বব্যাংক ও এডিবি থেকে সুনির্দিষ্ট ঋণের সঙ্গে সংযুক্ত নীতি শর্ত থেকে এসেছে।

জাতিগত বিনিময় প্রক্রিয়া

১৯৮২ সালে প্রথম বড় ধরনের বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৭২ সালের মার্চের রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত বাঙালি মালিকানার পাট ও বস্ত্র কারখানা ফিরিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে। এসব নির্বাহী সিদ্ধান্তের নীতিভিত্তি অপরিষ্কার রয়ে যায়, যেহেতু বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক যুক্তিবাদের বিপরীতে জাতিগত ভিত্তির নিরিখে প্রয়োগ হয়েছিল। যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হতো যদি পাট ও বস্ত্র শিল্প বিরাষ্ট্রীয়করণের বৈধতা প্রদান এবং এ দুই শিল্পের সব ইউনিট ব্যক্তিবিনিয়োগের জন্য রেখে দেয়া হতো। ১৯৮২ সালে পাট ও বস্ত্র শিল্প একাই উৎপাদন খাতে প্রায় ৬০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করেছিল। কাজেই এসব ইউনিট বেসরকারীকরণের যেকোনো সিদ্ধান্ত আধুনিক শিল্প খাতের মালিকানা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করত। তবে সরকার কেবল বাঙালি ইউনিটগুলো তাদের আগের মালিকের কাছে ছেড়ে দিয়েছিল। সরকারের এ সিদ্ধান্ত বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক বিডিং বা নিলামের প্রকাশ ঘটায়নি। এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়নি প্রাক্তন মালিকরা এখনো ব্যবসায় আছেন কিনা বা তারা এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ফিরতে আগ্রহী কিনা, এমনকি তারা বেঁচে আছেন কিনা।

প্রাক্তন মালিকদের শিল্পে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তে ১৯৭১ সালে পরিত্যক্ত হওয়া একই প্রতিষ্ঠানগুলোয় আগের পাকিস্তানি মালিকদের মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি যুক্ত থাকতে পারত। এরশাদ সরকার ধারণা করেছিল, স্বাধীনতার এক দশক পর ১৯৮৪ সালে এমনকি সামরিক শাসনের সময়েও এ ধরনের সিদ্ধান্ত কিছু রাজনৈতিক উত্তাপ বা উন্মাদনা তৈরি করতে পারে। তবে এ প্রপোজিশন কেবলই অনুমাননির্ভর; যেহেতু তখনকার সরকার এসব বিষয় কখনও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেনি, কেন তাদের বেসরকারীকরণের সিদ্ধান্ত কেবল বাঙালি মালিকানার শিল্পগুলোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল। এ ধরনের বিনিময় প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়েই সম্ভবত বিরল। এসওই খাত তৈরিতে মালয়েশিয়ার নীতি তখনকার বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত নীতির কাছাকাছি ছিল। বিদ্যমান বিশ্ব ব্যবস্থায় অবশ্য বৈষম্য ও মানবাধিকারের ইস্যু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বিদ্যমান বিশ্ব রীতিনীতির অধীনে এ ধরনের জাতিভিত্তিক বিনিময় প্রক্রিয়ার বৈধতা কেবল রাজনৈতিকভাবেই অস্থায়িত্বশীল হতে পারে না; উপরন্তু বৈষম্যমূলক ও সমতাপূর্ণ বাণিজ্যের প্রতিকূল হওয়ায় ডব্লিউটিএর দিক থেকে আইনগতভাবেও চ্যালেঞ্জেরও সম্মুখীন হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য সৌভাগ্য হলো, কোনো প্রাক্তন পাকিস্তানি মালিকই জাতিগতভাবে চালিত সরকারের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করেনি কিংবা আদালতের মাধ্যমে নিজেদের শিল্পে মালিকানা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা নেয়নি। অবশ্য ওই সময়ে কিছু পাকিস্তানি তাদের প্রতিষ্ঠানের রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা যাচাইয়ে বাংলাদেশে এসেছিল। এভাবে তত্কালীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কাছে ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তানিদের কমই বিনিয়োগ বা প্রচেষ্টা ছিল, বিশেষ করে যেগুলো এরই মধ্যে বাংলাদেশের সানসেট ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে বিন্যস্ত হয়েছিল।

সমকালীন যুগে বেসরকারীকরণ

আজ ব্যক্তি উদ্যোগ বেসরকারি বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দিকেও এগিয়েছে। বেসরকারি ও সরকারি উদ্যোগ জনপরিসরে একই সঙ্গে অবস্থান করছে। স্পষ্ট নীতি নির্দেশনার অভাবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও আধা সরকারি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষাবিদরা ও বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে যুক্ত চিকিৎসকরা প্রকাশ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা দিচ্ছে, যেখানে তারা সরকারি কোষাগার থেকে বেতন তুলছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সরকারি অবকাঠামো ব্যবহার করে ব্যবসা করার সুযোগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে উন্মুক্ত হয়েছে। টেলিকমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে সেলুলার ফোনের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফ্র্যাঞ্চাইজ দেয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিকম ব্যবস্থার লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত। এ খাতের নেতৃত্ব গ্রহণ করে বিশ্বখ্যাত গ্রামীণ ব্যাংক, যা গ্রামীণ এলাকায় সেলুলার ফোনসেবা প্রবর্তনে নরওয়ের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিকম কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে ব্যবসায় প্রবেশ করেছিল। গ্রামীণ টেলিকম সেবার ব্যয় কমাতে বাংলাদেশ রেলওয়ের ফাইবার অপটিক টেলিকমিউনিকেশন সংযোগের অলস ক্যাপাসিটি ব্যবহার করেছে।

বাংলাদেশ সরকার নিজেই বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বেসরকারি বিদেশী বিনিয়োগ আনতে উৎসাহ জুগিয়ে চলেছে। ১৯৯৭ সালে সুনির্দিষ্ট বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড স্থির ও বার্জ মাউন্টেড বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে চুক্তি সই করেছে, যেখানে সরকার একটি নির্দিষ্ট দামে বেসরকারি উৎপাদকদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিদ্যুৎ সঞ্চালন এখনো রয়ে গেছে সরকারের অধীনে। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিরীক্ষামূলক ভিত্তিতে ব্যক্তি খাতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন হচ্ছে। কিছু ব্যক্তি এজেন্ট কিংবা বিদ্যুৎ বোর্ডের কর্মচারীদের এ সুযোগ দেয়া হয়েছে।

বিদ্যমান ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যা এককভাবে সরকারি খাতে রেখে দেয়া হয়েছে। গণপরিসরে ব্যক্তিখাতের প্রবেশকে সরকারের দিক থেকে কোনো নীতির অংশ নয়, মেধা হিসেবেই দেখা হয়।

) বেসরকারীকরণ-পরবর্তী নৈপুণ্য

অদৃশ্য প্রাইভেটিয়ার

সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে শ্রমবিভাজন সংজ্ঞায়নে সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনার অনুপস্থিতিতে ব্যক্তিখাতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ সীমিত থেকে যায়। তবে এ উন্মুক্ত পরিবেশে ব্যক্তিখাতের নৈপুণ্য সম্পর্কে খুবই কম জানা যায়; বিশেষ করে একসময় সরকারি খাতের অধীনে থাকা ক্ষেত্রগুলোয় ব্যক্তির পারফরমেন্স কেমন, তা জানা যায় না। এ নিবন্ধের বাকি অংশে আমরা বেসরকারীকৃত ইউনিটগুলোর পারফরমেন্স বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি। এ চেষ্টা অবশ্য বেসরকারীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রাপ্ত সীমাবদ্ধ তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে।

১৯৯১ সালের মার্চ পর্যন্ত ৫০৫টি প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারিকরণ করা হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি করার ফলে ওইসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফল কী, তা নির্দেশকারী কোনো দলিল বা তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। বেসরকারীকরণ এজেন্ডা বাস্তবায়নে চাপ দেয়া দাতা সংস্থাগুলোর দিক থেকেও তাদের যুক্তির বৈধতা প্রতিষ্ঠায় বেসরকারীকৃত প্রতিষ্ঠানের ভাগ্য নির্ণয়ে কোনো অভিজ্ঞতালব্ধ গবেষণা হয়নি; সরকারের প্রতি যাদের স্বতঃসিদ্ধ পরামর্শ ছিল, বেসরকারীকরণ ক্ষুদ্র পরিসরে প্রতিষ্ঠান ও বৃহৎ পরিসরে অর্থনীতি উভয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক নৈপুণ্যের উন্নয়ন ঘটাবে।

বাংলাদেশ সরকার মনে হয় এ সাধারণ বিশ্বাস দ্বারা অগ্রসর হয়েছে, একবার যে ইউনিটটি বেসরকারি করা হয়েছে, তাতে কী ঘটল, তা নিয়ে তাদের আর মাথা ঘামানোর কোনো দরকার নেই। এ অবস্থান কিছুটা এ বিষয়ের দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য, বেসরকারীকৃত ইউনিটের চুক্তিবদ্ধ ব্যয়ে একটি ডাউন পেমেন্ট প্রদানের মাধ্যমে বিনিময়কৃত প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিশ্চিত করা হয়েছে। এভাবে এসওইগুলোর ক্রেতাদের কাছ থেকে বিক্রয়মূল্যের অনাদায়ী অর্থ সংগ্রহ করতে বাংলাদেশ সরকার চলমান দায়িত্ব ধরে রেখেছে। এদিকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বিনিময়কৃত বা ছেড়ে দেয়া এসওইগুলো বিক্রির অবশিষ্ট অর্থ পরবর্তী সময়ে পরিশোধ করা হয়েছে (৪০ মিলিয়ন টাকার বিক্রয়মূল্যের ৮ শতাংশ বাকি পড়েছিল)। ১৯৮১-৯১ সালের মধ্যে বিক্রি হওয়া এসওইগুলোর ২৬৭ মিলিয়ন টাকার বিক্রয়মূল্যের বাকি থাকা ২১ শতাংশ অর্থ এখনো সংগ্রহ করা যায়নি। রাষ্ট্রের বিচিত্র বাধ্যবাধকতার নিরিখে এটি বড় সংখ্যা না হলেও বাংলাদেশ সরকার এসব বেসরকারীকৃত প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে উদাসীন বা নিরুদ্বেগ থাকতে পারে না, এমনকি সেগুলো এখন ব্যক্তিমালিকানায় থাকলেও।

অবশ্য সেলস ডিউর চেয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে অধিকতর ভয়াবহ উদ্বেগ হলো, বেসরকারীকৃত অধিকাংশ এসওই এনসিবির কাছে ওভারড্রাফট রেখেছিল। এসওইর বেসরকারীকরণ মূল্য হিসেবে সরকার কর্তৃক নির্ধারণকৃত সাব-মার্কেট প্রাইসের দায় রাষ্ট্র প্রধানত ব্যক্তিক্রেতার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এভাবে এনসিবি ও ডিএফআইগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্র অধিকাংশ ছেড়ে দেয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি চলমান সম্পর্ক বজায় রেখেছে, যতক্ষণ তারা সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়দেনা পরিশোধ না করে। অভিজ্ঞতালব্ধ গবেষণায় এখন কিছু কারণিক প্রমাণ আছে, বিনিময়কৃত এসওইগুলোর বহন করা ঋণ দায় ও ব্যক্তিক্রেতার মেয়াদ আরো বৃদ্ধি পাওয়া ঋণ এনসিবির কাছে অনাদায়ী রয়ে গেছে। এভাবে অনাদায়ী অর্থ আদায় ও ব্যক্তিমালিকানার অধীনের অধিক কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত উভয় দিক থেকে বেসরকারীকরণ-পরবর্তী নৈপুণ্যে সরকার একটি অংশ ধরে রাখে। প্রধানত গৌণ তথ্য ব্যবহারে গত দশকে মাত্র গুটিকয়েক গবেষণা প্রবন্ধে বেসরকারীকরণের প্রভাব পর্যালোচনার চেষ্টা করা হয়েছে এবং তাও সীমাবদ্ধ থেকে ক্ষুদ্র পরিসরের কিছু শিল্পের ক্ষেত্রে (সোবহান ১৯৯৩)। ফলে পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা ও মৌলিক তথ্যের অনুপস্থিতিতে বেসরকারীকৃত ইউনিটগুলোর নৈপুণ্য সম্পর্কে একটি সমাপ্তিমূলক সিদ্ধান্তে পৌঁছা কঠিন।

বেসরকারীকরণে ধীরগতি

বেসরকারীকরণের ফলাফলের ওপর কোনো প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও আলোচ্য প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশ সরকারের ওপর দাতাদের দিক থেকে চাপ অব্যাহত থাকে। প্রকৃত বিষয় হলো, বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে বিএনপি সরকার কর্তৃক মাত্র ছয়টি ইউনিট বেসরকারিকরণ করা হয়। দাতাদের মধ্যে একটি ধারণা ছিল, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নতুন নির্বাচিত বিএনপি সরকার বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সক্ষম নয়। সরকারের সদিচ্ছা বা সামর্থ্যের ওপর এ অসমর্থনযোগ্য ধারণা সেক্টর করপোরেশন ও এনসিবির অধীনে থাকা বাকি এসওইগুলোর বেসরকারীকরণ ত্বরান্বিত করতে বিশ্বব্যাংক থেকে আরো চাপ আসে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বেসরকারীকরণের জন্য বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়।

১৯৯০-এর দশকে ১৯৮০-এর দশকে এরশাদের আমলে ব্যাপকভাবে নেয়া বেসরকারীকরণ অ্যাপ্রোচের নৈপুণ্য নির্ণয়ে বাংলাদেশ সরকারের ব্যর্থতা বাংলাদেশী দাতাদের কাছে কিছুটা ধোঁয়াশা হিসেবে রয়ে যায়। আবার ১৯৯০-এর দশকে বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া ধীর হওয়ার বিদ্যমান অবস্থা তদন্ত ছাড়া বিশ্বব্যাংক যুক্তি দিল, একজন অবসরপ্রাপ্ত আমলার নেতৃত্বাধীন প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড (পিবি) গঠন করলে বেসরকারিকরণ গতি পাবে। একটি ধারণা প্রচার করা হয়েছিল, ব্যক্তিখাত থেকে আসা পিবির প্রধান নির্বাহী অধিক দক্ষ ও কার্যকরভাবে এসওইগুলো বেসরকারি করতে পারে।

১৯৯৬ সালের জুনে নতুন নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার পিবির চেয়ারম্যান হিসেবে একজন খ্যাতিমান ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেয়। এ ভদ্রলোক একটি বিধিবদ্ধ বডির জন্য সত্যিই অভিনব। তাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দেয়া হয় এবং নিজের ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দেয়া হয়। একই সঙ্গে বোর্ডের সাম্মানিক (অবৈতনিক) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনেরও সুযোগ দেয়া হয়। নতুন চেয়ারম্যান বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার প্রতিশ্রুতি ও সেক্টর করপোরেশনের অধীনে থাকা বড়সংখ্যক ইউনিট তাত্ক্ষণিকভাবে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেন, যেগুলোর বেশকিছু ছিল লাভজনক প্রতিষ্ঠান।

দাতাদের চাপে নেয়া উত্তরসূরি সরকারগুলোর অ্যাপ্রোচ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়ার গতি পুরোপুরি সরবরাহচালিত ও প্রতিটি সরকারের ইচ্ছা দ্বারা তাড়িত। বিনিময়কৃত এসওইগুলোর সম্ভাবনাময় ক্রেতাদের চাহিদার নিবিড়তা সম্পর্কে কমই মনোযোগ দেয়া হয়েছে। সীমিত মেধাবী ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগযোগ্য সম্পদের ঘাটতির কারণে এসব ব্যক্তিক্রেতা যে খুব কমসংখ্যক হতে পারে, এ সম্ভাবনা সম্পর্কে তেমন চিন্তা ছিল না। প্রকৃতপক্ষে যদি এসব সম্পদ হাতে থাকে, তাহলে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগকারীরা কেন পুরনো যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত, ঋণ ও সমস্যায় জর্জরিত পুরনো ইউনিটের বিপরীতে গ্রিনফিল্ড (নতুন) উদ্যোগে বিনিয়োগ করবে না, সেটিও বিবেচনার বিষয়। চাহিদা-দিক প্রতিবন্ধকতার ওপর প্রতিফলনে ঘাটতি দাতাদের এ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়, বাংলাদেশ সরকার ছেড়ে দেয়া ইউনিটগুলোর দাম কমিয়েছে কিংবা তাদের দায় থেকে মুক্তি দিয়েছে। বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে সিদ্ধান্ত নেয়ায় নির্বাচিত সরকারের ব্যর্থতাকে তখন ব্যাখ্যা করা হয় ইচ্ছার ব্যর্থতা হিসেবে। যেকোনো মূল্যে এসওইগুলোকে মুক্তি দিতে আবারো দাতাদের চাপে বর্তমানেও সরকার বেসরকারীকরণের এই একমাত্রিক অ্যাপ্রোচ চালু রেখেছে।

বেসরকারীকরণের ফলাফলের ওপর বিআইডিএসের সমীক্ষা-১৯৯৭

নতুন সরকার ও পিবি এখনো বেসরকারীকৃত ইউনিটগুলোর ভাগ্য সম্পর্কে গভীর অজ্ঞতায় রয়ে গেছে, যারা তাদের বেসরকারীকরণ-পরবর্তী নৈপুণ্য নিয়ে সরকার, ব্যাংকার কিংবা গবেষকদের কাছে কমই স্বচ্ছতা বা জবাবদিহিতা দেখিয়েছে। এসব কোম্পানি পরিদর্শনে পরিমাণগত তথ্য পাওয়া যায়নি বললেই চলে। অর্থমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে বিনায়ক সেনের নির্দেশনায় বিআইডিএস একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। এ গবেষণা বেসরকারীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোয় কী ঘটছে, সে সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টিমূলক পর্যবেক্ষণ দিতে না পারলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান অবস্থার ওপর কিছু প্রাথমিক তথ্য আমাদের দেয়। বিআইডিএসের সমীক্ষাভিত্তিক সেনের গবেষণা বেসরকারি কারখানাগুলো সচল আছে কিনা, সে সম্পর্কে কেবল কিছু প্রাথমিক তথ্য দেয়, যার মাধ্যমে ব্যবস্থাপনাসংশ্লিষ্টদের কিছু গুণগত পর্যবেক্ষণ উঠে আসে।

বিআইডিএসের সমীক্ষায় ১৯৭৯ থেকে এ পর্যন্ত ২০৫টি বেসরকারিকরণকৃত প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনায় নেয়া হয়। এতে বিনিয়োগ বোর্ডের সমীক্ষায় তালিকাভুক্ত ১৯৭৯ সালের আগের প্রায় ৩০০ বেসরকারীকৃত ইউনিট বাদ পড়ে যায়। বিআইডিএসের করা সমীক্ষায় ২০৫টি ইউনিটের মধ্যে কেবল ১১২টি (৫৪.৬ শতাংশ) পরিচালনাধীন, ৮৩টি (৪০. ৫ শতাংশ) বন্ধ পাওয়া গেছে ও ১০টির (৪.৯ শতাংশ) অস্তিত্ব নেই বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। আলোচ্য সমীক্ষা থেকে বেরিয়ে এসেছে, বেসরকারীকৃত ইউনিটের প্রায় অর্ধেকই প্রকৃতপক্ষে বন্ধ হয়েছে।

নৈপুণ্য হিসাব

১১২টি ইউনিট পরিচালনাধীন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৮ শতাংশ ইউনিট ১০০ শতাংশ ক্যাপাসিটি নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ ইউনিটের পরিচালনা সক্ষমতা ৭৫-৯৯ শতাংশ, ২৫ শতাংশ ইউনিটের সক্ষমতা ৫০-৭৪ শতাংশের মধ্যে ও ১০ দশমিক ৮ শতাংশ ইউনিটের সক্ষমতা ৫০ শতাংশের নিচে। এখানে আবার সমীক্ষার হিসাব রয়ে গেছে ব্যক্তিভিত্তিক (ইমপ্রেশনিস্টিক), যা এসেছে প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের সাক্ষাত্কার থেকে এবং সেগুলো পরিমাণগত সাক্ষ্য-প্রমাণনির্ভর নয়। আলোচ্য সমীক্ষা এটিও নির্দেশ করে না, সক্ষমতা ব্যবহারের হিসাব একক শিফট কিংবা বহু শিফটভিত্তিক কিনা। কারণিক অভিজ্ঞতাবাদ বলে, কিছু প্রতিষ্ঠানের দুই শিফট ও কিছু প্রতিষ্ঠানের তিন শিফট কাজের সক্ষমতা রয়েছে। এভাবে এক শিফটভিত্তিক হিসাব অনেক বেসরকারীকৃত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার বেশ নিচে সক্ষমতার ধারণা আমাদের দেয়।

১৯৫টি প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, কেবল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ ইউনিট নিজেদের উচ্চলাভজনক, ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ লাভজনক, ৬ দশমিক ৭ শতাংশ ব্রেক ইভেন, ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ লোকসানি ও ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যাপক লোকসানি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেহেতু ২০৫টি ইউনিটের মধ্যে ৮৩টি বন্ধ হয়েছে, তাই ধারণা করা যায়, সেগুলো বন্ধ হয়েছে লোকসানের কারণে।

প্রাক-বিক্রয় অবস্থানের তুলনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈপুণ্য উন্নয়নে বেসরকারীকরণ কতটা সাহায্য করেছে? আমরা যদি বিনিময়-পূর্ব ও বিনিময়-উত্তর সময়ের নিরিখে বেসরকারীকৃত ইউনিটগুলো তুলনা করি, তাহলে দেখতে পাব, বিনিময়ের আগে নয়টি ইউনিট ব্যাপকভাবে লাভজনক ছিল, যেখানে বিনিময়ের পর লাভজনক হয়েছে ১১টি ইউনিট। এভাবে ১১টির মধ্যে অন্য দুটি বিনিময়ের পর লাভজনক হয়েছে। তবে অন্য নয়টি ইউনিট এসওইর অধীনে যেমন ব্যাপক লাভজনক ছিল, বেসরকারীকরণের পরও এ ধারা অব্যাহত রেখেছে। এ তথ্য থেকে বেসরকারীকরণের একটি ইতিবাচক ফল বেরিয়ে আসে, বিনিময়ের পরে লাভজনক ইউনিটের সংখ্যা ৩৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৬। এটি পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দেয়, বিনিময়ের আগে ২৬টি ইউনিট ব্রেক ইভেনে ছিল, বিনিময়ের পর তাদের ১৩টি ইউনিট লাভজনক হয়েছে। অন্যদিকে বিনিময়ের আগে যাদের ১০৫টি ইউনিট লোকসানে ছিল তাদের ১৫টি ইউনিট লাভজনক হয়েছে। বিপরীতে বেসরকারীকরণের আগে যেখানে কেবল ১৭টি ইউনিট ব্যাপক লোকসানে ছিল, এখন হয়েছে ৮৫টি ইউনিট। এভাবে বেসরকারীকরণের আগে ১০৫টি লোকসানে ছিল, ১৫টি ইউনিট লাভজনক হয়েছে, ২০টি ইউনিটে লোকসান অব্যাহত থাকে ও ৭০টি ইউনিট উচ্চলোকসানি প্রতিষ্ঠানের ক্যাটাগরিতে চলে যায়।

বিনিময় প্রক্রিয়ার পর বেকারত্ব সৃষ্টি

বিআইডিএসের সমীক্ষাকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত তথ্য নির্দেশ করে, ওইসব প্রতিষ্ঠানে বেসরকারীকরণের অন্যতম চূড়ান্ত ফল হলো, কর্মসংস্থানের মাত্রা ২৪ দশমিক ২ শতাংশ কমে কর্মীসংখ্যা ১০ লাখ ৮ হাজার ৬৪৫ থেকে ৮২ হাজার ৩৫৪-তে নেমে আসা। আরো উল্লেখযোগ্য, হ্রাসকৃত অপারেটিং ইউনিটে বর্তমানে কর্মরত ৮২ হাজার ৩৫৪ জনের মধ্যে ৩২ হাজার ৮১৩ বা ৪০ শতাংশ ছিল নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত। এভাবে অপারেটিং ইউনিটগুলোয় আসলে ১০ লাখ ৮ হাজার ৬৪৫ জনের মধ্যে কেবল ৪৯ হাজার ৫৪১ জনই (৪৭ শতাংশ) তাদের চাকরি ধরে রাখতে পেরেছেন, যা ইঙ্গিত দেয়, বেসরকারীকরণের পর এসব ইউনিটে ৫৯ হাজার ১০৪ জন (৫৩ শতাংশ লোক) নিজেদের চাকরি হারিয়েছেন।

বেসরকারীকরণের স্থিতিপত্র

বেসরকারীকরণের অভিজ্ঞতার ওপর প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণ বলে, প্রতিষ্ঠান বন্ধ, বেকারত্ব সৃষ্টি, ব্যাংকে পুঞ্জীভূত সম্ভাব্য দায় ও রাজস্ব হারানোর বিষয়গুলো মুনাফাযোগ্যতা উন্নয়ন ও দাবি মেটাতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পরিশোধ করা দামের অংশ হিসেবে বিচেনায় নিতে হবে। অবশ্য বেসরকারীকরণের ইতিবাচক সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাবের খুব একটা প্রমাণ মেলে না। সেক্টর করপোরেশনের লাভ-লোকসানের হিসাব প্রতিবেদন— যেখান থেকে ইউনিটগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে— নির্দেশ করে, রাষ্ট্রপতি এরশাদের অধীনে বেসরকারীকরণের বড় প্রবাহ বা ঢেউয়ের আগে ১৯৭৯-৮০ থেকে ১৯৮২-৮৩ এ চার বছরে ছয় সেক্টর করপোরেশনের মোট মুনাফা ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন টাকায় উন্নীত হয়েছিল এবং চার বছরের মধ্যে তিন বছরই রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো (এসওই) নিট মুনাফায় ছিল (বিশ্বব্যাংক, ১৯৮৫)। বড় আকারের বেসরকারীকরণের শেষ বছর ১৯৮২-৮৩ সালে এসওইগুলোর মুনাফা ৯১২ মিলিয়ন টাকায় উন্নীত হয়েছিল। এটি ইঙ্গিত করে না, বাংলাদেশে এসওইগুলো সরকারি কোষাগারের সময় সময় লোকসানি (নেট ড্রেন) ছিল। বিএনপি আমলের শেষের দিকে ১৯৯৫-৯৬ সালে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন টাকার বিক্রয়মূল্যের বেসরকারীকৃত ১৩১টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে করপোরেশনের লোকসান বেড়েছিল ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন টাকা (আইআরবিডি)। এ থেকে ইঙ্গিত মেলে, অন্তত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসওইগুলো বেসরকারীকরণের প্রধান যুক্তি সামষ্টিক- অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা হ্রাসের বিষয়টি অকার্যকর।

ব্যাংক বেসরকারীকরণের কিছু ফল

বিনিময় প্রক্রিয়ার এ সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়ে গিয়েছিল। এটি ইঙ্গিত করে, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের আকার হ্রাস ও ব্যক্তিখাতের সম্প্রসারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য কোনো স্বস্তি আনেনি, যেমনটা এটি স্বস্তি আনেনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য।

ব্যাংক বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া ব্যাংকিং শৃঙ্খলা উন্নয়ন করেনি কিংবা এনসিবির চেয়ে অধিক শৃঙ্খলিত উপায়ে সেগুলো যে পরিচালিত হবে, সেটিও নিশ্চিত করেনি। ১৯৯৬ সালে সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট ঋণের অনুপাত হিসেবে শ্রেণীকৃত ঋণ দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে। অবশ্য এনসিবি ঋণের ৩২ দশমিক ৬ ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ ঋণ ছিল শ্রেণীকৃত। ১৯৯৬ সালে আমরা যদি দুই বেসরকারীকৃত ব্যাংকের পোর্টফোলিও পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখব, পূবালী ব্যাংক তার ঋণের ৫৩ দশমিক ৬ ও উত্তরা ব্যাংক ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ ঋণকে শ্রেণীকৃত বলেছে। নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি ব্যাংকের শ্রেণীকরণ অনুপাত ৫০ দশমিক ৮, ইস্টার্ন ব্যাংকের ৪৯ দশমিক ৬ ও আল-বারাকা ব্যাংকের ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ। অধিকাংশ ব্যাংকই তাদের শ্রেণীকৃত ঋণের উচ্চ অনুপাতই মন্দ বা আদায় অযোগ্য বলেছে।

প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণ বলে, বেসরকারি ব্যাংকের বিরূপ ঋণ শ্রেণিবিন্যাসের কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ ঋণদান (ইনসাইডার লেন্ডিং), যেখানে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালকরা ব্যাংকিং আইন তোয়াক্কা না করে আইনবহির্ভূতভাবে ব্যাংকঋণের অনুমোদন দিয়েছে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেসব ঋণ খেলাপি হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবিত ঋণদান ও দুর্বল পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার কারণে এনসিবির ব্যাপক সংকট ক্ষমা করা যায় না। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ দায়িত্ব পরিপালন না করার বিষয়টিতেও কোনো অজুহাত খাড়া করা যায় না। তবে এটা স্পষ্ট, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় ব্যাংক বেসরকারীকরণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংকট বাড়িয়েছে। প্রকৃত বিষয় হলো, কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওর এক-তৃতীয়াংশ শ্রেণীকৃত থাকা ও ডিএফআইয়ের কাছে ঋণগ্রহীতার ৯০ শতাংশ খেলাপি থাকা (সোবহান, ১৯৯৩) ইঙ্গিত দেয়, ১৯৮২ সালের পর বেসরকারীকরণ-পরবর্তী যুগে ব্যক্তিখাত ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাছে ব্যাপক খেলাপি বা দায়গ্রস্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং বেসরকারীকরণের যুগেও সমরূপ থাকছে, যেটিকে এখন বাংলাদেশে বলা হয় খেলাপি সংস্কৃতি।

 

লেখক: অর্থনীতিবিদ; প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য

২০০২ সালে প্রকাশিত সিপিডির অকেশনাল পেপার সিরিজে লেখা গবেষণা নিবন্ধ থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির