আন্তর্জাতিক ব্যবসা

১৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই শুরু ডয়েচে ব্যাংকের : ধরিয়ে দেয়া খামে জানা গেল চাকরি নেই

বণিক বার্তা ডেস্ক    | ০০:০০:০০ মিনিট, জুলাই ১২, ২০১৯

মানবসম্পদ বিভাগ থেকে ডাক পড়েছে। উপস্থিত হওয়ার পর হাতে ধরিয়ে দেয়া হলো ব্যাংকের নাম মুদ্রিত একটি খাম। যে খামের ভেতরের চিঠিটি জানিয়ে দিচ্ছে, ডয়েচে ব্যাংকে এ কর্মীর চাকরির ইতি ঘটেছে। এখন বিদায় নিন।

প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে ১৮ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে জার্মানির শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডয়েচে ব্যাংক। এ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাস্তবায়ন শুরু হয়। আর ছাঁটাইয়ের তালিকায় নাম ওঠা কর্মীদের এভাবেই বিদায় জানানো শুরু করে ব্যাংকটি।

সংবাদ সম্মেলন করে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন ডয়েচে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্রিস্টিয়ান সুইং। এত বেশিসংখ্যক কর্মী ছাঁটাইয়ের জন্য দুঃখও প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে তার দুঃখ প্রকাশ চাকরিহারা কর্মীদের কতটা সান্ত্বনা জোগাবে, তা প্রশ্নযোগ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডয়েচে ব্যাংকের এ হালের জন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা দায় এড়াতে পারেন না। তাদের অদক্ষতা আর যথাসময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে না পারার ব্যর্থতা ব্যাংকটিকে সংকটে ফেলতে বড় ধরনের অবদান রেখেছে। এ দায় তারা এড়াতে পারেন না।

ব্যাংকটির যেসব শাখায় কর্মী ছাঁটাই প্রথমে শুরু হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সিডনি ও হংকংয়ের ইকুইটি অফিস। এ শাখাগুলোয় সোমবার বহু কর্মী এসে জানতে পারেন তারা এখন সাবেক। ব্যাংকটির হংকং শাখার ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের অনেকে মানবসম্পদ বিভাগকে অনুরোধ করেন, যদি আমার জন্য কোনো কাজ থাকে, তবে দয়া করে জানাবেন।

সোমবার হংকংয়ের শাখা থেকে ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের অফিস ভবন থেকে ব্যাংকের লোগো-সংবলিত খাম নিয়ে বের হয়ে আসতে দেখা যায়। অনেককে একসঙ্গে ব্যাংকটির লোগোর সামনে ছবি তুলতে দেখা যায়, পরস্পরের জন্য শুভকামনা জানান এবং ট্যাক্সি ডেকে সেখান থেকে বিদায় নেন। এক কর্মী নিজের কাছে থাকা খাম দেখিয়ে বলেন, তারা আপনাকে এ প্যাকেট এবং ভবনের বাইরে যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে দেবে। ওই কর্মী বলেন, এখন ইকুইটি বাজারের অবস্থা মোটেই ভালো না, তাই হয়তো আমি এ ধরনের কাজ পাব না। কিন্তু বিষয়টি আমাকে মেনে নিতে হবে। উল্লেখ্য, ডয়েচে ব্যাংক তাদের ইকুইটি ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধের পরিকল্পনা করছে। ২০২২ সাল নাগাদ প্রতিষ্ঠানের শ্রমশক্তি সংকুচিত করে ৭৪ হাজার করা হবে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।

হংকংয়ের মতো একই চিত্র দেখা যায় ব্যাংকটির লন্ডন অফিসেও। একজন আইটি কর্মী জানান, তিনি সকালে এসে জানতে পারেন তার চাকরি নেই। ছাঁটাই নিয়ে একটি চটজলদি বৈঠক হয়, তারপর খাম ধরিয়ে দেয়া হয়। আরেক কর্মী বলেন, আমার চাকরি নেই, এখন কোথায় যাব।

বেঙ্গালুরুর ডয়েচে ব্যাংকের একজন কর্মী জানান, সকালে আরো বেশ কয়েকজন সহকর্মীসহ তাকে জানিয়ে দেয়া হয় তাদের চাকরি নেই। এরপর তাদের হাতে খাম ও প্রায় এক মাসের বেতন ধরিয়ে দেয়া হয়। ওই কর্মী বলেন, সবাই বিহ্বল হয়ে পড়েছেন, বিশেষ করে যারা নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী, তাদের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা। ঋণ পরিশোধের মতো আর্থিক বোঝা তারা কীভাবে বহন করবেন, তা ভেবে তারা দিশাহারা।

ইকুইটি বিভাগের যেসব কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, তাদের জন্য নতুন চাকরি পাওয়া এ মুহূর্তে বেশ কঠিন, কারণ খাতটি বড় সংকটে রয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোয়ালিশনের গবেষণা ও বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান জর্জ কুজনেতসোভ বলেন, ইকুইটির চাকরির বাজার খুব কঠিন হতে যাচ্ছে। আমরা ধারণা করছি, যদি চলতি বছর ইকুইটির বিক্রি ও বাণিজ্য আয় ৭-৮ শতাংশ কমে, তবে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই নতুন কর্মী নিয়োগ বন্ধ রাখতে পারে।

ডয়েচে ব্যাংকের যেসব কর্মী ছাঁটাইয়ের কবল থেকে বেঁচে যাবেন, তারা আপাতত কিছু স্বস্তি পেতে পারেন, তবে তাদেরও ভবিষ্যৎ নিষ্কন্টক নয়। এখনো চাকরিতে বহাল থাকা সিঙ্গাপুরের এক ব্যাংকার বলেন, এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা যদি যথাযথ পণ্য আনতে না পারি, তবে এ অবস্থা থেকে কোথায় গিয়ে পৌঁছব? গ্রাহকরা কি আমাদের সঙ্গে থাকবে, নাকি সব খেল খতম?             সূত্র: রয়টার্স