ফিচার, আন্তর্জাতিক খবর, , ,

না দিন, না রাতের অদ্ভূত শহর নরিলিস্ক

বণিক বার্তা অনলাইন | ২০:৩০:০০ মিনিট, মে ১৩, ২০১৯

পৃথিবীর মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একটি শহর নরিলিস্ক। উত্তর মেরুর শেষ সীমানার এই শহরের সঙ্গে পৃথিবীর অন্য কোনো শহরের স্থল-সংযোগ নেই। রাশিয়ার সাইবেরিয়ার অন্তর্গত এই শহরটি আর্কটিক্ট সার্কেল থেকে ৪০০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। শহরটিতে ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষের বাস।

এতসব তথ্যের মধ্যে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, সেখানে বছরের নয় মাসই থাকে শীত। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো,  ‘পোলার নাইট’ চলাকালীন দুই মাস সূর্যের দেখা মেলে না!

এসব তথ্য অনেকের কাছে বিশেষ করে যারা অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন তাদের কাছে বেশ লোভনীয় মনে হতে পারে। হুট করেই পাড়ি দিতে পারেন রাশিয়ার এই নরিলিস্ক শহরে। গরমের হাঁসফাঁস অবস্থার মধ্যে বিরক্ত অনেকেই উপভোগ করতে যেতে পারেন নয় মাসব্যাপী দীর্ঘ শীতকালের হিম অনুভূতি। পাশাপাশি দুই মাস সূর্য না দেখে থাকার অভিজ্ঞতা! তবে তার মানে এটা না যে, সূর্য না ওঠার কারণে শহরটি জমাট অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে। আসলে এসময় না দিন, না রাত এমন একটি পরিস্থিতি বিরাজ করে সেখানে। যেটাকে বলা হয়, পোলার নাইট, পোলার ডে।

এমন অভিজ্ঞতা নিতেই সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রুশ আলোকচিত্রী এলিনা চারিনিশোভা। ২০১২-১৩ সালের বেশকিছু সময় তিনি সেখানে কাটান। অবশ্য যৌবনকালে তার মা সেখানে ছিলেন। মায়ের কাছ থেকে নানা রোমাঞ্চকর গল্প শুনেই মূলত নরিলিস্কে যাওয়ার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন এলিনা। 

তিনি বলেন, সেখানকার পরিবেশ নিয়ে মা অনেক গল্প করতেন। সেটা নিয়ে আমি সত্যিই খুব আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। আমি বুঝতে চেয়েছিলাম যে পোলার নাইট, পোলার ডে’র মধ্যে মানুষজন কীভাবে জীবনযাপন করেন। আসলেই কি মেরু অঞ্চলের মতো করে জীবন কাটানো যায়? এটি খুব চরমভাবাপন্ন একটি জায়গা।

সেখানকার মানুষ পরিবেশের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মানিয়ে নিয়েছেন। ঘর গরম রাখতে তারা দিনের বেলাতেও বাড়িতে লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাখেন। সেগুলো জানালার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এছাড়া তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষায় তারা বাড়িতে অনেক ফুল গাছ চাষ করেন। আর সময় দেখতে তারা ব্যবহার করেন বিশেষ ধরনের  সূর্যঘড়ি। আমার আগ্রহের মূল বিষয়টি ছিল এই পরিবেশ। সেখানকার মানুষ এমন ধরনের পরিবেশ ও জলবায়ুর মধ্যে কীভাবে মানিয়ে নিচ্ছে সেটা দেখা।

তবে যে ধরনের রোমাঞ্চকর অনুভূতি ও আগ্রহ নিয়ে এলিনা অদ্ভুত এই শহরে পাড়ি জমিয়েছিলেন, কিছুদিনের মধ্যেই সেসব ফিকে হয়ে আসে! কঠিন পরিবেশে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। কবে সূর্যের মুখ দেখা যাবে সেই আশায় সময় পার করতে থাকেন তিনি।

এলিনা বলেন, শহর থেকে কাজের স্থান বা শিল্পাঞ্চল ২০-৩০ কিলোমিটার দূরে। সেখানে যখন প্রবল তুষারঝড় হয়, তখন বাসগুলো একসঙ্গে মিলে যাতায়াত করে। পোলার নাইট খুব ধীরে ধীরে আসে। একসময় আপনি বুঝবেন সেখানে দিনের আলো নেই। মানসিকভাবে ধীরে ধীরে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। সেসময় মেজাজ ভালো করতে সূর্যের দেখা পাওয়া আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একসময় এটা খুব কঠিন ও দমবন্ধ অবস্থা হয়ে উঠেছিল। আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছিলাম। দুই মাসের মধ্যে আমার যন্ত্রণার মতো অনুভূতি শুরু হয়ে গেল। এমন মনে হতো যে, সূর্য কখনো আর ফিরে আসবে না!

দীর্ঘ দুই মাস পরে শহরে সূর্য ফিরে আসে। তখন মানুষের জন্য পোলার দিন খুব ভালো সময়, হঠাৎ মানুষ খুব খুশি হয়ে ওঠে। গরম আবহাওয়া ও সুন্দর সোনালী আলো উপভোগ করতে তারা প্রায়ই হাঁটাহাটি করে। তবে এই ভালোর অনুভূতিও এলিনার বেশিদিন স্থায়ী হয় না।

এলিনা বলেন, মাঝে মধ্যে ঘুমানো খুব কষ্টকর হয়ে পড়ে, কারণ আমরা তো দিনে ঘুমাতে অভ্যস্ত না। এটা বেশ দ্বান্দ্বিক একটা অবস্থা, কারণ আবহাওয়া  বেশ চরমভাবাপন্ন। কিন্তু সেখানকার মানুষগুলো খুব বন্ধুভাবাপন্ন ও উচ্ছ্বল। বিস্ময়করভাবে তাদের মধ্যে রসিবোধ আছে। সেখানকার অনেক মানুষই এই চরমভাবাপন্ন পরিবেশ উপভোগ করে। তাদের আত্মীয়-স্বজনও সেখানেই থাকে। এ জন্য নরিলিস্কই তাদের জন্য সুবিধাজনক স্থান। অবশ্য অনেকে আরো ভালো কিছু পেতে শহর ছেড়ে যাওয়ার স্বপ্নও দেখে।

আলোকচিত্রী এলিনা  বলেন, আমি অনেক তরুণের সঙ্গে দেখা করে, আলাপ করে অবাক হয়ে যেতাম। তারা আমাকে বলেছিল, নরিলিস্ক তাদের জন্য সুবিধাজনক স্থান। কারণ সেখানেই তাদের সবকিছু। তারা দীর্ঘ ছুটি, ভালো ও নিয়মিত বেতন পান।

এলিনা বলেন, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সেই স্থানে যেতে  টুল বা চাবির মতো কাজ করেছিল আলোকচিত্র। আলোকচিত্রী  না হলে শুধু ওই মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা করতে আমি অমন পরিবেশের মধ্যে থাকতে পারতাম না।

বিবিসি অবলম্বনে শিহাবুল ইসলাম