প্রথম পাতা

ঘন ঘন ঋণের সুদহার পরিবর্তন

ব্যাংকের ওপর চটেছেন ব্যবসায়ীরা

ব্যবসা খাতে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে এফবিসিসিআইয়ের বৈঠক

নিজস্ব প্রতিবেদক | ০০:০৩:০০ মিনিট, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৯

গত বছর সেপ্টেম্বরে ৯ শতাংশ সুদে এক্সিম ব্যাংক লিমিটেড থেকে ৬ কোটি টাকা ঋণ নেন বাংলাদেশ এয়ার কন্ডিশনিং ইকুইপমেন্টস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লুত্ফর রহমান। ঋণ নেয়ার এক মাস পরই ৯ শতাংশের পরিবর্তে সুদহার ১৪ শতাংশ জানিয়ে তার প্রতিষ্ঠান সুপ্রিম এয়ার কন্ডিশনারসকে চিঠি দেয় ব্যাংকটি। বেশি সুদের ঋণে বিনিয়োগের পর লোকসানের ঝুঁকিতে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করেন লুত্ফর রহমান। সর্বশেষ গতকাল ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সমন্বয় সভায় এ সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান চান তিনি।

ঘন ঘন ঋণের সুদহার পরিবর্তন নিয়ে এক্সিম ব্যাংকের ওপর চটেছেন আরো একাধিক ব্যবসায়ী। পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব হাজি মো. আবুল কাশেম বলেন, সুদহার এক অংকে নামানোর ঘোষণা দেয়ার পর এক ধরনের পরিকল্পনা থেকে ঋণ নিয়েছি। তবে কয়েক দিন পরই ওই সুদহার ১৩-১৪ শতাংশ করে চিঠি দেয়া হয়েছে। এতে পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়ে ব্যবসা হারানোর শঙ্কায় পড়েছি।

এক্সিম ব্যাংকের ঋণের সুদহার নিয়ে এ ধরনের ঘটনা এমকে ইলেকট্রনিকস, লুবানা জেনারেল হাসপাতাল, চিসেল চাইনিজ রেস্টুরেন্ট ও নিটল-টাটা গ্রুপের সঙ্গেও ঘটেছে বলে জানান লুত্ফর রহমান। গতকাল রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে এফবিসিসিআই আয়োজিত ‘আগামী জাতীয় বাজেটে বিভিন্ন ব্যবসা খাতের সুপারিশের সমন্বয় ও পাঁচ বছরের জন্য দেশের ব্যবসা উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে উন্মুক্ত আলোচনায় তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর ব্যাংক মালিকরা সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেন। এরপর আমি এক্সিম ব্যাংক থেকে দুটি কিস্তিতে ঋণ গ্রহণ করি। প্রথমে ৯ শতাংশ সুদহার নির্ধারণ করা হলেও এক মাস পরই তা ১৪ শতাংশ জানিয়ে চিঠি দেয়া হয়। ফলে আমরা ঋণ নিয়ে বিপদে পড়েছি।

অনুষ্ঠানে ব্যাংকের সুদহার নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ করে তার সমাধান ও দ্রুত সময়ের মধ্যে সব ব্যাংকে সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনতে এফবিসিসিআইকে ভূমিকা রাখার অনুরোধ করেন ব্যবসায়ীরা।

জবাবে এফবিসিসিআইয়ের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, আমাদের অনেক প্রচেষ্টার পরও সরকারি ব্যাংক ছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলো এক অংকের সুদহারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেনি। এ ব্যাপারে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। আগামীতে এর স্থায়ী সমাধান করা হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ব্যাংকের সুদহার অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। অন্য সংগঠনগুলোকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করেছে এফবিসিসিআই। ঋণের উচ্চ সুদহার থাকলে কোনোভাবেই ব্যবসার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি সম্ভব নয়।

ঋণখেলাপিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে এফবিসিসিআই যথেষ্ট সোচ্চার। অবৈধ পন্থায় যারা ব্যাংকের টাকা লুটপাট করেছে, তাদের ‘দৃষ্টান্তমূলক’ শাস্তি চাই। তবে অতীতের রেকর্ড দেখে অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের চিহ্নিত করে তাদের ক্ষেত্রে উত্তরণমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। বড় অংকের খেলাপিদের জন্য আলাদা স্ল্যাব করে ২০ বছরের জন্য ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দেয়া হয়েছে। অথচ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কোনো স্ল্যাব নেই। ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণও দিতে চায় না ব্যাংক।

আগামী বাজেটে ভ্যাট ও কর নীতি নিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে ব্যবসায়ীরা আন্দোলন করেছেন। ঐক্যবদ্ধ থাকার কারণে এটা জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়। সে কারণে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নজরে নিয়েছেন। তার দূরদৃষ্টির কারণেই ভ্যাট আইন স্থগিত রয়েছে। তবে সব ব্যবসায়ী সঠিকভাবে প্যাকেজ ভ্যাট দিচ্ছে না। ২৮ হাজার টাকা প্যাকেজ ভ্যাট না দিয়ে অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত মেলানো হচ্ছে। যেখানে অন্যায় করা হবে, ব্যবসায়ীরা হয়রানি হবেন, সেখানে এফবিসিসিআই ব্যবসায়ীদের পাশে থাকবে। কিন্তু কোনো অসৎ কাজে সমর্থন দেবে না।

নতুন আইনে ভ্যাটের একক হার ১৫ শতাংশ থাকবে না জানিয়ে তিনি বলেন, গত সপ্তাহে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের সঙ্গে নতুন আইন নিয়ে বৈঠক করেছি। তিনি একটি বিষয় মেনে নিয়েছেন, তা হলো সব ক্ষেত্রে ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ থাকবে না। এর বিভিন্ন হার হবে।

এর আগে বাজেট সুপারিশ তুলে ধরে বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মানেনি অধিকাংশ ব্যাংক। এক অংকের সুদে ঋণ দেয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো ব্যাংক তা বাস্তবায়ন করেনি। কয়েকদিন এক অংকের সুদে ঋণ দিলেও পরে আবার চিঠি দিয়ে দুই অংকে সুদ দেয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছে। মূলত খেলাপি ঋণের কারণে সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে পারলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এক অংকে ঋণ দেয়া সম্ভব।

অনুষ্ঠানে ক্রোকারিজ ও মেলামাইন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনির হোসেন বলেন, ব্যাংকগুলো ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেয় না। এখন ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয়। তার পরও ঋণ পাওয়া যায় না। যারা ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়, ব্যাংক তাদের ঋণ দেয় না। সৎ ব্যবসায়ীদের মূল্যায়ন করা হয় না। আর যারা ব্যাংকের টাকা লুট করে তাদের ঋণ দেয়।

পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় না করার অনুরোধ জানিয়ে পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব হাজি মো. আবুল কাশেম বলেন, যারা ভ্যাট-ট্যাক্স দেয়, কর কর্মকর্তারা শুধু তাদের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায় করেন। আর যারা দেয় না, তাদের কিছু বলেন না। পাইকারি ব্যবসায় ১ শতাংশ মুনাফা না হলেও ১৫ শতাংশ ভ্যাট দাবি করা হয়।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পিকেএসএফ থেকে ঋণের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়ে অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মোল্লা শামসুর রহমান শাহীন বলেন, ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঋণ পান না। অথচ পিকেএসএফ বানানো হয়েছিল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য। এখন পিকেএসএফ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টাকা না দিয়ে বিভিন্ন এনজিওকে দিচ্ছে। আর ছোট ব্যবসায়ীরা চড়া সুদ দিয়েও ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছেন না।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ভ্যাট অব্যাহতির দাবি জানান এসএমই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলী জামান। এছাড়া অনুষ্ঠানে কর, ভ্যাট ও শুল্কহার নিয়ে আগামী বাজেটের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরে সিমেন্ট, স্টিল, ট্যানার্স, ওষুধ শিল্প, তৈরি পোশাক শিল্পসহ ছোট-বড় অনেক ব্যবসায়ী সংগঠন।