প্রথম পাতা

অভিবাসন প্রত্যাশীদের ৫১% প্রতারণার শিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক | ০১:০১:০০ মিনিট, জুলাই ২০, ২০১৭

কাতারে অভিবাসী হওয়ার স্বপ্নে আত্মীয় হালিম মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন বাবুল আক্তার। এজন্য হালিম মিয়া তার কাছ থেকে টাকা নেন এবং কাতারে পৌঁছেও দেন। কিন্তু বিমানবন্দর থেকেই উধাও হয়ে যান হালিম মিয়া। পাঁচদিন পর বাবুল দেশে ফিরে এলেও পাওনা টাকা এখন বুঝে পাননি।

বাবুল আক্তার দেশে ফিরতে পারলেও প্রতারণার শিকার হয়ে বিদেশে গিয়ে আটকা পড়ার ঘটনাও কম নয়। পুরুষ কর্মীর পাশাপাশি নারী কর্মীরাও এসব প্রতারকের খপ্পরে পড়ছেন। এদের একজন বরগুনার শাহ আলম খানের স্ত্রী ছবি বেগম। সচ্ছলতার আশায় একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গত বছর পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যের দেশ লেবাননে। কাজ তো জোটেইনি, অন্যের পাসপোর্টে যাওয়ার কারণে ছবি বেগমের স্থান এখন দেশটির কারাগারে।

অভিবাসন প্রত্যাশীদের সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণা নিয়ে একটি গবেষণা করেছে বেসরকারি সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)। গতকাল প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনটিতে তারা দেখিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন প্রত্যাশীদের ৫১ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হচ্ছে।

জনশক্তি, কর্মস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাবে, দেশের যেসব জেলা থেকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শ্রমিক বিদেশে যান, তার মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে আছে টাঙ্গাইল। গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে যত সংখ্যক শ্রমিক বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন, তার ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ এ জেলা থেকে। জেলাটি থেকে গত ১০ বছরে কাজের উদ্দেশে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন ২ লাখ ৯০ হাজার ৭১৭ জন। গবেষণার জন্য তাই টাঙ্গাইলকেই বেছে নেয় রামরু। জেলার এলেঙ্গা ও পাইকোরার প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার পরিবারের ওপর জারিপ চালিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে রামরু।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতারণার শিকার ৫১ শতাংশের মধ্যে ১৯ শতাংশ মানুষ টাকা দেয়ার পরও বিদেশে যেতে ব্যর্থ হয়েছে। বাকি ৩২ শতাংশ প্রতারণার শিকার হয়েছে বিদেশে যাওয়ার পর। এতে তারা গড়ে ২ লাখ ৪৩ হাজার ২৪৭ টাকা করে হারিয়েছে।

রামরুর জরিপ অনুযায়ী, টাঙ্গাইলের পাইকোরা ইউনিয়নে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার থেকেই কেউ না কেউ অভিবাসী হয়েছে। এলেঙ্গায় এ হার ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এসব অঞ্চল থেকে প্রবাস ফেরতের সংখ্যাও কম নয়। ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবাস ফেরত মানুষ রয়েছে এ অঞ্চলে।

রামরুর চেয়ারপারসন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তাসনীম সিদ্দিকী এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রতারণার দায়ভার কেবল দালালদের কাঁধে দেয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রকেও এর দায় নিতে হবে। কোথায়, কীভাবে মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছে, তা তাদের খুঁজে বের করে সমাধান করতে হবে। এজন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় সহযোগিতা বাড়ানো ও দালালদের আইনের আওতায় আনার ওপর জোর দেন তিনি।

অভিবাসন প্রত্যাশীদের মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে বলে রামরুর গবেষণায় উঠে এসেছে। টাঙ্গাইলের দালাল সানোয়ার হোসেন জানান, জেলা শহরগুলোয় এজেন্সিগুলোর সাব-এজেন্সি না থাকায় অনেক দালাল প্রতারণার সুযোগ পাচ্ছে।

সাব-এজেন্ট প্রসঙ্গে জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সভাপতি বেনজীর আহমেদ বলেন, এজেন্সির মালিকরা সাব-এজেন্ট দিতে ভয় পান। কারণ এদের প্রতারণার দায় নিজেদের কাঁধে নিতে চান না তারা। আবার প্রতারিতরাও আইনের আশ্রয় নেন না। এতে প্রতারকদের বিচারের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। অভিবাসন প্রত্যাশীদের সরাসরি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক ভিসায় বিদেশ যেতে মাথাপিছু ব্যয় হয় ৪ থেকে ১০ লাখ টাকা। বড় অংকের এ ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই যায় মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের পকেটে। আবার দালালদের কারণে প্রতিনিয়তই ঘটছে অবৈধ অভিবাসন। এসব রুখতে অভিবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত দালাল বা মধ্যস্বত্ব্বভোগী বিলুপ্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অভিবাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর আওতায় সাব-এজেন্ট নিবন্ধন অথবা তালিকাভুক্ত প্রতিনিধি নিয়োগের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। শিগগিরই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এজন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) জাবেদ আহমেদের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। ওই কমিটি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ তৈরি করছে।

রামরুর গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জাবেদ আহমেদ বলেন, অভিবাসন প্রক্রিয়ার উন্নয়ন প্রয়োজন। এজন্য এ ধরনের গবেষণার তথ্য কাজে লাগবে। বিপুল সংখ্যক অভিবাসন প্রত্যাশীকে রিকল্পনামাফিক কাজে না লাগালে তারা বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

একই মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি চিফ কেএম আলী রেজা বলেন, এ ধরনের প্রতারণা রাতারাতি বন্ধ করা যাবে না। এজন্য রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া ঢেলে সাজাতে হবে। দালাল, এজেন্সিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩১ জন বাংলাদেশীর কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০১৫ সালে বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছিল ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮১ জন বাংলাদেশীর। সে হিসাবে গত বছর চাকরি নিয়ে বিদেশগমন বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। গত বছর চাকরি নিয়ে বিদেশ গেছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮ জন নারী কর্মী। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৭১৮।