টকিজ

ওপারে গোয়েন্দানির্ভর ছবি মানেই বক্স অফিস হিট

এখানে কোনো উদ্যোগই নেই গোয়েন্দা কাহিনীনির্ভর ছবি বানানোর

অনন্যা দাশ | ২১:১৪:০০ মিনিট, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৬

জটিল রহস্যের জট, টান টান উত্তেজনা, মারদাঙ্গা ক্লাইমেক্স— কলকাতায় শীতকাল মানেই বক্স অফিসে গোয়েন্দা গল্পের রমরমা অবস্থা। প্রতি বছরের বড়দিনের ছুটিতে সিনেমা হলগুলোয় একখানা ফেলুদা কিংবা ব্যোমকেশ তো থাকবেই। মন্দ লোকদের হারিয়ে বাঙালি গোয়েন্দার তুখোড় বুদ্ধির জয়ের কাহিনী বারবার দেখলেও তেতো হয়ে যায় না দর্শক। উল্টো সবাই মিলে যেন এ সময়টার অপেক্ষায়ই থাকে নিজ নিজ ছেলেবেলায় ফিরে যেতে। এবারের ছুটির মৌসুমের মুক্তির জন্যও তাই সার বেঁধে আছে একগাদা রহস্য গল্প— অন্তর্লীন, কসৌলিতে ঘটা খুনের রহস্য; সন্দ্বীপ রায়ের ডাবল ফেলুদা, সত্যজিতের ছোট দুটো ফেলুদার কাহিনী সমাদ্দারের চাবি ও গোলকধাম রহস্যের মিশ্রণে তৈরি। অরিন্দম শীলের ব্যোমকেশ পর্ব, শরদিন্দুর অমৃতার মৃত্যু থেকে নেয়া ইত্যাদি। মোটকথা কলকাতার বক্স অফিসে এখন গোয়েন্দা গল্প থেকে ছবি বানালেই হিট। প্রযোজকরাও তাই বিখ্যাত সব গোয়েন্দা চরিত্রের বড় পর্দার স্বত্ব কিনে নেয়ার জন্য কোমর বেঁধে লেগেছে। আসুন একঝলকে দেখে নিই এখন পর্যন্ত কোন কোন ঘাঘু গোয়েন্দা বড় পর্দাও কাঁপিয়ে দিয়েছেন।    

        

সত্যজিত্ রায়ের ‘ফেলুদা’: বাঙালি গোয়েন্দার কথা বললেই সবার আগে মনে পড়ে ফেলুদা আর তোপসের জুটির কথা। ছাপা অক্ষরে ফেলুদার আবির্ভাবের প্রায় ৫০ বছর পুরো হতে চলল। তবু শুধু কলকাতাই নয়, অনুবাদের কল্যাণে ভারতজুড়ে, এমনকি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যাওয়া ফেলুদার জনপ্রিয়তায় আজো এতটুকু ঘাটতি পড়েনি। বড় পর্দায় ফেলুদার অভিষেক ঘটে সোনার কেল্লা ছবির মাধ্যমে, ১৯৭৪ সালে। সোনার কেল্লা দিয়েই পর্দায় প্রাণ পায় ৬ ফুট ২ ইঞ্চির পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এক বাঙালি গোয়েন্দা। আজ পর্যন্ত বহু অভিনেতাই অভিনয় করেছেন ফেলুদার চরিত্রে, কিন্তু এদের মধ্যে মনে গেঁথে থাকার মতো ফেলুদা ছিলেন সৌমিত্র চ্যাটার্জি। আবার এখনকার প্রজন্মের কাছে হয়তো সব্যসাচী চক্রবর্তীই ফেলুদা হিসেবে বেশি জনপ্রিয়।

 

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ব্যোমকেশ বক্সি’: ব্যোমকেশ প্রথম বড় পর্দায় আসাটা সত্যজিত্ রায়ের হাত ধরে, সেই সুদূর ১৯৬৭ সালে। তবু ব্যোমকেশের বিশ্বজুড়ে সমাদ্দারের পেছনে বাসু চ্যাটার্জির টেলিভিশন ধারাবাহিক, যাতে কিনা রজিত কাপুর ব্যোমকেশের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, সেটার ভূমিকাই বেশি। অন্য কোনো অভিনেতার তুলনায় ব্যোমকেশের ভূমিকায় কাপুরকেই যেন মানিয়েছিল বেশি। বাংলা ও হিন্দি সিনেমা মিলে ব্যোমকেশে সাজা

অভিনেতার তালিকাটাও নেহাত ছোট নয়। উত্তম কুমার থেকে শুরু করে হালের সুশান্ত সিং রাজপুত পর্যন্ত অনেক নামেরই দেখা মিলবে এ তালিকায়।

 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কাকাবাবু’: সৃজিত মুখার্জির মিসর রহস্য সিনেমায় কাকাবাবু রূপে দেখা প্রসেনজিত্ চ্যাটার্জি হয়তোবা বাংলা সিনেমাজগতে দেখা সেরা কাকাবাবু। খোঁড়া পায়ের প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ইতিহাস বিশেষজ্ঞ কাকাবাবু ওরফে রাজা রায় চৌধুরী। পর্দায় কাকাবাবুর এ চরিত্রটির রীতিমতো ন্যায়সম্মত রূপদান করেছে প্রসেনজিত্। এর আগেও অবশ্য কাকাবাবুকে নিয়ে ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’ নামে তপন সিনহা একটি সিনেমা তৈরি করেছিলেন। তাছাড়া কাকাবাবুর কাহিনী থেকে বেশ কয়েকটি টিভি ধারাবাহিকও তৈরি হয়েছে। কিন্তু সবদিক বিচার করলে পর্দায় কাকাবাবুকে নিয়ে করা সেরা কাজ এখন পর্যন্ত মিসর রহস্য।

 

নীহার রঞ্জনের গুপ্তের ‘কিরীটী’: নীহার রঞ্জনের বেশকিছু উপন্যাস অবলম্বনে এরই মধ্যে সিনেমা বের হয়ে গেছে। তাই তার সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র কিরীটীকে নিয়ে এত দেরিতে সিনেমা তৈরির ব্যাপারটা কিছুটা বিস্ময়করই মনে হতে পারে। এ বছরই প্রথমবারের মতো পর্দায় দেখা গেল কিরীটীর, ‘কালো ভ্রমর’ সিনেমায়। ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস হাতে ঘুরে বেড়ানো চুরুট ফোকা কিরীটীর মাঝে অনেকটা শার্লক হোমসের গন্ধ পাবেন অনেকে। শিগগিরই অবশ্য কিরীটীকে নিয়ে মুক্তি এর একটি ছবি ‘কিরীটী রয়’, যার কাহিনী সেতারের সুর থেকে নেয়া।

 

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘সবর দাসগুপ্ত’: গোয়েন্দা নয়, তার চেয়েও দুর্লভ, সত্ পুলিশ অফিসার। একাকিত্ব প্রিয় সবরের কাহিনী অবশ্য বেশ বাস্তবঘেঁষা, যা ঠিক শিশুদের উপযোগী নয়। নাম ভূমিকায় শাশ্বত চ্যাটার্জি অভিনয় করা সবরের রহস্য কাহিনীগুলোয় বেশ নতুনত্বের ছোঁয়া পাওয়া যায়।  

 

সমরেশ মজুমদারের ‘অর্জুন’: অর্জুনকে নিয়ে মাত্র একখানা সিনেমাই তৈরি হয়েছিল ২০১৩ সালে, ‘কালিম্পং এ সীতাহরণ’। অর্জুন ও তার গুরু অমল সোমের কাহিনী অবশ্য একটু ভিন্ন ধরনের। উত্তর বাংলার তরুণ অর্জুন ঠিক অমল সোমের সকারী নয়, বরং সে নিজেই রোমাঞ্চ খুঁজে বেড়ানো এক নায়ক।

 

সমরেশ বোসের ‘গোগোল’: খুদে গোয়েন্দা গোগোল স্বপ্ন দেখে মার্শাল আর্টসের। আবার জটিল সব রহস্য সমাধানে নিজের মাথা খাটানোতেও জুড়ি নেই তার। তার সর্বক্ষণের সঙ্গী ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস আর কম্পাস। এখন পর্যন্ত দুটো সিনেমা তৈরি হয়েছে গোগোলকে নিয়ে।

 

সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের ‘কর্নেল নীলাদ্রি সান্যাল’: রাজা সেনের পরিচালনায় ‘কর্নেল’ সিনেমার মাধ্যমে ২০১৩ সালে কর্নেল নীলাদ্রিকে পর্দায় নিয়ে আসেন চিরঞ্জিত। আর তার ঢিলেঢালা সহকারী জয়ন্তের চরিত্রে অভিনয় করেন সাহেব। জয়ন্তের ভাষায় বুড়ো ঘুঘু বলে পরিচিত।

          

নারায়ণ সান্যালের ‘প্রসন্ন কুমার বসু’: ফেলুদার সময়কার আরো জনপ্রিয় গোয়েন্দা, নারায়ণ সান্যালের উকিল গোয়েন্দা পিকে বসু। পিকে বসুকে নিয়ে তৈরি প্রথম ফিল্ম হয়ে ১৯৭৪ সালে, ‘যদি জানতাম’ যাতে পিকে বসু হয়েছিলেন উত্তম কুমার। পিকে বসুর কাহিনীগুলো আগাথা ক্রিস্টির রহস্য উপন্যাস থেকে বেশ প্রভাবিত।  

সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘মিতিন মাসি’: মিতিন মাসি ওরফে প্রজ্ঞাপারমিতা মুখোপাধ্যায়, বাসস্থান দক্ষিণ কলকাতা, আর ১০ জন বাঙালির মতো নিজের ডাকনামেই বেশি পরিচিত তিনি। চটপটে আধুনিক এ বাঙালি নারী একাধারে একজন মা, মাসি ও গোয়েন্দা। এ গল্প থেকে সিনেমা কিংবা টেলিভিশন ধারাবাহিক যা-ই তৈরি হোক না কেন, দর্শকদের মনোরঞ্জনের ঘাটতি হবে না।  

              

নলিনী দাসের ‘লু কোয়ার্টেট’: মার্কিন ছোটদের নারী গোয়েন্দা সিরিজ ন্যান্সি ড্রুর মতো এখানে গোয়েন্দা একজন নয়, বরং বাংলাদেশের রকিব হাসানের জনপ্রিয় কিশোর গোয়েন্দা সিরিজ তিন গোয়েন্দার মতো লু কোয়ার্টেটে গোয়েন্দা চারজন, তবে তারা সবাই মেয়ে গোয়েন্দা, ন্যান্সি ড্রুর সঙ্গে মিলটা এখানেই। এরা হলো: কালু, মালু, বুলু, তুলু— চার হোস্টেলবাসী স্কুলছাত্রী দলবেঁধে বিভিন্ন রহস্যের জটলা খোলার কাহিনী নিয়েই এ গোয়েন্দা ধারাবাহিক।

সূত্র: স্ক্রল ইন