ফিচার, আন্তর্জাতিক খবর, , ,

ব্যয়বহুল বিয়ে, ব্যয়বহুল বিচ্ছেদ

বণিক বার্তা অনলাইন | ১৭:৩৪:০০ মিনিট, এপ্রিল ০৬, ২০১৯

গত বছরের শেষের দিকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে হয়ে গেল বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিয়ে। যে বিয়ে শিরোনাম হয়েছিল বিশ্ব গণমাধ্যমের। মেয়ে ইশা আম্বানির সেই বিয়েতে প্রায় হাজার কোটি টাকা খরচ করেছিলেন ভারতের সেরা ধনী মুকেশ ধীরুভাই আম্বানি। আর চলতি বছরের শুরুর দিকে আরও একটি খবর বিশ্ব গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল। তবে সেটি বিয়ে নয়, বিয়ে বিচ্ছেদের শিরোনাম। ২৫ বছর সংসার করার পর গত জানুয়ারিতে যখন টুইট করে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী অনলাইনে পণ্য বিক্রির প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস ও তার স্ত্রী ম্যাকেঞ্জি বেজোস, তখনই অনুমান করা গিয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিচ্ছেদের রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন তারা।

আর গত বৃহস্পতিবার এক টুইট বার্তায় চূড়ান্তভাবে সেই বিচ্ছেদের কথা জানিয়েছেন বেজোস দম্পতি। আর এই বিচ্ছেদের ফলে যেন কপাল খুললো ম্যাকেঞ্জির। বিশ্বের শীর্ষ ধনী নারীদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন তিনি। ৩৫ বিলিয়ন ডলার বা সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলার পরিমাণ সম্পদ নিয়ে বিশ্বের ধনী নারীর তালিকায় তিন নম্বরে উঠে এসেছেন ম্যাকেঞ্জি। একই সাথে বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় আছেন ২৪তম স্থানে।

বেজোস দম্পতির বিচ্ছেদের এই খবরের পর এখন শীর্ষ ধনীদের তালিকায় এসেছে পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে বিবিসির এক প্রতিবেদনে।

এই বিচ্ছেদের ফলে ৩ হাজার ৫৬০ কোটি ডলারের মালিক হলেন ম্যাকেঞ্জি। তবে অন্য আরো সম্পদ হিসাবে এর পরিমাণটা আরও বেশি হবে সেটা সহজে অনুমেয়। আর সেটা দেখার জন্য আগামী বছরের ফোর্বসের ধনীদের তালিকা প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

অবশ্য ওয়াশিংটন রাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী তিনি যদি বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে বেজোসের সম্পদের আধাআধি ভাগ চাইতেন, তাহলে শীর্ষ নারী ধনীর তালিকায় তার নাম ১ নম্বরেই থাকত।

পুঁজিবাজারে এক সাথে কাজ করার সময় ১৯৯৩ সালে বিয়ে হয় জেফ বেজোস ও ম্যাকেঞ্জির। এর পরের বছর অ্যামাজন প্রতিষ্ঠা করেন বেজোস। অ্যামাজনের প্রথম কর্মী ছিলেন ম্যাকেঞ্জি। পরে অবশ্য তিনি লেখালেখিতেই গুরুত্ব দেন। ৪৮ বছর বয়সী ম্যাকেঞ্জি বেজোস একজন গল্পকার। ‘দি টেস্টিং অব লুথার অলব্রাইট’ এবং ‘ট্র্যাপস’ নামে দুটো বই প্রকাশিত হয়েছে তার।

এই বিচ্ছেদের ফলে অনলাইনে পণ্য বিক্রির প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনের ৪ শতাংশ শেয়ার নিজের দখলে রাখবেন ম্যাকেঞ্জি। তবে তিনি ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা এবং বেজোসের ট্র্যাভেল ফার্ম ব্লু অরিজিনে তার অংশ ছেড়ে দিবেন।

বিচ্ছেদে প্রাপ্ত অর্থের ফলে ধনীদের তালিকায় স্থান করে নেওয়া ম্যাকেঞ্জির কারণে নতুন করে শীর্ষ ধনী নারীর তালিকা দিয়েছে বিবিসি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৯ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ সম্পদ নিয়ে বিশ্বে ধনী নারী তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ল’ রিয়াল কসমেটিকস এর উত্তরাধীকারী ফরাসি ফ্রান্সেওস ফ্রাঁসোয়া বেটেনকোর্ট মেয়ার্স। এই প্রতিষ্ঠানের ৩৩% শেয়ার তার দখলে।

আর প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি ডলার নিয়ে এই তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন ওয়ালমার্টের প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ওয়ালটনের একমাত্র কন্যা এলিস ওয়ালটন। তিনি ক্রিস্টাল ব্রিজ মিউজিয়ামের চেয়ারম্যান।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিচ্ছেদের চুক্তি অনুযায়ী মোট শেয়ারের ৪ শতাংশ মালিকানা পাচ্ছেন ম্যাকেঞ্জি। তবে কোম্পানির বোর্ডে ভোটিং ক্ষমতা সাবেক স্বামীর হাতেই দিয়ে যাচ্ছেন ম্যাকেঞ্জি। এছাড়া ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা এবং মহাকাশ ভ্রমণ প্রতিষ্ঠান ব্লু অরিজিনের কোনো অংশও নিচ্ছেন না তিনি। এর পরও বিশ্বের শীর্ষ ধনী নারীদের তালিকায় স্থান করে নিলেন ম্যাকেঞ্জি।

এদিকে বিচ্ছেদের মাশুল গুনতে গিয়ে বেজোসকে শীর্ষ ধনীর মুকুট হারাতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে ধনীদের তালিকায় আবার শীর্ষস্থানে ফিরতে পারেন সফটওয়্যার জায়ান্ট মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস।

ফলে গত বছরের শেষের দিকে ভারতীয় ধনকুবের মেয়ের বিয়ে আর চলতি বছরের শুরুতে বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তির বিয়ে বিচ্ছেদের যে রেকর্ড সেটি ভাঙার জন্য হয়তো আরও অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে। কারণ বিয়ে বিচ্ছেদের রেকর্ডটি ১৯৯৯ সালে তৈরি হয়েছিল এলেক ওয়ালডেস্টেন এবং তার স্ত্রী জসিলিনের বিচ্ছেদের মধ্যে দিয়ে। ৩৮০ কোটি ডলার দিয়ে বিচ্ছেদ হওয়া সেই রেকর্ডটি এবার বহু বহুগুন অর্থের বিনিময়ে প্রায় ২০ বছর পর ভাঙলেন বেজোস দম্পতি।

অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি বিয়ের তালিকায় প্রথম স্থানে থাকা রেকর্ডটি প্রায় ১৪ বছর ভেঙেছে ভারতের সেরা ধনী মুকেশ ধীরুভাই আম্বানির মেয়ে ইশা আম্বানির বিয়ে। এর আগ পর্যন্ত এই রেকর্ডটি ছিল ভারতের ইস্পাতশিল্পের ধনকুবের লক্ষ্মী মিত্তালের মেয়ে বানিশা মিত্তাল ও অমিত ভাটিয়ার বিয়ে। ২০০৫ সালে অনুষ্ঠিত সেই বিয়েতে খরচ হয়েছিল ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

আর গত বছরের শেষে ৪ হাজার ৩৭০ কোটি ডলারের মালিক মুকেশ আম্বানি অবশ্য তার সম্পদের সামান্যই খরচ করে সেই রেকর্ড ভেঙেছেন। মেয়ের বিয়েতে মাত্র ১০ কোটি ডলার খরচ করেছেন তিনি। যা বাংলাদেশী মুদ্রায় হিসাব করলে প্রায় হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এটিই এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে দামি বিয়ে।

আর দামি বিয়ের তৃতীয় স্থানে আছে ১৯৮১ সালে ডায়ানা ও ব্রিটিশ যুবরাজ প্রিন্স চার্লসের বিয়ে। সেই সময় এই বিয়েতে খরচ হয়েছিল ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার। মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করা হলে আজকের হিসাবে এই বিয়ের খরচ দাঁড়াবে ১১ কোটি ডলার।

ফলে ব্যয়বহুল বিচ্ছেদ আর ব্যয়বহুল বিয়ের রেকর্ডের জন্য অপেক্ষাটা যে অনেক বছর এটা সহজে অনুমেয়। তবে ততদিন বেজোস দম্পতির বিচ্ছেদের ফলে এত অর্থ পেয়ে আগামী বছরের ফোর্বসের তালিকায় ম্যাকেঞ্জি নিজেকে কোন অবস্থানে নিতে পারেন আর এত অর্থ দিয়ে স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদের ফলে জেফ বেজোস শীর্ষ ধনীর হারানো মুকুট ফিরে পান কি না সেটির জন্য দিন গুনায় যায়।

বিবিসি অবলম্বনে আল আমিন হুসাইন