বুধবার | জানুয়ারি ২৬, ২০২২ | ১২ মাঘ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

মৈত্রী

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী

২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ভারত বিজয় দিবসের ৫০ বছরে পদার্পণ উদযাপন করেছে। পরের দিন অর্থাৎ ১৭ ডিসেম্বর ভার্চুয়াল ব্যবস্থায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। ওই বৈঠকে দুই সরকারপ্রধান ২০২১ সাল তত্পরবর্তী এজেন্ডা নির্ধারণ করেন।

গত বছরের ২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডে অংশ নিতে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বিমানে বাংলাদেশ থেকে সশস্ত্র বাহিনীর ১২২ সদস্যের একটি কন্টিনজেন্ট ভারতে যায়। সেটি মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পদার্পণ সামনে রেখে।

এদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের জন্য গত বছরের ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী মোদি বাংলাদেশ সফর করেন। বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। বলতে গেলে দুই নেতা ২০০৯ সালের পর থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বহুমাত্রিক বাঁকবদল এনেছেন।

গত বছরের ডিসেম্বরের শীর্ষ বৈঠক ছিল গভীরতর সম্পৃক্তি, সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন, ইতিহাস-সংস্কৃতি-ভাষা এবং অন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্যের যৌথ বন্ধনভিত্তিক শক্তিশালী প্রতিবেশিতার সম্পর্ক বিনির্মাণের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ধারাবাহিকতা। দুই নেতাই পুনর্ব্যক্ত করেন যেবাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক ভ্রাতৃত্বসুলভ বন্ধনের ভিত্তিতে আবর্তিত এবং এতে সার্বভৌমত্ব, সমতা, আস্থা এমন বোঝাপড়ার প্রতিফলন হয়। বিচিত্র ধরনের সম্পৃক্ততা যেমন সংযোগ, বিদ্যুৎ জ্বালানি, উন্নয়ন সহযোগিতা, শিক্ষা সাংস্কৃতিক বিনিময়, সাইবার স্পেস, প্রতিরক্ষা ইন্টেলিজেন্সসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ঐকমত্য বিরাজমান। ঐকমত্যের ভিত্তিতে উভয়ই বহুমাত্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর।

প্রতিবেশিতা

বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে বড় অবদান আছে প্রধানমন্ত্রী মোদি সরকার কর্তৃক গৃহীত ভারতেরনেইবারহুড ফার্স্ট পলিসির। নীতির ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক আরো উন্নয়নের কার্যকর পথ-উপায়ের সন্ধান জোরালোভাবে করা হচ্ছে। ভারতের বৈরী চীন-পাকিস্তান অক্ষটি এক্ষেত্রে অবশ্য ব্যতিক্রম থেকেছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্র সমর্থিত সন্ত্রাসবাদ প্রকাশ্যে চীন সমর্থন করে এসেছে এবং চীনের সম্প্রসারণবাদী নীতি দুই দেশের (পাকিস্তান-ভারত) মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ অন্বেষণের সব ধরনের প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্র সমর্থিত সন্ত্রাসবাদ এবং চীনের সীমান্ত উত্তেজনা দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের অন্য জায়গায়ও সংঘাত-বিসম্ববাদ উসকে দিয়েছে। সেটি করেছে শান্তিপূর্ণ সম্পৃক্তি কার্যকর সহযোগিতা জলাঞ্জলি দিয়ে।

ভারতেরপ্রতিবেশী নীতিতেঐতিহ্যগতভাবেই পাকিস্তানের ওপরও ব্যাপক মনোযোগ দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি বাসে চড়ে লাহোরে গিয়েছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং (যার পারিবারিক শেকড় পাকিস্তানের চাকওয়াল জেলার গাহ এলাকায়) পাকিস্তান সফরে আকুল আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন, যদিও পাকিস্তান সুকৌশলে সেটি এড়িয়ে গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী মোদি লাহোরে নেওয়াজ শরিফের সঙ্গে দেখা করতে পাকিস্তানে একটি অঘোষিত সফর করেছিলেন এবং দিল্লিতে তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে নেওয়াজ শরিফকে অতিথি করেছিলেন।  

সর্বোচ্চ সদিচ্ছা নিয়ে ধরনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিষয়টি অনেকটা অধরা থেকে গেছে। ভারতের সঙ্গে স্বাভাবিক সর্ম্পক রাখার স্বপ্ন দেখা নেওয়াজ শরিফকে দেশটির সেনাবাহিনী চালিতডিপ স্টেটদেশ ছাড়তে বাধ্য করে। পাকিস্তান একটা করদ রাষ্ট্র (ক্লায়েন্ট স্টেট) হিসেবে চীনের দিকে ঝুঁকেছে এবং বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীরা যদি পাকিস্তানের ওপর দেয়া মনোযোগের অর্ধেক বাংলাদেশের প্রতি দিতেন তাহলে দেশটির সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো অনেকদূর এগিয়ে যেত বৈকি।

সংযোগ

তর্কাতীতভাবে স্বাধীনতার পর থেকে চলতি শতকের গত এক দশকে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অনেক বেশি অগ্রগতি ঘটেছে। আধুনিকায়িত সংযোগ এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যে, যে কেউ দিল্লিতে সকালের নাশতা, কলকাতায় দুপুরের খাবার এবং ঢাকায় রাতের খাবার খাওয়ার পরিকল্পনা করতে পারে। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যখন দিল্লি থেকে যাত্রীবাহী ট্রেন ঢাকায় আসবে। যাত্রা বা প্রস্থানস্থলে অভিবাসন কাস্টমস প্রক্রিয়া শেষে দিল্লি থেকে ঢাকা এবং ঢাকা থেকে দিল্লিতে দ্রুতগতির যাত্রীবাহী ট্রেন সুবিধা চালু করা অবাস্তব কাল্পনিক কোনো বিষয় নয়। এটি সম্ভব, যদি আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা-দোলাচল কাটাতে দুই দেশের সরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখায়। রেল সংযোগের অবকাঠামো উন্নয়নের অগ্রগতি কয়েক বছরের মধ্যেই বাস্তবে দৃশ্যমান হবে, বিশেষ করে যখন আখাউড়া-আগরতলা মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট লিংক অপারেশনাল হবে। পদ্মা সেতুর সর্বশেষ স্প্যান বসানো শেষ হয়েছে। এই বহুমুখী সেতু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের মধ্যে সংযোগ বদলে দেবে। দূরত্ব, সময় কমাবে। পণ্য পরিবহন মানুষের যাতায়াতের ব্যয় হ্রাস করবে। সেতুটি উন্মুক্ত হবে ২০২২ সালের জুনে এবং আশা করা হচ্ছে বাংলাদেশের জিডিপি - শতাংশ বাড়াবে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের উত্তরাংশের হলদিবাড়ী এবং পশ্চিমবঙ্গের চিলাহাটির মধ্যে পঞ্চম রেল সংযোগ উদ্বোধন করেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ব্রিটিশ আমলের আংশিক রেল সংযোগ পুনরায় স্থাপন করা হয়, পুনরুদ্ধার করা হয়। ঢাকা-কলকাতার মধ্যে সরাসরি প্রথম রেলসেবা মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু হয় ২০০৮ সালের এপ্রিলে এবং খুলনা কলকাতার মধ্যে বাঁধন এক্সপ্রেস চালু হয় ২০১৭ সালের নভেম্বরে। প্রয়োজনীয় গেজ অ্যালাইনমেন্টের পর পেট্রাপোল-বেনাপোল, গেদে-দর্শনা, সিঙ্গাবাদ-রোহানপুর রাধিকাপুর-বিরলে আন্তঃসীমান্ত রেল সংযোগস্থল তৈরি হয়েছে। আরো কিছু আন্তঃসীমান্ত রেল সংযোগস্থল আছে, যা পুনরুদ্ধার করা হবে। যা পণ্য, কনটেইনার যাত্রী পরিবহন সহজতর করবে। বর্তমানে বাংলা ভাগপূর্ব রেল সংযোগ পুনরুদ্ধারে সম্মত দ্বিপক্ষীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রেল সংযোগের কাজটি এগিয়ে যাচ্ছে।  

বাংলাদেশ ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় হাইওয়ে প্রজেক্টে যোগ দিতে আগ্রহী, যা দক্ষিণ এশিয়া আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে অতি প্রয়োজনীয় সংযোগের সুযোগ সৃষ্টি করবে। যেহেতু বাণিজ্য পর্যটন ধীরে ধীরে প্রাক-মহামারী পর্যায়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, সেহেতু পরিবহন ভ্রমণ ব্যয় কমাতে ব্যবসায়িক সম্প্রদায়/গোষ্ঠী থেকে ব্যাপারে বিশেষ চাহিদা রয়েছে। ভারতে ভ্রমণকারী বিদেশী পর্যটকদের সংখ্যায় বাংলাদেশীরা সবচেয়ে বেশি হতে যাচ্ছে।

নৌপথ

নদীভিত্তিক পরিবহনের একটিসহজ উপায়সম্পর্কে বাংলাদেশী প্রস্তাবসীমান্ত পারাপারে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই যেটি নদী ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতে নৌযান প্রবেশ এবং বাংলাদেশে পুনরায় প্রবেশে সাহায্য করবেভারতের দিক থেকে বিবেচনা করা হচ্ছে। গঙ্গার একটা অংশ (বাংলাদেশে পদ্মা নামে পরিচিত) নৌ-সীমানার একটা অংশ তৈরি করে। নদীটি এঁকেবেঁকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং বাংলাদেশের রাজশাহী জেলা দিয়ে আবার ভারতে প্রবেশ করেছে। ফলে ধরনের বাঁকদবল জেলে যাত্রীদের নদীর ওপর দিয়ে যাতায়াতে সমস্যা সৃষ্টি করে। কারণ এক নদীবন্দর থেকে যেকোনো দেশের আরেক নদীবন্দরে যেতে তাদের আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হতে হয়।

সময়ানুক্রমে আন্তঃসীমান্ত পরিবহনে নদীপথ সম্প্রসারণ হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী এবং এসব নদী যেখানে যেখানে নাব্যযোগ্য, সেখানে প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রেড অ্যান্ড ট্রানজিট ট্রিটির (পিআইডব্লিউটিটি) অধীনে নদীভিত্তিক সংযোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করবে। চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে কলকাতা থেকে আগরতলা পণ্যের ট্রান্সশিপমেন্ট এবং তার সঙ্গে সোনামুড়া-দাউদকানি আরেকটি নৌপথ পণ্য বাণিজ্য সহজতর করবে। বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত নেপাল) মোটর ভেহিকলস এগ্রিমেন্ট চালু করার চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় অপেক্ষমাণ। এটা বাস্তবায়ন হলে উল্লিখিত দেশগুলোর মধ্যে অনায়াসে যান চলাচলে সাহায্য করবে। অন্য কিছু সংযোগ প্রকল্প পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে হিলি (পশ্চিমবঙ্গ) মাহেন্দ্রগঞ্জের (মেঘালয়) মধ্যে সংযোগ স্থাপন। 

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

দুই দশক ধরে উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ নৈপুণ্যকারী অর্থনীতির একটিতে উন্নীত করেছে। যদি ভারতে প্রবৃদ্ধি হার কমে আসে, তাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে। এটি নিজেই দৃঢ়তা নেতৃত্বের একটা চমত্কার গল্প। স্বাধীনতার কিছুদিনের মধ্যেই দ্রুত বাংলাদেশ একটাবাস্কেট কেসথেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেছে। দারিদ্র্য বিমোচন, রফতানি নৈপুণ্যের মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে। এখন দেশটি উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সুপারিশ পেয়েছে জাতিসংঘের। কভিডের অভিঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরণ সহজগম্য করার জন্য দেশটি আরো পাঁচ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সাপোর্ট মেজারস পাওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছে। 

সীমান্ত ব্যবস্থাপনা

দুই দেশের মধ্যে হাজার ৯৭ কিলোমিটারের যৌথ সীমান্তের ব্যবস্থাপনা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বড় মাত্রার ইস্যু হয়ে আছে। আরো কিছুদিন থাকবে। ২০১৪ সালে স্থল সীমান্ত চুক্তি (এলবিএ) চূড়ান্ত হওয়ার পর মানচিত্র তৈরিসহ নদীর সীমানা নির্ধারণে ফলোআপ বাস্তবায়ন ব্যবস্থাগুলো চলমান রয়েছে। সীমান্তসহ আরো কয়েকটি ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে নদী সীমানা নির্ধারণের কাজটি করে। যেহেতু -দ্বীপ অঞ্চল তার পরিক্রমা পরিবর্তন করে, সেহেতু স্থির সীমানা অঙ্কন বা বর্ণনার বিষয়টি আলোচিত হবে জয়েন্ট বাউন্ডারি কনফারেন্সে। স্থল সীমান্ত চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন অবশ্যই উচ্চ প্রাধিকার দিতে হবে। সামগ্রিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা প্ল্যান (সিবিএমপি) উভয় দিকের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে অস্ত্র, মাদক, জাল মুদ্রা মানব পাচার রোধে-কমাতে সমর্থ করে তুলেছে। সন্ত্রাসবাদ উভয় দেশের জন্য একটা সাংবৎসরিক হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে। প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়ানো হয়েছে। মানুষের বৈধ চলাচল, যাতায়াত সহজতর করতে স্থলবন্দরের সঙ্গে অভিন্ন সীমান্ত স্ট্রিমলাইন করা হচ্ছে এবং বাকি থাকা বাধানিষেধ ধাপে ধাপে কমানো হবে। সীমান্তে বেড়া দেয়া এবং পরিবর্তনশীল নৌ-সীমানা নির্ধারণে দুই দেশই সম্মত হয়েছে। এগুলো হলো চলমান সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এজেন্ডা। বিরাজমান বিধিনিষেধ অপসারণ করে প্রতিষ্ঠিত সীমান্ত চৌকির মাধ্যমে মানুষের আন্তঃসীমান্ত চলাচলের উদ্যোগ নেয়া হবে। নিরাপত্তা সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম/তত্পরতা আরো সমন্বিতভাবে করার জন্য পুলিশ সদস্যদের জন্য সংলাপ সহযোগিতার একটি নতুন ফোরাম গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। 

দ্বিপক্ষীয় এজেন্ডায় সীমান্ত হত্যা একটি বিতর্কিত ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন কারণে প্রাথমিকভাবে নাগরিক সমাজের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে সীমান্তে নিজ নাগরিকের হত্যার ব্যাপারে (সাধারণত অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমকারী  বাংলাদেশী) বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবে বেশ সংবেদনশীল। আন্তঃসীমান্ত চোরাচালানে যুক্ত ভারতের নাগরিকরাও ভুক্তভোগী; যদিও বিপুল হত্যাকাণ্ডের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশীরাই বেশি, যেহেতু তাদের বেশির ভাগই মাফিয়াদের বাহক কিংবা চোরাচালান মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত। দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের ঘাটতি এবং আয়ের সহজ উৎসের জায়গা থেকে সীমান্তের পাশে বসবাসকারী মানুষ চোরাকারবারে জড়িত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ভারত উভয়ের দিক থেকে সীমান্তে অবৈধ কার্যক্রম অপতত্পরতা প্রতিরোধে আরো প্রচেষ্টা নিতে হবে। কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ভারত সরকার গরু চোরাচালান বন্ধ করেছে। উভয় পক্ষকেই চোরাকারবারের মূল কারণগুলো প্রতিরোধে দায়িত্ব নিতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এজন্য সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে দুর্নীতি শূন্যে নামিয়ে আনতে অবশ্যই কাজ করতে হবে।  

বাণিজ্য বিনিয়োগ

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। তবে বর্তমানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্ভাব্য প্রাক্কলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠন এবং বাণিজ্য বৃদ্ধিতে তাদের সুপারিশ বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। উভয় দেশই একটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (সিইপিএ) ব্যাপারে সম্মত হয়েছে, যা আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। এটি হলে পণ্য চলাচল-পরিবহন আরো দ্রুত অনায়াস হবে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত ভারতীয় ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে এবং বিবিআইএন দেশগুলোয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহযোগিতার একটি ফ্রেমওয়ার্ক উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, তার সুযোগ নিতে ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে।   

পানিবণ্টন

নদীর পানিবণ্টন একটা জটিল দীর্ঘ বিতর্কের ইস্যু। তিস্তার পানি ভাগাভাগি চুক্তি বেশ কিছুদিন ধরে আটকে আছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে সেটি হয়নি। এরই মধ্যে ছয় আন্তঃনদীর (যেমন মনু, মুহুরী, খোয়াই, গোমতি, ধরলা দুধকুমার) বিষয়ে একটা অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামো চূড়ান্ত করা দূরদর্শী কাজ। নদীর পানি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে আরো বেশি কাজ করতে হবে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, দূষণ পানিনিবিড় কৃষি অপ্রতিরোধ্যভাবে পানি বিনিময়ের প্যারাডাইম বদলে দিয়েছে। ভবিষ্যতের পরিকল্পনার জন্য এখন থেকে বহু দিকের ফ্যাক্টরগুলো মাথায় রাখতে হবে।  

অভিবাসন

ভারতে এনআরসি সিএএ করার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসনের বিষয়টি আরো জটিল হয়েছে। আসামে রাজনীতি, বিশেষ করে প্রাদেশিক নির্বাচনের রাজনীতি অবৈধ অভিবাসনের ইস্যুটি ঘিরে আবর্তিত হয়েছে এবং অমুসলিম অভিবাসীদের দ্রুত নাগরিকত্ব দেয়ার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। আসাম এবং ভারতের অন্য জায়গা থেকে বিপুলসংখ্যক অবৈধ অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ সত্য না- হতে পারে, কিন্তু আপত্তি একদম উড়িয়েও দেয়া যায় না। ভারত বাংলাদেশকে ব্যাপারে আশ্বস্ত করলেও এটি একটি বিবাদের কারণ হিসেবে রয়ে গেছে।

ভারতে হিন্দুদের বলপূর্বক অভিবাসনও একটি স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। দেশভাগের পর থেকে বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে কমেছে। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও হয়রানি অর্পিত সম্পত্তি আইনের (আগে পরিচিত ছিল শত্রু সম্পত্তি আইন) কারণে অব্যাহতভাবে হিন্দুরা দেশ ছেড়েছে। ১৯৭২ সালে ১৫ শতাংশ থেকে হিন্দু সম্প্রদায় এখন শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে। এটা কাম্য নয়। এটা ভারতের দিক থেকে একটা উদ্বেগের বিষয়। কাজেই বাংলাদেশ সরকারকে এক্ষেত্রে আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্বেগের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে আলোচনার ভিত্তিতে ভারত সরকারকেও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে।

রোহিঙ্গা ইস্যু

রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুটি বাংলাদেশে বাড়তি বোঝা সৃষ্টি করেছে এবং মিয়ানমারের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কে একটা কালো ছায়া ফেলেছে। বাংলাদেশের প্রত্যাশা যে ইস্যুর সমাধানে ভারত নেতৃত্বের ভূমিকা নেবে। কিন্তু তাদের সেই প্রত্যাশা অনেকটা অপূরণীয় থেকেছে। ইস্যুতে চীন ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছে, যদিও তেমন সফল হয়নি। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে তাত্ক্ষণিক কোনো প্রস্তাব নেই এবং শরণার্থীদের গ্রহণে মিয়ানমারেরও কোনো তাড়া নেই। যদিও তাদের প্রত্যাবাসনে অনেক কাজ করা হয়েছে, হচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ায় ক্যাম্পে আরো অনেক শিশু জন্ম নিয়েছে এবং তাদের সংখ্যায় যোগ হয়েছে। কাজেই ইস্যুটি সমাধানে ভারত সরকারকে আরো উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসা জরুরি।

চীন ফ্যাক্টর 

চীনের ভূমিকা এবং বাংলাদেশের চীনা কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা আগের চেয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়েছে। চীনের ‘অস্থিতিশীল উত্থান’ আর্থিক শক্তির পিঠে চড়ে দক্ষিণ এশিয়ায় আগ্রাসীভাবে প্রভাব বিস্তারের দিকে মোড় নিয়েছে। রাজনৈতিক অভিজাতরা আর্থিক প্রলোভনে সহজেই কুপোকাত এবং প্রভাব বাড়াতে চীন তার চেকবুক ডিপ্লোম্যাসি ব্যবহারে মোটেই দ্বিধান্বিত নয়। চীনের লক্ষ্য আধিপত্যমূলক আকাঙ্ক্ষা, বণিকী স্বার্থ এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে ভারতের পরিসর কমানো দ্বারা চালিত। পাকিস্তান-চীন সম্পর্কের ক্লায়েন্ট-প্যাট্রন সম্পর্ক হলো এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ভারতের সঙ্গে স্বার্থগত বিরোধী বৈরী চীন-পাকিস্তান অক্ষ বিনির্মাণে সাহায্য করেছে। এ অক্ষটি নিজেদের লক্ষ্য পূরণের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকেও ব্যবহারে আগ্রহী।

চীন এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোয় এই ‘সফল’ মডেল সম্প্রসারণ করতে চায়। সেদিক থেকে সম্ভাবনাময়ভাবে চীন ফ্যাক্টর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে, যদি বাংলাদেশ ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ অবমূল্যায়নে এটিকে ব্যবহার করা শুরু করে। চীনের ঋণ ফাঁদের কূটনীতিতে পা না দিতে বাংলাদেশ যতটা সম্ভব সতর্ক থেকেছে। এটা ইতিবাচক। শিলিগুড়ি করিডোরে বাংলাদেশ-চীন যৌথ অবকাঠামো প্রকল্প এবং সেখানকার স্পর্শকাতর ভূকৌশলগত পরিস্থিতি বরাবরই ভারতের উদ্বেগ হিসেবে রয়ে গেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীতে চীন একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে, যেহেতু দেশটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা হার্ডওয়্যারের প্রাথমিক সরবরাহকারী, সেহেতু তারা প্রশিক্ষণ বাদে ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বাংলাদেশের সামরিক খাতে খুব একটা ঢুকতে দেয় না। রাজনীতিতে হস্তক্ষেপে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষা খাতে সম্পৃক্তি গুরুত্বপূর্ণ, যদিও বাহিনীটি আরো অনেক পেশাদারি হয়েছে এবং রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছে।

উপসংহার

ঐতিহাসিক কারণে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের বন্ধন দীর্ঘস্থায়ী থাকবে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভবিষ্যত্ নেতৃত্বের পরিক্রমা এবং আবশ্যিকভাবে উত্তরাধিকার প্রশ্নটি সামনে আসবে। সামনে উত্তরাধিকার ইস্যুগুলো দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করবে। ১৯৯২ সাল থেকে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। তাদের দলের নেতৃত্ব কি পরিবারের মধ্যে থাকবে নাকি পরবর্তী প্রজন্ম থেকে অন্যরা নেতা হিসেবে আবির্ভূত হবেন, সেটি পর্যবেক্ষণের বিষয়। 

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সুবর্ণ সময়ের ভাষ্যের বাইরে গিয়ে আজকে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে তা হলো, বাংলাদেশ নিজেই চীনের সঙ্গে কতটা একীভূত হবে? পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নে চীনের বর্ধমান সামর্থ্য চূড়ান্তভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতবিরোধী লক্ষ্য চরিতার্থে বাংলাদেশকে নীতি প্রণয়নে রাজনৈতিক চাপ দেয়ার দিকে এগোবে দেশটি। তবে বাংলাদেশে চীনা পদক্ষেপের প্রভাব বদলাতে ভারতের যথেষ্ট শক্তি আছে এবং এ ভারসাম্যের কাজটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যত্ পরিক্রমা নির্ণয় করবে। যদি প্রতিভারসাম্য গ্রহণযোগ্যতার ব্যান্ডউইথের মধ্যে থাকে, তাহলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিপর্যয় থেকে সুরক্ষিত থাকবে। পারস্পরিক স্বার্থই সংবেদনশীলতার সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সামলাতে পারে এবং এক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের অবনমন ঠেকাতে পারে।

[ইংরেজি থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির]

 পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী: ভারতীয় কূটনীতিক

বাংলাদেশে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন