ফিচার, আন্তর্জাতিক খবর, , ,

বৈশাখীতে রক্তপাত : জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের ১০০ বছর

বণিক বার্তা ডেস্ক | ০৩:৩২:০০ মিনিট, এপ্রিল ১৪, ২০১৯

বিশ শতকের সবচেয়ে ঘৃণ্য রাজনৈতিক অপরাধগুলোর একটি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড। আজ থেকে ১০০ বছর আগে ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে প্রায় এক হাজার নিরপরাধ হিন্দু, মুসলমান ও শিখকে গুলি করে হত্যা করে ইংরেজ বাহিনী। এ হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিলেন ইংরেজ কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার। ঔপনিবেশিক আমলের উপাত্তে দেখা যায়, এ হত্যাকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা ৩৭৯। কিন্তু ভারতের উপাত্তে দেখা যায়, নিহতের সংখ্যা প্রায় এক হাজার। আরো কিছু উপাত্তে প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হওয়ার উল্লেখ রয়েছে।

১০০ বছর পার হলেও এ হত্যাকাণ্ডের জন্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি ব্রিটেন। ভারতের ব্রিটিশ হাইকমিশনার ডমিনিক অ্যাসকুইথ জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রাচীরঘেরা বাগান পরিদর্শন করেছেন। বাগানটিতে এখনো বুলেটের দাগ দৃশ্যমান।

আসকুইথ বলেন, আপনি হয়তো ইতিহাস পুনরায় লিখতে চান, কিন্তু পারেন না। আমাদের রানীর মতে, আপনি যা পারেন, তা হলো ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে এ ঘটনাকে আমরা সবসময় স্মরণ করব। এখানে যা ঘটেছিল, তা আমরা কখনো ভুলব না।

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় উপস্থিত হয়েছিলেন ১৯০৮-১৬ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হার্বার্ট আসকুইথের উত্তরসূরি ডমিনিক আসকুইথ। এ হত্যাকাণ্ডকে তিনি ‘লজ্জাজনক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সেদিন যা ঘটেছিল, তার জন্য আমরা গভীরভাবে অনুতপ্ত।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক টুইটে এ হত্যাকাণ্ডকে ‘বিভীষিকাময়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী অমৃতসরে উপস্থিত হয়েছিলেন। এক টুইটে তিনি বলেন, এ হত্যাকাণ্ড সারা বিশ্বকে হতবাক করেছিল এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই পাঞ্জাবে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। সৈন্য ও যুদ্ধের তহবিল সংগ্রহে ব্রিটিশ শাসকদের জোরপূর্বক পদক্ষেপের কারণে মূলত এ ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। সে সময় ইংরেজদের প্রণীত ব্ল্যাক অ্যাক্টসের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী হরতাল ডাকেন মহাত্মা গান্ধী। ১৯১৯ সালের ৩০ মার্চ ও ৬ এপ্রিল গান্ধীর ডাকা হরতাল পাঞ্জাবে তুমুল সাড়া পায়। মানুষের বিক্ষুব্ধ মনোভাব ও হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির ফলে ব্রিটিশ প্রশাসনের মধ্যে আতঙ্কের সঞ্চার হয়।

তুমুল বিক্ষোভের মুখে মহাত্মা গান্ধীর পাঞ্জাবে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। একই সঙ্গে অমৃতসরে দুই জনপ্রিয় নেতা কিচলু ও সত্য পালকে গ্রেফতার করা হয়। এতে বিক্ষোভ আরো তীব্রতর হয়ে ওঠে। লাহোর, কাসুর, গুজরানওয়ালা ও অমৃতসরে গণবিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়।

অমৃতসরের একটি সমাবেশে পুলিশ গুলি করলে কিছু আন্দোলনকারী বিক্ষুব্ধ ও সহিংস হয়ে ওঠে। পরদিন শহরের দায়িত্ব দেয়া হয় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ারের হাতে। দায়িত্ব হাতে পেয়েই ব্যাপক হারে গ্রেফতার এবং মিটিং ও জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন ডায়ার।

১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল বৈশাখী উৎসব চলাকালে জালিয়ানওয়ালাবাগের একটি মাঠে বিকালে সমাবেশ আহ্বান করা হয়। মাঠটি ছিল চারদিক থেকে ঘেরা। হাজারো মানুষ এ সমাবেশে উপস্থিত হয়। এসব মানুষের বেশির ভাগই আশপাশের গ্রাম থেকে অমৃতসরের মেলায় এসেছিল। মিটিং কিংবা জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা ছিল না। হঠাৎ করে কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই বাহিনী নিয়ে সমাবেশে হাজির হন ডায়ার এবং শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র মানুষের উদ্দেশে গুলি ছোড়ার নির্দেশ দেন। ডায়ারের অস্ত্রের মজুদ শেষ হওয়া পর্যন্ত গুলিবর্ষণ চলতে থাকে। একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকে নিরপরাধ মানুষ।

এ হত্যাকাণ্ড ভারতবর্ষের জনগণকে হতবাক করে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তন করে দেয় এ হত্যাকাণ্ড।

সূত্র: এএফপি ও ডন