সম্পাদকীয়

ফ্ল্যাট কেনার জন্য ঋণ ও বাস্তবতা

সৈয়দ ছলিম মোহাম্মদ আব্দুল কাদির | ২১:৪১:০০ মিনিট, জুন ০৪, ২০১৭

থাকার জন্য একটি ফ্ল্যাট যেন স্বপ্নের ঠিকানা। দেশের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত— সবারই ন্যূনতম চাওয়া একটি বাড়ি, ফ্ল্যাট তথা নিজস্ব ঠিকানা। মানুষ শান্তি চায় আর শান্তিতে থাকার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো একটি বাড়ি। আর তা নিজস্ব সামর্থ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ বিনিয়োগের মাধ্যমে ক্রয় করতে হয়, তবে উচ্চবিত্তের জন্য বাড়ি, ফ্ল্যাট কোনো কিছুই কেনার ক্ষেত্রে চিন্তা করতে হয় না। তারা নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশ ও বিদেশের উন্নত জায়গায় নিজেদের পছন্দমতো এক বা একাধিক বাড়ি কিনে থাকেন। প্রয়োজনের আলোকে অনেক সময় নিজস্ব বাড়ি ভাড়া দিয়ে হয়তো ক্ষেত্রভেদে অন্য জায়গায় নিজেও ভাড়া থাকেন, সেটা অবশ্য ভিন্ন কথা। সবকিছুই তাদের ইচ্ছাধীন হয়ে থাকে। অর্থাত্ স্বপ্নের ঠিকানা, ‘তাদের হাতের মুঠোয়’। তবে সমাজের উচ্চবিত্তের অধিকাংশই নিজস্ব বাড়িতেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

মধ্যবিত্ত ও  নিম্নমধ্যবিত্ত ব্যক্তির বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট কেনা হলো অনেকটা স্বপ্নের মতো, যা কিনতে হলে তার অনেক চিন্তা-ভাবনা করেই এগোতে হয়। তাদের সাধ আছে কিন্তু অনেক সময় সাধ্যে কুলায় না। সন্তান ও পরিবারের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ঢাকাসহ দেশের যেকোনো জায়গায় চাহিদা ও সামর্থ্যের আলোকে একটি বাড়ি নির্মাণের চিন্তা করেন। অনেক সময় তাদেরকে চিন্তার মধ্যে থাকতে হয়। চিন্তার বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে যায়। তাছাড়া সংসারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করার পর একটি বাড়ি করা সহজ কথা নয়। আর সব জায়গায় তাতে বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থও সংগ্রহ করা যায় না।

তবে সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নাগরিকদের অন্যতম চাহিদা থাকে বিভাগীয় শহর কিংবা জেলা শহরে পরিবার নিয়ে থাকার জন্য অন্তত একটি ফ্ল্যাট, যার জন্য তাকে অনেক পরিকল্পনা করতে হয়। ব্যাংকঋণ এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফিন্যান্স করপোরেশন স্বল্প সুদে ঋণ দেয়, কিন্তু অনেক সময় তাত্ক্ষণিক চাহিদা মেটানোর জন্য বেসরকারি ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানির দ্বারস্থ হতে হয়। ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছুটা অসতর্ক থাকলে কিংবা ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের শর্তগুলো যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে না পারলেই মহাবিপদে পড়তে হয়। ঋণ গ্রহণকারী ব্যক্তিকে গৃহীত ঋণের টাকা পরিশোধের পাশাপাশি অনেক টাকা সুদ হিসেবে প্রদান করতে হয়। অবশ্য সরকারি ব্যাংক কিংবা বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফিন্যান্স করপোরেশন থেকে ঋণ নিলে ভিন্ন কথা। সেক্ষেত্রে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করলে বাকি ঝামেলা খুব একটা থাকে না। কোনো কিস্তি সময়মতো না দিলে বাড়তি সুদ দিতে হয়। গ্রাহক তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেন।

মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে এ ধরনের ঝামেলা থেকে আমিও মুক্ত হতে পারিনি। বাস্তবতার নিরিখে তা বলার চেষ্টা করব। দৃঢ় বিশ্বাস যে, আমার মতো অনেক ভুক্তভোগীর এ ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তবে একটু সচেতন থাকতে পারলে ফ্ল্যাট কেনার জন্য ঋণ অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ হতে পারে।

পারিবারিক প্রয়োজনে ঢাকা শহরে ছোট আকারের একটি ফ্ল্যাট কেনার চিন্তা করি। এজন্য জমানো টাকার সঙ্গে আরো ১০ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে পাওয়ার আশায় ব্যাংকের দ্বারস্থ হই। এক পর্যায়ে একটি বেসরকারি হাউজিং ফিন্যান্স কোম্পানি ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে ঋণ দিতে সম্মত হয়। ফ্ল্যাট কেনার জন্য হাতে সময় কম থাকায় বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফিন্যান্স করপোরেশনে না গিয়ে উক্ত কোম্পানির সঙ্গে ২০১০ সালের ৮ নভেম্বর চুক্তিবদ্ধ হই। বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফিন্যান্স করপোরেশনে তখন কিছুটা কম সুদে ঋণ প্রদান করা হতো। চুক্তির শর্ত মোতাবেক সুদের হার যখন যা হবে, সে অনুযায়ী উত্তোলিত ঋণের সুদ প্রযোজ্য হবে। ভালো কথা, ১০ বছর মেয়াদি অর্থাত্ ১২০ কিস্তিতে তা পরিশোধের শর্তে রাজি হই। মাসিক কিস্তি ১৩ হাজার ৬৩৪ টাকা।

লিজিং কোম্পানিকে মাসিক কিস্তি দেয়া শুরু করলাম। দেখি কি, তিন মাস পরই সুদের হার বেড়ে ১৩ শতাংশ হয়ে গেল। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিন্তু লাভ হলো না। তাদের কথা, বর্তমানে সুদের হার বেশি, তাই চুক্তি অনুযায়ী তা আপনাকে দিতে হবে। এভাবে সুদের হার বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে ১৬ দশমিক ৭৫ শতাংশে এসে দাঁড়াল। আমি চিন্তা করলাম কীভাবে অতিরিক্ত সুদ থেকে বাঁচা যায়। এজন্য কিস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে প্রথমে ১৯ হাজার ২৩ ও পরবর্তীতে তা আবার ২৪ হাজার ৫১২ টাকা করি। দেখা গেল সুদ আর আশানুরূপ কমছে না। একপর্যায়ে এককালীন টাকাও জমা দিই। এতে কিছুটা কাজ হলো। সুদের পরিমাণ কমল। পড়ে বুঝলাম চুক্তির সময়ই মূল সমস্যা হয়েছে। তখন যদি ফিক্সড সুদে চুক্তি করতাম, হয়তো সুদের হার ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশের স্থলে বড়জোর ১২ শতাংশ হতো। যা হওয়ার হয়েছে, তা চিন্তা করে লাভ নেই।

এক পর্যায়ে খবর পেলাম, সুদের হার কমতে শুরু হয়েছে। খুশি হলাম, এবার হয়তো আমার বেলায় তা প্রযোজ্য হবে। কিন্তু যেভাবে বৃদ্ধির সময় সুদের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ত, কমার সময় তা আবার খুব ধীরগতিতে নামল। ২০১৫ সালের ২৭ এপ্রিল এসেও তা ১৪ শতাংশের নিচে নামল না। মজার বিষয় হলো, নতুন ঋণগ্রহীতাদের বেলায় তখন সুদের হার ক্ষেত্রভেদে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। নিয়মিত কিস্তি দেয়ার পরও সুদ কীভাবে আসত, তার একটি উদাহরণ দেয়া প্রাসঙ্গিক মনে করছি। জুলাই ২০১২ থেকে জুন ২০১৩ অর্থাত্ বছরে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬০৮ টাকা পরিশোধ করা হয়। তন্মধ্যে মূল টাকা ১২ হাজার ৩৫৮, সুদ ১ লাখ ৫১ হাজার ২৫০ টাকা, যা দেখে রীতিমতো আমার ভড়কে যাওয়ার অবস্থা।

এ অবস্থায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে মাসিক কিস্তি বাড়ানোর পাশাপাশি এককালীন টাকা জমা দেয়ার পরিমাণও বাড়িয়ে দিই। ২০১৫ সালের ২৭ এপ্রিল এককালীন ২ লাখ টাকা জমা দেয়া হয়।

তার পরও ২০১৫ সালের ৩০ জুন হিসাব অনুযায়ী সুদ হিসেবে আসে ১ লাখ ৭ হাজার ২৪৪ টাকা আর মূল টাকা ১ লাখ ২২ হাজার ৩৮৬ হয়, যা আমার গৃহীত ঋণ থেকে বাদ যায়। অবশেষে অনেক কষ্ট করে এককালীন অনেক টাকা একসঙ্গে জমা দিই। ২০১৬ সালের ২৭ মার্চ অবশিষ্ট ২৯ হাজার ১০৪ টাকা জমা দিয়ে এ হাউজিং কোম্পানি থেকে নিষ্কৃতি পাই।

ঋণ করে ফ্ল্যাট কিংবা বাড়ি কেনা ছাড়া মধ্যবিত্তের খুব একটা উপায় নেই। তবে এক্ষেত্রে সুদের হার নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার। আলাপ-আলোচনা করে সুদের হার নির্ধারণ করা দরকার। আর যারা সুদ দিয়ে বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট কিনতে চান না, তাদের বিষয়টি আলাদা। তারা নিশ্চয় নিজস্ব পরিকল্পনামাফিক এগোবেন। ঋণ গ্রহণ ছাড়া ফ্ল্যাট কিংবা বাড়ি করতে পারলে তো ভালো হয়। গত ১৯ এপ্রিল দৈনিক প্রথম আলোর একটি সংবাদ দেখি যে, বাড়ি নির্মাণে বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফিন্যান্স করপোরেশন থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়া হবে। বাড়ি নির্মাণে সুদের হার ৯ দশমিক ৫ শতাংশ, ফ্ল্যাট কেনায় ১০ শতাংশ। সংবাদটি পড়ে ভালো লাগল যে, সরকারি প্রতিষ্ঠান তো, গ্রাহক সুদের জাঁতাকল থেকে কিছুটা হলেও বাঁচবে। তবে অনেক সময় সহজে ও কম সময়ে ঋণ পাওয়ার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। তখন যেন সুদের হারের বিষয়টি মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া আবাসন খাত বিকাশের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংক, লিজিং খাতের ভূমিকাও ব্যাপক।

ঋণ ছাড়া স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণের চিন্তা করা মধ্যবিত্তের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই দুরাশা। এক্ষেত্রে সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছাড়া নিম্নবিত্তদের আর কোনো উপায় থাকে না। সুন্দর স্বপ্ন দেখা দোষের কিছু নয়। আমাদের প্রত্যাশা, দেশের আরো অনেক অগ্রগতি হবে। ২০২৪ সালে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। জিডিপির প্রবৃদ্ধিও প্রতি বছর বাড়ছে। আশা করি, একসময় নিম্নমধ্যবিত্ত, গরিব কিংবা সাধারণ নাগরিকদের থাকার জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা পর্যায়ক্রমে করার পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

 

লেখক: অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট