ফিচার

কেন মানুষ স্বপ্ন মনে রাখতে পারে না?

বণিক বার্তা অনলাইন | ০০:০০:০০ মিনিট, জুলাই ২০, ২০১৯

কখনো এক লাফে এভারেস্টে উঠা, পরক্ষণেই লাফিয়ে পড়া গহীন সমুদ্রে। এখনই খোলা মাঠে ছুটে বেড়ানো, এখনই আবার সুপারম্যান হয়ে আকাশে উড়ে যাওয়া। এমন আরো কত কি না ঘটে স্বপ্নে। স্বপ্ন হল মানুষের ঘুমের মধ্যে চোখের পর্দায় দেখা 'আন রিলিজড সিনেমা'। কিন্তু এইসব স্বপ্নের বেশিরভাগটাই ঘুম ভাঙলে আর মনে থাকে না। আবার কিছু মানুষ খুব ভালোভাবে তাদের স্বপ্ন মনে রাখতে পারে।

কেন এমনটা হয়? কেন মনে থাকে না গত রাতে দেখা স্বপ্ন? এর ব্যাখ্যা খুঁজতে যেতে হবে আপনাকে ঘুমের রাজ্যে।

বিবিসি ফিচারের সহযোগী সম্পাদক স্টিফেন ডওলিং বলছেন, শৈশবে আমি আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম, পাশেই ছিল বিদ্যালয়ের মূল গেট ও শিক্ষকদের গাড়ির গ্যারেজ। দিনটি ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল এবং আমাকে আমার সহপাঠীরা ঘিরে ধরেছিল। সহপাঠীদের সংখ্যা একশ’র বেশি হবে। আমি অনুভব করছিলাম, আমার কয়েকজন শিক্ষক আমার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু আমার মনোযোগ ছিল দুই জন মেয়ের দিকে। তাদেরকে আমি চিনি না।

তাদের মধ্যে চকচকে চুলের সঙ্গে সোনালী সানগ্লাস পরা একটি মেয়েকে আমি দেখছিলাম। সে তীব্র শব্দ করা কিছু যন্ত্র বাজাচ্ছিলেন। আমি বসে পড়ে দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরেছিলাম। আমার সহপাঠীরাও একইভাবে কান চেপে ধরেছিল। সে বিরক্তির সঙ্গে হাসছিলেনও।

তিনি বলেন, এই স্বপ্নটি আমি প্রায় ৪০ বছর আগে দেখেছিলাম। কিন্তু গতকালের দেখা স্বপ্নের মতো সেটি আমার এখনো বিস্তারিত মনে আছে। সপ্তাহের আগের কোনো ঘটনার সঙ্গে যদি স্বপ্নটাকে মেলাতে বলেন তবে বলবো এমন কোনো ঘটনা ছিল না। আমি স্বপ্ন দেখছি, জীববিদ্যা হয়তো বলবে এটা জাগ্রত, মনে থাকবে না। 

আমাদের অনেকের মধ্যে স্বপ্ন অদৃশ্যভাবে উপস্থিত থাকে। ভাগ্যবান হলে আমরা শুধুমাত্র দ্রুতগামী আভাসগুলো মনে রাখতে পারি। এমনকি আমাদের মধ্যে যারা বিস্ময়করভাবে অতীত স্বপ্ন বিস্তারিতভাবে মনে করতে পারে, তারাও কিছুদিন পরে আর বলতে পারে না যে স্বপ্নে কী দেখেছিল।

যাইহোক, এই ঘটনার কারণ কী হতে পারে সে সম্পর্কে একটু অনিশ্চয়তা আছে। আমরা কেন স্বপ্ন দেখি এবং সেগুলো মনে রাখতে পারি কিনা- উভয়ের মূলে রয়েছে আমাদের ঘুমন্ত শরীর ও অবচেতন মনের জীববিদ্যা।

একবার চিন্তা করার থেকে ঘুম বেশি জটিল একটি পক্রিয়া। বরং আমরা যখন ঘুমায় ও ঘুম থেকে উঠি তখন অচেতন প্লেট আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে। আমরা যখন বিশ্রামে থাকি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক উত্তেজনাপূর্ণ মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যায়, যার কিছু অংশে আবার পুরো মানসিক ক্রিয়াকলাপ চলতে থাকে।

স্টিফেন ডওলিং বলেন, আমরা ঘুমের র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট (আরইএম) স্টেজে স্বপ্ন দেখি। আরইএম অসামঞ্জস্য ঘুম হিসেবে পরিচিত। কারণ এটি জাগ্রত হওয়ার লক্ষণগুলোর কিছু অনুকরণ করতে পারে। আরইএম স্টেজের ঘুমে চোখ দ্রুত নড়াচড়া করতে থাকে, শ্বাস-প্রশ্বাসে পরিবর্তন হয় এবং শরীর এটোনিয়া নামে পরিচিত এক প্যারালাইজড অবস্থায় প্রবেশ করে। ঘুম চলাকালীন ৯০ মিনিট সময় ধরে এটা ঘটে। এরপরই আমাদের মস্তিষ্কে স্বপ্নের ঝোঁক তৈরি হয়।

তিনি আরো বলেন, আরইএম স্টেজে আমাদের মস্তিস্কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোতে রক্তের অতিরিক্ত প্রবাহ থাকে। মস্তিষ্কের কর্টেক্স বিষয়বস্তু দিয়ে আমাদের স্বপ্ন পূরণ করে এবং লিম্বিক অবস্থা আমাদের মানসিক অবস্থা প্রক্রিয়া করে। যখন আমরা ঘুমের স্বপ্নবান্ধব অবস্থায় থাকি, তখন বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের সঙ্গে তারা জ্বলে উঠে। তা সত্ত্বেও মস্তিষ্কের ফ্রনটাল লোব সরাসরি আমাদের সংকটপূর্ণ অবস্থাগুলোকে শান্ত করে দেয়। এর মানে হলো আমরা ঘুম থেকে জেগে না উঠা পর্যন্ত অজ্ঞাতনামা কাহিনীগুলোকে প্রায়শই অন্ধভাবে গ্রহণ করি।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও লেখক দায়েদ্রি ব্যারেট সম্প্রতি তার গিজমোডো গল্পে বলেছেন, সমস্যা হলো, অধিক কল্পনাপ্রসূত এই কাহিনীচিত্রের সবগুলো ধরে রাখা বা মনে রাখা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। যেই স্বপ্নগুলোর গঠন অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার হয়, সেগুলো মনে রাখা আমাদের জন্য বেশি সহজ হয়।

স্বপ্নের এই কাহিনীচিত্রগুলো মনে রাখতে নরাড্রিনালাইন নামের রাসায়নিক উপাদান কাজ করে। নরাড্রিনালাইন এমন একটি হরমোন, যা শরীর ও মনের সেরা অংশে কাজ করে এবং এটি আমাদের গভীর ঘুমের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে কম মাত্রায় নিয়ে আসে।

সুইজারল্যান্ডের লাউসান বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ঘুম গবেষণা চিকিৎসক ফ্রান্সেসকা সিকলারি বলেন, আমাদের জাগা ও ঘুমের স্পষ্ট সংজ্ঞা আছে এবং এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটা সম্ভবত ভালো ব্যাপার যে স্বপ্নের জীবন ও জেগে থাকা জীবনের মধ্যে পুরোপুরিভাবে পার্থক্য রয়েছে।

ঘুম গবেষক সিকলারি বলেন, আমার মনে হয় আপনি যদি জেগে থাকা জীবনের প্রতিটি বিষয় বিস্তারিতভাবে স্মরণ রাখেন তাহলে আপনি বিভ্রান্ত হতে শুরু করবেন যে, সত্তিকার জীবনে কী ঘটতে চলেছে। এর ফলে নারকোলিপ্সির মতো ঘুমের সমস্যাগুলোর শিকার ব্যক্তিরা তাদের জেগে থাকা ও ঘুমন্ত জীবনের মধ্যে পার্থক্য বলা কঠিন হয়ে যাবে। এটি তাদের বিভ্রান্ত ও বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলবে। এমনও মানুষ রয়েছে যারা তাদের স্বপ্ন খুব ভালোভাবে মনে রাখতে পারে। আসলে তারা তাদের স্বপ্নগুলো দিনের মধ্যে এক্সপোর্ট করে।

‘আমরা ঘুম চক্রের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা থেকে আসা স্বপ্নগুলো মনে রাখতে পারি- এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটা আমাদের ঘুমন্ত দেহের রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়। সাধারণভাবে ঘুমের আরইএম স্টেজে আমরা খুব স্পষ্টভাবে স্বপ্ন দেখি, যখন মস্তিষ্কের নরাড্রিনালাইন মাত্রা কম থাকে’- বলছিলেন ফ্রান্সেসকা সিকলারি।

জেগে উঠার ঠিক আগমুহূর্তে স্বপ্ন দেখা অবস্থায় আমরা নিজেদের আবিষ্কার করি। কিন্তু স্বপ্নের এই কাহিনীচিত্র মনে রাখার ক্ষেত্রে রাস্তা হিসেবে কাজ করে আমাদের সকালের রুটিন। প্রায়ই আমরা আমাদের এলার্ম ঘড়ির শব্দে চমকে উঠি, যা আমাদের নরাড্রিনালাইন মাত্রায় স্পাইক সৃষ্টি করে। এটি স্বপ্ন মনে রাখতে আমাদের জন্য কঠিন করে তোলে।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের আরেক ঘুম বিশেষজ্ঞ রবার্ট স্টিকগোল্ড বলেন, কেউ কেউ আমাকে প্রশ্ন করেন যে তারা কেন তাদের স্বপ্ন মনে করতে পারেন না। এর কারণ হলো, তারা খুব দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েন এবং এলার্ম ঘড়ির শব্দে জেগে উঠেন। এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আপনি যদি দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েন, তাহলে আপনি আপনার ঘুম চক্রের কোনো কিছু মনে রাখতে পারবেন না।

অনেক মানুষ তাদের ঘুমের একটি অংশের স্বপ্ন মনে করতে পারেন, যখন মনে ঘুমের বাইরে ও ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের মতো কাহিনীচিত্র শুরু হয়। এই প্রক্রিয়া ‘হিপনোগোগিক’ নামে পরিচিত।

স্টিকগোল্ড কয়েক বছর আগে একটি গবেষণা সম্পন্ন করেন। যেখানে ল্যাবে শিক্ষার্থীরা এই স্টেজে প্রবেশ করার পরেই তারা জেগে উঠেছিল। তারা প্রত্যেকেই তাদের স্বপ্ন মনে করতে পেরেছিল।

তিনি বলেন, এই পর্যায়টি ঘুমের প্রথম পাঁচ অথবা ১০ মিনিট। আপনি যদি দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েন, তাহলে আপনি ঘুম চক্রের কিছুই মনে করতে পারবেন না। তাই যদি সক্রিয়ভাবে আপনি আপনার স্বপ্ন মনে রাখতে চান তাহলে সাধারণ কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। যা আপনাকে আপনার স্বপ্নগুলো মনে রাখতে সহায়তা করতে পারে।

‘আমরা প্রথম যখন জেগে উঠি তখন স্বপ্নগুলো অবিশ্বাস্যভাবে ভঙ্গুর হয় এবং এটি কেন হয় তার কোনো উত্তর আমাদের কাছে নেই। যদি আপনি এমন ব্যক্তি হন, যিনি বিছানা থেকে উঠেই দিনের কাজকর্ম শুরু করেন তবে আপনি আপনার স্বপ্ন মনে করতে পারবেন না। আপনি শনিবার বা রোববার সকালের মতো যখন ছুটির দিনে ঘুমাবেন, তখন স্বপ্ন মনে রাখার জন্য এটি চমৎকার সময়। ঘুম থেকে জাগার পর কিছু সময় ওভাবেই শুয়ে থাকার চেষ্টা করুন, এমনকি আপনি চোখও খুলবেন না’- বলছিলেন ঘুম বিশেষজ্ঞ রবার্ট স্টিকগোল্ড।

সেসময় আপনি মনে করার চেষ্টা করুন, স্বপ্নটা কী ছিল। আপনি যা করছেন তা হলো, জেগে উঠার পর্যায়েই আপনি আপনার স্বপ্ন পর্যালোচনা করছেন এবং এটাকে আপনি অন্য স্মৃতির মতো মনে রাখবেন।

স্বপ্ন মনে রাখার আরও কিছু নিশ্চিত উপায় রয়েছে। স্টিকগোল্ড বলেন, বিছানায় যাওয়ার আগে বড় তিন গ্লাস পানি পান করুন। এটা কখনোই বিয়ার বা মদ নয়, কারণ অ্যালকোহল ঘুমের আরইএম পর্যায়কে বাধাগ্রস্ত করে। তাই পানি পান করুন। আপনি রাতে যে তিন বা চারবার ঘুম থেকে উঠবেন, এই পানি পান করার কারণে আরইএম চক্রের শেষে স্বাভাবিকভাবে আপনি জেগে উঠবেন।

স্বপ্ন মনে রাখার জন্য কয়েকজন ঘুম গবেষক আরো কিছু পরামর্শ দেন। স্বপ্ন মনে রাখতে চাইলে আপনার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে হবে, ঘুমের অবস্থাটা মনে করার চেষ্টা করতে হবে। এটা আসলেই কাজ করে বলে মনে করেন স্টিকগোল্ড।

এটি যদি আপনি করেন তবে আপনি আরও স্বপ্ন মনে করতে পারবেন। এটি আসলে ‘নিজের বাড়ির মতো কোন জায়গা নেই' বলার মতো। এটা সত্যিই কাজ করে।

 বিবিসি অবলম্বনে শিহাবুল ইসলাম