শেয়ারবাজার

ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের সৌদি প্রতিনিধি দল

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক | ২২:৫৬:০০ মিনিট, মার্চ ০৭, ২০১৯

তেলনির্ভর একমুখী অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে সৌদি আরব। এরই অংশ হিসেবে গত রাতে ঢাকা পৌঁছেছে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পাঠানো উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। ৩৪ সদস্যের এ দলে দেশটির অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এবং বাণিজ্য-বিনিয়োগমন্ত্রী ছাড়াও রয়েছেন সৌদি বিনিয়োগ তহবিল ও উন্নয়ন তহবিলের পদস্থ কর্মকর্তারা। এ সফরকে কেন্দ্র করে ৩ হাজার ১০৪ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব তৈরি করছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সফররত সৌদি প্রতিনিধি দল আজ সকালে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংলাপে মিলিত হবে। এজন্য বাংলাদেশের প্রস্তুতকৃত ২৯টি বিনিয়োগ প্রকল্পের মধ্যে শুধু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেই রয়েছে সাত প্রকল্প। এ খাতে ২ হাজার ১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব রাখছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে তেল শোধনাগার, পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স ও গুদামজাতকরণ নিয়ে ৭০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের প্রকল্প তৈরি করেছে সরকার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও সৌদি আরামকো এটি নিয়ে কাজ করছে। আর নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে কম মূল্যে বিদ্যুৎ আমদানির প্রকল্পে ৩০০-৫০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তুাব প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল।

এর বাইরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের ইজিসিবি ও সৌদি আলফানারের মধ্যে ফেনীতে ১০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ১০ কোটি ডলার, বাংলাদেশের স্রেডা ও সৌদি আলফানারের মধ্যে ১০০ মেগাওয়াটের হাইব্রিড সোলার প্রকল্পে ১০ কোটি ডলার এবং পাওয়ার স্টেশন ও সাবস্টেশন এবং উৎপাদন ও সঞ্চালন লাইনের উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশের ইজিসিবি/বিপিজিসি ও সৌদি আলফানারের মধ্যে ১ হাজার কোটি ডলারের প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়া ট্রান্সফরমার, সাবস্টেশন ও অন্যান্য অনুষঙ্গ উৎপাদন নিয়ে কৌশলগত অংশীদারিত্বে ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের প্রকল্প এবং এইচভি কেবল উৎপাদনে ৭ কোটি ডলারের প্রকল্প প্রস্তুত করেছে বাংলাদেশ।

সূত্র জানায়, একদিনের সফরে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ ছাড়াও সরকারের উচ্চকর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রতিনিধি দলটির আলোচনা ও মতবিনিময়ের সূচি নির্ধারিত হয়েছে। আজকের বেশ কয়েকটি আলোচনার মাধ্যমেই প্রকল্প ও অর্থায়ন চূড়ান্ত হবে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলাম বলেন, ৭ মার্চ সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত সৌদি আরব-বাংলাদেশ বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহযোগিতাবিষয়ক সংলাপ শুরু হবে। সৌদি আরবের এ দলের সঙ্গে আছেন দেশটির ‘পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের’ প্রতিনিধিরা। ফান্ডটির নেতৃত্বে আছেন যুবরাজ মোহাম্মেদ বিন সালমান। আমরা সহযোগিতা শুরু করছি সেসব প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প নিয়ে, যে বিষয়ে তাদের এবং আমাদের আগ্রহ আছে। বেসরকারি খাতের সম্ভাবনাগুলোকে এ সম্পর্কের আওতায় আনার জন্য আমরা কাজ করে যাব। বাংলাদেশের দৃঢ় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও সৌদি আরবের শক্তিশালী অর্থনীতি কাজে লাগিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন ধাপে উন্নীত হবে বলে আমরা আশা করছি।

জানা গেছে, কৃষি খাতে ইউরিয়া উৎপাদন প্রকল্পে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার, পর্যটন খাতে হোটেল থিম পার্ক টুরিজম প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রকল্পে ২৫ কোটি, মিরসরাইয়ে সৌদি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পে ৩০ কোটি, কম্পোজিট টেক্সটাইল মিল স্থাপনে ২০ কোটি, টয়লেট সিরামিক পণ্য উৎপাদনে ৩ কোটি, ফুড অ্যান্ড বেকারি খাতে ২ কোটি ৫০ লাখ, সৌদি হাইটেক পার্কে ৫ কোটি, পেপার মিলে ১৫ কোটি, সিমেন্ট উৎপাদনে ১৫ কোটি, ওষুধ ও এপিআই উৎপাদনে ১০ কোটি, বিআইডব্লিউটিএ লজিস্টিক খাতে ২০ লাখ, ময়মনসিংহ ও জামালপুরে বায়োমেডিকেল সরঞ্জাম প্রশিক্ষণ প্রকল্পে ৩০ লাখ, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ইউরিয়া-অ্যামোনিয়া কারখানা তৈরি প্রকল্পে ৩০০ কোটি, সৌদি আরবে অথবা মরক্কোয় পটাশ উৎপাদন প্রকল্পে ৯০ কোটি, অ্যাকুয়াকালচার বিষয়ক রেড সি প্রকল্পে ৫০ কোটি, সুদান ও উগান্ডায় কৃষিপণ্য উৎপাদন নিয়ে কন্ট্রাক্ট ফার্মি প্রকল্পে ১০০ কোটি, লারমনিরহাটে উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ফ্যাসিলিটি তৈরি প্রকল্পে ১০০ কোটি, টেলিটকের উন্নয়ন প্রকল্পে ২০০ কোটি, দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণবিষয়ক প্রকল্পে ৫ কোটি এবং হালাল মাংস প্রস্তুত কারখানা প্রকল্পে ৫ কোটি ডলারের প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে। এর বাইরে সৌদি আরবে বাংলাদেশী ব্যাংকের লাইসেন্স এবং বীমাবিষয়ক একটি প্রকল্পও প্রস্তুত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরবের হাই প্রোফাইল ডেলিগেশনের এটাই হতে যাচ্ছে প্রথম বাংলাদেশ সফর। বিশেষ করে বিনিয়োগের আলোচনায় অতীতে সৌদি আরবের তরফ থেকে এমন আগ্রহ আগে দেখানো হয়নি। সৌদি সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মোহাম্মেদ বিন মাজিদ আল তোয়াইজরি এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক মন্ত্রী ড. মজিদ বিন আবদুল্লাহ আল কাসাবির নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি আসবে। সেই দলে সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট ও পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্ত থাকছেন। এখন পর্যন্ত ৩ হাজার কোটি টাকার উপরে প্রকল্পের প্রস্তুতি রেখেছে বাংলাদেশ। প্রতিটি প্রকল্প নিয়েই আলোচনা করে সই করা হবে।

গত মাসে সৌদি মন্ত্রীদের বাংলাদেশ সফরের বিষয়টি গণমাধ্যমে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। তিনি জানান, সৌদি সরকারের দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী আসছেন। রাষ্ট্রদূত এ নিয়ে আলোচনা করে গেছেন। তিনি আশা করেন, ওই সফরে বড় বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হবে।

এর আগে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পাকিস্তান সফরে ২ হাজার কোটি ও ভারত সফরে দেশটির সঙ্গে ১০ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এরই মধ্যে ঢাকায় পৌঁছেছেন সৌদি আরবের বিনিয়োগসংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। এ সফরকে কেন্দ্র করে ৩ হাজার ১০৪ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব তৈরি করছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে শুধু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেই ২ হাজার ১৩০ কোটি ডলারের প্রস্তুতি রাখছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।