সম্পাদকীয়

ঐতিহ্য অহংকারের সারথি

বিশ্বজিত রায় | ০৩:৩২:০০ মিনিট, এপ্রিল ১৪, ২০১৯

পহেলা বৈশাখ বাঙালির ঐতিহ্যের স্মারক। বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতি ও কৃষ্টির অন্যতম জাগরণী শক্তি। বাঙালি চেতনার বিশাল অঙ্গনে যার অবস্থান অত্যন্ত পাকাপোক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী। সর্বজনীন এক মহোৎসবের নাম পহেলা বৈশাখ। শহর, গ্রাম সবখানে রয়েছে এর সমান বিস্তার। ঐতিহ্য, অহংকারের সারথি হয়ে বাঙালি উদযাপন করে বাংলা বছরের শুরুর সময়টা। তখন আনন্দ রঙে রঙিন হয় দেশ। এ উদযাপন রঙের বিচ্ছুরণ গিয়ে মেশে জাতীয় ও প্রান্তিক জীবনে। উৎসবপ্রিয় বাঙালি ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজনকে ধারণ করে চলেছে তাদের অস্তিত্বে। অপশক্তির নোংরা আঁচড় ও নগ্ন আক্রমণও আটকাতে পারেনি বাঙালিসত্তায় জাগ্রত বৈশাখী ভাবনাকে। পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে ধর্মান্ধগোষ্ঠী যত চড়াও হয়েছে, বাঙালির প্রাণের উৎসব ততই বিকশিত হয়েছে।

একসময় বাংলা নববর্ষ গ্রামে পালন হতো অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে। এ আনন্দ আয়োজনে কিছুটা ভাটা পড়েছে। ডিজিটাল বাস্তবতায় নেই বাংলা বর্ষবরণের পুরনো আমেজ। অনেক অনুষঙ্গই হারিয়ে গেছে পহেলা বৈশাখের উদযাপনী অঙ্গ থেকে। আগে গ্রামাঞ্চলে বৈশাখ বরণের প্রধান আকর্ষণ ছিল হালখাতা ও বৈশাখী মেলা। বৈশাখী মেলার সজ্জিত রব উৎসবস্থলে এক আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশের জন্ম দিয়ে যেত। কিন্তু এখন পরিবর্তনের অতল গহ্বরে প্রায় হারিয়ে গেছে প্রাচীন বাংলার এসব রীতি-রেওয়াজ।

ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সঙ্গে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মোগল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশমতে তত্কালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌরসন ও আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। প্রথমে এ সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

আকবরের সময়কাল থেকে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেকে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এর পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এ উৎসব একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এ পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান উপলক্ষ ছিল একটি হালখাতার আয়োজন করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হলো বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা—সব স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করেন।

আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোমকীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়।

আজকালকার বৈশাখ উদযাপনে পান্তা ইলিশ অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণমাধ্যমের বরাতে পান্তা ইলিশের বৈশাখী ব্যবহার অতীতের পান্তা ইলিশহীন বৈশাখের কথা মনে করিয়ে দেয়।

পান্তা ইলিশের কথা বাদ দিলে সামনে চলে আসে লাল-সাদায় বর্ষবরণের দৈহিক চলন-বলনের কথা। বৈশাখের প্রিয় রঙ লাল-সাদা সবাইকে রাঙায় নবরূপে নবরঙে। বৈশাখ আসার এক সপ্তাহ আগে থেকেই শহরে পোশাকের দোকানগুলোয় ক্রেতাসমাগম বেড়ে যায়। সাদা-লালের বাহারি অলঙ্করণে বৈশাখের আলপনায় অঙ্কিত পোশাক বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যুক্ত হওয়ার একটা বড় ক্ষেত্র তৈরি করে। নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে বাঙালি নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও যুবা বয়সী সবাই মিলেমিশে হয় একাকার।

 

লেখক: সাংবাদিক