দেশের খবর

‘দেশে প্রথম ইয়াবা আনা’ সাইফুল কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত

বণিক বার্তা প্রতিনিধি, কক্সবাজার | ১২:৪০:০০ মিনিট, মে ৩১, ২০১৯

‘দেশে প্রথম ইয়াবার চালান আনা’ সাইফুল করিম গ্রেফতার হওয়ার পর কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের অভিযানের মধ্যে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে টেকনাফ স্থলবন্দর সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

৪৫ বছর বয়সী সাইফুল করিম টেকনাফ সদর ইউনিয়নের শিলবুনিয়া পাড়ার ডা. মোহাম্মদ হানিফের ছেলে।

পুলিশের দাবি, স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর করা মাদক চোরাকারবারির তালিকায় সাইফুলের নাম ছিল ১ নম্বরে। তিনিই ১৯৯৭ সালে ইয়াবার প্রথম চালান দেশে এনেছিলেন। স্থানীয়ভাবে তাকে বলা হত ‘ইয়াবার গডফাদার’।

মাদক ব্যবসায় রাতারাতি ধনী হয়ে ওঠা সাইফুল কক্সবাজার জেলা থেকে সর্বোচ্চ কর দিয়ে সিআইপি মর্যাদাও পেয়েছিলেন। টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানার অস্ত্র ও মাদক আইনের সাতটি মামলার পলাতক আসামি সাইফুলকে দীর্ঘদিন ধরে খুঁজছিল পুলিশ।

গত ফেব্রুয়ারিতে কক্সবাজারে যে ১০২ জন মাদক চোরাকারবারি আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তখন সাইফুল করিমের আত্মসমর্পণের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এখন দ্বিতীয় দফা আত্মসমর্পণের সুযোগকে কাজে লাগাতে সে বিদেশ থেকে ফিরেছিল বলে জানা যায়।

পুলিশ জানায়, গত বছরের ৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর এলাকায় একটি চালানে ১৩ লাখ ইয়াবা বড়ি আটক হওয়ার পর সাইফুল করিমের নাম জানাজানি হয়। এর পরপরই তিনি গা ঢাকা দেন।

হালিশহরের অভিযানে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন উপকমিশনার মো. শহীদুল্লাহ। তিনি এখন চট্টগ্রামে কাউন্টার টেররিজমের দায়িত্বে আছেন।

তিনি বলেন, সাইফুল করিম ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম ইয়াবার চালান এনেছিলেন। ১৩ লাখ ইয়াবা বড়ি একসঙ্গে আটক হওয়ার পর তার সম্পর্কে আমরা এসব তথ্য পাই।

বন্দুকযুদ্ধের বিষয়ে টেকনাফের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ বলেন, ইয়াবা গডফাদার সাইফুল টেকনাফ সদরে অবস্থান করছেন খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। পরে থানায় নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সাইফুল স্বীকার করে যে, কয়েক দিন আগে সে নাফ নদী দিয়ে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার একটি বড় চালান এনেছে। চলানটি টেকনাফ স্থলবন্দরের নাফ নদী লাগোয়া সীমানা প্রাচীরের শেষ প্রান্তে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

ওসি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে ওই তথ্য পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে সাইফুলকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশের একটি দল টেকনাফ স্থলবন্দর সংলগ্ন ওই এলাকায় ইয়াবা উদ্ধারে অভিযানে যায়। তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছানো মাত্র সাইফুলের সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করে। পুলিশও তখন আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যায়। এরমধ্যে কোনো এক সময় সাইফুল গুলিবিদ্ধ হয়।

গুলিবিদ্ধ সাইফুলকে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়ার পারমর্শ দেন। পরে কক্সবাজারে পৌঁছালে সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে জানান ওসি প্রদীপ।

এই পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে নয়টি বন্দুক, ৪২টি গুলি এবং ১ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এ অভিযানে আহত পুলিশের এসআই রাসেল আহমেদ, কনস্টেবল ইমাম হোসেন ও কনস্টেবল মো. সোলেমানকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক প্রণয় রুদ্র বলেন, গুলিবিদ্ধ সাইফুল করিমকে দিবাগত রাত দেড়টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়। তার শরীরে চারটি গুলির দাগ ছিল। একটি বুকে, তিনটি পেটে।

এর আগে গত ৩ মে টেকনাফ থানার পুলিশ ১০ হাজার ইয়াবা বড়ি, ৪টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ নিজ বাড়ি থেকে সাইফুল করিমের দুই ছোট ভাই মাহবুবুল করিম ও রাশেদুল করিমকে গ্রেফতার করে। তারা বর্তমানে কক্সবাজার জেলা কারাগারে বন্দী।

জানা গেছে, ২০০৩ সালের দিকে সাইফুল করিম টেকনাফ স্থলবন্দরে আমদানি-রফতানির ব্যবসা শুরু করেন। একাধিকবার তিনি সেরা করদাতার (সিআইপি) খেতাব অর্জন করেন। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফ পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের কাছে সাড়ে ৩ লাখ ইয়াবা, ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ ১০২ জন শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করলেও সাইফুল তখন বিদেশে আত্মগোপন করেন।

তার পরিবারের দাবি, টেকনাফের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি আত্মসমর্পণের সুযোগের কথা দিয়ে কয়েক দিন আগে সাইফুল করিমকে মিয়ানমার থেকে টেকনাফে নিয়ে আসেন।

গত বছর মে মাসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সর্বশেষ তালিকায় ৭৩ শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীর মধ্যে সাইফুল করিমের নাম ছিল ২ নম্বরে। ১ নম্বরে রয়েছে টেকনাফের বিতর্কিত সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদির নাম। ওই তালিকায় বদির ছোট ভাই মুজিবুর রহমান, টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাফর আলমসহ অনেকের নাম রয়েছে।