প্রথম পাতা

আর্থিক দুর্বলতায় কাজ পেল না আব্দুল মোনেম

নিজস্ব প্রতিবেদক | ০১:৩২:০০ মিনিট, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৯

নির্মাণ খাতে দীর্ঘ ছয় দশকের অভিজ্ঞতা আব্দুল মোনেম লিমিটেডের। দেশের অবকাঠামো খাতের বড় বড় অনেক প্রকল্প নির্মাণে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানটি। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়ে মেরামত থেকে শুরু করে মেট্রোরেলের একটি অংশও। একের পর এক বড় অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের কাজ নিয়ে আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ অবস্থায় সাসেক প্রকল্পের একটি লটে সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও আর্থিক সক্ষমতার অভাবে আব্দুল মোনেমের পরিবর্তে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সাসেক সংযোগ প্রকল্প-২-এর আওতায় এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত সড়ককে চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। এ প্রকল্পে প্যাকেজ-৫-এর দরপত্রে অংশ নিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে আব্দুল মোনেম। তবে প্রতিষ্ঠানটি সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও ৬৫৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকার এ প্যাকেজের কাজ দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশনকে। প্রকল্পটিতে অর্থায়নকারী এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সুপারিশে আব্দুল মোনেমের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। একই প্রকল্পের অন্য একটি প্যাকেজের কাজ পাওয়া আব্দুল মোনেমের এ প্যাকেজ বাস্তবায়নে আর্থিক সক্ষমতা নেই বলে মতামত দেয়া হয়। ফলে গতকাল সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এ-সংক্রান্ত ক্রয় প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়া হয়নি। বরং আব্দুল মোনেমের কাছ থেকে এ বিষয়ে লিখিত নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে কমিটি।

এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণে একটি প্যাকেজের কাজ ছাড়াও নির্মাণাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পের একটি অংশের কাজ করছে আব্দুল মোনেম লিমিটেড। জাপানের টেক্কেন করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে মেট্রোরেল প্রকল্প প্যাকেজ-৫-এর আওতায় আগারগাঁও থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত নির্মাণকাজের দায়িত্ব পেয়েছে আব্দুল মোনেম। এ অংশে উড়াল রেলপথ ও স্টেশন নির্মাণের কাজ করছে তারা। এখানে নির্মাণ করা হবে ৩ দশমিক ২ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ। যাত্রী ওঠা-নামার জন্য নির্মাণ করা হবে তিনটি স্টেশন। আগারগাঁও-কারওয়ান বাজার অংশটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা।

পদ্মা সেতুর দুই পাড়ের সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণেও কাজ করছে আব্দুল মোনেম লিমিটেড। কাজটি তারা বাস্তবায়ন করছে মালয়েশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাইওয়ে কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যৌথভাবে। দুই পাড়ের সংযোগ সড়কের কাজ শতভাগ সম্পন্নও হয়েছে এরই মধ্যে।

একের পর এক বড় প্রকল্পের কাজ করা প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে জানান ব্যাংকাররা। বেসরকারি খাতের বিভিন্ন ব্যাংকে আব্দুল মোনেমের ঋণ রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। দেশের এক ডজন ব্যাংকের বড় গ্রাহকদের তালিকায় রয়েছে গ্রুপটি। যমুনা, ট্রাস্ট, ব্যাংক এশিয়া, প্রাইম, শাহজালাল ইসলামী, সোস্যাল ইসলামী (এসআইবিএল), স্ট্যান্ডার্ড, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকসহ (ইউসিবি) বেশ কয়েকটি ব্যাংক রয়েছে এ তালিকায়। গ্রুপের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হওয়ায় উদ্বিগ্ন ব্যাংকাররা।

বেশ কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন বণিক বার্তাকে। তবে ব্যাংকের শীর্ষ গ্রাহক হওয়ায় তাদের কেউই নিজেদের নাম উদ্ধৃত করে বক্তব্য দিতে চাননি।

প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে, এমন একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ছয় মাস আগেও আব্দুল মোনেমের আর্থিক অবস্থা তুলনামূলক খারাপ ছিল। ওই সময় তারা সময়মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছিল না। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক। সঠিক সময়ে পরিশোধ করতে না পারলেও কিস্তির অর্থ দিচ্ছে তারা।

বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বলেন, কয়েক বছর ধরে আব্দুল মোনেম গ্রুপের আর্থিক অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। গ্রুপটির কাছে আমাদের বড় অংকের ঋণ রয়েছে। ঋণের কিস্তি প্রায়ই অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছে। ঋণ পরিশোধের জন্য গ্রুপটিকে বারবার তাগাদা দেয়া হচ্ছে। গ্রুপটির মূল উদ্যোক্তা আব্দুল মোনেম অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই আর্থিক অবস্থা খারাপ হচ্ছে।

অন্য একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, আব্দুল মোনেম গ্রুপ সরকারের বড় বড় প্রকল্পের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ পাচ্ছে। এর পরও গ্রুপটির আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়াটা উদ্বেগের। পরিস্থিতির উত্তরণ না হলে বহু ব্যাংক বিপদে পড়বে।

আব্দুল মোনেমের আর্থিক অবস্থার বিষয়টি উঠে আসে গতকাল অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকেও। আর্থিক সক্ষমতা না থাকার কথা বলে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও সাসেক প্রকল্পের লট-৫-এর কাজের অনুমোদন দেয়া হয়নি আব্দুল মোনেমকে।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কমিটি ও অর্থনৈতিক) নাসিমা বেগম জানান, একই প্রকল্পে আরেকটি কাজ পেয়েছে আব্দুল মোনেম। আর কাজটির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে দেখতে অনুরোধ করে প্রকল্পের উন্নয়ন সহযোগী এডিবি। যাচাই করে সরকারের মতামত হলো, তারা কাজটি করতে পারছে না। পরবর্তী সময়ে এডিবির সুপারিশ নিয়ে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে এ লটের কাজ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেডকে কাজ দেয়ার সুপারিশ করা হয়। আজকের (গতকাল) বৈঠকে ক্রয় প্রস্তাবটি অনুমোদন হয়নি। সর্বনিম্ন দরদাতা আব্দুল মোনেমের কাছ থেকে লিখিত নেয়ার জন্য বৈঠকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতের কাজ করা হচ্ছে। ১৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির উন্নয়নকাজ বিভিন্ন প্যাকেজে ভাগ করে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব অংশ পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার পড়েছে প্যাকেজ ৫-এর আওতায়। এই প্যাকেজেই সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে আব্দুল মোনেম।

আব্দুল মোনেম গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মইনুদ্দিন মোনেম বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা ফিন্যানশিয়ালি স্ট্রং। পূর্বাভিজ্ঞতা থেকে সম্প্রতি সরকার ফিন্যানশিয়াল বিষয়গুলো কিছুটা কঠোর করে দিয়েছে। আমরা কাজ একটার পর একটা করেই যাচ্ছি। পদ্মায় আমরা তিনটা কাজ একসঙ্গে করেছি; ২ হাজার কোটি টাকার কাজ। এখানে দুটো যোগ করলে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার কাজ। আমাদের কোনো কাজেই ফিন্যান্সের কোনো সমস্যা থাকে না।