সম্পাদকীয়

স্বপ্ন পূরণের বাজেট ২০১৮-১৯ রূপরেখা ও প্রস্তাবনা

ড. এ কে আব্দুল মোমেন | ১৯:৫০:০০ মিনিট, মে ৩০, ২০১৮

বাজেট একটি বছরের আয়-ব্যয়ের দিকনির্দেশনা এবং কোন কোন খাতে কত ব্যয় করা হবে এবং কোন কোন খাত থেকে কত টাকা আয় সংগ্রহ করা যাবে বা বাড়াতে হবে তার এক হালখাতা। তবে যেহেতু বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তাই তাদের বার্ষিক বাজেট আর শুধু বার্ষিক বাজেট নয়; এর লক্ষ্য হচ্ছে এটাকে এমনভাবে ঢেলে সাজানো, যাতে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনের জন্য অধিকতর সম্পদ ও প্রযুক্তিবিদ্যা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব একটু বেশি। কারণ আমরা তিন তিনটি লক্ষ্য অর্জনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এগুলো হচ্ছে— প্রথমত. ২০২১ সালের মধ্যে ‘উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন, যার অর্থ হচ্ছে বর্তমানের জনপ্রতি ১ হাজার ৭৬৫ ডলারের বার্ষিক মাথাপিছু আয়কে ৩ হাজার ৯৫৬ ডলারে উন্নীত করা। দ্বিতীয়ত. ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা ও ১৬৯টি টার্গেট (দেশবিশেষে এর সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে) অর্জন করার জন্য যথোপযুক্ত সম্পদ আয়োজন ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা। এটা কিন্তু সহজ ব্যাপার নয় এবং এজন্য নতুন নতুন সৃষ্টিশীল আয় সংগ্রহের পন্থা গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত. ২০৪১ সালের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা’ অর্জন, যার লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত, সমৃদ্ধশালী, স্থিতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক অর্থনীতি; যেখানে ধনী-দরিদ্রের আকাশসম ফারাক থাকবে না, যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে, যেখানে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা সব নাগরিকের জন্য নিশ্চিত হবে। এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা গঠন করা চাট্টিখানি কথা নয়; বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য, যেখানে প্রতিকূল পরিবেশ ও ঘনবসতিপূর্ণ লোকের হলহলা। সুতরাং বাংলাদেশ যদিও বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রাইস ওয়াটার হাউজকুপারস গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, বিশ্বের ‘দ্বিতীয়’ মোস্ট ইম্প্রেসিভ বা সম্ভাবনাময় অর্থনীতি, তবু উল্লিখিত লক্ষ্য বা ভিশন অর্জন করা জাতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের উন্নয়ন অভাবনীয়

বর্তমানে আমাদের অর্থনীতি খুবই ভালো অবস্থানে আছে। বস্তুত, পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ, যার লক্ষণীয় সম্পদ বলতে ‘মানুষ’ ও ‘পানি’ ছাড়া অন্য কিছু নেই; না আছে তেলসম্পদ, জ্বালানি বা অন্যান্য খনিজ সম্পদের পাহাড়, না আছে উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানবসম্পদ বা নব নব প্রযুক্তিবিদ্যার অঢেল সরবরাহ ও জ্ঞান। তা সত্ত্বেও গেল নয় বছর এর অগ্রযাত্রা ও উন্নয়ন অবাক হওয়ার মতো। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যেমন— শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাসের ক্ষেত্রে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল এনরোলমেন্ট বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অথবা জীবনের গড় আয়ু বৃদ্ধিতে এবং বিশেষভাবে দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশের অর্জন প্রশংসনীয়। তাছাড়া গেল নয় বছরে এর জাতীয় জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি এক নাগাড়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের অধিক এবং এ বছর এর প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং আগামী বছরে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা সত্যিই প্রশংসার। এসব উন্নয়ন যে কত বেশি তা উপলব্ধির জন্য এটুকু তুলনা করলেই যথেষ্ট, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল— এ দীর্ঘ ১৫ বছরের গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং বর্তমানে তা দ্বিগুণের বেশি। এটা সম্ভব হয়েছে প্রথমত এ দেশের খেটে খাওয়া জনগণের জন্য, বিশেষ করে কৃষক, জেলে, গার্মেন্ট শ্রমিক ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য, যারা হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে স্বদেশের রিজার্ভ চাঙ্গা রাখছেন। দ্বিতীয়ত. বর্তমান সরকারের বলিষ্ঠ ও পরিপক্ব নেতৃত্বের জন্য, যাদের ধ্যান-ধারণায় দেশের উন্নয়ন হচ্ছে মূল লক্ষ্য। তাদের প্রচেষ্টার ফলে দেশে আজ ‘মঙ্গা’ নেই। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধান গার্মেন্ট বা তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ, বিশেষ করে জাতিসংঘের মহাসচিব একে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং আমেরিকার প্রভাবশালী পত্রিকা ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ একে ‘Standard bearer of the South Asia’ বা দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর স্ট্যান্ডার্ড বহনকারী দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

বস্তুত, বাংলাদেশের অর্জন অভাবনীয়। এটা আর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি নয়’। সম্প্রতি জাতিসংঘ চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করে রায় দিয়েছে, ‘বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জন করেছে’ এবং আগামী বছরগুলোয় আমরা যদি আমাদের উন্নয়নের গতিপ্রবাহ ধরে রাখতে পারি তাহলে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে মর্যাদা অর্জন করব। ‘স্বল্প আয়ের বা দরিদ্রতম দেশগুলোর অন্যতম’— এ বদনাম আমরা উতরে উঠেছি। শুধু তাই নয়, বিশ্বের ২১৪টি দেশ বা অঞ্চলগুলোর মধ্যে (১৯৩টি দেশ জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত) মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু-১’ উেক্ষপণ করে বাংলাদেশ ৫৭তম অবস্থান অর্জন করেছে। এ বছর দরিদ্র দেশ থেকে উত্তরণ এবং স্যাটেলাইট উেক্ষপণের মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের মান-সম্মান, ইজ্জত ও ভাবমূর্তি যে কত উপরে উঠেছে, তা টাকার পরিমাণে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। আজ বাঙালি জাতি একটি গর্বিত জাতি, বাংলাদেশ আত্মমর্যাদাপূর্ণ সম্ভাবনাময় দেশ।

মূলত চারটি ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অর্জন অভাবনীয়— ১. বিদ্যুৎ উৎপাদন ২. কৃষি বিপ্লব ৩. দারিদ্র্য বিমোচন ও ৪. ডিজিটালাইজেশন। যেখানে ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, তা বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। যদিও জমির পরিমাণ দিন দিন কমছে, তা সত্ত্বেও খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে সাড়ে তিন গুণেরও অধিক; যা ১১ লাখ থেকে প্রায় ৩৮ লাখ টন হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে এ সরকারের অর্জন দেশকে উচ্চ মার্গে নিয়ে গেছে। ১৯৯১ সালে যেখানে ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করত, বর্তমানে তা কমে ২২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। পৃথিবীর মধ্যে দুটো দেশ গণচীন ও বাংলাদেশের অর্জন এক্ষেত্রে অনুকরণীয়। দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ১৩ কোটি আজ ডিজিটাল ফোন ব্যবহার করছে। আরেকটি অর্জন লক্ষণীয়, আর তা হচ্ছে নারী জাগরণ। আগে যেখানে মাত্র ৬ শতাংশ নারী কর্মজীবী ছিলেন, তা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৩৮ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশের উন্নয়নে এ এক বিশাল অর্জন।

আমাদের উন্নয়নমানবীয় উন্নয়ন বটে

যখন কোনো দেশে উন্নয়ন দ্রুতগতিতে হয়, তখন সে দেশে মূল্যস্ফীতি যেমন বাড়ে, তেমনি ধনী-দরিদ্রের ফারাকও লক্ষণীয়ভাবে বাড়ে। তবে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে অধিকতর খরচ করছে। লোকজনের বেতন ও ভাতা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এতে দেশের অভ্যন্তরে একটি ‘বিরাট বাজার’ তৈরি হয়েছে। ফলে বিনিয়োগের আকর্ষণ বেড়েছে এবং একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি নাগালের মধ্যে আছে। ধনী-দরিদ্রের ফারাক প্রতিবেশী রাষ্ট্র যেমন— শ্রীলংকা, ভারত, ভুটান, পাকিস্তানের চেয়ে এখনো কম এবং সেজন্য একে ‘মানবীয় উন্নয়ন’ বলা যেতে পারে। তবে এ ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, যাতে ফারাকটি খুব বেশি না হয়।

ভিশনগুলো অর্জনের জন্য অনেক সম্পদ দরকার

যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম তা হচ্ছে, আমাদের সামনে অনেক ‘ভিশন’ ও রূপরেখা রয়েছে। তার অর্থ অনেক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন অধিকতর সম্পদ ও প্রযুক্তি অর্জন।

২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আমাদের দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান অবকাঠামোর উন্নয়ন খুবই প্রয়োজন। দৃশ্যমান অবকাঠামো হচ্ছে— রাস্তাঘাট, বিমানবন্দর, নদীবন্দর, রেললাইন, জ্বালানি, আইটি টেকনোলজি বা ডিজিটালাইজেশন, সড়ক-মহাসড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট ইত্যাদি। টাকা থাকলে এগুলো করা সম্ভব এবং সরকার একাধিক মেগা প্রজেক্ট শুরু করেছে। ঢাকা-সিলেট ৪+২ লেন বা ঢাকা-চট্টগ্রাম আট লেনে উন্নীতকরণের কাজ এখনো শুরু হয়নি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট সবার জানা। এ মহাসড়ক দিয়ে বছরে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার বা ৬ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য পরিবহন হয়। ঢাকা শহরের যানজটও অসহনীয় অবস্থায় রয়েছে। সুতরাং একে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য অধিকতর সম্পদ দরকার।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার জন্য আগামী ১৩ বছরে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ৭৫ লাখ ১৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বা ৯২৮ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে হবে। অর্থাৎ প্রতি বছর অতিরিক্ত ৫ কোটি ৭৮ লাখ ২১ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা বা ৬৬ বিলিয়ন ডলার জোগান দিতে হবে। আমাদের প্রস্তাবিত বাজেট হচ্ছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা বা ৫৮ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের জিডিপি ও চাহিদার তুলনায় অনেক কম।

মোদ্দাকথা, আমাদের আরো সম্পদ দরকার। সম্পদ সংগ্রহ করার জন্য প্রধানত তিনটি দরজা খোলা আছে। প্রথমত. অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ, দ্বিতীয়ত. বৈদেশিক সাহায্য এবং তৃতীয়ত. ব্যবসায়ীদের অধিকতর বিনোয়োগ।

সাম্প্রতিককালে বৈদেশিক সাহায্য তুলনামূলকভাবে দিন দিন কমে এসেছে এবং তাছাড়া আমাদের উন্নয়নের পার্টনার বা অংশীদার দেশগুলো যে পরিমাণ সাহায্য দিয়ে থাকে, তা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। উন্নয়নশীল দেশের জন্য পার্টনার দেশগুলো গেল এক দশকে গড়ে ১৫৬ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছে, যা টেকসই উন্নয়নের চাহিদা যদি ফি বছর ৫ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার হয়ে থাকে তাহলে ২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং যদি অতিরিক্ত ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার হয়ে থাকে তাহলে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ মাত্র, অর্থাৎ ৫ শতাংশেরও কম। এর অর্থ হলো, চাহিদার ৯৫ শতাংশ সম্পদ দেশকে অন্যভাবে সংগ্রহ করতে হবে। সুতরাং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়ানোর জন্য নব নব সৃষ্টিশীল উদ্যোগ নিতে হবে।

আয়কর বাড়ানোর জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করা যেতে পারে

সুখের কথা, আয়কর প্রদানকারীর সংখ্যা ১১ লাখ থেকে বেড়ে ৩৩ লাখে পৌঁছেছে। তবে সাড়ে ১৬ কোটির দেশে তা এখনো কম। এক্ষেত্রে আমাদের একটি প্রস্তাব আছে। প্রস্তাবটি হলো, দেশের প্রত্যেকের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে কে কত আয়কর দিয়েছে তা নির্ধারণ করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘সোস্যাল সিকিউরিটি কার্ড’-এর বিপরীতে প্রত্যেককে বাধ্যতামূলকভাবে আয়কর দাখিল করতে হয়। আমাদের দেশে ব্যক্তিবিশেষের জন্য টিআইএনের (TIN) পরিবর্তে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করলে এর সংখ্যা সহজেই বাড়তে পারে। তবে করপোরেশন বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য টিআইএন রাখা যেতে পারে। বস্তুত, যাদেরই জাতীয় পরিচয়পত্র আছে, তাদের প্রত্যেককে আগামীতে বার্ষিক আয়ের হিসাব দাখিল করার জন্য বাজেট বক্তৃতায় ঘোষণা দেয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়ত. প্রত্যেক লেনদেনে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর যদি ব্যবহার করা হয়, তাহলে কে কত আয় করেছেন, এ ডিজিটাইজেশনের যুগে তা নির্ণয় করা অসম্ভব নয়।

সরকারের রিজার্ভ ফান্ডের বিপরীতে সভরেন বন্ড চালু করা প্রয়োজন

আমরা জানি, ব্যক্তিবিশেষের জন্য সঞ্চয় হচ্ছে আশীর্বাদ। তবে দেশের জন্য তা হচ্ছে অভিশাপ। অর্থনীতিতে একটি তত্ত্ব আছে, যা ‘গ্রিফিন প্যারাডক্স’ নামে সমধিক প্রসিদ্ধ। এ তত্ত্বমতে, সরকারের জন্য সঞ্চয় হচ্ছে অভিশাপ। রাষ্ট্রীয় সঞ্চয় যদি বিনিয়োগ না করা হয় তাহলে নতুন প্রডাক্টিভিটি আসবে না। অর্থাৎ ‘অলস সম্পদ’ দেশের জন্য ভালো নয়। যারা ব্যবসা করেন তা তারা জানেন। ইনভেনটরি বা মজুদ পণ্য যদি বিক্রি না হয় তাহলে বেজায় মুশকিল, তাতে ব্যবসার রিটার্ন অব ইনভেস্টমেন্ট দুর্বল হবে। সুতরাং যত বেশি ও যত দ্রুত ইনভেন্টরি ব্যবহূত হবে ততই ব্যবসার জন্য ভালো। বেশি মজুদ রাখা যেমন ক্ষতিকর, একেবারে কম রাখাও ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের ৩২ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আছে বলে আমরা গর্ব বোধ করি। গর্ব বোধ করার যথেষ্ট কারণও আছে। তবে রিজার্ভ অলস সম্পদ, একে কাজে লাগাতে না পারলে দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, ‘What should be the optimam level of reserve?’ কতটুকু রিজার্ভ রাখা দেশের জন্য মঙ্গলকর তা নির্ণয় করতে হবে। আর এই অধিক রিজার্ভের একটি অংশ সভরেন বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বিনিয়োগ করা দরকার। বোধ করি তাতে প্রথমত. গুচ্ছ ধরে ঋণ নিতে হবে না এবং দ্বিতীয়ত. সাম্প্রতিককালে যেহেতু অন্য দেশের রিজার্ভ-বন্ডের রেটও অনেক কমে গেছে, আসন্ন বাজেটে এ ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দেয়া যেতে পারে বৈকি। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে নিশ্চয়ই তাদের সুচিন্তিত অভিমত সরকারকে জানিয়েছে।

সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ সম্পদের অপচয় বন্ধ করা প্রয়োজন

সরকার প্রতিটি প্রজেক্ট বা প্রোগ্রামে অনেক টাকা বরাদ্দ করছে এবং বহু উন্নয়ন প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই কাজ বড় ধীরগতিতে হয় এবং তার ফলে ব্যয়ভার বাড়ে, সম্পদের অপচয় হয়। সম্পদের অপচয় সাম্প্রতিককালে বিরাট আকার ধারণ করেছে। দুর্নীতিও লাগামহীন হারে বেড়েছে। তাছাড়া বিশেষভাবে লক্ষণীয়, ছোটখাটো কাজের জন্যও জনগণ ও সরকারি কর্মচারীদের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বারবার ধরনা দিতে হয়। ফলে উন্নয়ন কাজগুলো ধীরগতি বা স্থবির হয়ে পড়ে। অনেক সময় ছোট একটি কাজ, যেমন ধরুন রাস্তাঘাট মেরামতের কাজ যথাসময়ে না হওয়ায় সমস্যাটা কয়েক গুণ বাড়ে। আর তাতে খরচও বাড়ে। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য বিশেষ করে মানুষের হয়রানি বন্ধ এবং জনগণের বহুমুখী প্রতিভা ও সৃষ্টিশীল স্পিরিটের পরস্ফুিটনের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য প্রয়োজন সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ এবং জেলায় জেলায় ‘জেলা সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তন; যারা নিজ দায়িত্বে দৈনন্দিন বহু কাজ সমাধা করবে এবং উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হবে। জেলায় জেলায় জেলা সরকার প্রবর্তনের আগে এ ব্যাপারে জনগণকে বোঝাতে হবে, এর ভালো-মন্দ বিশ্লেষণ করতে হবে এবং এজন্য আসন্ন বাজেটে নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন বৈকি।

ব্যাংকঋণ কেলেঙ্কারি আজ সর্বজনবিদিত, তবে প্রতিকার দরকার

ব্যাংকঋণ কেলেঙ্কারি আজ সর্বজনবিদিত। হাজার হাজার কোটি টাকা এর ফলে বেহাত হচ্ছে এবং ব্যাংক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলেছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য কী কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা এখনো জনগণ জানে না। আর কেউ কেউ কোনো কোনো ব্যক্তিবিশেষকে শাস্তি দিলেই মনে করেন, ব্যাংক কেলেঙ্কারি বন্ধ হয়ে যাবে। পত্রপত্রিকায় খবর বের হয়েছে, প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদালতে বছরের পর বছর আটকে আছে (দৈনিক প্রতিদিন, ২৪ মে, ২০১৮)। কেলেঙ্কারি হওয়ার পর ঋণ ফেরত না পেলে তখন আদালতে যাওয়া হয়। বরং কেলেঙ্কারি যাতে না হয় তার উদ্যোগ নেয়া জরুরি। বস্তুত, ব্যাংক কেলেঙ্কারি বন্ধের জন্য ‘কয়েকজন উদ্যোগী’ (যারা ১৯৭১ সালে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান) সুপারিশ করেছিলেন, ‘ডিজিটাল পোর্টাল’ তৈরি করে কোন কোন বাবদ বা কোলেটারালের বিপক্ষে কোন কোন ব্যাংক থেকে কত পরিমাণ ঋণ নেয়া হয়েছে, তা যদি তুলে ধরা যায় এবং সেই সঙ্গে ওই কোম্পানির ঋণের পরিমাণ মোট কত আছে বা হবে এবং এর অ্যাসেট কত আছে তা লিপিবদ্ধ করা যায়, তাহলে বিভিন্ন ব্যাংকের পর্ষদ যখন ঋণ দেয়ার কথা বিবেচনা করবে, তখন সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ পাবে এবং এর ফলে সুপারিশকারীদের ধারণা ব্যাংক কেলেঙ্কারি কমবে। তারা বিনা পয়সায় এ কাজটি করে কেলেঙ্কারি বন্ধে সাহায্য করতে চান। প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকে দুই বছর ধরে পড়ে আছে। এদের এ দায়িত্ব দিলে ব্যাংক কেলেঙ্কারি বন্ধের ন্যূনতম একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জনমনে আস্থার সংকট কমবে। বস্তুত, ব্যাংক কেলেঙ্কারি সরকারের বহু অর্জন ম্লান করে দিচ্ছে। আসন্ন বাজেট বক্তৃতায় ব্যাংক কেলেঙ্কারি বন্ধের জন্য সরকার কী কী উদ্যোগ নিয়েছে বা নেবে, তার বিবরণী থাকলে জনমনে আস্থা বাড়তে পারে।

অধিকতর চাকরি বা উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষ বরাদ্দ দরকার। দেশে বেকার শিক্ষিত যুবক-যুবতীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। দেশের এক-তৃতীয়াংশ জনগণের বয়স ১৮ থেকে ৩৩ বছরের মধ্যে এবং মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশ হচ্ছে ২৫ বছরের নিচে। অশিক্ষিত লোকের মধ্যে বেকারত্ব ৪-৫ শতাংশের বেশি নয় বলে বিভিন্ন তথ্যে প্রকাশ। তবে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাংলাদেশে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি এবং তা দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য বাজেটে স্কিল ডেভেলপমেন্ট ও উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারের বরাদ্দ ‘সিডমানি’ হিসেবে কাজ করতে পারে। উল্লেখ্য, এ বিরাটসংখ্যক উঠতি জনগোষ্ঠীকে যদি উপযুক্ত কাজে না লাগানো যায়, তাহলে যেমন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পাওয়া যাবে না এবং একই সময়ে এদের সমাজের বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। সুতরাং এ ব্যাপারে বাজেটে জোর দেয়া প্রয়োজন বোধ করি।

পুঁজিবাজার তুলনামূলকভাবে দুর্বল

আমাদের দেশে পুঁজিবাজার তুলনামূলকভাবে দুর্বল এবং জাতীয় বাজেটে বা জিডিপিতে এর অবদান অত্যন্ত কম— ২১ শতাংশ মাত্র। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে এ অবদান ৮৬ শতাংশেরও বেশি এবং থাইল্যান্ডে প্রায় ১১৭ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে এর অবদান ১৪০ শতাংশ এবং সুইজারল্যান্ডে ২২৯ শতাংশ। এ অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের গভীরতা কম। ফলে মেনিপুলেশন সহজ হয় এবং তালিকাভুক্ত বা লিস্টেড ভালো কোম্পানির সংখ্যা খুবই কম। এ সংখ্যা বাড়ানো উচিত। আসন্ন বাজেটে যেসব কোম্পানি নতুনভাবে তালিকাভুক্ত হবে, তাদের আগামী দুই বছরের জন্য আয়করমুক্ত করা হলে অনেকে হয়তো লিস্টেড হতে পারে। ন্যূনপক্ষে কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হলে ১৫ শতাংশ আয়কর যদি ছাড় দেয়া যায় তাহলে কিছু কোম্পানি লিস্টেড হতে পারে। তৃতীয়ত. সরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিদেশী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে তালিকাভুক্ত করার জন্য অনেকেই সুপারিশ করেছেন। তাছাড়া ব্যাংকের সুদের হার ও ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য যেসব বন্ড বাজারে ছাড়া হবে সেগুলোকে আয়করমুক্ত রাখার বিধান অনেক দেশেই আছে। সাম্প্রতিককালে চীনের শেনজেন-সাংহাই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্ট্র্যাটিজিক পার্টনারশিপ হওয়ায় অনেকে গেইন ট্যাক্স মওকুফের প্রস্তাব দিয়েছেন। গেইন ট্যাক্স মওকুফ প্রস্তাবটি গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে শর্ত থাকে, এই অতিরিক্ত পুঁজি যেন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হয়। এ টাকাগুলো বিদেশে পাচার বা বাজে খরচে যাতে না ব্যয় হয়, তার জন্য শর্ত জুড়ে দিতে হবে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে আইন আছে, যদি বাড়ি বিক্রি করে লাভ হয় তাহলে তার ওপর গেইন ট্যাক্স ধার্য হয়। তবে দুই বছরের মধ্যে ওই টাকাটা নতুন বাড়ি কেনার জন্য খরচ করলে গেইন ট্যাক্স দিতে হয় না।

বিদেশে টাকা পাচার বন্ধ করার উদ্যোগ প্রয়োজন

পত্রপত্রিকায় প্রায়ই খবর প্রকাশ হয়, বাংলাদেশীরা বিদেশে বেআইনিভাবে অর্থ পাচার করছে। বিভিন্ন দেশে যেমন— দুবাই, মালয়েশিয়া, বাহরাইন, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ইত্যাদিতে ‘বেগম পাড়া’ তৈরি হয়েছে। এ অবৈধ অর্থ পাচার যাতে না হয়, তার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। অবৈধ অর্থ পাচারের প্রকৃত তথ্য দিতে পারলে যে বা যারা এ তথ্য দিয়েছেন, তাদের পুরস্কৃত করার ঘোষণা দেয়া যেতে পারে। তথ্য প্রদানকারী স্বদেশী-বিদেশী নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান হতে পারে। তাছাড়া ওইসব দেশের সঙ্গে পার্টনারশিপ এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেসব বাংলাদেশী সেখানে বিনিয়োগ করেছেন, তার হিসাব-নিকাশ দেয়ার জন্য সে দেশের সরকারকে চাপ দেয়া যেতে পারে। উল্লেখ্য, কোনো মার্কিন নাগরিক বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে বা ব্যাংকে টাকা রাখলে তাকে তা মার্কিন আয়কর বিভাগকে জানাতে হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকও তাদের তথ্য সরবরাহ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

বাজেট ব্যবসাবান্ধব হওয়া প্রয়োজন

বাজেট ব্যবসাবান্ধব হওয়া প্রয়োজন এজন্য যে, ব্যবসায়ীদের অধিকতর বিনিয়োগ ছাড়া আমাদের ভিশনগুলো অর্জন সম্ভব নয়। দুঃখের বিষয়, এখন পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম, মাত্র ২৩ শতাংশ। একে দু-তিন গুণ বাড়াতে হবে এবং তা সম্ভব। দৃশ্যমান এবং বিশেষ করে অদৃশ্যমান অবকাঠামোগুলো যেমন আইন-কানুন, রীতি-নীতি, প্রসেস-প্রসিডিউর অর্থাৎ আমলাতন্ত্রের জটিলতা যদি দূর করা যায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অহেতুক হয়রানি বন্ধ করা যায়, বিনিয়োগের নিশ্চয়তা প্রদান করা যায় এবং জমি অধিগ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা লাঘব করা যায় তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগ অবশ্যই বাড়বে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ব্যবসা করতে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী ১৭৬ দিন লাগে, যেখানে মালয়েশিয়ায় লাগে ১৯ দিন। আমাদের সরকারি কর্মচারীরা কি মালয়েশিয়ার কর্মচারী থেকে বিদ্যাবুদ্ধিতে দুর্বল? নিশ্চয়ই না, তবে এমন অবস্থা কেন? তাছাড়া ব্যবসার সিকিউরিটি অবশ্যই নিশ্চিত করা চাই। এর সঙ্গে বিদেশে অর্থ পাচার ও ব্যাংক ব্যবস্থার সমন্বয়ও প্রয়োজন।

এপ্রিলের মধ্যেই বাজেটের টাকা বিলিবণ্টন সম্পন্ন করা প্রয়োজন

সম্পদের অপচয় ও দুর্নীতি কমানোর জন্য বাজেটে কিছু দিকনির্দেশনা থাকলে জনগণ খুশি হবে এবং দেশও উপকৃত হবে। দেশে ঝড়বৃষ্টি শুরু হলেই রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ি ও ড্রেনের কাজ শুরু হয়। এর মূল কারণ হলো, মে-জুনের শেষে বাজেট বছর শেষ হয় এবং বাজেটের টাকা শেষ করার জন্য এ তাড়াহুড়া। ফলে কাজ নিম্নমানের হয় এবং টাকাটা বিফলে যায়। বিভিন্ন তথ্যমতে, এতে প্রকল্পের ৩০ থেকে ৬০ শতাংশের মতো অপচয় হয় এবং জনগণের করের টাকা এভাবে যথেচ্ছভাবে অপচয় যাতে না হয়, তার জন্য ডায়নামিক পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। বস্তুত, এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন সরকারের বাজেটে বরাদ্দকৃত টাকা ১ বৈশাখ বা এপ্রিলের মধ্যেই বিলিবণ্টন সম্পন্ন করা।

সম্পদ আদায়ের নব নব উদ্যোগ

দেশে প্রতিদিন শত শত অনুষ্ঠান হয়। অধিকতর সম্পদ আহরণের জন্য ইভেন্ট ট্যাক্স আরোপ করা যেতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ব্যবস্থা চালু আছে।

যারা বাড়ি ভাড়া দিয়ে থাকেন, তারা এ থেকে কিছুটা আয়কর রেহাই পেলে নিশ্চয়ই খুশি হবেন। সুতরাং প্রত্যেক এনআইডিওয়ালা, যারা বাড়ি ভাড়া দিয়ে থাকেন, তারা কত টাকা বাড়ি ভাড়া দিয়েছেন, তার হিসাব আয়কর বিভাগকে জানালে এর ২৫ শতাংশ মওকুফ পাবেন বলে সরকারি আদেশ জারি হলে নিজ উদ্যোগে ভাড়াটিয়ারা তা সরকারকে জানাবে। এ অবস্থায় যারা বাড়ি ভাড়া দিয়েছেন তারা যেমন মওকুফ পাবেন এবং যারা বাড়ি ভাড়া নিয়েছেন তাদের আয়ের খবরটাও আয়কর বিভাগ অতি সহজে জানতে পারবে। এতে নতুন আয়ের সংস্থান সম্ভব। তাছাড়া বাড়িঘর ও জমি রেজিস্ট্রেশন বাবদ কর ‘মার্কেট রেটে’ করলে কয়েক হাজার কোটি টাকা সহজেই আয় সম্ভব এবং কালো টাকার ঝকমারিও কমবে।

বস্তুত, বাজেট প্রণয়নে দেশের ভিশনগুলো ভুললে চলবে না। বাজেট যদিও এক বছরের হালখাতা, তবে দেশের রূপকল্প অর্জনে এ এক বড় হাতিয়ার। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে, বাজেটের সঙ্গে দেশের অন্যসব নীতিমালা যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে বা সেভাবে ঢেলে সাজানো হয়, তাহলে এর কার্যকারিতা ও অর্জন অনেক শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ হবে। আর অন্যসব নীতিমালা পরস্পরবিরোধী বা সমন্বয়হীন হলে এর কার্যকারিতা দুর্বল হওয়ার শঙ্কা অধিক। সুতরাং সরকারকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

 

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি; চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান